সরকারকে বেকায়দায় ফেলেছেন তিন খান

0
65
Print Friendly, PDF & Email

 বিরোধীদল আন্দোলন করে এ পর্যন্ত সরকারকে যতটা না বেকায়দায় বা চাপে ফেলতে সক্ষম হয়েছে, তার চেয়ে ঢের বেশি বেকায়দায় ও বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছেন কয়েকজন মন্ত্রী, বিভিন্ন সময় আবোল-তাবোল কথা বলে। লাগামহীন বক্তব্য দেওয়া বা অতিকথন শুরু করেছিলেন বাণিজ্যমন্ত্রী ফারুক খান। পরে এই তালিকায় নৌপরিবহন মন্ত্রী শাহজাহান খানসহ আরও কয়েকজন যুক্ত হয়েছেন। সর্বশেষ যুক্ত হয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর। দেখা যাচ্ছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তিন ‘খান’— ফারুক খান, শাজাহান খান, মহীউদ্দীন খান— সরকারকে বিব্রত করতে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন। রাজধানীতে কোনও ধরনের সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর সরকারকে বড় ধরনের বেকায়দায় ফেলেছেন।

কেবল বিরোধীদল নয়, নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকেও কঠোর ভাষায় সরকারের এই অবস্থানের সমালোচনা করা হচ্ছে। শান্তিপূর্ণ উপায়ে সভা-সমাবেশ করা যে-কোনও মানুষের সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকার কেড়ে নেওয়া তো রীতিমতো সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল। এটা গুরুতর অপরাধ। এই অপরাধ করে কোনও মন্ত্রী কিংবা সরকারও পার পেতে পারে না। একমাত্র জরুরি অবস্থা জারি হলেই এই অধিকার স্থগিত করা যায়। দেশে বর্তমানে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়নি, এটা আমরা সবাই জানি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যেসব দল অনুমতি নিয়ে নিজেদের সমাবেশ দুর্বৃত্তদের হাতে তুলে দেয় এবং জনসাধারণের ওপর অন্যায়-অত্যাচার ও জ্বালাও-পোড়াও ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড করে, তাদের আগামী এক মাস সমাবেশ করতে দেওয়া হবে না। এই এক মাসের সময়সীমা কবে থেকে শুরু হয়েছে এবং কবে শেষ হবে সেটা অবশ্য মন্ত্রী স্পষ্ট করেননি। এছাড়া প্রশ্ন হচ্ছে, এক মাস পর তারা ভালো হয়ে যাবে, আর জ্বালাও-পোড়াও-ভাঙচুর করবে না— এই নিশ্চয়তা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে কে দিয়েছে? একই সঙ্গে জানতে ইচ্ছা করে, এতবড় একটা সিদ্ধান্ত কি তিনি একাই নিয়েছেন? এ ব্যাপারে সরকারের নীতিনির্ধারকরা কি একমত পোষণ করেন? যদি আলাপ-আলোচনা করে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকে, তাহলে এ নিয়ে একেক মন্ত্রী একেক রকম ব্যাখ্যা দিচ্ছেন কেন? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজেও এর যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে তিন রকম বক্তব্য দিয়েছেন। যদি ধরে নেওয়া হয়, ‘জনগণের ওপর অন্যায়-অত্যাচার ও জ্বালাও-পোড়াও’ করার কারণেই সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে, তাহলে প্রশ্ন আসে, যারা এটা করছে, তাদের ওপর শর্তসাপেক্ষে নিষেধাজ্ঞা আরোপ না করে ঢালাওভাবে সবার ওপর এ ধরনের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া কেন? একজন শান্তিভঙ্গ করেছে বা করবে— এই আশঙ্কায় অন্যজনের অধিকার কেড়ে নেওয়ার স্বেচ্ছাচারিতা কোনওভাবেই সমর্থন করা যায় না।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছেন, সাম্প্রতিক ঘূর্ণিঝড় মহাসেনে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ত্রাণকার্য পরিচালনার সুবিধার্থে একমাস সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পক্ষে দারুণ সাফাই ব্যাখ্যা দিয়েছেন সরকারি দলের সাধারণ সম্পাদক! কিন্তু তার এই ব্যাখ্যা দেশবাসীকে সন্তুষ্ট বা আশ্বস্ত কোনওটাই করতে পারেনি। বরং এসব হাস্যকর বক্তব্য সরকারের উদ্দেশ্যের সততাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। ঘূর্ণিঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপকূলীয় অঞ্চল। আর ত্রাণ কাজে সুবিধার জন্য ঢাকায় সভা-সমাবেশ করা যাবে না! ছেলে ভোলানো কথা বলে লোক হাসানোর পথ অবিলম্বে পরিহার করা উচিত। দেশের মানুষ এসব ছেলেমানুষি একেবারেই পছন্দ করে না।

এটা ঠিক যে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠানের নামে সম্প্রতি দেশে মারাত্মক সব আইনবিরোধী ঘটনা ঘটেছে। শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্ট হয়েছে। সাধারণ মানুষ অসহায় ও আতঙ্ক বোধ করেছে। বিশেষ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, ছাত্রশিবির এবং হেফাজতে ইসলামির সমাবেশ থেকে একাধিকবার বড় ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে। জান-মালের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এমনকী শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর সদস্যদের ওপরও আক্রমণ করা হয়েছে, তাদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয়েছে, মাথা থেঁতলে দেওয়া হয়েছে, হত্যা করা হয়েছে। এই ধরনের হিংসাশ্রয়ী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড কোনও বিবেচনায়ই গণতন্ত্রসম্মত নয়। গণতন্ত্রের নামে এসব কার্যকলাপ চলতে পারে না। কোনও গণতান্ত্রিক দেশেই এসব অপরাধমূলক কাজ চলতে দেওয়া হয় না। সভা-সমাবেশ যেন শান্তিপূর্ণ হয় তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। বিএনপি-জামায়াত-শিবির কিংবা হেফাজতের সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হবে— এই অঙ্গীকার করেই সমাবেশের অনুমতি নিয়ে তারা কথা রাখেনি, অঙ্গীকারের খেলাপ করেছে। যারা অঙ্গীকার ভঙ্গ করে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করলে কারও কিছু বলার থাকে না। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক মাস কাউকেই সমাবেশ করতে না দেওয়ার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাতে লাভ হয়েছে, বিরোধী পক্ষের, ক্ষতি হয়েছে সরকারের। অন্যের যাত্রাভঙ্গ করার জন্য নিজের নাক কাটা একেই বলে!

হেফাজতের ঢাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে ৫ ও ৬ মে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে যে ধ্বংসযজ্ঞ চলেছে, তাতে কেবল হেফাজত নয়, বিএনপি এবং জামায়াত-শিবিরও কোণঠাসা অবস্থায় পড়েছিল। তাদের আচার-আচরণ কতটুকু গণতান্ত্রিক এবং রাজনীতির নামে তাদের এসব ধ্বংসাত্মক ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড অবাধে চলতে দেওয়া যায় কি-না, সে সব প্রশ্ন যখন মানুষের মনে প্রবল হয়ে উঠছে— তাদের ‘নৈতিক’ অবস্থান যখন দুর্বল হয়ে পড়েছে, তখনই যেন তাদের উদ্ধারে এগিয়ে এলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বিএনপি-জামায়াতের সমর্থন নিয়ে হেফাজতে ইসলাম দেশের ভেতর যে মহা-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির মাধ্যমে সরকার উত্খাতের ষড়যন্ত্র করছিল, তা নিয়ে কথা না বলে এখন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তুঘলোকি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই কথা বলছেন অনেকে। সাভারের রানা প্লাজা ট্রাজেডির পর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর স্তম্ভ ধরে নাড়াচাড়া করা ভবনধসের একটি কারণ হতে পারে বলে বালখিল্য মন্তব্য করে হাসির পাত্র হয়েছিলেন। তার এই উদ্ভটতত্ত্ব অনেককেই ক্ষুব্ধ করেছিল। প্রশ্ন উঠেছিল তার বিচারবুদ্ধি নিয়েও।

ওই বক্তব্যের রেশ কাটতে না কাটতেই এক মাসের জন্য ঢাকায় সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সরকারের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তির ওপর যে কালিমা লেপন করলেন, তা এককথায় অমোচনীয়। সাহারা খাতুনকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরকে দায়িত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী হয়তো আশা করেছিলেন যে, একজন সাবেক আমলা এবং তার আগের আমলের প্রতিমন্ত্রী এবার পূর্ণমন্ত্রী হয়ে দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়ে সরকারের মেয়াদের শেষ দিনগুলো নির্বিঘ্ন করে তুলবেন। কিন্তু হায়! জিয়ার খাল কাটা বিপ্লবের সারথি কী হাসিনার ভাবমূর্তি উজ্জ্বলে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারেন? ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের কারণেই শেষসময়ে সরকারকে না জানি আরও কত হোঁচট খেতে হয়।

শেয়ার করুন