পঙ্গু লিমন বনাম রাষ্ট্র

0
72
Print Friendly, PDF & Email

দুই বছর আগে র্যাব গুলি করেছিল ১৬ বছরের কিশোর লিমনকে। পরিণতিতে তার এক পা কেটে ফেলতে হয়। এর পরও নিস্তার পায়নি সে। গ্রেপ্তার করে তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা দিয়েছে র্যাব। সেই দুই মামলার বিচার-প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের গরিব পরিবারে জন্ম নেওয়া নিরীহ এই কলেজছাত্রের ওপর রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নিষ্ঠুরতার ঘটনা সারা দেশের মানুষকে নাড়া দেয়। এরপর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র আরও উঠেপড়ে লাগে পঙ্গু এই কিশোরের বিরুদ্ধে।
উচ্চ আদালতের নির্দেশে জামিনে মুক্তি এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক সহায়তায় এক বছর ধরে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে কৃত্রিম পা নিয়ে আবার লেখাপড়ায় ফিরে গেছে লিমন। সেটাও মানুষের সহায়তায়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় বাহিনীর করা দুটি মামলার খড়্গ এখন তার ঘুম হারাম করে দিয়েছে। এ দুটি মামলায় পুলিশ লিমনকে আসামি করে অভিযোগপত্র দিয়েছে। অভিযোগপত্র দুটি আদালত গ্রহণও করেছেন। এই মানসিক চাপ ও যন্ত্রণা নিয়ে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে সে।
নথিপত্রে দেখা যায়, দুটি অভিযোগপত্রেই মূলত র্যাবের লেখা এজাহারকে তুলে দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ সন্ত্রাসী মোরশেদ জমাদ্দার তার দলবল নিয়ে রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে পুরোনো জমাদ্দারহাট শহীদ জমাদ্দারের বাড়িতে বৈঠক করছিল।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র্যাব সেখানে অভিযান চালায়। র্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে সন্ত্রাসীরা র্যাবের ওপর গুলিবর্ষণ করে, র্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। উভয় পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময়ের একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে গেলে ঘটনাস্থলে লিমনকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। তার পাশেই পাওয়া যায় আমেরিকার তৈরি একটি পিস্তল ও একটি গুলির খোসা। আর এভাবে বন্দুকযুদ্ধ করে সরকারি কাজেও বাধা দিয়েছে লিমন।
ঝালকাঠির আদালতে লিমনের আইনজীবী নাসির উদ্দিন কবির প্রশ্ন তুলে বলেন, র্যাবের কথিত ঘটনার সময় লিমন ১৬ বছরের এক কিশোর, র্যাব তাকে গুলি করে মুমূর্ষু অবস্থায় ফেলে রাখে। তখন সে সরকারি কাজে বাধা দিল কীভাবে?
লিমনের আইনজীবীরা জানান, র্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে যতগুলো কথিত ‘ক্রসফায়ার’ বা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ বিবরণ দেওয়া হয়েছিল, লিমনের ক্ষেত্রেও ঠিক একই রকম বিবরণ দিয়ে মামলা করা হয়। অথচ যে কথিত সন্ত্রাসী মোরশেদ জমাদ্দারের কথা বলা হচ্ছে, তাকে বা ওই কথিত বন্দুকযুদ্ধে জড়িত অপর কাউকে আজ পর্যন্ত র্যাব গ্রেপ্তার দেখাতে পারেনি।
লিমনের পক্ষে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান। তবে শেষ পর্যন্ত সেটা আর বাস্তবায়িত হয়নি। তাঁকে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র ও স্থানীয় কয়েকজন আইনজীবী বিনা মূল্যে আইনি সহায়তা দিচ্ছেন।
লিমনকে নিয়ে যা হলো
২০১১ সালের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুর উপেজলার সাতুরিয়া গ্রামে র্যাবের গুলিতে আহত হয় লিমন। এ কারণে ওই বছর সে আর এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারেনি।
লিমনের অভিযোগ, বাড়ির পাশের মাঠ থেকে গরু আনতে গেলে র্যাবের সদস্যরা তাকে ধরে পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। পরে গ্রামবাসী চাঁদা তুলে তার চিকিৎসার খরচ চালান। একপর্যায়ে বরিশালের শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে লিমনকে ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। পঙ্গু হাসপাতালের চিকিৎসকেরা লিমনের জীবন বাঁচাতে তার বাম পা ঊরুর নিচ থেকে কেটে ফেলেন।
এ ঘটনার পর বরিশালে র্যাব-৮-এর তৎকালীন উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) লুৎফর রহমান বাদী হয়ে লিমনসহ আটজনের নামে রাজাপুর থানায় দুটি মামলা করেন। একটি অস্ত্র আইনে, অপরটি সরকারি কাজে বাধাদানের অভিযোগে।
এরপর প্রথম আলোতে ‘চরম নিষ্ঠুরতা’ শিরোনামে ওই বছরের ৬ এপ্রিল এ-সংক্রান্ত খবর ছাপা হয়। এরপর অন্যান্য সংবাদমাধ্যমেও লিমনের ওপর নিষ্ঠুরতার খবর প্রকাশিত হয়। লিমনের এ ঘটনা মানবিকবোধসম্পন্ন সব মানুষকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। এরপর লিমনকে সন্ত্রাসী প্রমাণের জন্য নানা তৎপরতা চলে। স্থানীয়ভাবে র্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিরা লিমনের গ্রামে গিয়ে ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ও লিমনের পক্ষে গণমাধ্যমে কথা বলা মানুষকে হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন। এমনকি এসব কথিত সোর্স ও সেখানকার সরকারদলীয় কিছু নেতা-কর্মী তদন্তে যাওয়া বিভিন্ন সংস্থার কাছে লিমনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যও দেন। এসব তৎপরতার কথাও সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
মায়ের করা মামলার অপমৃত্যু
অন্যদিকে গুলিবর্ষণকারী র্যাবের ছয় সদস্যের বিরুদ্ধে লিমনের মা হেনোয়ারা বেগমের করা মামলা প্রথমে রাজাপুর থানার পুলিশ নেয়নি। পরে তিনি ঝালকাঠির জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম আদালতে যান। আদালতের নির্দেশের পরও পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো মামলা না নিতে জেলা ও

শেয়ার করুন