সংসদ অভিমুখী বিরোধী দল

0
75
Print Friendly, PDF & Email

সাংসদ সংসদে যাবেন, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমাদের দেশে তা ঘটছে না। বিরোধী দলের সাংসদেরা সাধারণত সংসদে যোগ দেন না। তবে জানা যায়, সংসদের বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দল যোগ দিতে পারে। এর পেছনে মূলত রয়েছে বিরোধী দলের সাংসদদের সদস্যপদ বহাল রাখার চেষ্টা—এটা বললে অত্যুক্তি হবে না। কেননা একনাগাড়ে ৯০ কর্মদিবস সংসদ অধিবেশনে যোগ না দিলে সদস্যপদ চলে যায়। তাঁদের সে সময়সীমা নিকটবর্তী। আর অতীত ঐতিহ্য একই ধরনের। এ দোষটা শুধু তাঁদের দিলেই চলবে না, এখন যাঁরা সরকারে আছেন তাঁরাও বিরোধী দলে থাকতে একই কাজ করেছেন। ১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্বল্পকাল পর থেকেই এটা দেখতে আমরা অভ্যস্ত।
সাংসদেরা নির্বাচিত হন সংসদে গিয়ে দেশের মানুষের দাবিদাওয়া ও সুবিধা-অসুবিধা তুলে ধরতে। অথচ বিরোধী দলে যাঁরা স্থান নেন, তাঁরা সেসব প্রত্যাশার বিপরীতে অবস্থান নিয়ে চলছেন দীর্ঘকাল ধরে। অথচ নির্বাচিত সাংসদের সুযোগ-সুবিধা ও মর্যাদা ভোগে তাঁদের মধ্যে নেই কোনো কুণ্ঠা। সে ঐতিহ্য আমাদের জাতীয় সংসদকে অনেকটাই দুর্বল করে ফেলেছে—এটাকেও অতিশয়োক্তি বলা যাবে না। কিন্তু ভেবে বিস্মিত হতে হয় এ ধারাবাহিকতা থেকে কি তাঁরা বের হয়ে আসবেন না? অন্তত বর্তমানে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাকে কেন্দ্র করেও তো এখনকার বিরোধী দল তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী আহ্বান জানিয়েছেন সংসদে গিয়ে তাঁদের বক্তব্য পেশ করতে। তাই তাঁরা শুধু সদস্যপদ রক্ষার খাতিরে নয়, তাঁদের দাবির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরার যতটুকু সুযোগ সংসদে পাওয়া যায় তা পূর্ণ ব্যবহার করতে পারেন। এতে তাঁদের মৌলিক অবস্থানে ভাটা পড়বে এমনটা মনে করার কারণ নেই। কেননা সংসদে যোগদান আর আন্দোলনও যুগপৎ চলতে পারে।
গত কয়েক মাস আগামী নির্বাচনকালে নির্দলীয় সরকার কায়েমের জন্য বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট অবিরাম আন্দোলন করে যাচ্ছে। আর বর্তমান সংবিধানের বিধান অনুসারে ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করতে শাসক দলের অবস্থানও অনেকটা অনড়। এর মধ্যে আবার প্রচলিত রাজনীতির সঙ্গে সংগতিবিহীন কতিপয় আন্দোলন পরিস্থিতিকে করেছে উত্তপ্ত। সময়ে সময়ে ঢিমেতালে চললেও মাঝেমধ্যেই আন্দোলন চাঙা হয়ে যায়। ঘটে হতাহতের ঘটনা। হানাহানি আর দাঙ্গা-সংঘাত তার অনুষঙ্গ। প্রায়ই ডাক আসে হরতাল বা অবরোধের। এতে সৃষ্টি হয় জনদুর্ভোগ। ক্ষতি হয় অর্থনীতির। গত ৫ মে হেফাজতে ইসলাম নামের একটি সংগঠন পূর্বঘোষণা দিয়েই ঢাকা অবরোধ নামে একটি কর্মসূচি পালন করে। অতঃপর তারা ঘোষণা ব্যতিরেকেই অবস্থান নেয় মতিঝিলের শাপলা চত্বরে। মনে হচ্ছিল অবস্থান থেকে সরে যাবে না তারা। তাদের প্রতি সহযোগিতা ও সহমর্মিতার হাত বাড়ান বিরোধীদলীয় জোটের পাশাপাশি শাসক মহাজোটের শরিক জাতীয় পার্টিও। সে অবরোধ ও সমাবেশ সামনে রেখে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে তাদের দাবি মেনে নিতে ১৮-দলীয় জোটের পক্ষে বিরোধী দলের নেতা আলটিমেটাম দেন। যা-ই হোক, সরকার আইনি শক্তি প্রয়োগে হেফাজতের সমাবেশ ভেঙে দেয়। এরপর অন্তত এখনকার মতো বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন জোর হারিয়ে ফেলেছে। তা সত্ত্বেও দেশজুড়ে দুটো হরতাল হয়েছে। জেলায় জেলায় তো প্রায় নিত্যই তা চলছে পালা করে। এ পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ মহাসচিবের বিশেষ দূতের প্রচেষ্টায় পক্ষদ্বয়ের মধ্যে সংলাপের যে আয়োজন চলছিল, তা আপাতত উবে গেছে এমনটাই মনে হচ্ছে। তবে এখন বিরোধীদলীয় জোট চাইছে সংলাপের জন্য সরকারের আহ্বান। আবার এর সঙ্গে শর্তও যুক্ত করছেন কেউ কেউ। এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সংসদে গিয়ে তাদের বক্তব্য পেশ করার আহ্বান জানিয়ে যাচ্ছেন। কোনো আনুষ্ঠানিক সংলাপের প্রশ্নে সরকারপক্ষ এখন এগোতে রাজি নয়, এমনটাই মনে হচ্ছে।
যে বিষয়কে কেন্দ্র করে দুটি পক্ষ বিপরীতমুখী অবস্থান নিয়েছে তা বেশ জটিল। বিরোধী দল নির্দলীয় সরকারের অধীনে ব্যতীত আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না, এমনটাই বলে আসছে। যেমনটা ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ সালের প্রথম প্রান্তিক পর্যন্ত আজকের সরকারি দল বিরোধী দলে থাকতে বলেছিল। আর আজকের সরকারি দল এখন যা বলে, ঠিক একই কথা বলত তখনকার সরকারি দল। মনে হচ্ছে, আওয়ামী লীগের ‘অসমাপ্ত’ আন্দোলন বিএনপি করছে আর বিএনপির তখনকার রক্ষণশীল অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ যেন ফুটবল খেলার মধ্য বিরতির পর পক্ষদ্বয়ের প্রান্ত পরিবর্তন। জাতীয় নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও সব দলের অংশগ্রহণে হোক—এটাই সবার প্রত্যাশা। এমন হলেই রাজনৈতিক অস্থিরতা অন্তত কিছুকালের জন্য হলেও কমবে। এ ধরনের নির্বাচন হয়েছে ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জুন, ২০০১ আর ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে। আমাদের পশ্চাৎমুখী রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য পরাজিত দল নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করলেও দেশে-বিদেশে তা গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। অনেকেই মনে করেন, এই অভিযোগগুলো যথাযথ বলে অভিযোগকারীরাই বিশ্বাস করেন না। নিয়ম রক্ষার খাতিরে বলে যাচ্ছেন। হতেও পারে। যা-ই হোক, উল্লিখিত নির্বাচনগুলো প্রথম তিনটির মাধ্যমে গঠিত সংসদ ও সরকার তাদের মেয়াদ পুরো করেছে। চতুর্থটিও করতে চলেছে। আর দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনই সরকার বা সংসদ মেয়াদ পুরো করতে পারেনি। বলার অপেক্ষা রাখে না, জনগণের কাছে তাঁরা পাঁচ বছরের জন্য ম্যান্ডেট পান। নির্বাচন যথাযথভাবে অনুষ্ঠিত হলে মেয়াদ পূর্তির আগে সেগুলোর ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না; জনসমর্থনের কারণে।
এ পরিপ্রেক্ষিতে একটি পক্ষপাতহীন পরিবেশে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কীভাবে আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচন করা যায়, সে প্রস্তাব বিরোধী দল সংসদে রাখতে পারে। সরকারপক্ষও স্বাভাবিক নিয়মে ভিন্নতর বক্তব্য দেবে। সেখানে তাদের একতরফা সংখ্যাগরিষ্ঠতাও রয়েছে। এ অবস্থায় বিরোধী দল যত ধরনের যুক্তিতর্ক আর নজিরই পেশ করুক, সংসদে ভোট দিয়ে এটাকে পাস করানো যাবে না। সরকারি দলের কোনো সদস্য যদি বিরোধী দলের এসব যুক্তিতর্কে বিশ্বস্ত হয়ে তাঁদের মতামতের সমর্থকও হন, তিনি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের খড়্গের ভয়ে মুখ খুলবেন না। কেননা, নিজের দলের বিপক্ষে ভোট দিলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে। তবে বিরোধী দল সংসদে বিরতিহীনভাবে যোগ দিয়ে যুক্তিতর্ক পেশের অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাতে পারে। তেমনি একটি সমঝোতার স্বার্থে সংসদ অধিবেশনকক্ষের বাইরে চেষ্টা চালাতে হবে। উভয় পক্ষের স্বল্পসংখ্যক নেতা ক্রমাগত বৈঠক করে বিদ্যমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাতে সচেষ্ট থাকতে পারেন। পূর্বশর্ত আর পাল্টা শর্ত দিয়ে কোনো সফল সংলাপ হবে না। এ ক্ষেত্রটিতে সরকারের উদারতা আর বিরোধী দলের কিছুটা ছাড় দেওয়ার আবশ্যকতা রয়েছে। ঘরোয়া আলাপে ঐকমত্য হলে তা প্রয়োজনে সংসদে পেশ করা যেতে পারে। তবে মূল প্রস্তাবে বিরোধী দল, আর এর বিপরীতে সরকারি দল অটল থেকে গেলে কোনো সমাধান আসবে বলে মনে হয় না। রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীলই থাকবে। আর বিরোধী দল ব্যতিরেকেই সরকারি দলকে নির্বাচনে গিয়ে জয়লাভের সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। ইতিহাস থেকে আমরা কেউই শিক্ষা নিই না। অথচ নিকট অতীত ২০০৬ সালের ইতিহাসই বলে, এ রকম জেদাজেদিতে দুই দলের কেউ অন্তত তখন জেতেনি। এবার জিতবে এমন আশা করার ভিত্তি কোথায় তা বোধগম্য হচ্ছে না।
তবে এযাত্রায় শুধু সংসদের পদ রক্ষার জন্য নয়, বিরোধী দলকে সংসদে যেতে হবে তাদের মৌলিক দাবি পেশ করার জন্য। যার জন্য তারা দীর্ঘকাল আন্দোলন করে আসছে, তা সংসদের মাধ্যমে দেশবাসীকে জানাতে তাদের সংসদে যেতে হবে। আর তাঁরা নির্বাচিত হয়েছেনও সেখানে গিয়ে এর সব কার্যপ্রণালিতে অংশ নেওয়ার জন্য। অতীতে উভয় পক্ষ নেতিবাচক কাজটিই করেছে। ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হয় সবাইকে। কিন্তু আমরা নিই না কেন? সংসদ বর্জনের অজুহাত তো উভয় পক্ষের একই ধরনের। নতুন কিছু তো শুনছি না আজ প্রায় দুই দশক। নিরাপদ আরামদায়ক পরিবেশে টেলিভিশনে সরাসরি সমপ্রচারের সুযোগ আছে এমন একটি স্থানে বিনা খরচ ও ঝুঁকিতে তাঁরা দাবিদাওয়া ও যুক্তি তুলে ধরতে চেষ্টা করতে পারেন। সে চেষ্টা হবে যখন যতটা সম্ভব। আর যেহেতু সংসদে যোগ দিয়ে দাবি উপস্থাপন করতে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং অনুরোধ করেছেন। এ ক্ষেত্রে সরকারি দল বিরোধী দলের প্রতি যথেষ্ট সহনশীল থাকাই যৌক্তিক হবে। অধিবেশনকক্ষের বাইরে আলোচনার প্রক্রিয়াও যুগপৎ চালু করার প্রয়োজনীয়তা তারা উপেক্ষা করতে পারে না। সদিচ্ছা থাকলে সে আলোচনা সফলও হবে। পূর্ব আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র রুয়ান্ডা গোত্রীয় দাঙ্গায় ক্ষত-বিক্ষত হয়ে পড়েছিল ১৯৯০ থেকে ১৯৯৪ সাল সময়কালে। দেশটির প্রায় এক-দশমাংশ লোক তাতে নিহত হয়, এমনটাই জানা গেছে। জাতিসংঘকে পাঠাতে হয় শান্তিরক্ষী বাহিনী। সে গণতান্ত্রিক রুয়ান্ডা আজ একটি শান্তির দেশ। পর্যটন তার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রধান উৎস। হুতু, তুতসিসহ সব গোত্রই এখন সেখানে সম্প্রীতির সঙ্গে বসবাস করছে। আমাদের সমস্যা তো জটিল কিছু নয়। তাহলে সমাধান হবে না কেন?
মীমাংসা হয় ন্যায়নীতি ও যুক্তির ভিত্তিতে। তা করতে ভাবতে হয় মীমাংসাটি না হলে কী হবে সেটাও। ১৬ কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ জাতীয় নেতাদের হাতে। জেদাজেদি করে তাঁদের চলার পথকে কণ্টকাকীর্ণ করা যথোচিত হবে না। জাতির অভিভাবক তাঁরাই। তাঁদের দূরদর্শী আর সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করতে সহায়ক হবে—এ প্রত্যাশা সবার। এর অন্যথা জাতিকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

শেয়ার করুন