এবারও কালোটাকা সাদা

0
132
Print Friendly, PDF & Email

নির্বাচনী বছরে কালোটাকার মালিকদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা আসছে নতুন বাজেটে। চার বছর ধরে যাঁরা নানা উপায়ে কালোটাকা উপার্জন করেছেন, তাঁদের জন্য আবারও সরকার এগিয়ে আসছে। তবে উৎপাদন খাতে নয়, বরং জমি বা ফ্ল্যাট কেনার জন্য এই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।
ফ্ল্যাট কেনার জন্য ব্যাংকঋণ দুষ্প্রাপ্য করা হয়েছে। জমির দামও অনেক বেড়েছে। ফলে সৎ উপার্জনকারীদের পক্ষে জমি বা ফ্ল্যাট কেনা এখন আর সম্ভব হচ্ছে না। অথচ সাদাটাকা আয় করা ব্যক্তিদের আরেক দফা বঞ্চিত করে কালোটাকার মালিকদের জন্য সহজে জমি-ফ্ল্যাট কেনার সুযোগ রাখা হচ্ছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সূত্রে জানা গেছে, শেয়ারবাজারের বাইরে আগামী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে অবৈধভাবে উপার্জিত টাকা দিয়ে জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট কেনা যাবে। শুধু ক্রয়মূল্যের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা কর দিলেই এর উৎস সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করবে না এনবিআর। তবে বরাবরের মতো লোক দেখানো ঘোষণা থাকবে যে, অনুপার্জিত আয়কারীরা এই সুযোগ পাবেন, অবৈধ আয়ের লোকজন পাবেন না। তবে কোনটা অনুপার্জিত, আর কোনটা অবৈধ, সেটা অতীতে কখনোই আলাদা করেনি এনবিআর।
এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত সরকারের পরিকল্পনা হচ্ছে জমি বা প্লট কেনার ক্ষেত্রে হস্তান্তর বা চুক্তিমূল্যের ১০ শতাংশ টাকা দিলেই আর কোনো কর দিতে হবে না। জমির মালিককে বার্ষিক আয়কর বিবরণী জমার সময় তা উল্লেখ করলেই চলবে। তবে একাধিক জমি বা প্লট কিনতে হলে দিতে হবে ২০ শতাংশ অর্থ। সর্বশেষ ২০০৭-০৮ অর্থবছরে জমি বা প্লট কেনার সময় সাড়ে ৭ শতাংশ হারে কর দিয়ে এই সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে তিন বছর পর আবার ফ্ল্যাট বা বাণিজ্যিক ফ্লোর কেনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হতে পারে। ২০০ বর্গমিটার পর্যন্ত আয়তনের কোনো ফ্ল্যাট কিনতে প্রতি মিটারে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, মতিঝিলের মতো এলাকায় প্রতি বর্গমিটারে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা কর দিতে হবে। আর এসব এলাকায় ২০০ বর্গমিটারের বেশি আয়তনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে করের পরিমাণ হবে প্রতি বর্গমিটারে পাঁচ থেকে সাত হাজার টাকা।
আবার রাজধানীর অন্য এলাকায় ২০০ বর্গমিটারের বেশি ফ্ল্যাটে কর দিতে হবে বর্গমিটারপ্রতি তিন হাজার টাকা। এর চেয়ে কম আয়তনের ক্ষেত্রে বর্গমিটারপ্রতি দুই হাজার টাকা কর দিতে হবে। কালোটাকা দিয়ে একাধিক ফ্ল্যাটও কেনা যাবে। তবে এ ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের ২০ শতাংশ অর্থ দেওয়া হলে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। এ ছাড়া রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় ফ্ল্যাট কিনতেও একই সুবিধা দেওয়া হতে পারে।
সর্বশেষ ২০০৯-১০ অর্থবছরে ফ্ল্যাট ও বাণিজ্যিক ফ্লোর কেনায় কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ঢাকা ও চট্টগ্রামের অভিজাত এলাকায় ১০০ বর্গমিটারের কম ফ্ল্যাট বা ফ্লোরে বর্গমিটারপ্রতি ৮০০ টাকা, ১০০ থেকে ২০০ বর্গমিটারের ফ্ল্যাটে বর্গমিটারপ্রতি এক হাজার টাকা, ২০০ বর্গমিটারের বেশি ফ্ল্যাটে বর্গমিটারপ্রতি দেড় হাজার টাকা কর দেওয়ার বিধান করা হয়েছিল। আবার অভিজাত এলাকার বাইরে সমপরিমাণ আয়তনের ফ্ল্যাটে করের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৪০০, ৬০০ ও এক হাজার টাকা।
এদিকে ১০ শতাংশ কর দিয়ে শেয়ারবাজারে কালোটাকা সাদা করার সুযোগ এখনো রয়েছে। এটি রাখার পক্ষে বেশি মতামত রয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে। তবে এই সুযোগ কেউ নিচ্ছেন না বলে বাতিলও করা হতে পারে। এ ছাড়া মিউচুয়াল ফান্ড ও বন্ড কেনার ক্ষেত্রেও বিশেষ কিছু সুবিধা নতুন বাজেটে থাকতে পারে বলে জানা গেছে। এনবিআর সূত্র আরও জানায়, প্রচলিত হারে কর ও এর ওপর ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে বৈধভাবে উপার্জিত আয় প্রদর্শনের সুযোগ চলতি অর্থবছরেই নিয়মিত করা হয়েছিল। এই সুযোগও থাকছে।
প্রসঙ্গত, বিএনপির আমলের ২০০১-০৫ সময় ছাড়া সব সরকারের আমলেই কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো বছরই কালোটাকা সাদা করায় খুব একটা উৎসাহ দেখা যায়নি। তার পরও সরকারগুলো এই সুযোগ দিয়ে আসছে।
স্বাধীনতার পর থেকে এখন পর্যন্ত সরকারগুলো ১৭ বার কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিয়েছে। আর সব মিলিয়ে দেশে সাদা হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ৩৭৪ কোটি কালোটাকা। এতে সরকার রাজস্ব পেয়েছে মাত্র এক হাজার ৪০৬ কোটি টাকা। সর্বশেষ ২০১১-১২ অর্থবছর পর্যন্ত ১২ হাজার ৯৯৬ কোটি কালোটাকা সাদা হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া সংবিধানের ২০(২) ধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ ধরনের সুযোগ প্রদান ক্ষমতাসীনদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী। এটা নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য। কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দিলে সমাজে একধরনের বার্তা পৌঁছায় যে, অবৈধভাবে অর্থ উপার্জন করলে একসময় পার পাওয়া যায়। এতে বৈধ উপার্জনকারীরা নিরুৎসাহিত হন। এ ছাড়া সমাজের নীতিকাঠামোর মধ্যে দুর্নীতি আশ্রয়-প্রশ্রয় পায় বলে তিনি মনে করেন।
করমুক্ত সীমা বাড়ছে: আগামী অর্থবছরে ব্যক্তিশ্রেণীর করদাতাদের করমুক্ত সীমা বাড়ানো হতে পারে বলে জানা গেছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে বিষয়টি সরকার বিবেচনা করছে। সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হলে আগামী অর্থবছর থেকে দুই লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত করমুক্ত রাখার ঘোষণা থাকবে। নারী করদাতাদের ক্ষেত্রে তা আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত উন্নীত করা হতে পারে। প্রথম দুই লাখের পর পরবর্তী তিন লাখের জন্য ১০ শতাংশ, পরবর্তী চার লাখের জন্য ১৫ শতাংশ, পরবর্তী তিন লাখের জন্য ২০ শতাংশ এবং অবশিষ্ট আয়ের জন্য ২৫ শতাংশ আয়কর আরোপের প্রস্তাব করা হচ্ছে।
বর্তমানে সাধারণ করদাতাদের ন্যূনতম করমুক্ত সীমা দুই লাখ টাকা। নারী ও ৬৫ বছরের বেশি বয়সী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এই সীমা দুই লাখ ২৫ হাজার টাকা। প্রাক্-বাজেট আলোচনায় বিভিন্ন শ্রেণীর পেশার প্রতিনিধিরা করমুক্ত সীমা বাড়ানোর দাবি করেছেন।
কর অবকাশ থাকবে, ধরন পাল্টাবে: ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিদ্যমান সুবিধাভোগী ৩৬টি শিল্প খাতের জন্য কর অবকাশ-সুবিধা বা ট্যাক্স হলিডে অব্যাহত থাকবে। তবে এর ধরন পাল্টাবে। কর অবকাশ নেওয়ার পর উদ্যোক্তা প্রথম দুই বছর শতভাগ করমুক্ত-সুবিধা পাবেন। পরে প্রতিবছরের জন্য ১০ শতাংশ হারে করসুবিধা কমবে। শিল্প প্রতিষ্ঠার পর ১২তম বছর পর্যন্ত রেয়াতি হারে করমুক্ত-সুবিধা থাকবে। এরপর নিয়মিত হারে কর দিতে হবে।
এ ছাড়া কর খাতে আরও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হতে পারে। বর্তমানে ১৫০০ সিসি ও এর বেশি সিসির গাড়ির মালিককে নিবন্ধন ও ফিটনেস নিবন্ধনের সময় ১৫ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত কর দিতে হয়। এখন থেকে ১৩০০ সিসির গাড়ির মালিককেও এই করের আওতায় আনা হচ্ছে। বার্ষিক ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা উৎসে কর বসানো হতে পারে। এর মানে হলো, অপেক্ষাকৃত কম দামি গাড়ির মালিককেও কর দিতে হবে। আর একাধিক গাড়ির মালিককে বাড়তি গাড়ির জন্য ৫০ শতাংশ বেশি কর দিতে হবে।
করপোরেট করের ক্ষেত্রেও কিছুটা পরিবর্তন আনার চিন্তাভাবনা চলছে। মুঠোফোনের অপারেটরদের জন্য করের হার পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত এমন কোম্পানির ক্ষেত্রে করপোরেট কর বাড়িয়ে সাড়ে ৩৭ শতাংশ বা ৪০ শতাংশ করা হতে পারে। বর্তমানে ৩৫ শতাংশ হারে কর দেয় তালিকাভুক্ত মুঠোফোন কোম্পানিগুলো। তবে তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির করের হার ৪৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হচ্ছে। বাংলাদেশে একমাত্র তালিকাভুক্ত মুঠোফোন কোম্পানি হচ্ছে গ্রামীণফোন। অন্যান্য করপোরেট করের হার অপরিবর্তিত থাকবে বলে জানা গেছে।
আমদানি পর্যায়ে শুল্কহার পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে এনবিআর দুই ধরনের শুল্কহার নিয়ে কাজ করছে। মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে ৩ শতাংশ আমদানি শুল্ক কমিয়ে ২ শতাংশ করা হতে পারে। তবে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ শিল্প তৈরি পোশাক খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ওপর শুল্কহার ১ শতাংশ রয়েছে। তাই অন্য খাতের মূলধনি যন্ত্রপাতি আনার ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড় দিলে বিনিয়োগ খুব বেশি আকৃষ্ট হবে না বলে এনবিআরের অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন।
তাই মধ্যবর্তী কাঁচামাল বা পণ্য আমদানিতে কিছুটা শুল্ক ছাড় দেওয়া হতে পারে। বর্তমানে ১২ শতাংশ হারে আমদানি শুল্ক দিতে হয়। সেটা কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হতে পারে। এই দুটি বিকল্প নিয়েই কাজ করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা।
জানা গেছে, ইতিমধ্যে কর প্রস্তাবগুলো নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দুই দফা বৈঠক করেছেন অর্থমন্ত্রী ও এনবিআরের কর্মকর্তারা। আর প্রায় প্রতিদিনই অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করছেন এনবিআরের কর্মকর্তারা। আগামী দু-এক দিনের মধ্যেই এসব প্রস্তাব চূড়ান্ত করা হবে। শেষ সময়ে আরও কিছু পরিবর্তন হতে পারে।
আগামী অর্থবছরের জন্য এনবিআরকে প্রায় এক লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্বের লক্ষ্য দেওয়া হচ্ছে। এনবিআরের পক্ষে প্রথম থেকেই এই লক্ষ্য দেওয়ার বিপক্ষে মত দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী অনড় থাকার কারণে এই লক্ষ্য অর্জনে এনবিআর মূলত কর ছাড় দেওয়ার চেয়ে কর আদায় বাড়ানোর দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। আর এনবিআরের বর্তমান প্রশাসন দিয়েই বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর বসিয়ে আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ বেশি থাকবে আগামী বাজেটে। অগ্রিম কর, উৎসে কর, নিবন্ধনের সময় কর আরোপের মতো সহজে আদায় করা যায়, এমন প্রস্তাব বেশি থাকবে বলে জানা গেছে।

শেয়ার করুন