খুলনায় খালেকের তালা মনির আনারস মধুর দোয়াত-কলম

0
84
Print Friendly, PDF & Email

খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) মেয়র প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ চূড়ান্ত হয়েছে। সদ্য বিদায়ী মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি তালুকদার আবদুুল খালেক তালা, বিএনপি মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি আনারস এবং জাতীয় পার্টির জেলা শাখার সভাপতি শফিকুল ইসলাম মধু দোয়াত-কলম প্রতীক পেয়েছেন। নির্বাচনী হলফনামায় তারা এ সব প্রতীকই চেয়েছিলেন।
এবারের নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী মাত্র ৩ জন থাকায় ১৮টি প্রতীক বরাদ্দ থাকলেও তাদের চাওয়া বহাল রাখা হয়েছে।
গতকাল সকাল সাড়ে ৯টায় নগরীর জিয়া হলে প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেন রিটার্নিং অফিসার মোস্তফা ফারুক। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় এ ৩ জন মেয়র প্রার্থী ছাড়াও ৩১টি সাধারণ ওয়ার্ডে ১৩৭ জন কাউন্সিলর ও ১০টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডে ৪৫ জন কাউন্সিলর প্রার্থী রয়েছেন।
রিটার্নিং অফিসার মোস্তফা ফারুক জানান, নির্ধারিত প্রতীকে একাধিক প্রার্থী দাবিদার হলে লটারির মাধ্যমে ফয়সালা করা হবে।
মেয়র প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু : ১২ মে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েই গণসংযোগ, কর্মিসভা আর নাগরিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে অনানুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করেছিলেন কেসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। রোববার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন পার হতেই গতকাল সকালে প্রতীক বরাদ্দ নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রচারণায় নেমে পড়েছেন তারা।
স্থানীয় সরকারের অরাজনৈতিক পরিচয়ের এই নির্বাচনে তিন প্রার্থীকেই নতুন সংগঠন দাঁড় করিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে তালুকদার আবদুুল খালেক সম্মিলিত নাগরিক কমিটির ব্যানারে, মনিরুজ্জামান মনির পক্ষে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরাম এবং মধুর পক্ষে খুলনা নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি গঠনের মধ্যদিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু হয়েছে।
প্রতীক বরাদ্দের পর গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে নগরীর সিটি কলেজ মোড়ে একটি আইটি প্রতিষ্ঠানে তালুকদার আবদুল খালেকের নির্বাচনী ওয়েব সাইটের উদ্বোধন হয়। এ সময় সম্মিলিত নাগরিক কমিটির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট এনায়েত আলী, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি হারুনর রশিদ, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা রশিদী সুজা, মহানগর সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজান, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মো. ফায়েকউজ্জামান, সাংবাদিক মকবুল হোসেন মিন্টু, সুজন আহমেদ, শফিকুর রহমান পলাশ, ফয়েজুল ইসলাম টিটো প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সম্মিলিত নাগরিক ফোরামের মেয়র প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা মনিরুজ্জামান মনি সকাল সাড়ে ১১টায় ফেরিঘাট জিন্নাহ মসজিদের সামনে থেকে প্রচারণা শুরু করেন। এ সময় ফোরামের আহ্বায়ক শেখ সিরাজুল ইসলাম, নগর বিএনপির সভাপতি নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি, সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা, সাবেক এমপি সৈয়দা নার্গিস আলী, সাবেক এমপি মো. মুজিবর রহমান, আইনজীবী লতিফুর রহমান লাবু উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে জাতীয় পার্টি জেলা সভাপতি ও আসন্ন কেসিসি নির্বাচনে মেয়র পদে অংশ নেয়া শফিকুল ইসলাম মধুর পক্ষে গঠন করা হয়েছে খুলনা নাগরিক উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি। কমিটির পক্ষ থেকে প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় প্রচারণা। এ সময় সন্ত্রাস, দুর্নীতি, মাদকমুক্ত ও সুষম উন্নয়নের ভিত্তিতে আধুনিক খুলনা গড়তে এ কমিটির প্রার্থী শফিকুল ইসলাম মধুকে বিজয়ী করার আহ্বান জানানো হয়। গণসংযোগকালে উপস্থিত ছিলেন নগর জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মোল্লা মুজিবর রহমান, কাজী জাহিদুল ইসলাম মিলন, মোস্তফা কামাল জাহাঙ্গীর প্রমুখ।
মনি’র সমর্থনে ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরাম গঠন : কেসিসি নির্বাচনের মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনির সমর্থনে ৩০২ সদস্যের ‘ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরাম’ গঠন করা হয়েছে। সাবেক মেয়র শেখ সিরাজুল ইসলামকে কমিটির আহ্বায়ক এবং জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি সরদার মো. ইউনুসকে সদস্য সচিব এবং প্রার্থীর প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট করা হয়েছে এস এম শফিকুল আলম মনাকে। এছাড়া প্রবীণ রাজনীতিবিদ এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাইকে প্রধান উপদেষ্টা করে ১৯ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ ঘোষণা করা হয়। গঠন করা হয়েছে ১৩টি উপ-কমিটি। সার্বিক তদারকিতে আছেন সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম মঞ্জু। রোববার রাতে নগরীর একটি অভিজাত হোটেলে নাগরিক মতবিনিময় সভায় এই কমিটি গঠন করা হয়। জাতীয়তাবাদী নাগরিক ফোরামের ব্যানারে মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হলেও পরে সভায় সর্বসম্মতিক্রমে কমিটির নাম পরিবর্তন করে ‘ঐক্যবদ্ধ নাগরিক ফোরাম’ নামকরণ করা হয়। কেসিসির প্রথম মেয়র আলহাজ সিরাজুল ইসলামের সভাপতিত্বে সভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও ১৮ দলীয় জোটের সমন্বয়কারী নজরুল ইসলাম মঞ্জু এমপি। এতে বক্তব্য রাখেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এম নুরুল ইসলাম দাদু ভাই, মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি, বিজেপি সভাপতি অ্যাডভোকেট লতিফুর রহমান লাবু, জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম কুদ্দুস, শফিকুল আলম মনা, সাহারুজ্জামান মোর্ত্তজা, মো. মুজিবর রহমান, কাজী সেকেন্দার আলী ডালিম, সৈয়দা নার্গিস আলী, অ্যাডভোকেট গাজী আবদুুল বারী, জাফরউল্লাহ খান সাচ্চু, অধ্যক্ষ আলী আহমেদ, আলহাজ সরোয়ার খান, খুবির প্রফেসর ড. রেজাউল করিম, প্রফেসর ড. হারুনর রশিদ খান, ড্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মো. সোলায়মান, কলেজ শিক্ষক সমিতির অধ্যক্ষ শামসুদ্দোহা, মুক্তিযোদ্ধা শেখ আবু জাফর, এ্যাবের সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার এম এম এ গোফরান, কুয়েটের প্রফেসর ড. খন্দকার আফতাব হোসেন প্রমুখ। মতবিনিময় সভা সঞ্চালনা করেন অধ্যাপক আবদুল মান্নান ও ড. মো. নাজমুস সাদাত। কোরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা মুজিবর রহমান। সভা শেষে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
খালেকের দুই উপাচার্যরা : খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনকে সামনে রেখে ক্যাম্পাসের বাইরে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন দুই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। গত এক সপ্তাহ ধরে তারা মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বী এক প্রার্থীর পক্ষে সক্রিয়ভাবে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। তাদের এ কর্মকাণ্ডে চাকরিবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জানা গেছে, নির্বাচনে সম্মিলিত নাগরিক কমিটির ব্যানারে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী তালুকদার আবদুল খালেক। তার নির্বাচন পরিচালনার জন্য গঠিত কমিটিতে দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামান এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আলমগীর। তালুকদার আবদুল খালেকের পক্ষে তারা দুজনেই প্রকাশ্যে প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন।
রোববার সকালে খুলনা প্রেস ক্লাবে তালুকদার আবদুল খালেকের পক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা দুজনেই উপস্থিত ছিলেন। তালুকদার আবদুল খালেকের পক্ষে মাঠে নামা সম্মিলিত নাগরিক কমিটির ব্যানারে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সোমবার প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দের পর নগরের সিটি কলেজ মোড়ে খালেকের নির্বাচনী কার্যালয় উদ্বোধন করা হয়। খালেকের নির্বাচনী প্রচারণা ও প্রতিদিনকার কার্যক্রম এবং নগরবাসীর কাছে ডিজিটাল-পদ্ধতিতে ভোট প্রার্থনার জন্য নতুন একটি ওয়েবসাইটের উদ্বোধন করা হয়। এখানেও খুবি ভিসি উপস্থিত ছিলেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো লিখিত চাকরিবিধি নেই। তবে প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই একে ছাত্ররাজনীতিমুক্ত ক্যাম্পাস হিসেবে ঘোষণা দেয়া হয়েছে।
এ সম্পর্কে জানতে খুবির উপাচার্য মোহাম্মদ ফায়েক উজ্জামানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সম্মিলিত নাগরিক কমিটি একটি অরাজনৈতিক সংগঠন। এই নির্বাচন দলীয় কোনো নির্বাচন নয়। তাই আমরা এখানে তার (তালুকদার আবদুল খালেক) পক্ষে নির্বাচনের মাঠে নেমেছি। এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় নিজের অংশগ্রহণ বিধিসম্মত দাবি করে সচেতন নাগরিক হিসেবে তারা এখানে এসেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মুহাম্মদ আলমগীর বলেন, খালেক সাহেবের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণায় নামলে সমস্যা কোথায়? বিষয়টি চাকরিবিধির সঙ্গে সাংঘর্ষিক কি না, জানতে চাইলে তিনি চাকরিবিধি দেখে নেয়ার পরামর্শ দেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদ সাংবিধানিক পদ। তা ছাড়া অতীতের নির্বাচনগুলোয় এর আগে এমন রেওয়াজ দেখা যায়নি।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিএনপি-সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনিরুজ্জামান মনি অভিযোগ করে বলেন, নির্বাচনে জেতার জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেখেছেন তালুকদার খালেক। তিনি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কর্মীদের মাঠে নামিয়েছেন।
সূত্রগুলো দাবি করেছে, এই দুই উপাচার্য ব্যক্তিগতভাবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তাই তারা খালেকের পক্ষে মাঠে নেমেছেন। এর মধ্যে খুবি উপাচার্যের বাড়ি গোপালগঞ্জে।

শেয়ার করুন