তারেক জিয়া: বিএনপি-আ.লীগের টার্মকার্ড!

0
61
Print Friendly, PDF & Email

স্বাধীন বাংলাদেশে দুইজন নেতার প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক পটভূমিতে যেমন তাৎপর্যপূর্ণ ছিল, তেমনি রাষ্ট্রের জন্যও অপরিহার্য ছিল।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারিতে পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে ফেরেন ‘মহানায়ক’ হয়ে। আর তারই মেয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১/১১ সরকারের জেল-জুলুমের হুমকি মাথায় নিয়ে দেশে ফেরেন ৭ মে ২০০৭।

একই বছরের জুলাই মাসের ১৬ তারিখে শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করা হয়।

এই দুই মহান নেতার পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সহযোগিতায় পাকিস্তানের আরেক গণধীকৃত নেতা গোলাম আজমের (এই অর্থে, তখনও তিনি পাকিস্তানের পাসপোর্ট বহন করতেন) প্রত্যাবর্তন দেশমাতাকে মেনে নিতে হয়েছে।

এই গণধীকৃত নেতা দেশের স্বাধীনতাকামী নিরীহ মানুষকে গণহত্যা, গণধর্ষণ, লুটতরাজসহ বহুবিধ মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আজ বিচারের মুখোমুখি। এখনও তিনি স্বাধীনতাবিরোধী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যমণি।

পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার প্রথমবারের শাসন আমলেই গোলাম আজমকে স্বাধীন বাংলাদেশের পাসপোর্ট দেওয়া হয়।

সাম্প্রতি, লন্ডনে বিএনপির ভাইস-প্রেসিডেন্ট তারেক জিয়ার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের রাজনীতিতে আরেক নতুন উপাদান যোগ হলো। বিশেষ করে আদালত কর্তৃক ইন্টারপোলের মাধ্যমে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির ফলে তারেক জিয়া ইস্যুটি এখন রাজনৈতিক মহলসহ সাধারণ জনগণের কাছেও বেশ কৌতূহলোদ্দীপক হয়ে উঠেছে।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে যে, তারেককে ফিরিয়ে আনতে দল যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। অচিরেই দেশে ফিরে দলের নেতৃত্ব দেবেন তারেক জিয়া। পাশাপাশি বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তারেক রহমানের প্রতি অনেক অন্যায় করা হয়েছে।

তার বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলো আইনগতভাবে মোকাবেলা করবে বিএনপি। ঢাকার একটি জনপ্রিয় কাগজে প্রকাশিত হলো যে, খালেদা জিয়া নাকি মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজীনাকে বলেছেন, খুব শিগগিরই তারেক জিয়া দলের নেতৃত্ব নেবে। তিনি কানাডা ও জার্মানির রাষ্ট্রদূতদের অনুরোধ করেছেন, তারা যেন সরকারকে বলে তারেককে হয়রানি না করতে।

তাই, বলা যায়, বাংলাদেশ আরেক নেতার প্রত্যাবর্তনের অভিজ্ঞতা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। অনেক কারণেই তারেকের প্রত্যাবর্তনটি দেশের অভিজ্ঞতার ভাণ্ডারে বৈশিষ্ট্যগতভাবে নতুন। চারটি কারণে এ তরুণ নেতার প্রত্যাবর্তন দেশে আগে যেসব নেতার প্রত্যাবর্তন ঘটেছিল, সেগুলির চেয়ে বৈশিষ্ট্যগতভাবে আলাদা।

প্রথমত, ১/১১ সরকারের সময় একটি রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে মুচলেকা দিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ না করার শর্তে তারেক জিয়া লন্ডনে গেছেন চিকিৎসার জন্য।

দেশে তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলাসহ অনেক ধরনের মামলা থাকা সত্ত্বেও আইনি প্রক্রিয়া এড়িয়ে লন্ডনে একটি রহস্যজনক ও অস্পষ্ট জীবনযাপন করছেন। বেশ কিছুদিন ধরে বিভিন্ন সংবাদ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানা গেল যে, তিনি সেখানে রাজনৈতিক আশ্রয়ে আছেন এবং দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, তারেক জিয়া একাত্তরের চেতনাবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির আশ্রয়দাতা প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ছেলে, যার ওপর তার বাবার তৈরি করা রাজনৈতিক দল বিএনপির ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে বলে বিএনপির তরুণ প্রজন্মের বিশ্বাস।

নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব ও সরকারি দলের নানাবিধ রাজনৈতিক কৌশলের কারণে দলটি এখন অন্ধলোকের মতো দিগহারা। তাই, তারেকের সক্রিয় রাজনীতিকে উপলক্ষ করে যদি দলটি প্রাণ ফিরে পায়, এই আশা নিয়ে দিনাতিপাত করছে দলটির একাংশ।

পাশাপাশি বিএনপির মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম প্রতিক্রিয়াশীল, নিরেট স্বাধীনতার চেতনা ধারণকারী ও উদারমনা অংশের নেতাদের আবার গুরুত্বহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিএনপির এ অংশের গুরুত্বহীন হয়ে পড়ায় দলের ওপর সম্ভাব্য কী প্রভাব পড়তে পারে, তাও তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিবেচনায় নিতে হবে।

তৃতীয় কারণটি হলো, তারেক জিয়া দুর্নীতি, মানি লন্ডারিং, রাজনৈতিক সন্ত্রাস ও ধর্মীয় উগ্রবাদসহ বহু অপকর্মের সঙ্গে জড়িত বলে বিভিন্ন মহলের বিশ্বাস। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুর্নীতির অভিযোগ সব দলের বিরুদ্ধেই কমবেশি আছে। কিন্তু সরকারের পাশাপাশি হাওয়া ভবন থেকে আলাদা ছায়া সরকার গঠন করে দুর্নীতির অভিযোগ একমাত্র তারেক জিয়ার বিরুদ্ধেই। সত্যিকার অর্থেই ‘হাওয়া ভবন’ হয়ে উঠেছিল দুর্নীতিসহ নানা অপকর্মের সমার্থক।

সর্বশেষ যে কারণটি তা হলো, তারেক জিয়ার রাজনীতিতে এসে বিএনপির হাল ধরার ব্যাপারে খোদ মার্কিন প্রশাসনসহ পশ্চিমা দুনিয়ার স্পষ্ট আপত্তি আছে। ইতোমধ্যে, বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে এ সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে।

পশ্চিমা দুনিয়া মনে করে যে, বাংলাদেশে উগ্রবাদী/জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থানের পেছনে তারেক জিয়ার ভূমিকা ব্যাপক। বাংলাদেশের ইতিহাসে একমাত্র তারেক জিয়া ছাড়া দেশের আর কোনো রাজনীতিবিদ মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক করার দুঃসাহস দেখায়নি। এমনকি তারেক জিয়াকে খোদ মার্কিন প্রশাসনও আমেরিকার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।

তারেক জিয়া বিএনপির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলে বাংলাদেশে যে উগ্রবাদী/জঙ্গিবাদী শক্তিগুলি যে, নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে, সেটা পশ্চিমা দুনিয়ার মূল ভাবনার বিষয়।

তারেক জিয়ার দেশে প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে দুটি সম্ভাবনা আছে। প্রথমত তিনি নির্বাচনের আগে একটি রাজনৈতিক সুবিধামতো সময়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করতে পারেন। আর দ্বিতীয় যে সম্ভাবনাটি আছে, তা হলো জেল-জুলুম থেকে নিজেকে দূরে রাখা। দেশে না ফিরে লন্ডন থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেন। কারণ, জেলের অভিজ্ঞতা তারেক জিয়া দ্বিতীয়বার না নেওয়ার অনেক রাজনৈতিক ও পারিবারিক কারণ আছে। সে কারণগুলো হয়ত আরেকটি লেখায় আলোচনা করা যাবে।

প্রথম সম্ভাবনাটির পেছনে যে মূল কারণটি আছে, তা হলো- তারেককে দেশে এনে দলকে পুনরুজ্জীবিত করা। সন্দেহ নেই বিএনপির বর্তমান কেন্দ্রীয় রাজনীতি এখন দেশের একটি জেলার রাজনীতির মতো বহু দলে উপদলে বিভক্ত। অবিশ্বাসের ছোবল দলটিকে এমন পর্যায়ে নিয়ে গেছে, যা কেবলই হাস্যকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, কিছুদিন আগে স্থায়ী কমিটির সভা চলার ঠিক আগ মুহূর্তে খালেদা জিয়ার অফিস কর্মকর্তারা স্থায়ী কমিটির নেতার কাছ থেকে প্রতিবাদ করা সত্ত্বেও বেগম জিয়ার সামনেই মোবাইল ফোনগুলো জব্দ করেন। কারণ হিসেবে বেগম জিয়া বলছিলেন- সভার তথ্য নাকি বাইরে চলে যায়!

বিএনপির সর্বোচ্চ নেতারা প্রায় সবাই জেলে। হরতাল করতে হচ্ছে, শুধু সংবাদ সম্মেলন করে। সারাদেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষার বিপরীতে গিয়ে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্তদেরকে কোমর বেঁধে আশয়-প্রশয় দিচ্ছে, তা দলটির জন্য ক্যান্সারস্বরূপ। মানবতাবিরোধী অপরাধীদের রায়ের পর দেশব্যাপী মন্দির-মসজিদের ওপর হামলা, অগ্নিসংযোগ, মানুষহত্যা এবং সর্বশেষ ৫ মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মোড়কে যে জঙ্গিবাদী কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসী দেখলো, তাতেও যে বিএনপির রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ছিল, তা সবার কাছেই পরিষ্কার।

লাশের সংখ্যা নিয়ে কুরাজনীতিও যে দলটির জন্য শুভ হয়ে দাঁড়ায়নি, তাও দলটি বুঝতে ব্যর্থ। একটি দল কতটুকু অসহায় হলে এই প্রযুক্তির যুগেও গুজবনির্ভর রাজনীতি করতে চায়, তা সহজেই অনুমেয়।

সরকারের বিরুদ্ধে অনেকে জনপ্রিয় ইস্যু থাকা সত্ত্বেও বিএনপি প্রতিক্রিয়াশীল দলগুলির সমান্তরাল পথচলার জন্যই সরকারের বিপক্ষে কোনো গ্রহণযোগ্য আন্দোলন তৈরি করতে পারেনি। এমনকি বিএনপির আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য  একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধীদের বাঁচানো, এমনও এখন সাধারণ জনগণ মনে করে।

এমতাবস্থায় খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপির বর্তমান রাজনীতি বহু প্রশ্নের মুখোমুখি। তাই, তারেক জিয়ার আগমণ বিএনপিতে নতুন প্রাণ, উদ্দীপনা ও আগ্রহ যোগাবে বলে অনেকেরই ধারণা।

দ্বিতীয় সম্ভাবনাটি হলো- তারেকের দেশে না ফেরা। সরকার যে তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে বদ্ধপরিকার, তা বিএনপির হাইকমান্ড বুঝে গেছে। তাকে গ্রেফতারের বিষয়ে সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে ইতোমধ্যে পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। সরকারের এই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তটি যে চিন্তাভাবনা প্রসূত, তা সহজেই অনুমেয়।

সরকার তাকে গ্রেফতার করে বিএনপিকে এমন চাপে ফেলতে চায়, যেন কেয়ারটেকার পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করার উপস্থিত শক্তিটুকুও হারাতে হয় বিএনপিকে।

তারেক জিয়াকে গ্রেফতারের পরে বর্তমান সাংগঠনিক অবস্থায় দল হিসেবে বিএনপি রাজপথে কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, তার দুর্নীতিতে পরিপূর্ণ ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সহায়ক ভূমিকার বিপরীতে জনগণই বা কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে, কিংবা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কী প্রভাব পড়বে, তা সরকার বিচার-বিশ্লেষণ করেই এগুচ্ছে বলে মনে হয়।

সরকার জানে, এখন বিএনপির একমাত্র ভরসা তারেক জিয়া। বিএনপির অনেক নেতাকর্মী হয়ত ভাবছে যে, তাদের নেতা আসার সময় লাখ লাখ লোক গিয়ে বিমানবন্দরে শুভেচ্ছা জানাবে। এ বিষয়ে ভালো একটি অনুমান হলো যে, তারেক জিয়াকে নেতাকর্মীরা নয়, বিমানবন্দর থেকে আনতে যাবে পুলিশ।

সরকার জানে, তারেক জিয়াকে কাবু করলে বিএনপির আপাতত আর কোনো শক্তি থাকবে না। পাশাপাশি দেশে একটি বড় জনগোষ্ঠী যারা সরকারের বিভিন্ন শাসনগত ত্রুটির জন্য অসন্তুষ্ট, তারেকের গ্রেফতারের ফলে আদর্শিক কারণে সরকারকে বাহবা দেবে। তারেক জিয়ার বিষয়ে সরকারের এ ভূমিকাটি বিএনপিকে সবচেয়ে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলছে। সরকারের কঠোর মনোভাব ছাড়াও আরও কিছু রাজনৈতিক উপাদান বিবেচনায় নেওয়া যায় দ্বিতীয় সম্ভাবনার বিষয়ে।

রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি রাজপথের চেয়ে ড্রয়িং রুমেই মানানসই। সামরিক ছাউনিতে বহু আদর্শিকমনা লোকদের নিয়ে গঠিত বিএনপি রাজপথের আন্দোলনে সক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যর্থ। বরং বর্তমানে অপপ্রচার, গুজব, ধর্মীয় উগ্র গোষ্ঠীর ওপর নির্ভর করে রাজনীতি করাটাই যেন তাদের মূল রাজনীতি। আর তাই মাঠের রাজনীতি থেকে এসি রুমের রাজনীতির চর্চা তারেক জিয়াকে কতটুকু রাজনৈতিক সাহস দেবে, দেশে ফিরে এসে তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কীভাবে মোকাবেলা করবে, তা এখন দেখার বিষয়।

দৃশ্যত, এখন তারেক জিয়া সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের কাছেই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য টার্ম কার্ড।

শেয়ার করুন