মুসলমানদের প্রতি মিয়ানমারের বৈষম্যমূলক নীতি

0
84
Print Friendly, PDF & Email

জাতিদ্বেষ যেন মিয়ানমার সরকারের চরিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংখ্যালঘুদের প্রতি দেশটির শাসক শ্রেণীর বীতশ্রদ্ধ মনোভাব আর আক্রোশ অন্তহীন। এর প্রমাণ মিলেছে মুসলিম জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য সরকারের নতুন পদক্ষেপে।
দেশটির সরকার সম্প্রতি ঘোষণা করেছে, সংখ্যালঘু রাখাইন মুসলমানেরা দুটির বেশি সন্তান জন্ম দিতে পারবে না। সরকার বলছে, মুসলমানদের ওপর বৌদ্ধদের আক্রমণ বন্ধে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
‘দ্য গার্ডিয়ান’-এর এক প্রতিবেদনে আজ বলা হয়েছে, সরকারি কর্মকর্তারা মনে করছেন, সংঘাতপূর্ণ রাখাইন প্রদেশে মুসলমানদের জন্য ‘দুই সন্তাননীতি’ জারির মধ্য দিয়ে বৌদ্ধদের সঙ্গে মুসলমানদের বিদ্বেষ কমে আসবে।
কর্মকর্তারা বলেছেন, বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি দুটি শহরে রোহিঙ্গাদের মধ্যে বহু বিয়ের চল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। বুথিডঙ ও মনদাও শহর দুটির ৯৫ শতাংশই মুসলমান।
রাখাইনের প্রাদেশিক প্রশাসনের মুখপাত্র উইন মিয়েইং বলেন, সংখ্যালঘু মুসলমানদের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন ইস্যুকে ঘিরে ওই অঞ্চলের উত্তেজনা ও সংঘাত প্রশমিত করতে করণীয় ঠিক করতে কয়েক মাস আগে একটি কমিশন নিয়োগ করা হয়। এ কমিশনের সুপারিশের ভিত্তিতেই এক সপ্তাহ আগে নতুন নীতি জারি করা হয়। জাতিগত সংঘাতপূর্ণ প্রদেশটিতে নিরাপত্তারক্ষীদের সংখ্যা দ্বিগুণ করারও পরামর্শ দিয়েছে কমিশন।
উইন মিয়েইং বলেন, ‘রাখাইনে রোহিঙ্গা মুসলমানদের জন্মহার বৌদ্ধদের চেয়ে ১০ গুণ বেশি। এখানকার উত্তেজনার অন্যতম কারণ জনসংখ্যাধিক্য।’
প্রায় এক বছর আগে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে রাখাইন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। বৌদ্ধরা রাম দা হাতে মুসলমানদের ওপর হামলা চালায়, হাজার হাজার মুসলমানের বাড়িঘর ধুলায় মিশিয়ে দেওয়া হয়। এতে কয়েক হাজার রোহিঙ্গা প্রাণ হারায়। দাঙ্গায় এখন পর্যন্ত সোয়া লাখ মুসলমান দেশ ছেড়ে পালিয়েছে।
দেশটিতে বিভিন্ন জাতির মধ্যে সংঘর্ষ ও বিবাদ প্রশমিত করার বিষয়টি প্রেসিডেন্ট থেইন সেইনের সরকারের জন্য একটি বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সংস্কারবাদী সরকার সামরিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে যে সুনাম পেয়েছিল, তা জলাঞ্জলি যেতে বসেছে। আবার একই সময়ে মিয়ানমারের বিরোধী দলের নেতা অং সান সু চির ভাবমূর্তিও ডুবতে বসেছে। শান্তিতে নোবেলজয়ী সু চি মিয়ানমারের সংখ্যালঘুদের পক্ষে কথা বলতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন। এখন পর্যন্ত তিনি মুসলমানদের ওপর আক্রমণ বন্ধের জন্য সরকারকে যেমন কোনো ধরনের চাপ দেননি, তেমনি নিজ বার্মা জাতির লোকেদের বা বৌদ্ধদেরও সংঘাত বন্ধের আহ্বান জানাননি।
উইন মিয়েং বলেন, নতুন নীতি কীভাবে কার্যকর করা হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। তবে বুথিডঙ ও মনদাও শহর দুটির মুসলমানদের জন্য দুই সন্তাননীতিটি অবশ্যই কার্যকর করা হবে।
উইন মিয়েং আরও বলেন, রাখাইন প্রদেশের যেসব শহরে মুসলমানদের সংখ্যা খুব বেশি নয়, সেখানে দুই সন্তাননীতি কার্যকর হবে না।
সরকারি কমিশনটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রজননহার রাখাইনদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করেছে। তারা মনে করে, রোহিঙ্গাদের সংখ্যা বৃদ্ধি তাদের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
মিয়ানমারে সরকারিভাবে স্বীকৃত জাতির সংখ্যা ১৩৫। কিন্তু রোহিঙ্গারা এ তালিকার অন্তর্ভুক্ত নয়। মিয়ানমারীয়রা মনে করে, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক এবং মিয়ানমারের অবৈধ অভিবাসী। অবশ্য বাংলাদেশ মিয়ানমারের এ দাবিকে বরাবরই হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিয়েছে। কারণ, হাজারো ঐতিহাসিক প্রমাণ থেকে জানা গেছে, রোহিঙ্গারা রাখাইন অঞ্চলের আদিবাসী।

শেয়ার করুন