বিশ্ব কাঁপানো প্রণয় কেলেঙ্কারি

0
276
Print Friendly, PDF & Email

কোনো মানুষই দোষ-গুণের ঊর্ধ্বে নয়। একজন মানুষ যত বড়ই হোক না কেন, রক্ত-মাংসের তৈরি আর সব মানুষের মতো তারও ভুলভ্রান্তি হতে পারে। একজন রাষ্ট্রপ্রধান বা বিখ্যাত কোনো লোকের অপরাধ কিংবা অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। পৃথিবীর ইতিহাসে সেই প্রাচীনকাল থেকেই বিখ্যাত মানুষদের নানা কেলেঙ্কারির গল্প মুখে মুখে রটে আসছে। রাজা, প্রিন্সেস কিংবা রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে ফিল্ম স্টার পর্যন্ত অনেকের জীবনেই কলঙ্কজনক ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনা সবসময়ই বিশ্বকে কাঁপিয়ে তোলে আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের করে বিব্রত। আজ আমরা পৃথিবীর ইতিহাসে আলোচিত এমন কতগুলো কেলেঙ্কারির কথাই জানব।

প্রিন্সেস ডায়না

ব্রিটিশ রাজপরিবারের বধূদের মধ্যে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন কেবল একজন। প্রিন্সেস ডায়না ও চার্লসের প্রেম ছিল সেরা রোমাঞ্চকর কাহিনী। ডায়নার পুরো নাম ছিল ডায়না স্পেন্সার। তাকে দেখেই তার রূপে মুগ্ধ হয়েছিলেন তৃতীয় চার্লস। চার্লসের দৃষ্টিতে ডায়না পৃথিবীর সেরা সুন্দরী। আর ডায়নার দৃষ্টিতেও প্রিন্স চার্লসই সবচেয়ে আরাধ্য পুরুষ। দুজন দুজনের প্রেমে মজে গেল। সারা বিশ্বে ঝড় উঠল। রানী এলিজাবেথ প্রথমে এ বিয়েতে অমত করলেও পরে রাজি হয়ে যান। ১৯৮১ সালের ২৯ জুলাই ধুমধামের সঙ্গে তাদের বিয়ে হয়ে গেল। বিশ্বের প্রায় ৫০০ কোটি মানুষ টেলিভিশনের পর্দায় উপভোগ করল সত্যিকারের এক রাজকীয় বিয়ে। সেই সময় প্রিন্স চার্লসের বয়স ছিল ৩২ আর প্রিন্সেস ডায়নার বয়স ২০। চরম উৎসাহ-উদ্দীপনা আর আনন্দের জোয়ারে শুরু হলো প্রিন্স চার্লস আর প্রিন্সেস ডায়নার নতুন জীবন। রাজকীয় জাহাজ ব্রিটানিয়াতে চড়ে হানিমুন করলেন তারা। সব ঠিকঠাক মতোই চলছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে ফিকে হতে লাগল সম্পর্ক। এর মধ্যে বিয়ের এক বছরের মাথায় ডায়না অনুভব করলেন চার্লস তাকে আগের মতো আর ভালোবাসে না। একান্তে সময় দিতে চায় না। একটু যেন বেশিই ব্যস্ততা দেখাচ্ছে। চাইলেই এড়িয়ে যায়। বিষয়টি এক দিন-দুই দিন করে বেশ ক’দিন ধরে খেয়াল করলেন ডায়না। এরপর প্রিন্সকে সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন এই অবহেলার কী মানে। প্রিন্স তখন এড়িয়ে গেলেন। ব্রিটেনের ভবিষ্যৎ রাজা হিসেবে তার ব্যস্ততার কথা বলে স্ত্রীর ভালোবাসাকে চেপে রাখলেন। আর এসব নিয়ে দুজনের মধ্যে দূরত্ব বাড়তে থাকে। দুজনেই দুজনকে সন্দেহ করতে থাকলেন। প্রিন্স চার্লসও ডায়নাকে নিয়ে নানা ঘটনা-রটনার খবর জানলেন। প্রায়ই এ নিয়ে কথা কাটাকাটি হতো। আস্তে আস্তে তাদের মধ্যকার দূরত্ব আরও বেড়ে গেল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে বিয়ের সাত বছর পর ঘটল মারাত্দক ঘটনাটি। ১৯৮৯ সালের প্রথম দিকে প্রিন্স চার্লসের হাতে এলো একটি টেপ রেকর্ড ক্যাসেট। তাতে দুটি কণ্ঠের সংলাপ। একটি নারীকণ্ঠ, অন্যটি পুরুষ। নারীকণ্ঠটি প্রিন্সেস ডায়নার। পুরুষকণ্ঠটি জেমস গিলাবের। চার্লস অনুসন্ধান করে জানলেন গিলাব ছিলেন ডায়নার বিয়ে-পূর্ব জীবনের বয়ফ্রেন্ড। আর এই কথোপকথনটি ওই সময়ের। সাইরিল রিনান নামে এক অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা এবং জেন নরগোভ নামে আরেকজন মিলে গোপনে আড়ি পেতে ডায়না ও জেমস গিলাবের কণ্ঠ ধারণ করেন। এরপর সেটি এক সময় প্রিন্স চার্লসের হাতে আসে। অল্প সময়ের মধ্যেই ক্যাসেটের বিষয়টি সবার নজরে চলে আসে। প্রকাশিত হয়ে পড়ে এই আলোচিত অডিও টেপটি। ক্যাসেট প্রকাশের পর সারা বিশ্বে আলোড়ন ওঠে। এর ছোঁয়া লেগেছিল রাজপ্রাসাদেও। সংসারে ভাঙনের সুর উঠল। ১৯৯২ সালের ৯ ডিসেম্বর ডায়না ও চার্লস আনুষ্ঠানিকভাবে আলাদা থাকার ঘোষণা দেন। এরপর অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মিসরীয় ধনকুবের ডোডি আল ফাহাদের সঙ্গে জড়ান ডায়না। কিন্তু খুব বেশি দিন দুনিয়ার বুকে টিকতে পারেননি সুন্দরী ডায়না। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ব্রিটেনের রাজপরিবারের অন্যতম সদস্য প্রিন্সেস ডায়না এবং তার বন্ধু মধ্যপ্রাচ্যের ধনকুবের ডোডি আল ফাহাদ প্যারিসে এক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছিলেন।

মনিকাগেট

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ও আলোচিত নারী কেলেঙ্কারির ঘটনাটি ঘটে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সময়। উইলিয়াম জেফারসন ক্লিনটন ছিলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪২তম প্রেসিডেন্ট। তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে ১৯৯৮ সালে মনিকা লিউনস্কির সঙ্গে যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে দারুণ বিপাকে পড়েছিলেন। ১৯৯৫ সালে মনিকা লিউনস্কির বয়স যখন ২২ বছর তখন ক্লিনটনের সঙ্গে তার সম্পর্ক তৈরি হয়। তাদের প্রেম বিশ্বব্যাপী তোলপাড় সৃষ্টি করে। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের সঙ্গে হোয়াইট হাউসের কর্মচারী মনিকা লিউনস্কির রসালো প্রেমকাহিনী জনসমক্ষে প্রকাশিত হওয়ার পর সবাই নড়েচড়ে বসেন। কারণ ওটাই ছিল ক্ষমতাসীন কোনো প্রেসিডেন্টের এ রকম নারী কেলেঙ্কারির প্রথম ঘটনা।

ক্লিনটনের বিষয়টি যতটা না ছিল স্ক্যান্ডাল, তার চেয়ে অনেক বেশি চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে। তবে রাজনৈতিক চড়াই-উতরাইয়ে যতটা না বেগ পেতে হয়েছে, সে রকমটা হয়নি সাধারণ মানুষের বেলায়। আশ্চর্যজনকভাবে মার্কিন জনগণ ছিল ক্লিনটনের প্রতি দারুণ সহানুভূতিশীল। কারণ সে সময় মার্কিন অর্থনীতির অবস্থা ছিল খুবই ভালো এবং বেকারত্বের হার ছিল নূ্যনতম পর্যায়ে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে একটা পজিটিভ রেসপন্স আদায় করে নিতে পেরেছিলেন ক্লিনটন। ১৯৯৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে চাকরি পায় লুইস এবং ক্লার্ক কলেজ গ্র্যাজুয়েট সুন্দরী মনিকা লিউনস্কি। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন তখন সপরিবারে এই রাজকীয় প্রাসাদে বাস করতেন। ২২ বছরের সুন্দরী মনিকার সঙ্গে অল্প সময়ের মধ্যেই সখ্য গড়ে ওঠে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের। একপর্যায়ে দুজনের মধ্যে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। গভীর প্রণয় চলাকালে মনিকা এবং ক্লিনটন নিয়মিত অভিসারে মিলিত হতেন। তাদের প্রেম এতটাই রসালো ছিল যে তারা হোয়াইট হাউসেই ৯ বার গোপন অভিসারে লিপ্ত হন। তার চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় এর মধ্যে পাঁচবার এ রকম অভিসারের সময় ক্লিনটনের স্ত্রী হিলারি ক্লিনটন হোয়াইট হাউসেই ছিলেন। কিন্তু তাদের এ অভিসারের খবর হিলারি তো দূরের কথা কাকপক্ষিও টের পায়নি। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে চাকরির সুবাদে মনিকার সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে তার সহকর্মী লিন্ডা ট্রিপের। আলাপচারিতার একপর্যায়ে মনিকা তার বিশ্বস্ত বন্ধু ও সহকর্মী লিন্ডাকে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার গোপন অভিসারের কথা জানান। ট্রিপ মনিকাকে এ সংক্রান্ত প্রমাণ ধরে রাখতে নানা পরামর্শ দেন। এখানেই ভুলটা করে বসেন মনিকা। গোপন কথা গোপনই রাখতে হয়। এই স্ক্যান্ডালের খবর প্রথম প্রকাশ্যে আসে ১৭ জানুয়ারি ১৯৯৮ সালে ড্রাজ রিপোর্ট ওয়েবসাইটে। এ বছরেরই ২১ জানুয়ারি দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট তাদের প্রধান প্রতিবেদন হিসেবে এই স্ক্যান্ডালের খবর প্রকাশ করে। এ প্রতিবেদনে জনগণের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

এ ঘটনা সত্য প্রমাণিত হওয়ার পর সিনেট সদস্যরা প্রেসিডেন্টের নৈতিক মান নিয়ে প্রশ্ন তুলে তাকে ইমপিচমেন্টের দাবি করেন। ক্লিনটনের ডেমোক্র্যাটিক পার্টির অনেক সদস্য ও বিরোধী রিপাবলিকানরা এ দাবি সমর্থন করেন। ফলে সিনেটে এ বিষয়ে ২১ দিন ধরে তুমুল বিতর্ক হয়। অবশেষে ভোটাভুটিতে ক্লিনটন জয়লাভ করেন। অর্থাৎ এ যাত্রায় প্রেসিডেন্ট ইমপিচমেন্টের হাত থেকে রক্ষা পান। হিলারি ক্লিনটন পুরো ঘটনায় স্বামীর পাশে থেকে স্বামীর মনোবল জোগান। পুরো ঘটনাটি মার্কিন ইতিহাসে মনিকাগেট কেলেঙ্কারি হিসেবে পরিচিত।

জন এফ কেনেডি

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুজব ছড়িয়েছে সম্ভবত জন এফ কেনেডির সময়। তার সময়ে ট্যাবলয়েড পত্রিকার গুজবগুলো সম্পর্কে কম-বেশি সবারই জানা আছে। তাকে সব সময়ই নারীঘেঁষা পুরুষ বলে মানা হতো। ১৯৫৩ সালে জ্যাকুলিনকে বিয়ে করার আগ পর্যন্ত কেনেডির গার্লফ্রেন্ডের কোনো লাগাম ছিল না। অবশ্য বিয়ের পরও অন্য নারীর প্রতি কেনেডির দৃষ্টির কোনো পরিবর্তন হলো না। তিনি মহিলাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চাইতেন এবং তাদের হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণও জানাতেন। তবে তার সময়ে বড় কোনো কেলেঙ্কারির ঘটনা ওই ভাবে প্রকাশ না পেলেও তার এই ছোক ছোক স্বভাবের কথা অল্প সময়ের মধ্যেই চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং আলোচনার জন্ম দেয়।

 জেফারসন ও শেলি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের মতো এতটা আলোচিত ও রগরগে না হলেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট টমাস জেফারসন ও শেলি হামিংয়ের মধ্যকার সম্পর্ক ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্টদের মধ্যে প্রথম কোনো যৌন কেলেঙ্কারির ঘটনা। আর এ ঘটনাটি এমনই আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয় যে, এ সংক্রান্ত গল্প এখনো মানুষ চর্চা করে। ১৮০২ সালে জেফারসনের চাকরানি শেলি তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পর্ক স্থাপন ও একটি সন্তানের পিতৃত্ব রক্ষার দাবি নিয়ে হাজির হন। জেফারসন এসব কিছুই অস্বীকার করেন এবং পরবর্তী ৭ বছরের জন্য প্রেসিডেন্টের ক্ষমতায় আসীন হন। তখনও এ নিয়ে বিতর্ক চলছিল। সব বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে ১৯৯৮ ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে শেলির অভিযোগটি প্রমাণিত হয় এবং জেফারসন শেলির একটি সন্তানের ভরণপোষণে বাধ্য হন।

 রাজা অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড

রাজা অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড প্রেমের জন্য সিংহাসন ছেড়ে বিখ্যাত হয়েছিলেন। ১৯৩১ সালের ১০ জানুয়ারি এক পার্টিতে প্রিন্স অব ওয়েলস অ্যাডওয়ার্ডের সঙ্গে তালাকপ্রাপ্ত এবং পুনর্বিবাহিত আমেরিকান নারী ওয়ালিস সিম্পসনের প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে। এরপর তাদের এই সাক্ষাৎ চলতে থাকে। ১৯৩১ এর মে, ১৯৩২ এর জানুয়ারিতে তাদের দেখা হয়। সে বছরই জানুয়ারিতে একটি দুর্গে অ্যাডওয়ার্ড ও সিম্পসন একত্রে পুরো একটি সপ্তাহ কাটান। ১৯৩৪ সালের আগস্টে সিম্পসনের স্বামীকে ছাড়াই অ্যাডওয়ার্ড তাকে নিয়ে ছুটি কাটাতে স্পেন ও পর্তুগালের উপকূলে ক্রুজে ভ্রমণ করেন। সে বছরই অ্যাডওয়ার্ড সিম্পসনকে বাকিংহাম প্যালেসে নিয়ে আসেন এবং তার মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। এরপর থেকেই এ দুজনকে ঘিরে ব্রিটিশদের মধ্যে নানা জল্পনা-কল্পনা ও গুজব ডালপালা মেলতে থাকে। ব্রিটিশ রাজপরিবারের অ্যাডওয়ার্ড আর তালাকপ্রাপ্ত পুনর্বিবাহিত নারী সিম্পসনের এই মেলামেশাকে কেউই ভালো দৃষ্টিতে নিল না। তবুও তাদের মধ্যকার নিষিদ্ধ প্রণয় থেমে ছিল না। ১৯৩৬ সালে অ্যাডওয়ার্ড যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তার এই প্রণয় নিয়ে লোকজনের মধ্যে কানাঘুষা শুরু হলো। এ সম্পর্কের ব্যাপারটি তখন ব্রিটেনের আকাশে-বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল আগের চেয়েও দ্রুত গতিতে। আর এসবের কারণে ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে তার স্বামী আর্নেস্ট সিম্পসনের সম্পর্কে চূড়ান্ত টানাপড়েন শুরু হলো এবং ওয়ালিস সিম্পসন স্বামীর কাছে ডিভোর্স চাইলেন।

১৯৩৬ সালের নভেম্বরে কিং অ্যাডওয়ার্ড প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলিকে জানালেন, তিনি সিম্পসনকে বিয়ে করতে চান। প্রধানমন্ত্রী রাজাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন ব্রিটিশ নাগরিকরা কোনোভাবেই তালাকপ্রাপ্ত আমেরিকান নারীকে তাদের রানী হিসেবে মেনে নেবে না। মাঝখানে অ্যাডওয়ার্ড ভিন্ন একটি প্রক্রিয়ায় সিম্পসনকে বিয়ে করতে চেয়েছিলেন। যে প্রক্রিয়ায় তাদের বিয়ে ঠিকই হবে কিন্তু সিম্পসন রানী হবে না। কিন্তু এই উদ্যোগ ধোপে টিকল না। অ্যাডওয়ার্ড বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। ফলে ১৯৩৬ সালের ১০ ডিসেম্বর অ্যাডওয়ার্ড আনুষ্ঠানিকভাবে সিংহাসন ছেড়ে দেন। পরবর্তী সময়ে ১৯৩৭ সালের মে মাসে অষ্টম অ্যাডওয়ার্ড ও ওয়ালিস সিম্পসন বিয়েবন্ধনে আবদ্ধ হন।

 

 অ্যান্ড্রু জ্যাকসন

প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে ১৯৭১ সালে অ্যান্ড্রু জ্যাকসনর‌্যাচেল ডোনেলসন নামক এক মহিলাকে বিয়ে করেছিলেন। তার আগেও বিয়ে হয়েছিল এবং ধারণা করা হয়েছিল যে, আইনসম্মতভাবে তার বিয়ে বিচ্ছেদ হয়েছে। কিন্তু জ্যাকসনের সঙ্গে বিয়ের পর তিনি দেখলেন ঘটনা আসলে তা নয়। র্যাচেলের স্বামী তার স্ত্রীর ব্যভিচারের বিরুদ্ধে আইনগত অভিযোগ উত্থাপন করেন। তখন জ্যাকসন আবিষ্কার করেন র্যাচেলের আইনসম্মতভাবে বিয়ে বিচ্ছেদ হয়নি। সে ক্ষেত্রে জ্যাকসন র্যাচেলকে বৈধভাবে বিয়ে করার জন্য ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। যদিও এটি ছিল প্রায় ৩০ বছরের পুরনো একটি ঘটনা, এরপরও ১৮২৮ সালের নির্বাচনে এ ঘটনাটি তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়। পরবর্তীতে র্যাচেলের অকাল মৃত্যুর জন্যও অ্যান্ড্রু জ্যাকসনকে দায়ী করা হয়।

 
উড্রো উইলসন

মার্কিন প্রেসিডেন্টদের কেলেঙ্কারির যত ঘটনা আছে, তার মধ্যে যৌনবিষয়ক ঘটনা কম ছিল না। কল্যাণমূলক ভাবনা ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখা মার্কিন প্রেসিডেন্ট, সমাজবিজ্ঞানী উড্রো উইলসনও কেলেঙ্কারির বাইরে ছিলেন না। তবে তার ক্ষেত্রে বিষয়টি মোটেও যৌন বা এ রকম কিছু ছিল না। এটি ছিল কেবলই একটি এনগেজমেন্টের ঘটনা। তার প্রথম স্ত্রী অ্যালেন লুইস অ্যাসন ১৯১৪ সালে মৃত্যুবরণ করেন। এর পরের বসন্তে উড্রো উইলসনের সঙ্গে এডি গাল্টের দেখা হয় এবং দুজনের মধ্যে একটি হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। এমনকি ধারণা করা হয়, তাদের এনগেজমেন্ট পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিল। তবে বিতর্কের সূত্রপাত ছিল এখানে যে, স্ত্রী থাকাকালীন থেকেই তাদের মধ্যে সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে সেটাকে শুধু জনসমক্ষে আনা হয়। অনেকের ধারণা, গাল্টকে বিয়ে করার জন্য প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন তার প্রথম স্ত্রীকে হত্যা করেছিলেন।

 
গ্রোভার ক্লেভল্যান্ড

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থিতার সময় থেকেই গ্রোভার ক্লেভল্যান্ডকে একটি কলঙ্কের বোঝা মাথায় বয়ে বেড়াতে হয়েছে। পরবর্তীতে প্রকাশ পায় যে মারিয়া সি হপলিন নামের এক বিধবার সঙ্গে গ্রোভার ক্লেভল্যান্ডের সম্পর্ক ছিল এবং তাদের একটি সন্তানও হয়েছিল। মহিলা দাবি করেন, ক্লেভল্যান্ডই এ শিশুটির পিতা এবং তিনি ছেলেটির নাম রেখেছিলেন অস্কার ফুলসোম ক্লেভল্যান্ড। গ্রোভার ক্লেভল্যান্ড অবশ্য শিশুটির পিতৃত্ব অস্বীকার করেননি। শিশুটিকে তিনি একটি এতিমখানায় পাঠিয়ে দেন। পুরো ব্যাপারটিতে ক্লেভল্যান্ডের সততা ও সত্যবাদিতা ছিল চোখে পড়ার মতো। তখন মার্কিন নির্বাচনে ক্লেভল্যান্ডের বিরুদ্ধে এ ঘটনাটিকে ব্যবহার করা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনিই বিজয়ী হন।

 
প্রিন্স চার্লস

পুরনো দিনের বয়ফ্রেন্ড জেমস গিলাবের সঙ্গে আলাপের অডিও টেপ শুনে প্রিন্সেস ডায়নার কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেন প্রিন্স চার্লস। কিন্তু ঘটনার তখন কেবল শুরু। প্রিন্স চার্লস নিজেও দুধে ধোয়া তুলসী পাতা ছিলেন না। ডায়নাকে অভিযুক্ত করে তিনি নিজে যে ঠিক ছিলেন, তা নয়। বরং স্ত্রীকে পাশে রেখেই চুটিয়ে প্রেম করে যাচ্ছিলেন দীর্ঘদিনের বান্ধবী ক্যামিলা পার্কারের সঙ্গে। বিষয়টি টের পেয়েছিলেন ডায়না। পরে জানা গেছে, এর প্রতিশোধ নিতেই গিলাবের সঙ্গে নিজেকে জড়িয়েছিলেন ডায়না। ক্যাসেট প্রকাশের পর এসব কথাই প্রিন্সকে বলতে চেয়েছিলেন ডায়না। কিন্তু চার্লস তাকে সে সুযোগ দেননি।

পরের ঘটনা আরও চমকপ্রদ। এবার ডায়না নিজেই প্রকাশ করলেন আরেকটা ক্যাসেট। যেটা চার্লস ও ক্যামিলার প্রেমালাপ। ধারণ করা হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে। ডায়না গিলাবে সংলাপের দুই সপ্তাহ আগের ঘটনা এটি। ডায়না গিলাবের সংলাপ ছিল প্রেমাকুতিতে ভরা।

কিন্তু চার্লস আর ক্যামিলার কথোপকথন ছিল নোংরা ও কুরুচিপূর্ণ যৌনাবেদনে ভরপুর। এসব কারণে এক সময় ক্যামিলার সংসার ভাঙে। আর ডায়নাও রাজপরিবার ত্যাগ করেন। পরবর্তীতে অবশ্য ব্রিটিশ রাজপরিবারে ডায়নার স্থলাভিষিক্ত হন ক্যামিলা।

সিলভিও বারলুসকোনি

ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই নানা কারণে আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছিলেন ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি। বিতর্ক যেন কোনোভাবেই পিছু ছাড়ছিল না তার। সবচেয়ে বড় বিষয় তাকে ঘিরে হওয়া বিতর্কগুলোর অধিকাংশই নারীকেন্দ্রিক। তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো মিডিয়ায় অকাট্য প্রমাণসহ উপস্থাপিত হয়। আর বিষয়টি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দেয়। সবার কাছে সবকিছু পরিষ্কার হওয়ার পরও সিলভিও বারলুসকোনি নিজে সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। কিন্তু এখানেই শেষ নয়। তিনি নিজে অস্বীকার করলে কী হবে তার স্ত্রী ভেরোনিকা ল্যারিও স্বামীকে ‘অসুস্থ মানসিকতার পুরুষ’ অভিহিত করে ডিভোর্স দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। সিলভিও বারলুসকোনির বিরুদ্ধে সবচেয়ে আলোচিত অভিযোগ ছিল ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী ব্যালে ড্যান্সারের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করা। রুবি রুবাকুওরি নামের ওই কিশোরী ড্যান্সার বারলুসকোনির কাছ থেকে উপহার হিসেবে ৭ হাজার ইউরো এবং একটি ডায়মন্ড নেকলেস নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও অনৈতিক সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। এই নারীর বিরুদ্ধে চুরি-চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরেও বিচিত্র অভিযোগে অভিযুক্ত হয়েছেন ইতালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিলভিও বারলুসকোনি। তিনি নাকি এখনো তার জমকালো পার্টিতে সঙ্গ দেওয়া নারীদের জন্য প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অর্থ খরচ করেন। যৌন কেলেঙ্কারি, অবৈধ সুবিধা গ্রহণ ও কর ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগের মুখে ৭৬ বছর বয়সী বারলুসকোনি গত বছর পদত্যাগে বাধ্য হন।

অষ্টম হেনরি

রাজা অষ্টম হেনরির ঘটনা ব্রিটিশ রাজপরিবারের কেলেঙ্কারির পুরনো ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। এ কালের রাজা-রানী বা রাজপুত্র এর উদাহরণ টেনে নিজেদের দোষ আড়াল করতে চাইলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। রাজপরিবারে কেলেঙ্কারি থাকবেই। ঘটনা রাজা অষ্টম হেনরির আমলের। আর তিনি ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছেন তার ছয় স্ত্রীর কারণে! হেনরির প্রথম স্ত্রী ছিলেন ক্যাথরিন। ১৫০৯ সালে তাকে বিয়ের ২৪ বছর পর তালাক দেন হেনরি। মজার ব্যাপার হলো, ক্যাথরিন ছিলেন হেনরির ভাই আর্থারের বিধবা স্ত্রী। ওই বছরই হেনরি অন্তঃসত্ত্বা নারী অ্যানি বোলিনকে বিয়ে করেন। এ দম্পতির ঘরেই জন্ম হয় এলিজাবেথের। ১৫৩৬ সালের ১৯ মে রাজার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও আদেশ অমান্যের অভিযোগে অ্যানির মুণ্ডুপাত করা হয়। ওই মাস শেষের আগেই হেনরি জেন সেইমোরকে বিয়ে করেন। অ্যাডওয়ার্ডের জন্মের বছরখানেকের মধ্যেই জেনের মৃত্যু ঘটে। এরপর হেনরি জার্মান প্রিন্সেস অ্যান অব ক্লেভসের পোট্রেট দেখে তার প্রেমে পড়ে যান। ১৫৪০ সালে তার সঙ্গে হেনরির বিয়ে হয়। তবে সেটি খুব বেশি দিন টেকেনি। ১৫৪০ সালের জুলাইয়ে হেনরি অ্যানি বালিনের কাজিন ক্যাথরিন হাওয়ার্ডকে বিয়ে করেন। এ বিয়েও বেশি দিন টিকল না। তাকেও অ্যানি বালিনের মতো অভিযুক্ত করে মুণ্ডুপাতের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। পরের বছর ১৫৪১ সালে ক্যাথরিন পার হেনরির ষষ্ঠ স্ত্রী হলেন। তিনিই ১৫৪৭ সালে হেনরির মৃত্যু পর্যন্ত তার স্ত্রী ছিলেন।

 

আর্নল্ড সোয়ার্জনেগার

তার উত্থান অনেকটাই স্বপ্নের মতো। প্রথম জীবনে একজন বডিবিল্ডার হিসেবে খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছান তিনি। এরপর হলিউডের টিকিট নিয়ে আস্তে আস্তে সাফল্যের মুকুট পরিধান করেন। আর হলিউড অভিনেতা থেকে আর্নল্ড সোয়ার্জনেগার ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর বনে যান। তার জীবনের সবকিছুই ঠিকঠাক চলছিল। কিন্তু একটি কেলেঙ্কারিতে সব এলোমেলো হয়ে যায়। আর্নল্ড সোয়ার্জনেগার নিজ বাড়িতে থাকা দীর্ঘদিনের গৃহপরিচারিকার সঙ্গে স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়েন।

গৃহপরিচারিকা মিলড্রেড প্যাট্রিসিয়ারের সঙ্গে সোয়ার্জনেগারের ১৪ বছর বয়সী একটি পুত্রসন্তান আছে। মিলড্রেড নিজে তাদের স্ক্যান্ডালটি প্রকাশ করেন। একপর্যায়ে টার্মিনেটর খ্যাত সোয়ার্জনেগার অভিযোগ স্বীকার করে নেন। আর সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ গতিতে খবরটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ভক্তদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সোয়ার্জনেগারের স্ত্রী মারিয়া শ্রীভার দীর্ঘ ২৫ বছরের সংসার ছেড়ে চলে যান।

সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন

শেয়ার করুন