পাসপোর্ট অফিস দালালদের দখলে!

0
117
Print Friendly, PDF & Email

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কড়া নজরদারি সত্ত্বেও পাসপোর্ট অফিসে কমছে না দালালদের দৌরাত্ম্য। এই দালালদের খপ্পরে পড়ে প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। খোদ পাসপোর্ট অফিসের সামনেই এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও অনেক সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্বিকার থাকতে দেখা যায়।

পাসপোর্ট প্রতি এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি তো দিতেই হয়, আবার কোনো কোনো সময় টাকা নিয়েও পাসপোর্ট না দিয়ে মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করছে দালাল সিন্ডিকেটটি।

২১ মে র‌্যাব অভিযান চালিয়ে সাত জন দালাল আটক করে এক মাসের কারাদণ্ড দেয়। দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন জাকির হোসেন (৩৪), নায়েব আলী (৩০), জুয়েল আহমেদ (১৯), মহাসিন শিকদার (২২), এসএম টুটুল (২৯), ছাদেক (৪৮) ও আতিকুর রহমান (৬০)। এরপরও সম্প্রতি পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দালালদের আনাগোনা লক্ষ্য করা যায়।

দালালদের দৌরাত্ম্য প্রসঙ্গে পরিচালক পাসপোর্ট ফজলুল হক বলেন, “দালালদের আটকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সর্বোচ্চ নির্দেশ দেওয়া রয়েছে।”

তিনি বলেন, “সাধারণ মানুষ সচেতন হলেই দালালদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি যারা এ ধরনের কাজে জড়িত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণাত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।”

কয়েকদিন আগে পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, পাসপোর্ট অফিসের মূল ফটকের সামনে কয়েকজন দালাল ঘোরাফেরা করছে। নাম পরিচয় গোপন রেখে পাসপোর্টের জন্য সহায়তা চাইলে তারা ৫ হাজার টাকা দাবি করে।

পাসপোর্ট করতে তিন হাজার টাকা লাগে এমন কথা বললে তারা জানায়, তাদের আরো খরচা রয়েছে। পাঁচ হাজার টাকা হলে পুলিশ ভেরিফিকেশনসহ সমস্ত কাজ তারা করে দেবে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মূল ফটকের সামনে জাহাঙ্গীর, হারুণ এবং বেলাল নামে এ তিন জন দালাল প্রতিদিনই থাকে। এর আগে কয়েকবার জাহাঙ্গীর আটক হলেও জামিনে বেরিয়ে সে আবারও একই কাজ করছে।

অপরদিকে পুরো পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে প্রায় ৫০ জনের দালাল রয়েছে বলে জানা যায়। পাসপোর্ট অফিসে টাকা জমা দেওয়ার জন্য সোনালী ব্যাংক থেকে শুরু করে পাসপোর্ট অফিস পর্যন্ত এরা বিস্তৃত থাকে। বিশেষ করে, পাসপোর্ট অফিসের সামনে ফুটপাতের উপর চা দোকানের পাশেই এরা নানা ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়ায়। চা দোকানে বসে পাসপোর্টের কোনো সমস্যা নিয়ে কথা বললেই তারা নানা কৌশলে তাদের সঙ্গে সমস্যা সমাধানের কথা বলেন। এক পর্যায়ে তাদের সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে টাকা দাবি করেন। আর সাধারণ মানুষ সমস্যা সমাধানের আশ্বাস পেয়ে সরল বিশ্বাসে তাদের টাকাও দেয়।

পাসপোর্ট করতে আসা মিরপুর এলাকার আব্দুল আওয়াল বলেন, “সোনালী ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার সময় তিন দালাল বলেছে ১ হাজার টাকা বেশি দিলে সবকাজ করে দেবে তারা। কিন্তু বিশ্বাস না পাওয়ায় তিনি নিজেই এসেছেন।”

তিনি বলেন, “সোনালী ব্যাংকের সামনে টাকা জমা দিতে বড় লাইন। সেখানেও আগে টাকা জমা দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে দালালরা টাকা নিচ্ছে। অনেক লোক দ্রুত কাজ করার জন্য টাকাও দিচ্ছেন। কিন্তু কাজ দ্রুত হয় না। বরং দ্রুত টাকা জমা দেওয়ার জন্য যে ১০০ টাকা দালালরা নিচ্ছে সেটি প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়।”

একই অভিযোগ করেন, সাকলাইন নামের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্র।

সাকলাইন বলেন, “এতদিন পত্রপত্রিকায় দালালের কথা পড়লেও আজ তা বাস্তবে দেখলাম। ব্যাংক থেকে টাকা জমা দিতে আসার পর থেকে টাকা জমা দেওয়া পর্যন্ত দালালরা পিছু লেগেই আছে।”

আরিফুর রহমান নামের আরেক ছাত্র বলেন, “পাসপোর্ট অফিসে সাধারণ মানুষ যে নাকাল হয় তা দেখে বোঝা গেল।”

তিনি অভিযোগ করে বলেন, “সোনালী ব্যাংক এলাকায় পুলিশের সামনেই দালালরা ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ কোনো পদক্ষেপা নেয় না। ”

ভুক্তভোগীদের  অভিযোগ, দালালরা এমনিতেই সাধারণ মানুষের কাছ থেকে এক থেকে দেড় হাজার টাকা বেশি নেয়। আবার কখনো পাসপোর্ট করে দেওয়ার নাম করে টাকা নিয়ে পাসপোর্ট করে দেয় না। এক পর্যায়ে পাসপোর্ট করতে দেওয়া লোকজনকে ভয়ভীতি দেখায় দালালরা।

এদিকে পাসপোর্ট অফিসে দায়িত্বপালনকারী সেনা সদস্যরা বলেন, “আমরা দালাল নির্মূল করতে সার্বক্ষণিক কাজ করছি। কিন্তু প্রতিদিন পাসপোর্ট অফিসে এত লোক আসে যে, কে দালাল আর কে পাসপোর্ট করতে এসেছে এটা যাচাই করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যায়। তবে কেউ অভিযোগ দিলে আমরা দ্রুত পদেক্ষপ নিই।

সেনা সদস্যরা বলেন, “পাসপোর্ট অফিসে কোনো সমস্যা হলে সাধারণ মানুষকে না বলে সেনা সদস্য অথবা পুলিশের সহায়তা নিতে হবে। তাহলে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।।”

শেরে বাংলানগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)  আব্দুল মোমিন জানান, পাসপোর্ট অফিসে দালালদের তৎপরতা রোধে পুলিশের দুই তিনটি মোবাইল টিম কাজ করে।

তিনি বলেন, “প্রায় প্রতিদিনই একজন দু’জন করে দালাল আটক করা হয়। এরপরও দালালদের তৎপরতা রয়েছে।”

মানুষ সচেতন হলে দালালদের তৎপরতা থাকবে না না বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

শেয়ার করুন