খালেদার ১৫ আগস্টের জন্মদিন বিতর্কিত

0
53
Print Friendly, PDF & Email

 বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের ‘কারাগারে কেমন ছিলাম’ [২০০৭-২০০৮] বইটি ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। ওয়ান-ইলেভেনের পর কারাগারে বসে লেখা এ বইয়ে তিনি দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার জন্মদিনকে বিতর্কিত বলে মন্তব্য করেছেন। বইটিতে চারদলীয় জোট সরকারের মন্ত্রী ও তারেক রহমানের বন্ধু-বান্ধবদেরও কড়া সমালোচনা করা হয়েছে। মওদুদ আহমদ বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার শুনানি শুরু করতে না পারাকে নিজের গ্লানি ও লজ্জা বলে উল্লেখ করেন। সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন মিলনায়তনে গত ১২ মে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য সংবলিত এ বইটির মোড়ক উন্মোচন করা হয়। সম্প্রতি বহুল আলোচিত কর্নেল তাহের হত্যাকাণ্ডের রায় নিয়ে মওদুদ আহমদের লেখা ‘ডেমোক্রেসি অ্যান্ড চ্যালেঞ্জ অব ডেভেলপমেন্ট : এ স্টাডি অব পলিটিক্যাল অ্যান্ড মিলিটারি ইন্টারভেনশান ইন বাংলাদেশ’ বইটিও আলোচিত হয়। যদিও মওদুদ দাবি করেছেন, কর্নেল তাহেরের সামরিক আদালতে বিচার অবৈধ ঘোষণার হাইকোর্টের রায়ে তার বই থেকে যে উদ্ধৃতির কথা গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তা সঠিক নয়। কারাগারে কেমন ছিলাম বইয়ে মওদুদ আহমদ ওয়ান-ইলেভেন-পরবর্তী সময়ে গ্রেফতার, রিমান্ড ও কারাগারে কাটানোর দিনলিপি বর্ণনা করেছেন। বইয়ের ৩২৪ পৃষ্ঠায় [শুক্রবার, ১৫ আগস্ট-২০০৮, দিন-৪৯১] তিনি লিখেছেন, ‘আজ জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ধানমন্ডির বাড়িতে স্ত্রী ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে খুন হন। জাতির ইতিহাসে এ এক মহাশোকের দিন। বিতর্কিত একটি জন্মদিন হিসেবে আজ বেগম জিয়ারও ৬৩তম জন্মদিন। সঠিক হলেও আমি হলে আমার জন্মদিন বোধহয় এক দিন আগে বা পরে পালন করতাম ও শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যা দিবসের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতাম। এটা একটা রুচিবোধের বিষয়। বেগম জিয়া তা করলে তিনি সব শ্রেণীর জনগণের কাছ থেকে আরও বেশি শ্রদ্ধা অর্জন করতে পারতেন। তার এই উদারতা তাকে আরও বেশি মহীয়ান করে তুলত।’ ১৭৬ পৃষ্ঠায় [মঙ্গলবার, ১৬ অক্টোবর-২০০৭, দিন-১৮৭] মওদুদ লেখেন- ‘বেগম জিয়া খোকনকে (ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন) বলেছেন, তার চারদিকে লোকজনের করা এতসব দুর্নীতি সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। অথচ আমরা এতদিন ধরে তার উল্টোটাই শুনে আসছি। এটা এক আজব ধরনের ঘটনা। তার দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি খুব উদ্বিগ্ন।’ ওই পৃষ্ঠায়ই [বুধবার, ১৭ অক্টোবর-২০০৭, দিন-১৮৮] আরও লেখা হয়েছে, ‘১৯৯১-৯৬ সালের তুলনায় বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক অবদান ২০০১-২০০৬ সালে ছিল নিঃসন্দেহে অনেক কম। এর পর আমরা ক্ষমতায় গেলে বিএনপির সাফল্য হয়তো হবে আরও কম। কারণ দলটির শাসন কৌশলে উন্নতির কোনো স্পর্শ লাগেনি। বিএনপির রাজনীতির রক্তধারায় আত্দোপলব্ধি এবং আত্দসংশোধন শব্দ দুটির কোনো অস্তিত্ব নেই। ক্ষমতার দাপট, অর্থলোলুপতা, বিলাসবহুল জীবনযাপন, অতিরিক্ত আত্দবিশ্বাস এবং দুর্নীতির মাত্রা বোধহয় একপর্যায়ে থেকে যাবে। আওয়ামী লীগের বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। এর পর যখনই তারা আবার ক্ষমতায় আসবে সেই শাসনকাল হবে আরও নিকৃষ্ট।’ সাবেক এ আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী লিখেছেন, ‘বিশ্ব বিপর্যয়ে বিএনপি বন্ধুহীন হয়ে পড়া এবং রাজনীতিতে প্রান্তিক অবস্থায় চলে আসার পেছনে মূল কারণ হলো দুটি। সেগুলো হলো : (১) জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে গভীর সখ্যের কারণে বিএনপিকে চিহ্নিত করা হয়েছে এমন ইসলামী উগ্রবাদী শক্তির সহযোদ্ধা হিসেবে, যাদের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। যুক্তরাষ্ট্র বা ভারতের কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়। (২) তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে প্রধানমন্ত্রীর অফিসে থাকা লোকজনের দুর্নীতি। বিএনপি যদি এ দুয়ের গ্লানি কাটিয়ে ভারসাম্যময় মধ্যপন্থি গণতন্ত্রের ধারক-বাহক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে না পারে তাহলে অদূরভবিষ্যতে ক্ষমতায় আসতে পারবে না এবং কোনো রকমে আসতে সক্ষম হলেও বেশি দিন তা ধরে রাখতে পারবে না। অন্যদিকে জাতি যদি নারী নেত্রীদের ব্যক্তিগত রাজনীতির প্রতি মোহান্ধ থেকে যায় তা হবে জাতির জন্য সমপরিমাণেরই বিবদময়।’ বইয়ের ১৪১ পৃষ্ঠায় [বুধবার, ১৫ আগস্ট-২০০৭, দিন-১২৫] বলা হয়েছে, ‘সারা দেশে উদযাপিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকী। রাষ্ট্রপতি, প্রধান উপদেষ্টা ও সশস্ত্রবাহিনীর তিন বিভাগের প্রধান জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে টুঙ্গিপাড়া গিয়েছেন। ১৯৮৩ সালে আমার লেখা- বাংলাদেশ শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল_ বইয়ে বঙ্গবন্ধুর বিশদ মূল্যায়ন করা হয়েছে। তার সমস্ত ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমি তাকে ইতিহাসের মহানতম নায়ক হিসেবে উল্লেখ করেছি। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়েই তার সমাধি রচিত হয়নি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তার প্রবাদ বাক্যের মতোই ভাস্বর হয়ে থাকবে। কিন্তু আজ বঙ্গবন্ধুকে বিতর্কিত এবং খণ্ডিত করার জন্য তাদের দলীয় কিছু বুদ্ধিজীবীই দায়ী। আমার এ কারণে দুঃখ হয় যে, অক্লান্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমি সরকারের বিরোধিতার কারণে আপিল বিভাগে জমে থাকা সেই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের মামলার শুনানি শুরু করতে পারিনি। আমি এমনও যুক্তি দেখিয়েছি যে, মুজিব যখন নিহত হন তখন বিএনপির জন্মই হয়নি। কাজেই আপিল শুরু না করে বিএনপি এর দায়ভার বহন করতে যাবে কেন? কিন্তু প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যদের আমি বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছি। এ জন্য ব্যক্তিগতভাবে আমি লজ্জিত এবং নিজেকেই আমার কাছে ছোট বলে মনে হয়।’ ১৭১ পৃষ্ঠায় [শুক্রবার, ৫ অক্টোবর-২০০৭, দিন-১৭৬] মওদুদ আহমদ লিখেছেন- ‘এই ভেবে আমার অনেক দুঃখ হয় যে, আমার বিরুদ্ধে সরকারের আনীত দুর্নীতির অভিযোগেই আজ আমাকে জেল খাটতে হচ্ছে। তার চেয়ে বড় কথা হলো, আমাকে এমন সব লোকের সঙ্গে একসারিতে ফেলা হয়েছে, দুর্নীতির ব্যাপারে যাতে জনসমক্ষে মনে করা হয়, আমি সত্যিই একজন দুর্নীতিবাজ। সচরাচর ব্যক্তিগতভাবে বা সামাজিকভাবে যাদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়, আজ তাদের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছি। বেগম জিয়াসহ আমাদের সবাইকে এ সরকার একই কাতারে বসিয়ে দিয়েছে।’ ১৫২ পৃষ্ঠায় [সোমবার, ৩ সেপ্টেম্বর-২০০৭, দিন-১৪৪] লেখা_ ‘আজ প্রত্যুষে বেগম খালেদা জিয়া ও তার ছেলে আরাফাত রহমান কোকোকে তাদের বাসা থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে কন্টেইনার হ্যান্ডেলিং এর চুক্তিতে দুর্নীতি সংক্রান্ত একটি অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছে। আদালতে বেগম জিয়া নিজেকে ও দুই সন্তানকে নির্দোষ বলে দাবি করেছেন। কিন্তু আমাদের সম্পর্কে কিছুই বলেননি।’ ৭৪ পৃষ্ঠায় [বৃহস্পতিবার, ৩ মে-২০০৭, দিন-২১] বলা হয়েছে- ‘এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, আমাদের সরকার সুশাসনে অনেকটাই ব্যর্থ হয়েছে। শুধু তাই নয়, অনেক ক্ষেত্রে ছিল অব্যবস্থাপনা ও অপশাসনের নমুনা। মন্ত্রী ও নিজের দফতরকেন্দ্রিক লোকজনের বিভিন্ন রকমের দুর্নীতি প্রধানমন্ত্রী বন্ধ করতে পারেননি। তিনি হয়তো অনেক কিছু জানতেনই না। আজ গোটা জাতিকে তার মাশুল দিতে হচ্ছে।’ ব্যারিস্টার মওদুদ ৭৭ পৃষ্ঠায় [মঙ্গলবার-৮ মে, ২০০৭, দিন-২৬] লিখেছেন, ‘শেখ হাসিনা ফিরে এসেছেন গতকাল। তার সাহসের আমি প্রশংসা করি। বাবার নেতৃত্বেরই নমুনা দেখিয়েছেন তিনি। ফলে জনগণের মধ্যে তার ভাবমূর্তি বেড়েছে। এই মুহূর্তে তিনি দেশের একমাত্র নেত্রী হিসেবে আবিভর্ূত হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছেন, যদি তিনি এই সাহস অব্যাহত রেখে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন। তবে হাসিনার ভূমিকার ভবিষ্যদ্বাণী করা যায় না। খালেদাকে পরাজিত করতে গিয়ে যে কোনো কিছু করা থেকে তিনি বিরত হবেন না। সেই কারণে তার ভাবমূর্তি আবার নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’ ১৫৩ পৃষ্ঠায় [মঙ্গলবার, ৪ সেপ্টেম্বর-২০০৭, দিন-১৪৫] লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের গণতন্ত্রবিষয়ক বইটি লেখার কাজ আমি ইতোমধ্যেই অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছি। কিন্তু এ নিয়ে আমি যতই লেখায় অগ্রসর হচ্ছি ততই শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার উদীয়মান সেই গণতন্ত্রকে সুসংহত না করার জন্য দায়ী কিনা তা পর্যালোচনা করছি। বর্তমানে আমি বইয়ের সেই অধ্যায়টি লিখছি।’ বইয়ের মুখবন্ধে ব্যারিস্টার মওদুদ উল্লেখ করেন, ‘এই বইয়ে যেসব মতামত বা অভিব্যক্তি রয়েছে তা নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত। আমার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।’ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড প্রকাশিত বইটির দাম ৭০০ টাকা।

শেয়ার করুন