সংবাদ সম্মেলনে মজিনা: সংলাপের গতি মন্থর, বিনিয়োগ অন্যত্র চলে যাচ্ছে

0
91
Print Friendly, PDF & Email

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বিনিয়োগ পরিবেশকে কঠিন করে তুলেছে_এ পর্যবেক্ষণ জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাবি্লউ মজিনা। তিনি বলেন, ‘এখন বিদেশি কারখানাগুলো (প্রতিষ্ঠানগুলো) এ দেশে আসছে না। অন্যত্র চলে যাচ্ছে। তবে সেগুলো এখানেই (বাংলাদেশে) আসা উচিত। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এ দেশে বিনিয়োগকে কঠিন করে তুলেছে।’
আজ বুধবার ঢাকায় আমেরিকান সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে ড্যান মজিনা আরো বলেন, চলমান রাজনৈতিক সংকটের সমাধান বাংলাদেশকেই করতে হবে। ২০০৬ ও ২০০৭ সালের চেয়ে এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন বলেন তিনি মন্তব্য করেন।
মজিনা বলেন, আগামী রবিবার থেকে ঢাকায় অনুষ্ঠেয় বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারি সংলাপের দ্বিতীয় পর্বে উন্নয়ন সহযোগিতা ও সুশাসন, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, নিরাপত্তা সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগ_এ চারটি বৃহৎ ইস্যু ছাড়াও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাবে।
এর আগে সাংবাদিকরা বাংলাদেশে চলমান রাজনৈতিক ইস্যু অংশীদারি সংলাপে গুরুত্ব পাবে কি না, জানতে চাইলে মজিনা বলেন, ‘হ্যাঁ, এটি (রাজনৈতিক ইস্যু) অংশীদারি সংলাপে স্থান পাবে। আমরা বন্ধু। বন্ধুরা পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা করবে। আর এটিই অংশীদারি সংলাপ।’
রাজনৈতিক অচলাবস্থা দূর করতে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতা করবে কি না_এ প্রশ্নের উত্তরে মজিনা বলেন, ‘এটি ২০০৬ বা ২০০৭ সাল নয়, এটি ২০১৩ সাল। এবারের প্রেক্ষাপট অত্যন্ত ভিন্ন। ২০০৬, ২০০৭ সালের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের আছে।’
মজিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ সবচেয়ে বাস্তববাদী দেশগুলোর অন্যতম। তাদের (বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের) এ প্রক্রিয়ায় আমার, আমেরিকার বা বাইরের কারো প্রয়োজন নেই। বাংলাদেশ এবং কেবল বাংলাদেশই এ সমস্যার সমাধান করতে পারে। তারাও এটি বুঝতে পারবে বলে আমি মনে করি।’
মজিনা বলেন, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উপায় যাই হোক না কেন_বাংলাদেশ যখন তা খুঁজে পাবে, তখন যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘসহ বাংলাদেশের সব বন্ধু সহযোগিতার জন্য এগিয়ে আসবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পথ খুঁজে বের করা বাংলাদেশেরই কাজ।’
যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত বলেন, চীন থেকে বিনিয়োগ অন্যত্র চলে যাচ্ছে। এ সময় বিনিয়োগ বাংলাদেশেই আসা উচিত।
অংশীদারি সংলাপ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের তৃতীয় শীর্ষ কর্মকর্তা (রাজনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি) ওয়েন্ডি শারমেনের নেতৃত্বে আগামী সপ্তাহে ঢাকা সফরে আসা প্রতিনিধিদলটি সংঘাতের বিরুদ্ধে কথা বলবে বলে জানান মজিনা। তিনি বলেন, ‘আমি নিশ্চিত, তারা (প্রতিনিধিদল) যে বার্তার ওপর গুরুত্বারোপ করবে, তা হলো রাজনৈতিক সংঘাত গ্রহণযোগ্য নয়।’ সংঘাতের বিরুদ্ধে তিনি টানা তিনবার ‘না’ বলেন।
মজিনা বলেন, রাজনৈতিক অঙ্গনের সব অংশীদারেরই শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশের অধিকার আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে। বিরোধী দল ও অন্যদের শান্তিপূর্ণ উপায়ে মত প্রকাশের প্রয়োজনীয় স্থান ও সুযোগ দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, শান্তিপূর্ণভাবে মত প্রকাশ করা বিরোধী দলেরও দায়িত্ব।’
অংশীদারি সংলাপ : মজিনা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ সম্পর্ক বর্তমানে জোরালো। একে আরো জোরালো, গভীর ও বিস্তৃত করাই সংলাপের লক্ষ্য। তিনি আরো বলেন, ইন্দো-প্যাসিফিক করিডরের সঙ্গে আঞ্চলিক সংযোগ, খাদ্য নিরাপত্তা, শ্রম ইস্যুতেও অংশীদারি সংলাপে আলোচনা হবে।
মজিনা বলেন, ‘তাজরীন ও রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি ঠেকানো নিশ্চিত করার উপায় এবং শ্রমিকদের উন্নততর কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সংঘটিত হওয়ার ও অধিকার চর্চার বিষয়টি নিশ্চিত করার বিষয়ে তাঁরা (যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা) আলোচনা করবেন। তিনি বলেন, অংশীদার সংলাপ থেকে স্বাস্থ্য, শ্রম আইন ও খাদ্য নিরাপত্তা ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসতে পারে।
জিএসপি-টিকফা : যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা জিএসপি ইস্যুতে প্রশ্নের উত্তরে মজিনা বলেন, বর্তমানে এটি পর্যালোচনা চলছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডা. দীপু মনির ওয়াশিংটন সফরে বাংলাদেশ তার প্রত্যাশার কথা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে।
জিএসপি বহাল থাকার সঙ্গে প্রস্তাবিত টিকফার (বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতার কাঠামো চুক্তি) কোনো সম্পর্ক আছে কি না, জানতে চাইলে মজিনা বলেন, ‘টিকফা টিকফাই। এটি কেবল একটি বিষয়েই কাজ করবে। এটি আমেরিকা ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি ফোরাম তৈরি করবে, যা বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথে বাধাগুলো চিহ্নিত করে তা কাটিয়ে ওঠতে কাজ করবে।’ তিনি বলেন, জিএসপির সঙ্গে টিকফার সম্পর্ক নেই।
ভারত, নেপাল ও অ্যাঙ্গোলাসহ প্রায় ৪০টি দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের টিকফা বা এ ধরনের চুক্তি আছে উল্লেখ করে মজিনা বলেন, এ চুক্তিকে ভালো মনে করলে বাংলাদেশ তাতে স্বাক্ষর করবে। আর ভালো মনে না করলে এতে কখনোই বাংলাদেশের স্বাক্ষর করা ঠিক নয়।
অন্য এক প্রশ্নের উত্তরে মজিনা বলেন, শ্রম আইন সংশোধনের ব্যাপারে বাংলাদেশ কাজ করছে। রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে ওই আইন সংশোধন হয়নি। আগামী সংসদ অধিবেশনে ওই আইন সংশোধন হতে হতে জুন মাসের শেষ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তত দিনে জিএসপির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত হয়ে যাবে।
মজিনা জানান, ওয়েন্ডি শারমেন একটি চমকপ্রদ ও শক্তিশালী প্রতিনিধিদল নিয়ে আসছেন। দলে অ্যাসিস্ট্যান্ট সেক্রেটারি হোসে ফার্নান্দেজও রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আশা করছি, শারমেন প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।’ সরকার ও বিরোধী দলের সংলাপ প্রসঙ্গে মজিনা বলেন, এখানে লোকজন পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন। সংলাপের অগ্রগতি মন্থর।
উগ্রবাদ প্রসঙ্গ : হেফাজতে ইসলাম ও জামায়াত-শিবিরের তাণ্ডব দেখে এ দেশের অনেকে উগ্রবাদের উত্থানের আশঙ্কা করছে উল্লেখ করে এ ইস্যুতে আসন্ন সংলাপে আলোচনা হবে কি না জানতে চান সাংবাদিকদের একজন। জবাবে মজিনা বলেন, উগ্রবাদ মোকাবিলায় বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা যুক্তরাষ্ট্র করে থাকে। কয়েক বছর আগেও যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংবাদপত্রে লেখা হয়েছিল, বাংলাদেশ কি পরবর্তী আফগানিস্তান হচ্ছে? এখন এ প্রশ্ন কেউ করেন না।
বস্ত্র ও পাটমন্ত্রীর চিঠি প্রসঙ্গে : বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীর চিঠি প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাষ্ট্রদূত সাংবাদিকদের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীকে প্রশ্ন করতে বলেন। যুক্তরাষ্ট্রের অনেক অঙ্গরাজ্যের শ্রমিকরা ইউনিয়ন করার অধিকার রাখেন না_এ দেশের রাজনীতিকদের এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ তথ্য সঠিক নয়। যুক্তরাষ্ট্রে সবার শ্রম অধিকার আছে।
বাংলায় সম্ভাষণ : সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের তথ্য কর্মকর্তা কেরি ম্যাকার্থি বাংলা ভাষায় সাংবাদিকদের স্বাগত জানান এবং সংবাদ সম্মেলনের বিষয়বস্তু তুলে ধরেন। পরে রাষ্ট্রদূত মজিনাও ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে সাংবাদিকদের স্বাগত জানান।

শেয়ার করুন