তারেকের গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে

0
99
Print Friendly, PDF & Email

বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বড় ছেলে ও দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ইংরেজিতে ইস্যু করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিচারকের নির্দেশ অনুযায়ী গত ২৮ মে পরোয়ানাটি মন্ত্রণালয়ে পেঁৗছানো হয়েছে বলে আদালত সূত্রে জানা গেছে। কয়েক দিন ধরে ইন্টারপোলের মাধ্যমে তারেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে বলে ব্যাপক প্রচার চলে। তবে ইন্টারপোলের বিষয়টি আদালতের আদেশে নেই।
আইনজীবীরা বলেছেন, ইন্টারপোলের মাধ্যমে পরোয়ানা পাঠানোর নির্দেশ দেওয়ার এখতিয়ার আদালতের নেই। সে কারণেই আদালত এ ধরনের আদেশ দেননি। তবে বিদেশে অবস্থানরত কাউকে ধরতে ইন্টারপোলের সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি সরকার ও পুলিশ বিভাগের।
এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আদালত বলেছেন তাঁকে বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। এখন পররাষ্ট্রসচিব যদি মনে করেন তা হলে তিনি ইন্টারপোলকে বলতে পারেন, স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডকেও বলতে পারেন।’
গত ২৬ মে সিঙ্গাপুরে অর্থ পাচারের অভিযোগে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আবেদন করে। দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল আদালতে এক আবেদনে বলেন, তারেক রহমানের বিরুদ্ধে নতুন করে ইংরেজি ভাষায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা প্রয়োজন। ইন্টারপোলের মাধ্যমে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নিতে তিনি আদালতের আদেশ প্রার্থনা করেন। আদালতে আইনজীবী বলেন, তারেক রহমান বর্তমানে সুস্থ আছেন। যুক্তরাজ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে তিনি অংশগ্রহণ করছেন। সভা-সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন_ যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতে দেখা যাচ্ছে। এখন তাঁর আর চিকিৎসার প্রয়োজন নেই। এই আবেদনের সঙ্গে তারেকের যুক্তরাজ্যের ঠিকানাও উল্লেখ করা হয়।
গতকাল নথি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, আদালত সর্বশেষ আদেশে বলেছেন, ২০১১ সালের ৮ আগস্ট এ মামলায় অভিযোগ গঠন করে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। এখনো ওই পরোয়ানা তামিল করা হয়নি। এমনকি তারেক রহমান আত্মসমর্পণও করেননি। তিনি বিদেশে অবস্থান করছেন। আদেশে আরো বলা হয়, তারেক রহমানের বর্তমান ঠিকানা মল সাউথ গেট, লন্ডন-এন-১৪ ওএলআর যুক্তরাজ্যে। ওই ঠিকানায় নতুন করে পরোয়ানা পাঠানো যেতে পারে। এমতাবস্থায় ইংরেজিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষের আবেদন মঞ্জুর করা হলো। আদালত আদেশে আরো বলেছেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেবেন।
আদালতের সাঁটলিপিকার নূরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গত ২৮ মে তারেক রহমানের পরোয়ানা পাঠানো হয়েছে। তারা ওই দিন আদালতের আদেশ ও পরোয়ানা গ্রহণও করেছেন। দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজল গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে জানান, বুধবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ পররাষ্ট্রসচিবের কাছে পেঁৗছে দেওয়া হয়েছে। তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন কী করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা তামিলের ব্যবস্থা করা যায়।
টঙ্গীতে প্রস্তাবিত ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্মাণ কনস্ট্রাকশন কম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাদিজা ইসলামের কাছ থেকে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা নেন। সিঙ্গাপুরে এই টাকা লেনদেনের পর মামুন ওই অর্থ সিঙ্গাপুরের ক্যাপিটাল স্ট্রিটের সিটি ব্যাংকে (এনএ) নিজ নামের হিসাবে জমা করেন। এই টাকার মধ্যে তারেক রহমান তিন কোটি ৭৮ লাখ টাকা বিভিন্ন খাতে খরচ করেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।
২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর ক্যান্টনমেন্ট থানায় মামলাটি করেন দুর্নীতি দমন কমিশনের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ২০১১ সালের ৬ জুলাই দুদক আদালতে মামলাটিতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। মামলায় মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ‘ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের’ (এফবিআই) এজেন্টসহ মোট ৯ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।
‘তারেক মুচলেকার শর্ত ভঙ্গ করেছেন’ : আমাদের চট্টগ্রাম অফিস জানায়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেছেন, তারেক রহমান মুচলেকা দিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। এখন রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মুচলেকার শর্ত ভঙ্গ করায় তাঁকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা হবে। তিনি বলেন, হরতালে ভাঙচুর বন্ধ করার লক্ষ্যে আইন করার চিন্তা করছে সরকার। হরতাল চলাকালে জানমালের ক্ষতি হলে এর ক্ষতিপূরণ আদায় করা হবে হরতাল আহ্বানকারী দলের কাছ থেকে।
গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) নতুন চারটি থানা উদ্বোধন শেষে এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
পুলিশের অনুষ্ঠান রাজনৈতিক মঞ্চ : চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের (সিএমপি) বিদ্যমান ১২টি থানাকে পুনর্গঠন করে ১৬টিতে উন্নীত করা হয়েছে। নতুন চারটি থানার আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে গতকাল। নতুন থানাগুলো হলো চকবাজার, সদরঘাট, আকবরশাহ ও ইপিজেড। থানা উদ্বোধন উপলক্ষে গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ লাইনের শ্যুটিং ক্লাবে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। পুলিশের আয়োজন করা এই অনুষ্ঠানটি শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক মঞ্চে পরিণত হয়।
অনুষ্ঠানে বক্তারা সরকারের গুণগানের পাশাপাশি আগামী নির্বাচনে নৌকার জন্য ভোট প্রার্থনা করেন। ‘শেখ হাসিনার সরকার, বারবার দরকার’ বলে স্লোগান দেন। পুলিশ কর্মকর্তারাও সরকারের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে আগের সরকারের সমালোচনা করেছেন। এর আগে দুপুরে নতুন চারটি থানার উদ্বোধন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
নগর পুলিশের কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে পুলিশ সরকারের নির্দেশে নির্যাতন করেছে। আমিও সেই নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারে গিয়েছিলাম। এখন পুলিশ নির্যাতন করে না। জনগণের প্রকৃত বন্ধু হিসেবে কাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘স্বৈরতন্ত্রের ঔরসে যাদের জন্ম, তাদের ঘৃৃণা করতে শিখতে হবে।’
বক্তব্য শেষে চলে যাওয়ার সময় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে বলেন, ‘তারেক রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে মুচলেকা দিয়ে বিদেশ গিয়েছিলেন। কিন্তু বিদেশে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য দিয়ে মুচলেকার শর্ত ভঙ্গ করেছেন। শর্ত ভঙ্গের জন্য তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার করা হবে।’
এর আগে অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ডা. আফছারুল আমিন, উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন, সাবেক মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী, জাসদ কেন্দ্রীয় কার্যকরী কমিটির সভাপতি সংসদ সদস্য মাইনুদ্দিন খান বাদল, সংসদ সদস্য এ বি এম আবুল কাশেম মাস্টার, সংসদ সদস্য এম এ লতিফ, অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অপরাধ ও অভিযান) এ কে এম শহীদুল হক, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি নওশের আলী এবং দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোছলেম উদ্দিন আহমেদ।
পুলিশ কর্মকর্তার রাজনৈতিক বক্তব্য : অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (প্রশাসন ও অভিযান) এ কে এম শহীদুল হক বক্তব্য রাখতে গিয়ে বারবার রাজনৈতিক প্রসঙ্গ টেনে আনেন। তিনি বলেন, ‘আমাকে কেউ বিএনপি, আওয়ামী লীগ ভাবতে পারেন, কিন্তু সত্য বলব। কারণ আমি এই দেশের নাগরিক।’ তিনি বলেন, ‘দেশে এখন আগের মতো বোমা হামলা হয় না। জঙ্গি লালন করা হয় না। দমন করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এ সরকারের আমলে কি ৫০০ জায়গায় একসঙ্গে বোমা ফুটেছে? এজলাসে বিচারকের ওপর বোমা হামলা করা হয়েছে? একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতো ঘটনা কি ঘটেছে?’ তিনি আরো বলেন, ‘অনেকে বলেছিলেন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে। আপনারা কি কেউ মসজিদে উলুধ্বনি শুনেছেন? অনেকে বলেছিলেন, শান্তি চুক্তি হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম পর্যন্ত ভারত হয়ে যাবে। সেটা কি হয়েছে?’ তিনি বলেন, ‘আমি যত দিন এআইজি থাকব, এক দিনের জন্যও হেফাজতকে ঢাকায় ঢুকতে দেব না। হেফাজত ঢাকায় গিয়ে যে তাণ্ডব চালিয়েছে ঢাকাবাসীই তাদের ভবিষ্যতে সেখানে ঢুকতে দেবে না।’
সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে স্লোগান শুরু করেন। এতে উপস্থিত সুধীজনদেরও সম্পৃক্ত করেন।
বক্তব্য দেওয়ার সময় সাবেক মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং সংসদ সদস্য এম এ লতিফ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হকের বক্তব্যের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেন। এম এ লতিফ বলেন, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী বলে রাজনৈতিক হোক আর এমনিতে হোক, কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবেন না, সেটা তো হতে পারে না।’
পুলিশ নগরীতে চারটি থানার অনুষ্ঠান করলেও নগর পিতা চট্টগ্রাম নগরীর মেয়র ও বিএনপি নেতা এম মনজুর আলম এবং নগরীর একটি আসনের সংসদ সদস্য আওয়ামী লীগ নেতা নুরুল ইসলাম বিএসসিকে আমন্ত্রণ জানায়নি।
‘হরতালে ভাঙচুরের ক্ষতিপূরণ আইন করবে সরকার’
হরতালকে জাতির জন্য কলঙ্ক উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর বলেন, ‘হরতালে ভাঙচুর বন্ধে নতুন আইন করার কথা চিন্তা করছে সরকার। যদি কোনো রাজনৈতিক দল হরতাল ডেকে জনগণের কিংবা সরকারি সম্পদ ভাঙচুর করে তবে ওই দলের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ নেওয়া হবে।’ তিনি গতকাল বিকেলে চট্টগ্রামের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক মতবিনিময় সভায় এ কথা বলেন। চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্সের আয়োজনে সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংসদ সদস্য এম আবদুল লতিফ, মাইনুদ্দিন খান বাদল ও সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম।
সভায় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিরা দেশের অন্যান্য জায়গার তুলনায় চট্টগ্রামের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ছিনতাই এবং চট্টগ্রামের ট্রাফিক পরিস্থিতি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন।

শেয়ার করুন