অ্যামনেস্টির বার্ষিক প্রতিবেদন : হত্যা গুম বন্ধে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব : বিনা বিচারে ৩০ হত্যা ১০ গুমসহ নির্যাতনের অভিযোগ

0
75
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন, গুম, নারী, সংখ্যালঘু ও পাহাড়ি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ওপর নির্যাতনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। প্রতিবেদনে বাংলাদেশ পরিস্থিতির বিবরণে বিনা বিচারে ৩০ জনকে হত্যা, ১০ জনের গুম এবং অনেকগুলো নির্যাতনের ঘটনায় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ সময় ভোর ৫টায় লন্ডনে অ্যামনেস্টির বার্ষিক প্রতিবেদন-২০১৩ প্রকাশ করা হয়। এতে বিশ্বের ১৫৯টি দেশের গত বছরের (২০১২) সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হয়েছে। সংগঠনটি প্রতি বছরই বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির বিস্তারিত পর্যালোচনা প্রকাশ করে থাকে। ওই প্রতিবেদনের বাংলাদেশ অংশে এসব মন্তব্য করা হয়েছে। অ্যামনেস্টি তার বার্ষিক প্রতিবেদনে বলেছে, মানবাধিকার বিষয়ে বৈশ্বিক নিষ্ক্রিয়তার কারণে শরণার্থী ও অভিবাসীদের জন্য বিশ্ব আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠছে।

আর বাংলাদেশ প্রসঙ্গে অ্যামনেস্টি প্রধানমন্ত্রীর ২০১২-এর জানুয়ারির একটি মন্তব্য ‘দেশে কোন মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়নি’ উদ্ধৃত করার পাশাপাশি বছরজুড়ে ঘটা বিভিন্ন ধরনের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কয়েক ডজন ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছে। বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতির পর্যালোচনায় সংস্থাটি এবারের প্রতিবেদনে মূলত অভিবাসী ও শরণার্থীদের ভোগান্তি এবং তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ার প্রবণতার কথা বলেছে।

অ্যামনেস্টির প্রতিবেদনে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার দেশগুলোতে রাজপথ এবং অনলাইন উভয় ক্ষেত্রে মত প্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ‘রাষ্ট্রের নির্মম আক্রমণ’কে একটি অভিন্ন প্রবণতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনায় গত বছরের ডিসেম্বর মাস থেকে রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আয়োজনের জন্য বিরোধীদল বিএনপির দাবি এবং যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বিচারাধীন জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের মুক্তির দাবিতে হরতাল কার্যকর করা এবং বিরোধীদের সমাবেশে সরকার-সমর্থকদের হামলার দৃষ্টান্ত এতে তুলে ধরা হয়।

সংস্থাটি বলেছে, বিশ্বব্যাপী সংঘাত থেকে বাঁচতে অথবা কর্মসংস্থানের আশায় দেশান্তর হওয়া লাখ লাখ উদ্বাস্তু ও অভিবাসী মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। বিশ্বব্যাপী সরকারগুলো তাদের নাগরিক অথবা উদ্বাস্তু ও শরণার্থীদের অধিকার রক্ষার চেয়ে বেশি আগ্রহী সীমান্ত রক্ষায়। অ্যামনেস্টির মহাসচিব সলিল শেঠি বলেছেন, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের নামে অনেক বেশিসংখ্যক সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত হচ্ছে, যা সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বৈধ সীমাকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

বিনা বিচারে হত্যার ঘটনায় কমপক্ষে ৩০ জনের নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, তারা বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন বলে পুলিশ দাবি করেছে। আর নিহতদের পরিবারগুলো বলেছে, বেসামরিক পোশাক পরিহিত লোকজন র‌্যাব বা পুলিশের পরিচয় দিয়ে তাদের গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার পর মেরে ফেলা হয়েছে। এসব ঘটনার কোন বিচার হয়নি। উদাহরণ হিসেবে গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়া জেলার একজন কৃষক আতিয়ার রহমান ওরফে তোফা মোল্লার নিহত হওয়ার ঘটনাটি উল্লেখ করা হয়। র‌্যাবের দাবি, তিনি ক্রসফায়ারে মারা গেছেন। আর তার পরিবার ও অন্যান্য প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, র‌্যাব তাকে আগের দিন সন্ধ্যায় বাসা থেকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায়। তার মৃতদেহে তিনটি গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে, যেগুলোর মধ্যে দুটি ছিল পেছন দিকে।

নির্যাতন এবং দুর্ব্যবহার ব্যাপকভাবে প্রচলিত উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব ঘটনার ক্ষেত্রে পুলিশ, র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কোন জবাবদিহি নেই। নির্যাতনের ক্ষেত্রে যেসব পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়, সেগুলোর মধ্যে মারধর করা, লাথি মারা, ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা, খাবার ও ঘুম থেকে বঞ্চিত করা এবং বৈদ্যুতিক শক দেয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

গত বছর মোট ১০ জন গুম হয়েছেন উল্লেখ করে অ্যামনেস্টি বলেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হতভাগ্য ব্যক্তিদের কোন সন্ধান মেলেনি। আর যাদের মৃতদেহ পাওয়া গেছে, তাদের দেহে মারধর ও আঘাতের চিহ্ন ছিল। দৃষ্টান্ত হিসেবে এক্ষেত্রে গত বছরের ১৭ এপ্রিল নিখোঁজ হওয়া বিএনপির নেতা ইলিয়াস আলীর কথা তুলে ধরা হয়েছে।

নারী এবং মেয়ে শিশুদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে অ্যাসিড নিক্ষেপ, যৌতুক দিতে না পারায় হত্যা, ধর্মীয় বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে সালিসের মাধ্যমে দোররা মারা, পারিবারিক সহিংসতা এবং যৌন সহিংসতার কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এতে দৃষ্টান্ত হিসেবে কুষ্টিয়া জেলার খোকসা থানায় গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর আলেয়া বেগম এবং তার মেয়েকে গ্রেফতার করে নির্যাতন করার অভিযোগের কথা বলা হয়। তাদের দুই দিন খোকসা থানায় আটক রাখার পর কুষ্টিয়া সদর থানায় নিয়ে একটি অন্ধকার ঘরে আটকে রাখা হয়। এরপর কলেজপড়ুয়াা মেয়েটিকে মায়ের কাছ থেকে আলাদা করে অন্য একটি কক্ষে নিয়ে পুলিশ যৌন নিপীড়ন চালায়। ১৮ সেপ্টেম্বর আদালতে হাজির করার পর তারা ছাড়া পেয়ে সংবাদ মাধ্যমের কাছে এসব অভিযোগ জানালে পুলিশ ২৬ সেপ্টেম্বর আবার তাদের গ্রেফতার করে।

আগের বছরগুলোর মতোই গত বছরও সরকার আদিবাসীদের ভূমি অধিকারের দাবি নিষ্পত্তি করতে ব্যর্থ হয়েছে উল্লেখ করে অ্যামনেস্টি বলেছে, এই জনগোষ্ঠীর ওপর বসতি স্থাপনকারী বাঙালিদের হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সুরক্ষা দিতে পারেনি। পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের পরিবেশ উন্নয়নের দাবি সমর্থন করেছেন যেসব শ্রমিক নেতা তাদের হয়রানি করা এবং ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে জানিয়ে অ্যামনেস্টি গত বছরের ৪ এপ্রিল শ্রমিক নেতা আমিনুল ইসলামের নিখোঁজ হওয়া এবং পরে ঘাটাইলে তার লাশ পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে। পরিবার তার দেহে আঘাতের চিহ্ন দেখতে পেয়েছে। পরিবার বলেছে, নিরাপত্তা বাহিনী তাকে তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

এছাড়া গত নভেম্বরে সাভারের তাজরীন ফ্যাশনে অগি্নকা-ে ১১১ জনের প্রাণহানির ঘটনা তুলে ধরে বলা হয়, কারখানার কর্মকর্তারা দুর্ঘটনার সময় শ্রমিকদের সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য গেট খুলে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।

ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা গত সেপ্টেম্বরে এক নতুন মাত্রা লাভ করে বলে মন্তব্য করে অ্যামনেস্টি বলেছে, ফেসবুকে কোরান শরিফের বিকৃত ছবি প্রকাশের প্রতিবাদে চট্টগ্রামের পটিয়া ও কক্সবাজারের রামুতে হাজার হাজার লোক ২০টি বৌদ্ধমন্দির ও আশ্রম, একটি হিন্দু মন্দির এবং বহু বাড়িঘর ও দোকানে আগুন লাগিয়ে দেয়। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গত বছর বাংলাদেশে মৃত্যুদ-ের আদেশ হয়েছে ৪৫ জনের। আর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে একজনের।

শেয়ার করুন