ভিক্ষুকচক্রের শিকার শিশুরা

0
79
Print Friendly, PDF & Email

শিশুদের অপহরণ করে চেহারাসুরত ও বেশবাস বদলে দেওয়া হচ্ছে। করা হচ্ছে হাত-পা বিকল করার মতো নির্মম কাজ, যাতে আপনজনেরা চিনতে না পারে তাদের। তারপর বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে পীর-মুর্শিদের মাজারে। সেখানে পুণ্যার্থীদের কাছ থেকে চেয়েচিন্তে ভালোই রোজগার করছে শিশুরা। ওই অর্থে পকেট ভারী হচ্ছে ‘বেগিং মাফিয়া’ বলে পরিচিত ভিক্ষুকচক্রের।
পাকিস্তানের বিভিন্ন শহরের মাজারে এভাবেই চলছে শিশুদের মাধ্যমে ভিক্ষার এই রমরমা বাণিজ্য। আজ শনিবার বিবিসি অনলাইনের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়।
পাকিস্তানের অনেক মুসলমানই মাজার জিয়ারতে গিয়ে গরিব-দুঃখীদের অর্থসহায়তা দেন। মহত্ উদ্দেশ্য নিয়ে তাঁরা এই কাজ করলেও আদতে তা হিতে বিপরীত হয়ে দাঁড়ায়। সহজে অর্থ আয় করার কৌশল হিসেবে ভিক্ষুকচক্রের মাফিয়ারা ছোট ছোট শিশুকে অপহরণ করে পঙ্গু বানিয়ে ভিক্ষাবৃত্তিতে লাগিয়ে দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের বেশির ভাগ নগর ও শহরে পীর-মুর্শিদ ও সুফিদের কবরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে মাজার। সাধারণ মানুষ তাঁদের দোয়া পাওয়ার জন্য মাজারে ছুটে যায়। এসব মাজার ও আশপাশের এলাকায় শিশুসহ বহুসংখ্যক ভিক্ষুকের বাস। মাজারে আসা মানুষ সরল মনে সত্কর্মের উদ্দেশে তাদের অর্থ দিয়ে এক ধরনের তৃপ্তি পায়।
বছরের পর বছর ধরে চলে আসা মানুষের এই আবেগকে কেন্দ্র করে ব্যবসা ফেঁদে বসেছে একটি চক্র। শিশুদের প্রতি গড়পড়তা মানুষের মায়া-মমতা বেশি থাকায় ভিক্ষা আদায়ের মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে তাদের বেছে নিয়েছে চক্রটি। শারীরিক প্রতিবন্ধীদের প্রতি মানুষের বেশি মায়া থাকে বলে ভিক্ষুকচক্রের হোতারা অপহূত শিশুদের অঙ্গ বিকল করে দেয়।
বেসরকারি সংগঠন রোশনি হেল্পলাইন চ্যারিটির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলর তথ্যমতে, ২০১০ সালে শুধু করাচি থেকেই তিন হাজার শিশু নিখোঁজ হয়েছে। এই শিশুদের বেশির ভাগেরই ঠাঁই হয় পাকিস্তানের বিভিন্ন মাজারে। তবে এর আগে শিশুদের ন্যাড়া করে এবং আরও কিছু ছদ্মবেশ যোগ করে তাদের চেহারাটা অন্য রকম করে ফেলা হয়। এতে আপনজনেরা কাছ থেকে দেখলেও চিনতে পারে না।
মোহাম্মদ আলী বলেন, মাজারে ভিক্ষাবৃত্তি এত বছর ধরে চলে আসছে যে পুলিশও বিষয়টি নিয়ে মাথা ঘামায় না। এত শিশু কোত্থেকে আসে, এ নিয়েও কেউ প্রশ্ন তোলে না। তাঁর ভাষ্য, কোনো মাজারে কয়েক ঘণ্টা থাকলেই টের পাওয়া যায় শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশুদের আয় বেশি। এ কারণে অনেক সুস্থ শিশুকে প্রতিবন্ধী বানিয়ে ভিক্ষার জন্য বসিয়ে দেওয়া হয়।
মোহাম্মদ আলী বলেন, প্রতিবন্ধী করতে গিয়ে শিশুর চোখ উপড়ে ফেলার মতো নির্মম কাজও করে চক্রটি।
করাচি থেকে ট্যাক্সিচালক মীর মোহাম্মদের বাড়ি যেতে মাত্র ঘণ্টা খানেক লাগে। তাঁর ভাষ্য, সম্প্রতি তাঁর বড় ছেলে প্রতিবন্ধী মুমতাজ নিখোঁজ হয়েছে। হুইলচেয়ারে থাকা ছেলেকে বেশ কয়েকজন ব্যক্তি জোর করে রিকশায় তুলে নিয়ে গেছে বলে পরে খবর পেয়েছেন। এর পর থেকে তিনি ছেলের সন্ধানে মাজারে মাজারে ঘুরছেন।
প্রজননশাস্ত্রবিদ ড. কাশেম মেহেদি জানান, পাকিস্তানে স্বজনদের মধ্যে বিয়ের হার অনেক বেশি বলে জেনেটিক কারণে অনেক শিশু প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মায়। অনেক সময় বাবা-মা এদের মাজারে ফেলে রেখে যায়। এদের দিয়েও ভিক্ষাবৃত্তি চালিয়ে যায় চক্রের লোকজন।
মোহাম্মদ আলী মনে করেন, এই পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রয়োজন। বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করতে হবে। তাহলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবে, মাজারের এসব অসহায় শিশু কোত্থেকে এসেছে। সত্ উদ্দেশে দান করলেও সত্যিকারে তা কাদের কাছে যায় বা এর কারণে শিশুরা কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এ নিয়েও ভাবতে হবে। এগুলো নিয়ে যত প্রশ্ন উঠবে, যত আলোচনা হবে, তত সমাধানের পথ উন্মোচিত হবে।

শেয়ার করুন