আ.লীগের সমালোচনায় মওদুদ, জবাব দিলেন তোফায়েল

0
77
Print Friendly, PDF & Email

প্রথমবারের মতো বিরোধী দলের উপস্থিতিতে গতকাল সোমবার সংসদে পাস হয়েছে চলতি ২০১২-১৩ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ‘নির্দিষ্টকরণ (সম্পূরক) বিল, ২০১৩’ উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।
এর আগে সম্পূরক বাজেটের ওপর সংসদে প্রাণবন্ত আলোচনা হয়। আলোচনায় বিএনপির নেতা মওদুদ আহমদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ এখন গণতন্ত্র চায়, কিন্তু বিরোধী দল চায় না। তাদের ধ্যানধারণা একদলীয় সরকারের।
জবাবে আওয়ামী লীগের নেতা তোফায়েল আহমেদ বলেন, যাঁরা সামরিক স্বৈরশাসনের অধীনে কাজ করেন, তাঁদের মুখে এ কথা শোভা পায় না। বিএনপি আন্দোলন-সংগ্রাম করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আদায় করতে পারবে না।
বিকেল পাঁচটায় স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অধিবেশন শুরু হয়। সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার সময় প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন।
আলোচনায় মওদুদ আহমদ শেয়ারবাজার, হল-মার্ক, পদ্মা সেতুর কথা উল্লেখ করে বলেন, এ সরকারের মেয়াদে মানুষের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি, গরিব আরও গরিব হয়েছে। এ সরকারের সময় হচ্ছে দেশের সবচেয়ে কলঙ্কময় অধ্যায়। মওদুদ আহমদ আরও বলেন, ‘জিয়াউর রহমান, খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক রহমান সম্পর্কে অশালীন বক্তব্য রাখবেন না। যদি এমন হয়, আমরাও পাল্টা জবাব দেব। কোনো কিছুই বিনা চ্যালেঞ্জে যাবে না।’
মওদুদ আহমদের বক্তব্যের জবাবে তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু বাকশাল কায়েম করেছিলেন। জিয়াউর রহমান সেই দলের সদস্য হতে আবেদন করেছিলেন। আবেদনটি আমার কাছে আছে। দেখতে চাইলে দেখাতে পারি।’ তিনি আরও বলেন, বাকশাল ছিল একটা ক্ষণস্থায়ী প্রক্রিয়া। একদলীয় শাসন থেকে কি সামরিক স্বৈরশাসন ভালো? যাঁরা সামরিক স্বৈরশাসনের অধীনে কাজ করেন, তাঁদের মুখে এ কথা শোভা পায় না। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা কি হাওয়া ভবন থেকে হয়নি? তিনি কি ভুলে গেছেন সেই ১০ ট্রাক অস্ত্রের কথা? ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, কীভাবে ১০ ট্রাক অস্ত্র কোথা থেকে খালাস করে কোথায় কোথায় পাঠানো হতো।’
এর আগে আলোচনায় অংশ নিয়ে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বলেন, দেশের উন্নয়নে এ সরকার কাজ করে। এ জন্য বড় আকারের বাজেট দিয়েছে, দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের বাজেট সব সময় অপচয়ের দিকে দেশের অর্থনীতিকে নিয়ে যায়।
সম্পূরক বরাদ্দ অনুমোদন: গতকাল সংসদে ২৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে মোট ১১ হাজার কোটি ৫৫ লাখ ১১ হাজার টাকার সম্পূরক বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়। এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রাক্কলিত বাজেটের চেয়ে সংশোধিত বাজেটে বেশি ব্যয় হয়েছে। চলতি অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল এক লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। অর্থবছর শেষে এসে সংশোধিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৮৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা।
সম্পূরক বাজেটে সর্বোচ্চ পাঁচ হাজার ৯৬৬ কোটি ৮১ লাখ টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে কৃষি খাতে। সবচেয়ে কম ৬২ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ অনুমোদন করা হয়েছে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ খাতে।
বিলের ওপর ২৯৯টি ছাঁটাই প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিরোধী দলের ১২ জন ও স্বতন্ত্র সাংসদ ফজলুল আজিম এসব প্রস্তাব দেন। এর মধ্যে পাঁচটি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে দেওয়া ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। প্রস্তাবগুলো দেন বিএনপির জয়নুল আবদিন, নাজিম উদ্দিন আহম্মেদ, জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, লুৎফুর রহমান, সৈয়দা আসিফা আশরাফী, আবুল খায়ের ভূঁইয়া, রেহানা আক্তার, এ এম মাহবুব উদ্দিন, রাশেদা বেগম, শহীদ উদ্দীন চৌধুরী, নিলোফার চৌধুরী, হারুনুর রশিদ ও স্বতন্ত্র সদস্য ফজলুল আজিম। তবে তাঁদের ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়।
বিলের ওপর আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘আমাদের প্রাক্কলন যথাযথ ছিল। অনেক সংসদ সদস্য বলেছেন, সামষ্টিক অর্থনীতি মারাত্মক দুর্বল। সামষ্টিক অর্থনীতি ভালো না হলে প্রাক্কলন ও সংশোধনের ব্যবধান এত কম হতো না। অতীতে কখনো ব্যবধান এত কম ছিল না।’
মুহিত বলেন, ‘আমার মনে হয়, অনেক সংসদ সদস্য সামষ্টিক ব্যবস্থাপনা বোঝেন না। তাঁরা না বুঝেই কথা বলেছেন। সামষ্টিক অর্থনীতি বুঝতে হলে বৈদেশিক বাণিজ্য, বৈদেশিক ঘাটতি আর উৎপাদনমূলক ব্যয়ের পার্থক্য দেখতে হয়। আমি যা শুনেছি, তাতে মনে হয়েছে যে না বুঝেই কথা বলেছেন।’
অশালীন ভাষা ব্যবহার করলে মাইক বন্ধের আহ্বান: সংসদে কেউ অসংসদীয় ও অশালীন ভাষা ব্যবহার করলে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর মাইক বন্ধ করে দেওয়ার জন্য গতকাল স্পিকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে সরকারি ও বিরোধী দল। তবে স্পিকার এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
সম্পূরক বাজেটের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাবের সময় বিএনপির সংরক্ষিত মহিলা আসনের সাংসদ রেহানা আক্তার, নীলোফার চৌধুরী ও সৈয়দা আসিফা আশরাফী দুই মন্ত্রীকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করে বক্তব্য দেন। তাঁরা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে ‘পাকিস্তানের পদলেহনকারী’, ‘অপ্রকৃতিস্থ’সহ বিভিন্ন মন্তব্য করেন। তাঁরা পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনিকে ‘হাইব্রিড মন্ত্রী’ উল্লেখ করে তাঁর বিদেশ ভ্রমণ নিয়েও কটাক্ষ করেন। এসব বক্তব্য সংসদে দফায় দফায় উত্তাপ ছড়ায়। সরকারি দলের সদস্যদের এ সময় হইচই করতে দেখা যায়।
এ পরিস্থিতিতে ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার মধ্যেই পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে সরকারদলীয় হুইপ আ স ম ফিরোজ অসংসদীয় শব্দ ব্যবহারের সময় সঙ্গে সঙ্গে মাইক বন্ধ করে দিতে স্পিকারের কাছে আহ্বান জানান।
এরপর বিরোধীদলীয় সাংসদ এম কে আনোয়ার ফ্লোর নিয়ে স্পিকারের উদ্দেশে বলেন, ‘কেউ অসংসদীয় ভাষা ব্যবহার করলে আপনার ক্ষমতা ব্যবহার করবেন। অশালীন ভাষা ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে আপনি মাইক বন্ধ করে দেবেন।’ এ ব্যাপারে তাঁরা সহযোগিতা করবেন বলে জানান।
সংসদের অধিবেশন আজ মঙ্গলবার বেলা তিনটা পর্যন্ত মুলতবি করা হয়।

শেয়ার করুন