জনপ্রিয় রাজনীতি দেশে নেই : সরকার বদল হচ্ছে পালাক্রমে

0
114
Print Friendly, PDF & Email

হরতাল কোনভাবে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অনুষঙ্গ হতে পারে না। জাতীয় সংসদে জনস্বার্থে লড়াই করার বিকল্প হিসেবেও নির্বাচিত বিরোধী দল হরতাল কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে না। কিন্তু তদসত্ত্বেও আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি উভয় দলই বিরোধী রাজনীতিতে অবস্থানকালে হরতাল কর্মসূচি পালন করে থাকে এবং পুলিশকে হরতালকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়।
২৮ মে বিএনপি জোটভুক্ত এক্টিভিস্টরা সকাল-সন্ধ্যা হরতাল পালন করতে গিয়ে সারাদেশে কমপক্ষে একশ’ যানবাহনে আগুন দিয়েছে এবং ভাংচুর চালিয়েছে। জনজীবনে নানা ধরনের হয়রানি তো রয়েছেই। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও সমস্যা কম সৃষ্টি হয়নি। সব হরতালই সাধারণ মানুষের জীবনে চরম দুর্ভোগ ডেকে আনে। নানাভাবে তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়। যাদের কর্মক্ষেত্রে যেতে হয় তাদের দুর্দশার কোন সীমা থাকে না। হরতাল দেশের অর্থনীতির গতিপ্রবাহকে করে ছন্দহীন ও ক্ষতিগ্রস্ত। হরতালে আইনের শাসন বিদায় নেয় এবং সবকিছু অচল করতে হিংসার ভাষা ব্যবহƒত হয়। আমাদের জানামতে হরতালের প্রতি জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের কথা বলার জন্যই বলা হয়। হরতালের রাজনীতি হচ্ছে রাজপথে হিংসা-হানাহানির রাজনীতি। এ অপরাজনীতির হাত থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্যই তো গণতান্ত্রিক রাজনীতির প্রতি মানুষের দুর্নিবার আকর্ষণ।
হরতালের কারণে মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) মারাÍক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে অর্থনীতিতে। সাম্প্রতিক এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিদিনের হরতালে অর্থনীতির যে ক্ষতি হচ্ছে তার পরিমাণ ২০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। হরতালের ফলে যেহেতু দেশী এবং বিদেশী বিনিয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়, সেহেতু ব্যবসায়ী সম্প্রদায় সর্বদা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে হরতালের বিকল্প কর্মসূচি প্রত্যাশা করে এসেছে, যাতে দেশের অর্থনীতির ওপর ক্ষতিকর প্রভাব এড়ানো যায়। সময়মতো রফতানি কাজে বাধা দিয়ে পোশাকশিল্পের স্থায়ী ক্ষতি করা হয়েছে।
প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও ২০১০-১১ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানি আয়ের শতকরা ৭৯ ভাগ এসেছে তৈরি পোশাকশিল্প খাত থেকে। যার পরিমাণ ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এ খাতের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেকে বলেছেন, তারা তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়া সচল রাখতে মারাÍক সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। কারণ কাপড় পরিবহনকারী যানবাহনকে হরতালের আওতার বাইরে রাখা হয় না।
গত কয়েক সপ্তাহের রাজনৈতিক উত্তাপ-উত্তেজনায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার লোকসহ শতাধিক লোক নিহত হয়েছেন, সহস্রাধিক আহত ও গ্রেফতার হয়েছেন এবং প্রচুর সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
দেশের প্রতিটি নাগরিকের জান-মালকে পবিত্র জ্ঞান করার ব্যাপারে শাসনতান্ত্রিক গ্যারান্টি রয়েছে। কিন্তু আন্দোলনকারী এক্টিভিস্টরা মনে করেন তাদের প্রতিটি কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক, এর মধ্যে ভুলভ্রান্তি কিংবা অপরাধের কিছু নেই।
আগামীতে যারা রাজনৈতিক নেতা হবেন তাদের এভাবে ভুল শিক্ষা দেয়া হচ্ছে। আসলে খুনখারাবি, অপরাধ আর ভাংচুর করার নাম রাজনীতি নয়। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, জ্বালাও-পোড়াও রাজনীতির জন্য আমরা এমন রাজনৈতিক নেতাদের পাচ্ছি, যাদের না আছে রাজনীতি সম্পর্কে কোন ধারণা, না আছে রাজনীতির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে কোন জ্ঞান। যার অনিবার্য ফল হল আমরা আমলা চালিত সরকার পেয়েছি আর রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা পরিচালিত গণতান্ত্রিক সরকার থেকে বঞ্চিত হয়েছি। রাজনীতির নামে চলছে আমলাতন্ত্র ও বাণিজ্যতন্ত্র।
দেশের প্রতিটি নাগরিক হরতালের রাজনীতির ক্ষতিকর পরিণতি প্রতিরোধ করার ব্যাপারে উদ্বেগ বোধ না করে পারে না। এর জন্য দরকার সত্যিকার গণতান্ত্রিক রাজনীতি, যেখানে আলোচনার মাধ্যমে সব মতপার্থক্য মিটিয়ে ফেলা যায়। পরবর্তী সরকার আওয়ামী লীগ না বিএনপি গঠন করবে এজন্য আগামী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে পথের সন্ধান করতে দুই রাজনৈতিক নেতার মধ্যে কোন সংলাপ হবে কিনা সেটা আমার কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করে না। এর মধ্যে দেশের কোন স্বার্থ নেই, আছে রাজনৈতিক নেতাদের স্বার্থ।
আমাদের প্রধান সমস্যা হল রাষ্ট্র পরিচালনায় রাজনৈতিক অব্যবস্থাজনিত নৈরাজ্য। বিরোধী দলের রাজনীতি হল সংসদ বর্জন আর হরতালের আন্দোলন। তাই সংকটের সমাধান না খুঁজে নির্বাচন অনুষ্ঠান করলে দেশে যে শান্তি-শৃংখলা বা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য নিরাপদ পরিস্থিতির প্রয়োজন হবে তার নিশ্চয়তা কিভাবে দেয়া সম্ভব তা আমার কাছে বোধগম্য নয়।
ঘনঘন হরতালের জন্য দেশের ক্ষতি হচ্ছে, দেশবাসীর ভোগান্তি বাড়ছে কিন্তু বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি এবং তার নেতৃত্বাধীন জোট সন্দেহাতীতভাবে দেখতে পাচ্ছে তাদের হারানোর কোন কিছু নেই যদি নির্বাচন সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত হয়। তারা নিশ্চিত যে, নির্বাচন হলে সরকারের অপকর্ম, একগুঁয়ে আচরণ এবং শাসন কাজে ব্যর্থতার জন্য জনগণ পরিবর্তন চাইবেই। সরকারের ভুলভ্রান্তি ও ব্যর্থতার জন্য বিরোধী পক্ষের ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার দৃষ্টান্তই চলে আসছে।
নির্বাচন ও রাজনীতির রূপ-চরিত্র এমন দাঁড়িয়েছে যে, হরতালের রাজনীতি এবং পুলিশের বাড়াবাড়ি পাশাপাশি চলে এবং হরতাল কর্মসূচি পরিহার করার সব আবেদন-নিবেদন অরণ্যে রোদনে পরিণত হয়। আমাদের রাজনীতির বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যা দেশের জন্য মঙ্গলজনক এবং সুবিবেচনাপ্রসূত তাকে অবজ্ঞা করা। যেটা সবচেয়ে নৈরাশ্যজনক ব্যাপার তা হল হরতালের জন্য জনগণকে যে দুর্ভোগ সহ্য করতে হচ্ছে তার সঙ্গে জনগণের চাওয়া-পাওয়ার কোন সম্পর্ক নেই। দলীয় লোকদের নিজস্ব স্বার্থে বিরোধী দল হরতাল ডাকছে। তাদের দাবি হচ্ছে নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার হতে হবে এবং কারাগারে আটক তাদের নেতাকর্মীদের মুক্তি দিতে হবে। এরূপ জনস্বার্থহীন রাজনীতি চলতে পারছে, কারণ, আমাদের রাজনীতিতে জনমতের কোন গুরুত্ব নেই। জনসেবার মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জনের ব্যাপারে প্রধান দলগুলো তেমন কোন তাগিদ অনুভব করছে না।
এভাবে আমরা যে গণতন্ত্র অর্জন করেছি তা জনগণের গণতন্ত্র নয়, জনগণের জন্যও নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে জনপ্রিয় সরকার গঠনে ভোটারদের ভূমিকা পালন করার কোন সুযোগ নেই। সরকার চালাতে গিয়ে নেতৃত্বের জনপ্রিয়তা হারিয়ে ফেলার ব্যাপারটি এতটা গভীর ও হতাশাব্যঞ্জক যে, বিরোধী দলের ধ্বংসাÍক হরতালের রাজনীতি সরকারকে জনপ্রিয়তা অর্জনে কোন সাহায্য করছে না, অথবা আরেক টার্মের জন্য জনগণ সরকারকে আস্থায় নিচ্ছে না। এমন কথাও শোনা যায় যে, সরকারি দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দেশের অর্থনীতির যত ক্ষতি করেছে বিরোধী দলের হরতালজনিত ক্ষতি তার কাছে তুচ্ছ।
ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন করে কখনও ক্ষমতায় থাকতে পারেনি এ কথা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের ব্যাপারে যেমন সত্য ঠিক তেমনি শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ব্যাপারেও সত্য। বিরোধী দলে যারা থেকেছেন তারাই জনস্বার্থবিরোধী হরতালের রাজনীতি করে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করেছেন। সুতরাং জনপ্রিয়তাহীন হরতাল জনগণের কাছে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে অতীতে যেমন কোন অবদান রাখেনি তেমনি আগামী নির্বাচনেও রাখবে না। পালাক্রমে সরকার গঠনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থাকার এবার সম্ভাবনা থাকতে পারে না। এ ধরনের নির্বাচনে পরাজয়ের অনিবার্যতার কারণে সরকার অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচনের কথা চিন্তা করতে পারে না, যে নির্বাচনের সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্ন সম্পৃক্ত।
পালাক্রমে ব্যর্থ সরকার পাওয়ার ভয়াবহ অরাজকতা থেকে দেশকে রক্ষার জরুরি বিষয়টি সবাইকে গভীরভাবে অনুধাবন করতে হবে। বারবার ব্যর্থ সরকার পাওয়ার ব্যাপারে জটিলতার ক্ষেত্রে আমরা শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছি। দেশকে পুলিশি রাষ্ট্রের দিকে নিয়ে যাওয়া সহজ মনে হতে পারে। এটা কোন সুবিবেচিত রাজনৈতিক চিন্তা হতে পারে না। পুলিশি শক্তির কর্মকাণ্ড নৈরাজ্যিক ও সন্ত্রাসী শক্তিগুলোকে সাহস জোগাবে। পুলিশ প্রশাসনেও শৃংখলা রক্ষার ক্ষেত্রে নতুন নতুন সমস্যা ও সংকট দেখা দেবে। অর্থাৎ দেশব্যাপী নৈরাজ্য ও অরাজক পরিস্থিতির ভয়াবহতা বৃদ্ধি পাবে। রাজনৈতিক নেতৃত্বই বিপন্ন হবে। প্রয়োজন সুস্থ চিন্তার, সুস্থ রাজনীতির। জাতীয় পর্যায়ের সংলাপ হতে হবে সংঘাত-সংঘর্ষ ও সহিংস রাজনীতির অবসানের জন্য। জনসম্পদের বেপরোয়া লুটপাট বন্ধের জন্য। সর্বত্র নীতি-চরিত্রহীনতার সংক্রামক ব্যাধি থেকে জাতিকে রক্ষার জন্য।
জানি, কিছু লোকের মধ্যে এরূপ ধারণা থাকা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে যে, কোন না কোনভাবে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থেকে তারা সব সময়ই ভালো থাকবেনÑ বিপদ যত যাবে অন্যদের ওপর দিয়ে। আমার ধারণা, সংকট এত গভীরে পৌঁছেছে যে, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার কথা ভাবতে না পারলে যারা দেশ ছেড়ে ভালো থাকার কথা ভাবতে পারবেন, তারাই ভালো থাকতে পারবেন।

ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন : আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ

শেয়ার করুন