বাংলাদেশের পোশাকশিল্প নিয়ে দ্বিধাবিভক্ত ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্র

0
124
Print Friendly, PDF & Email

একটা সময় বিশ্বে হালনাগাদ ফ্যাশনের কেন্দ্র ছিল লন্ডন, ইতালি, নিউইয়র্কের মতো অভিজাত শহরগুলো। কিন্তু গত শতাব্দীর শেষদিকে এসে বড় বড় খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলো, যারা সস্তা দামে আধুনিক, স্টাইলিশ পোশাক বিক্রি শুরু করলো। কম দামের কারণে দ্রুত জনপ্রিয় হলো এসব পোশাক। ছড়িয়ে পড়লো ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের অভিজাত থেকে শুরু করে সাধারণ শ্রেণীর মানুষের মধ্যে। আর এটি সম্ভব হয়েছিল বাংলাদেশের মতো কম মজুরির দেশগুলোর মাধ্যমেই।

তবে গত ২৪ এপ্রিল যখন সাভারের রানা প্লাজা ধসে ১১২৯ জন পোশাকশ্রমিকের জ্যান্ত কবর হলো, তখন কিন্তু আটলান্টিকের দুই পাড় থেকে সাড়া এলো দু’রকম।

রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পরপরই মানবাধিকার কর্মী ও বিভিন্ন ইউনিয়নের চাপে বিভিন্ন পোশাক বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘বাংলাদেশের আগুন ও ভবন নিরাপত্তা’ নামে পাঁচ বছর মেয়াদী একটি চুক্তিতে সই করে। এর আওতায় নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নয়নে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ বছর মেয়াদে সর্বোচ্চ ২৫ লাখ ডলার দিতে হবে। ইউরোপের বেশিরভাগ প্রধান খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান, যেমন- ব্রিটেনের মার্ক অ্যান্ড স্পেন্সার, ফ্রান্সের ক্যারাফোর, সুইডেনের এইচঅ্যান্ডএম ইত্যাদি এতে সই করলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র দু’টি কোম্পানি ছাড়া আর কেউ সই করেনি।

এর আগে ২০১২ সালের তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের পরও বাংলাদেশের পোশাক খাতের নিরাপত্তা বিধানে একটি সম্মিলিত চুক্তিতে সই করার জন্য বিভিন্ন কোম্পানিকে চাপ দিয়েছিল শ্রম ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো। তবে সেসময় কেবল যুক্তরাষ্ট্রের পিভিএইচ (কেলভিন ক্লাইন ও টমি হিলফিগার ব্র্যান্ডের মালিক প্রতিষ্ঠান) এবং জার্মানির টিশিবো তাতে সই করেছিল।

কিন্তু রানা প্লাজার ঘটনার পর এগিয়ে আসে বাংলাদেশে উৎপাদনকারী বৃহত্তম খুচরা বিক্রেতা সুইডেনের এইচঅ্যান্ডএম। এরপর আরও এগিয়ে আসে ব্রিটেনের প্রিমার্ক, স্পেনের ইন্ডিটেক্স (জারা ব্র্যান্ডের মালিক প্রতিষ্ঠান)। শেষ পর্যন্ত সব মিলিয়ে প্রায় চল্লিশটি কোম্পানি চুক্তিতে সই করে, যারা সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশের সাড়ে চার হাজার পোশাক কারখানার মধ্যে এক হাজারটিরও বেশিতে পরিবেশ উন্নত করতে সক্ষম।

কিন্তু নানামুখী চাপ ও প্রতিবাদের মুখেও যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিগুলো কেন চুক্তিতে সই করতে চাচ্ছে না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশ্ন উঠছে। পিভিএইচ ও অ্যাবারক্রম্বি অ্যান্ড ফিচ ছাড়া কোনো মার্কিন কোম্পানিই এতে যোগ দেয়নি। এমনকি মার্কিন খুচরা বিক্রেতা ক্যাটো ও চিলড্রেন’স প্লেস রানা প্লাজা থেকে কাজ করালেও চুক্তিতে সই করেনি।

অবশ্য ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের এই পার্থক্যের প্রথম কারণ হিসেবে বলা যায়, বাংলাদেশে তৈরি মোট পোশাকের ৬০ ভাগই ইউরোপে চলে যায়। এখানেই রয়েছে দেশের পোশাক খাতের সবচেয়ে বড় বাজার।

অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, ইউরোপের কোম্পানিগুলোর জন্য সামাজিক দায়বদ্ধতার খাতিরে ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে চুক্তিতে আসা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু ওয়ালমার্টের মতো মার্কিন কোম্পানিগুলো সম্পূর্ণ ইউনিয়নবিরোধী।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের ক্রেতাদের পার্থক্যও এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন কেউ কেউ। তাদের মতে, ইউরোপের ক্রেতারা যেখানে খুঁটিয়ে বিশ্লেষণ করে থাকেন ও সামগ্রিক পরিবেশ নিয়ে সচেতন থাকেন, সেখানে আমেরিকান ক্রেতারা মূলত কম দামকেই প্রাধান্য দেন। ক্রেতাদের পাশাপাশি মার্কিন খুচরা বিক্রেতারাও খরচ কমানোর ব্যাপারে খুবই সচেতন। ইউরোপের কোম্পানিগুলোর মত সামাজিক দায়বদ্ধতা বা নৈতিকতা চর্চা তাদের মধ্যে তেমন দেখা যায় না।

তবে বাংলাদেশ সফরকালে গত সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি ওয়েন্ডি শারম্যান জানান, শ্রমিক নিরাপত্তার সাধারণ নীতিমালা মেনে চলার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র সব কোম্পানিকে বাংলাদেশ থেকে পোশাক কেনা অব্যাহত রাখার আহবান জানাবে।

অন্যদিকে, সাধারণ ভোক্তাদের উপর চালানো জরিপে দেখা গেছে, ইউরোপ বা যুক্তরাষ্ট্রের হোক, তাদের বেশিরভাগই নৈতিক বিষয়টি নিয়ে সচেতন। কিন্তু তাদের জন্য সমস্যা হচ্ছে নৈতিকতা মেনে তৈরি হওয়া পোশাক আর ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে তৈরি হওয়া পোশাক আলাদা করা।

সচেতন অনেক ক্রেতা ভেবে থাকেন, পোশাক বেশি দামি হলে হয়তো সেটি নীতি-নৈতিকতার সব শর্ত মেনে তৈরি করা হয়েছে। তাই তারা সস্তা পোশাকের বদলে দামি পোশাকই বেছে নেন। কিন্তু এটি যে সঠিক পন্থা নয়, তা তারা নিজেরাও স্বীকার করেন। তাই পোশাক কিভাবে তৈরি হচ্ছে, সে ব্যাপারে ভোক্তারা কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে আরও বেশি তথ্য আশা করেন। যাতে নিজেরাই নৈতিক বিষয়গুলো যাচাই করে পোশাক কিনতে পারেন।

ভোক্তাদের পছন্দ-অপছন্দ ছাড়াও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা চুক্তিটি ভালোভাবে কার্যকর হওয়ার পথে আরেকটি বাধা দুর্নীতি। এসবের কারণে দীর্ঘমেয়াদে এই চুক্তি কতোটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। কিন্তু বেশিরভাগই মনে করছেন, বাংলাদেশের পোশাক খাতকে এ চুক্তি আমূল বদলে ফেলতে পারে। এর ফলে পোশাক খাত আরও সমুন্নত হবে, প্রত্যাশা বাড়বে শ্রমিকদের। যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক পোশাক খাতে।

যুক্তরাষ্ট্রেভিত্তিক বিশ্ব শ্রম ও মানবাধিকার ইনস্টিটিউটের পরিচালক চার্লস কার্নাগানের মতে, বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য চুক্তিটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ বটে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকারের দুর্নীতি, অনিয়ম এ খাতে এখনও বিদ্যমান। যে কারণে সমস্যাটির কোনো সহজ সমাধান নেই।

তিনি আরও মনে করেন, চুক্তিতে ইউনিয়নগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই ইউনিয়নগুলো বাংলাদেশি ইউনিয়নের মতো শুধু কাগজপত্রে থাকলে হবে না, তাদের সত্যি সক্রিয় হতে হবে।

শেয়ার করুন