নায়ক থেকে খলনায়ক!

0
85
Print Friendly, PDF & Email

আন্তর্জাতিক মঞ্চে কী অবিশ্বাস্য, নাটকীয় আবির্ভাব হয়েছিল তাঁর! সেই রূপকথার সাক্ষী হয়ে আছে কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠ। টেস্ট ক্রিকেটের দীর্ঘ ইতিহাসে নিজের নামটি লিখিয়েছিলেন সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে, সেটিও অভিষেকেই! সেই মোহাম্মদ আশরাফুল, বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম মহা তারকা, বাংলাদেশের ক্রিকেটের একাধিক গৌরবময় আখ্যানের জনক আশরাফুলের আজ এ কী পরিণতি! এখনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। কিন্তু আকসুর কাছে তিনি নিজ মুখেই সব দোষ স্বীকার তো করেছেনই। এরই মধ্যে আজ মঙ্গলবার সাময়িকভাবে নিষিদ্ধও হয়ে গেলেন। মাথার ওপর ঝুলছে আরও বড় শাস্তির খড়্গ।
মাত্র ১৭ বছর বয়স। গা থেকে কৈশোরের গন্ধ পুরোপুরি মুছে যায়নি। তখনই জাতীয় দলের প্রত্যাশার ভার জোয়াল হয়ে চেপে বসেছিল তাঁর কাঁধে। ধীরে ধীরে পাড়ার ছোট্ট মাঠের অচেনা আশরাফুল থেকে এক সময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। আশরাফুলকে ‘আশরাফুল’ হয়ে উঠতে দেখার একদম কাছের সাক্ষী প্রথম আলোর ক্রীড়া সম্পাদক উত্পল শুভ্র ১ জুন প্রতিবেদনে লিখেছেন, ‘চোখের জল আড়াল করতে হচ্ছে কয়েক দিন ধরেই। মোহাম্মদ আশরাফুলের প্রসঙ্গ উঠলে সব সময় তা করতেও পারছি না। কলম্বোর সিংহলিজ স্পোর্টস ক্লাব মাঠে আশরাফুল ষাটের ঘরে যাওয়ার পর থেকেই প্রেসবক্সে দাঁড়িয়ে। অভিষেকেই সেঞ্চুরিটা হবে তো, হলেই তো ইতিহাস—টেস্ট ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরি! সেই সেঞ্চুরি হলো, প্রেসবক্সের নিয়মনীতি ভুলে গিয়ে গলা ফাটিয়ে চিত্কার দিলাম। এখন কোন আশরাফুলকে মনে রাখব?’
সকালের সূর্যোদয় হয়তো সব সময় দিনের সঠিক পূর্বাভাস দেয় না। আশরাফুলও তাঁর প্রতিভার প্রতি সব সময় সুবিচার করতে পারেননি। কিন্তু তার পরও তাঁর ব্যাটে রচিত হয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অসাধারণ কিছু কাহিনি। সেই টেস্ট অভিষেকেই সেঞ্চুরি তো আছেই, কার্ডিফে তখনকার মহাপরাক্রমশালী অস্ট্রেলিয়াকে বধ করেছিল ১০১ বলে তাঁরই ১০০ রানের ইনিংসটি। পরের ম্যাচেই নটিংহামে ইংল্যান্ডের বোলারদের নাকের জল-চোখের জল এক করে দিয়েছিলেন ৫২ বলে ৯৪ রানের বিস্ফোরক এক ইনিংস খেলে। ২০০৪ সালে চট্টগ্রাম টেস্টে ভারতের বিপক্ষে ১৫৮ রানে অপরাজিত থাকা সেই অসাধারণ ইনিংসটিও চোখে ভেসে আছে সবার।
এসব টুকরো স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে উত্পল শুভ্র লিখেছিলেন, ‘বললে তো আরও কতই বলা যায়! ২০০৭ বিশ্বকাপে গায়ানার আশরাফুল, সে বছরই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে জোহানেসবার্গের আশরাফুল… বাংলাদেশের ক্রিকেটে প্রথম বড় সব সাফল্যেই তো আছেন আশরাফুল। তামিম ইকবাল সেদিন কথায় কথায় বলছিলেন, “আশরাফুল ভাইকে আমি বলি বাংলাদেশের ক্রিকেটের প্রথম প্রেম। প্রথম প্রেম যেমন কোনো দিন ভোলা যায় না, আশরাফুল ভাইকেও মানুষের চিরদিন মনে থাকবে।”’
এ দেশের মানুষকে অনেকবারই আনন্দে ভাসিয়েছেন আশরাফুল। অনেকবার হতাশও করেছেন। আশরাফুল এ দেশের মানুষের হাসি-কান্না-আনন্দ-হতাশার সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। তিনি এভাবে লোভের ফাঁদে পা দেবেন, এটা এখনো অনেকেরই যেন বিশ্বাস হচ্ছে না। বিশ্বাস করা কঠিনই। তবে এটাই বাস্তবতা, আশরাফুল নিজেই আকসুর কাছে সব দোষ স্বীকার করেছেন বলে প্রথম আলোর কাছে শক্ত প্রমাণ আছে।
আপাতত সাময়িক নিষিদ্ধ হলেন। আসল শাস্তি আরও কঠোর বা কঠিন হতে পারে। এমনও শোনা যাচ্ছে, কমপক্ষে পাঁচ বছরের জন্য নিষিদ্ধ হতে পারেন তিনি। সেটাও যদি হয়, আশরাফুলের অন্তত আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ‘এলিজি’ লেখার সময় এসে গেছে। ২৯-এর দোর গোড়ায় দাঁড়িয়ে আছেন। নিষেধাজ্ঞা পেরিয়ে ৩৪ বছর বয়সে আবার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরবেন—বাংলাদেশের ক্রিকেটের বাস্তবতা তা বলে না।
হায় আশরাফুল!

শেয়ার করুন