রাসিক : হারানো মেয়র পদ পুনরুদ্ধারে একাট্টা বিএনপি : ৫৪ কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে ১৪৮ মামলা

0
75
Print Friendly, PDF & Email

১৭ বছর একটানা শাসন করা রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র পদটি পুনরুদ্ধার করে ‘রাজশাহীর মাটি বিএনপির ঘাঁটি’ হিসেবে আবারও প্রমাণ করতে চায় মহানগর ও জেলা বিএনপি। একই সঙ্গে সাবেক মেয়র রাজশাহী মহানগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে হারিয়ে গত ওয়ান ইলেভেন সরকারের সময় নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার প্রতিশোধ নিয়ে অনেকটাই মরিয়া উঠেছে স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে স্থানীয় নেতাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় মাঠ পরিস্থিতিও বিএনপির অনুকূলে রয়েছে বলে মনে করছেন ভোটাররা। স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, রাজশাহী বিভাগের আটটি জেলার জাতীয় সংসদের আসনগুলোয় জয়েনর ক্ষেত্রে প্রভাব রয়েছে রাসিকের মেয়র পদের। এছাড়া আঞ্চলিক রাজনীতিতেও এ নির্বাচনের ফলাফল প্রভাব ফেলে। বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত রাজশাহী বিভাগের আসনগুলোতে ২০০৮ এর রাসিক নির্বাচন প্রভাব ফেলেছিল। মেয়র খায়রুজ্জামান লিটন মেয়র হওয়ার পর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জেলার ছয়টি আসন দীর্ঘদিন পর পুনরুদ্ধার করে ক্ষমতাসীন মহাজোটের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। সদর আসনে জয়ী হয় জোটের প্রার্থী বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির পলিট ব্যুরোর সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। বিভাগীয় অন্য জেলার নির্বাচনী আসনেরও বেশিরভাগ লাভ করে মহাজোট।
এ কারণেই আসন্ন রাসিক নির্বাচনকে হালকাভাবে নিচ্ছে না বিএনপি। মান অভিমান ভুলে বিএনপির অপর প্রার্থীকে নির্বাচনের মাঠ থেকে তুলে নিয়েছে দলটি। তৃণমূলের নেতাকর্মী ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীদের করা হয়েছে সুসংগঠিত। পাড়ায়-মহল্লায় করা হয়েছে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি। আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু না হওয়ায় নেতাকর্মীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাড়ি গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময় করার। একই সঙ্গে দলটির জেলা ও মহানগর কমিটি এক হয়ে তৈরি করছেন একটি নির্বাচনী কার্যকরী কমিটি।
এদিকে ১৮ দলীয় জোটের অন্যতম শরীক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মেয়র প্রার্থী ডা. মো. জাহাঙ্গীরকে মেয়র পদে নির্বাচন থেকে সরিয়ে নিতে দলটি নিয়েছে নানা উদ্যোগ। দলের কেন্দ্র থেকেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে জামায়াতের কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে। এরই মধ্যে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-১, ২ ও ৩ আসন জামায়াত শর্ত হিসেবে দাখিল করেছে বিএনপির কাছে। কিন্তু বিএনপি এ বিষয়ে ছাড় না দিয়ে রাসিকের তিনটি ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদ ছেড়ে দিতে রাজি করেছে জামায়াতকে।
বিএনপির মেয়র প্রার্থী মহানগর যুবদলের আহ্বায়ক মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলকে সমর্থন দিতে এরই মধ্যে গঠিত হয়েছে সম্মিলিত নাগরিক ফোরাম। লিটনকে হারাতে দীর্ঘদিনের মান-অভিমান ভুলে জোটবদ্ধ হয়েছেন রাসিকের ১৭ বছরের সাবেক মেয়র, সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মহানগর সভাপতি মিজানুর রহমান মিনু ও দলটির বিশেষ সম্পাদক ও জেলা সভাপতি অ্যাডভোকেট নাদিম মোস্তফা ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন।
সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘আমাদের মেয়র প্রার্থী বুলবুল একজন সত্ ও সজ্জন ব্যক্তি। তিনি তার নিষ্কলুষ পরিচয়ের জন্যই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবেন। আমরা চাইছি চার সিটি নির্বাচনে বুলবুল যেন সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে নির্বাচিত হন। সে লক্ষ্যে জেলা ও মহানগর বিএনপি এক হয়ে কাজ করছে। আমরা জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।’
৫৪ কাউন্সিলর প্রার্থীর বিরুদ্ধে ১৪৮ মামলা : সময় যতই গড়াচ্ছে, ততই উত্তাপ ছড়াচ্ছে আসন্ন রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচন। এ পর্যন্ত সাধারণ কাউন্সিল পদে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন ১৫৮ জন প্রার্থী। বৈধ এসব প্রার্থীর মধ্যে ৫৪ জনেরই বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন সময় করা ১৪৮টি মামলা। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৯টি। এখনও বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন রয়েছে ৭৬টি। বাকি তিনটি মামলার মধ্যে দুটি আদালত থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আর কার্যক্রম স্থগিত রয়েছে একটির। এবারের নির্বাচনে অংশ নেয়া সাধারণ কাউন্সিলর প্রার্থীদের দাখিল করা হলফনামায় এসব তথ্য উল্লেখ করা হয়।
প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশিসংখ্যক মামলা রয়েছে রাসিকের ১৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী রেজা-উন্ নবী আল মামুনের বিরুদ্ধে। তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় ১৩টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে ১১টিতেই তিনি খালাস পেয়েছেন। বাকি দুটির মধ্যে একটি তদন্তাধীন ও একটি বিচারাধীন। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১১টি মামলা রয়েছে ১৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী মনিরুজ্জামান শরিফের বিরুদ্ধে। তিনিও সাতটি মামলায় খালাস পেয়েছেন। এছাড়া তার বিরুদ্ধে করা দুটি করে মোট চারটি মামলা এখনও তদন্তাধীন ও বিচারাধীন।
তৃতীয় সর্বোচ্চ আটটি মামলা রয়েছে রাসিকের ২৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী রবিউল ইসলামের বিরুদ্ধে। এর মধ্যে একটি মামলা থেকে তিনি খালাস পেলেও বাকি সাতটি মামলা এখনও বিচারাধীন।
চতুর্থ অবস্থানে থাকা রাসিকের ১২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর প্রার্থী ইকবাল হোসেনের বিরুদ্ধে রয়েছে ৬টি মামলা। যার পাঁচটিই এখনও বিচারাধীন। পাঁচটি করে মামলা রয়েছে ৪নং ওয়ার্ডে সাজ্জাদ হোসেন ও ২৩নং ওয়ার্ডে মাহাতাব হোসেন চৌধুরীর বিরদ্ধে। এর মধ্যে সাজ্জাদ হোসেন তিনটি এবং মাহাতাব হোসেন চৌধুরী চারটি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন। চারটি করে মামলা রয়েছে ৪নং ওয়ার্ডে রুহুল আমীন, ৯নং ওয়ার্ডে রোকেনুর হোসেন রুমেল, ১৭নং ওয়ার্ডে শাহাদত আলী শাহু, ২২নং ওয়ার্ডে আবদুল হামিদ, ২৯নং ওয়ার্ডে শাহজাহান আলী ও গিয়াস উদ্দিনের নামে।
এছাড়া রাসিকের ১নং ওয়ার্ডে শহীদ আলম, ৬নং ওয়ার্ডে তাজউদ্দিন আহমেদ সেন্টু, ৭নং ওয়ার্ডে মাহফুজুর রহমান, ১৬নং ওয়ার্ডে বেলাল আহমেদ, ১৮নং ওয়ার্ডে ফাইজুল হক ফাহি, ২৩নং ওয়ার্ডে বজলুল হক মন্টু, ২৫নং ওয়ার্ডে তরিকুল আলম পল্টু, ২৫নং ওয়ার্ডে রবিউল ইসলাম, ২৬নং ওয়ার্ডে মখলেসুর রহমান খলিল, ২৯নং ওয়ার্ডে আবু জাফর বাবু এবং ৩০নং ওয়ার্ডে আবদুস সামাদের নামে তিনটি করে মামলা রয়েছে।
একই সঙ্গে আটজনের নামে দুটি করে এবং ২০ জনের নামে ১০টি করে মামলা রয়েছে। এদের অধিকাংশেরই বেশকিছু মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বেশকিছু মামলা থেকে খালাসও পেয়েছেন কেউ কেউ।
রাজশাহী আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস জানায়, গতকাল পর্যন্ত আসন্ন রাজশাহী সিটি করপোরেশন (রাসিক) নির্বাচনে সাধারণ কাউন্সিল পদে এ পর্যন্ত প্রার্থী তালিকায় রয়েছেন ১৫৮ জন। এর আগে যাচাই-বাছাই করে ওই পদে ১৬২ জনের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। ১০টি সংরক্ষিত আসনে ৬৭ জন প্রার্থীসহ এখন পর্যন্ত বৈধ কাউন্সিলর প্রার্থী সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২২৫ জনে।
তফসিল অনুযায়ী, রোববার মনোনয়নপত্র প্রত্যাহরের সময়সীমা শেষ হচ্ছে। প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে ২৭ মে। ১৫ জুন রাজশাহীসহ দেশের চার সিটি করপোরেশনে একযোগে এ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।

শেয়ার করুন