উপমহাদেশে সরকারবিরোধী জনমত তুঙ্গে

0
139
Print Friendly, PDF & Email

পাকিস্তানে ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনে ২৭২টি আসনের মধ্যে দেশটির বৃহত্তম রাজনৈতিক দল পাকিস্তান পিপলস পার্টি পেয়েছিল ১২৪টি আসন। এর পর পাঁচ বছরের শাসনামলে জন-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে পিপিপি পেয়েছে মাত্র ৩১টি আসন। পিপিপির আসনসংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা চার ভাগের এক ভাগে। মোট ভোটের হিসাবেও পিপিপি নেমে গেছে তৃতীয় অবস্থানে। কার্যত পিপিপিকে প্রত্যাখ্যান করেছে পাকিস্তানের জনগণ।
ক্ষমতাসীন দলের এ শোচনীয় অবস্থা শুধু পাকিস্তানের পিপিপিরই নয়; উপমহাদেশের প্রায় প্রতিটি দেশের চিত্র এমনটাই। প্রতিটি দেশেই বইছে সরকারবিরোধী ঝড়ো হাওয়া।
বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে কথিত ভারত, নতুন গণতান্ত্রিক দেশ মিয়ানমার এবং ভঙ্গুর গণতন্ত্রের দেশ বাংলাদেশেও ক্ষমতাসীন দলগুলোর বিরুদ্ধে জনগণ ফুঁসে উঠেছে। সুযোগ পেলেই ঘটছে গণবিস্ফোরণ।
ভারতে সদ্যপ্রকাশিত ব্যাপকভিত্তিক এক জনমত জরিপে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনে ক্ষমতাসীন কংগ্রেস ৮৮টি আসন হারাতে পারে। এতে গত নির্বাচনে ২০৬টি আসনে জয়ী কংগ্রেসের আগামী নির্বাচনে আসনসংখ্যা কমে দাঁড়াতে পারে ১১৬টিতে।
অন্যদিকে মিয়ানমারে গত এপ্রিলে অনুষ্ঠিত ৪৪টি আসনের উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল পেয়েছে মাত্র একটি আসন।
বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগেরও এ ধরনের ভরাডুবি ঘটতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মন্তব্য করেছেন।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. তারেক শামসুর রেহমান এ প্রসঙ্গে গত রোববার আমার দেশ-কে বলেন, ‘উপমহাদেশে পরিবর্তনের হাওয়া বইছে।’
তিনি বলেন, সম্প্রতি পাকিস্তানের নির্বাচনে একটি জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় এসেছে। আগামী বছর ভারতের নির্বাচনে, যেটি এগিয়ে নিয়ে আসা হতে পারে, কংগ্রেসের পরাজয় ঘটতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বাংলাদেশেও এর প্রতিক্রিয়া পড়বে বলে ধারণা করা যায়।
ভারত : বেশ বেকায়দায় আছে ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল কংগ্রেস। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) টানা নয় বছর ক্ষমতায় থাকলেও আগামী বছর অনুষ্ঠেয় সাধারণ নির্বাচনে পরাজয় ঘটতে পারে।
গত ২২ মে হেডলাইনস টুডে-সি ভোটার প্রকাশিত জনমত জরিপে দেখা যায়, শুধু আটটি রাজ্যেই কংগ্রেস ৮৮টি আসন হারাতে পারে। জরিপে দেখা যায়, মধ্যপন্থী কংগ্রেসের ব্যর্থ শাসনের কারণে আগামী নির্বাচনে মৌলবাদী দল বিজেপি ভারতের একক বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হতে পারে। কংগ্রেসের একের পর এক দুর্নীতির কাহিনী প্রকাশ, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস এবং তামিল নাড়ুর ডিএমকের ইউপিএ জোট ত্যাগও কংগ্রেসের সম্ভাব্য পরাজয়ের কারণ হতে পারে। রাজ্যসভা ও স্থানীয় নির্বাচনেও এর প্রমাণ পাওয়া গেছে।
গত মার্চ থেকে মে মাসে ভারতের ৫৪০টি লোকসভা আসনে ১২ লাখ ভোটারের ওপর জরিপটি পরিচালনা করা হয়। জরিপের এ ফলাফল ভারতে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।
২০০৯ সালের সংসদ নির্বাচনে এককভাবে কংগ্রেস পেয়েছিল ২০৬টি আসন। আগামী সংসদ নির্বাচনে কংগ্রেসের আসন কমে দাঁড়াতে পারে মাত্র ১১৬টিতে।
জরিপে দেখা যায়, বিজেপির অতীত যেহেতু কালিমালিপ্ত, তাই কংগ্রেসের হারানো সব আসনে তারা জয়ী হওয়ার সুযোগ পাবে না। আগামী নির্বাচনে বিজেপি ২১টি আসন বেশি পেতে পারে। এতে এককভাবে বিজেপির আসন দাঁড়াতে পারে ১৩৭টিতে। অন্যান্য আঞ্চলিক দলের আসন ৬৮টি বাড়তে পারে।
পাকিস্তান : পাকিস্তানের সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে পিপিপির ভরাডুবি ঘটেছে। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ২৭২টি আসনের মধ্যে ১২৪টি আসন পাওয়া পিপিপির আসনসংখ্যা এবার কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩১টিতে। আসনসংখ্যার বিচারে কোনোভাবে পিপিপি বিরোধী দলের মর্যাদা ধরে রাখতে সক্ষম হলেও পপুলার ভোট বা জনগণের মোট ভোটে পিপিপির স্থান হয়েছে ক্রিকেটার কাম ক্যারিশম্যাটিক নেতা ইমরান খানের পাকিস্তান তেহরিক-ই ইনসাফ (পিটিআই) পার্টির নিচে। পিটিআই মোট ভোট পেয়েছে ৭৫ লাখ। পিপিপি পেয়েছে ৬৮ লাখ ভোট। অন্যদিকে নওয়াজ শরীফ নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ পেয়েছে ১২৫টি আসন এবং ভোট পেয়েছে ১ কোটি ৪৭ লাখ। নির্বাচনে ভোট পড়েছে ৪ কোটি ৬২ লাখ অর্থাত্ মোট ভোটের ৫৫ শতাংশ।
পিপিপির পরাজয়ের কারণে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে যেতে হতে পারে পিপিপির কো-চেয়ারম্যান আসিফ আলী জারদারিকে। তিনি হয়তো মেয়াদ পূর্ণ করার সুযোগ পেতে পারেন।
মিয়ানমার : অর্ধ শতাব্দীর সেনাশাসনের পর সেনা নিয়ন্ত্রণে অনুষ্ঠিত ২০১০ সালের সাধারণ নির্বাচন বর্জন করেছিল নোবেল জয়ী গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চি নেতৃত্বাধীন মিয়ানমারের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি। তবে নতুন সরকার গণতান্ত্রিক সংস্কার শুরু করলে গত বছরের এপ্রিলে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনে অংশ নেয় সু চির দল। সে সময় ৬৬৪ আসনবিশিষ্ট মিয়ানমারের সংসদের ৪৪টি আসনে উপনির্বাচন হয়। সেখানে ৪৩টি আসনেই জয়ী হয় সু চির দল।
২০১৫ সালে অনুষ্ঠিত হবে মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। বিশ্লেষকরা সবাই একমত যে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে সেনানিয়ন্ত্রিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টির ভরাডুবি ঘটবে এবং উপনির্বাচনের আদলে জয় পাবেন অং সান সু চি।
আগামী নির্বাচনে সু চির এনএলডির অবিস্মরণীয় জয়ের পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও জয়ী হতে পারেন সু চি। এতে বিদায় নিতে পারেন মিয়ানমারের সাবেক জান্তা এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট থেইন সেইন।
বাংলাদেশ : বাংলাদেশে আগামী সংসদ নির্বাচনের ফলাফল কী হবে, সেটা নিয়ে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ করা হয়নি। তবে আওয়ামী লীগের অপশাসন, বেপরোয়া দুর্নীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল, বিচার বিভাগকে চরমভাবে দলীয়করণ, বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন, ইসলামবিরোধী কার্যকলাপ, ভারতের তাঁবেদারি, অর্থনৈতিক চরম অব্যবস্থাপনা, ছাত্রলীগের বেপরোয়া সন্ত্রাস, আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি, গণমাধ্যম দমনসহ নানা কারণে দলটি যে জনগণ থেকে একেবারেই বিছিন্ন হয়ে গেছে, তা নিয়ে নিরপেক্ষ কোনো পর্যবেক্ষকের দ্বিমত নেই।
বিভিন্ন নির্বাচনেও এর বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। বিরোধী দলের বর্জনের মধ্যেও টাঙ্গাইলে উপনির্বাচনসহ বিভিন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ভরাডুবি ঘটছে।
গত ১১ মে আওয়ামী লীগ সমর্থক হিসেবে পরিচিত প্রথম আলো প্রকাশিত জনমত জরিপে দেখা যায়, দেশের শতকরা ৮৫ ভাগ মানুষ মনে করে দেশের অবস্থা খারাপ। বিপরীতে মাত্র ১৩ শতাংশ মানুষ বলেছে দেশের অবস্থা ভালো।
জরিপে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়েছেন শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ। ২০১১ সালে ৭৩ শতাংশ এবং ২০১২ সালে ৭৬ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়েছিলেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ জরিপের তাত্পর্য এই যে, আওয়ামী লীগ সমর্থক একটি বড়ই অংশই আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। ৯০ শতাংশ মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে মত দিয়ে কার্যত জানিয়ে দিয়েছেন, আওয়ামী লীগের ওপর তাদের আস্থা নেই। একে আওয়ামী রাজনীতির জন্য ভয়াবহ বিপদ সঙ্কেত হিসেবেই দেখতে চান তারা।
ড. তারেক শামসুর রেহমান বলেন, উপমহাদেশের মানুষ বুঝতে পারছে যে ক্ষমতাসীন দলের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। পাকিস্তানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। নেপালেও প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১১ জুন সাধারণ নির্বাচন হবে।
প্রথম আলোর জনমত জরিপের বিষয়ে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগেও অনেক শুভবুদ্ধির মানুষ আছেন। তারা ছাত্রলীগের সন্ত্রাস, হলমার্কসহ নানা দুর্নীতির কাহিনী, অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও সুশাসন নিশ্চিত করতে না পারায় আওয়ামী লীগের ওপর হতাশ।
ড. তারেক শামসুর রেহমানের পূর্বাভাস, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু হলে বাংলাদেশেও ক্ষমতার পালাবদলের প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

শেয়ার করুন