লোকটা

0
145
Print Friendly, PDF & Email

ওই যে লোকটা মেছো হাটায় ঘুরছে, চলুন না ওকে একটু নেড়েচেড়ে দেখি। ধরা যাক ওর নাম ওয়াহাব। সংসারি  তো বটেই, তা-না হলে এই গিজ গিজে ভিড়ে কী করতে আসে? একটা হাত ছেঁড়া-ময়লা পেন্টের পকেটে সেঁধিয়ে ঠোঁট নাড়ছে কেন? তবে কি ও বাজারের ফর্দটার সঙ্গে পকেটের তাকত ঠাওরাচ্ছে।

লোকটা মাছ বাজারে এসে দুনিয়া ত’ল্য পুরোনো আর জরাজীর্ণ হ্যাংলা-পাতলা শরীরটা নুয়ে পরা বাঁশের মতো বাঁকিয়ে বলে: গোলশার ভাগা কতো?

নিকিরি এক আঁজলা পানি ছিটিয়ে মাছের ডালাটা হাতিয়ে দিলো, মাছগুলো আরেকটু উজ্জ্বল আর আধিক্যের উছিলায় মোহনীয়। সে ঠোঁট দুটো নেড়েও থেমে যায়।
: পঁচিশ… বলেই পিছু হটতে শুরু করে। তার বিবেচনায় কিছু বেশিই বলা হয়েছে। নিকিরি গোঁফের তলে ভাঙা কাচের মতো ধারালো হাসি। তার দুই কান গরম হয়ে ওঠে। উদগারের মতো ঘেন্না লাগে।

লোকটা শরীরের সর্বত্র কাচ-কাটা কষ্ট নিয়ে নিকিরির সামনে থেকে সরে আসে।

রুই-কাতলার ডালাটার সামনে দাঁড়াতে এক ফোঁটা মকদুর নেই, সে চোরা চোখে চেয়ে চেয়ে সরে গেলো, ইচা-চান্দা-পুঁটির সাম্যময় অঞ্চলে। এখানে সে সাহসে ভরসা পায়, কিছুটা স্বস্তিও; কিন্তু পাশের ডালার মস্ত, তেজি পাঙাস দুটো খুব আফাল করছে। এটাই বোধকরি ওর মনোযোগে গঞ্জনা দেয়।

বাম পাশের তিন-তিনটে ডালায় জিয়ল মাছ। নাহ, কৈ মাছগুলো তাদের কঠিন কানকো আর দাঁড়ার কাঁটাগুলো দিয়ে জগৎটাকে বুঝি আস্ত রাখতে চাইছে না। আর ঐ শিং মাছগুলো…

ওয়াহাব পকেটে হাত সেঁধিয়ে একটা কুড়ি টাকার, দুটো পাঁচ টাকার, তিনটে দুটাকার এবং জেবের এক কোণে ডুব দিয়ে বসে থাকা এক টাকার এতিম কয়েনটায় হাত বুলিয়ে ওম লয়।

ডান সারির বোয়াল, গ্রাস কার্প, কমন কার্প, সরপুঁটি আর বাইন মাছের ডালাগুলো যেন ওকে ঠেলে দেয় শুঁটকির মহলায়।

খরধার আর বিচিত্র একটা গন্ধের ঘূর্ণী তাকে টান দিয়ে আপন করে নেয়। টাকি, শোল, গজার, টেংরা, কেচকি, চেপা-হিদল প্রত্যেকরই রূপ-গন্ধের ফুটানিতে তার জিভ চনমন করে ওঠে।

দেখুন না ওয়াহাব কেমন সরে যাচ্ছে, অনেকটা কেটে পড়ার মতলব। হতে পারে ও এখন মাছ বা শুঁটকি না কিনে, তরকারি কিনবে। শীতের বাজারে যেমনটা হয়, বাখর পাতা থেকে শুরু করে অধুনা শংকর প্রজাতির কোয়াশ লাউ তক হরেক কিসিমের দীর্ঘ সারি ঘুরে ঘুরে সে খুঁটিয়ে দেখে, দরদাম করে। তর্ক বা মলামলিতে না জড়িয়ে কেমন সাউদের মতো স্বচ্ছন্দে হাঁটে।

তাজা আনাজের হালকা-বিচিত্র গন্ধে তার বদন কোমল হয়ে ওঠে। পেঁয়াজ-মরিচ আর নানান মসলার ঝাঁঝালো গন্ধ এবং হাঁস-মুরগির বিটলা দুর্গন্ধ নিতে সে আদপেই রাজি নয়, তা না হলে ও-দিকটা না মাড়িয়ে ওয়াহাব কেন টমেটোর পেলবতা দুচোখে মেখে ঘেমে ওঠা হাতটা পকেট থেকে বের করে নিজের অবয়বের জীর্ণতাটুকু ঘষে মেজে দেখছে… ভাবছে… আর অলিগলি ঘুরে পথটা খুঁজছে, যে পথে সে এই হাটের ভিড়ে সেঁধিয়ে পড়েছিল। এমন তো হতে পারে, সে হাটের গলিতে পা রাখার আগে যে ইচ্ছাটি পোক্ত করে নিয়েছিল সেটিই এখন জেহেনে নেই। এত লোকের জটলা, এত বিচিত গন্ধ, চেতন-অচেতনের বহুমাত্রিক কথকতা আর কামুকের মতো শুমারহীন ভোগ্যপণ্যের চাপে বোধকরি তার আদত ইচ্ছাটিই মরে কাঁই হয়ে গেছে।

শেয়ার করুন