ডিসিসি নির্বাচন: অনিশ্চয়তার মাঝেও বিএনপির চমক-প্রস্তুতি

0
86
Print Friendly, PDF & Email

দুই ঢাকা সিটি কর্পোরেশন (ডিসিসি) নির্বাচন আবারও অনিশ্চিত। তাই বলে বন্ধ হচ্ছে না নির্বাচন নিয়ে বিএনপির প্রস্তুতি। দলটি তাদের কথা রাখতে চায়, ‘চমক’ দেবে বলে দলের ঘোষণর মান রাখতে চায়। বিভক্ত ঢাকার মেয়র নির্বাচনের অভিষেকেই চমক দিতে মরিয়া দেশের প্রধান বিরোধী দল।

সূত্র জানায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র ও দলের ভাইস-চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে বিভক্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণকে জয় করতে চেয়েছেন দলের চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। সেক্ষেত্রে আব্বাসকে ঢাকা উত্তর ও খোকাকে ঢাকা দক্ষিণ থেকে নির্বাচন করানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে গতবারই। 

দল সূত্রে জানা গেছে, ডিসিসি নির্বাচনে যতোই অনিশ্চিত অবস্থা তৈরি হোক না কেন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার নির্দেশ রয়েছে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে। যাতে যে কোনো সময় নির্বাচন হলে কোনোভাবেই বিব্রত হতে না হয় বিএনপিকে।
 
যদিও এই নির্বাচনে কৌশলে অংশ নিচ্ছে এই দল। সরাসরি দলের ব্যানার ব্যবহার না করে বিএনপি প্রার্থীরা ভিন্ন ব্যানারে নির্বাচনে অংশ নেবেন বলে সূত্র জানায়।
 
গতবার ডিসিসি নির্বাচনের তারিখ সামনে রেখে এক সংবাদ সম্মেলনে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছিলেন, ডিসিসি নির্বাচনে বিএনপির ‘চমক’ থাকছে।
 
পরে সেই নির্বাচন জটিলতায় পড়ে আর সম্পন্ন হলো না। তবে চমক-পরিকল্পনাটি ঠিকই প্রকাশ হযে পড়ে। জানা গেছে, দলের দুই ‘টাইগার’কে মাঠে নামাতে চান খালেদা।
 
সূত্র জানায়, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস এবং অবিভক্ত ঢাকার শেষ মেয়র ও দলের ভাইস-চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাকে নির্বাচনে দাঁড় করিয়ে বিভক্ত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণকে জয় করতে চেয়েছেন খালেদা। 
 
সূত্র জানায়, এ সম্পর্কিত পরিকল্পনা আগেই গোছানো ছিল। ক্ষমতায় এলে বিএনপি সরকার ঢাকাকে আবার এক করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।
 
আর সেক্ষেত্রে দলের দুই মেয়রের একজন সমগ্র ঢাকার দায়িত্বটি পেয়ে যাবেন। অন্যজনেরও হারানোর কিছু থাকবে না, তাকে দেওয়া হবে আকর্ষণীয় কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব। আব্বাস ও খোকা এ বিষয়টিতে অমত করেননি বলেও একই সূত্রে জানা গেছে।
 
এ প্রসঙ্গে বিএনপির এক নেতা বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্য থেকে বোঝা গেছে, নির্বাচন আবারও পেছাচ্ছে সরকার। এর কারণও আমরা জানি। আমাদের দুই ‘টাইগার’ লড়বেন শুনেই সরকার ভয় পাচ্ছে। তবে দলের সিদ্ধান্ত এখনো বহাল আছে।’’

বিএনপির ওই নেতাও ‘দুই টাইগার’ বলতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকার কথা বুঝিয়েছেন বলেও স্পষ্ট করলেন। 

উল্লেখ্য, মঙ্গলবার নির্বাচন কমিশনের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজ জানিয়েছেন, ডিসিসি উত্তর ও দক্ষিণের নির্বাচন এখনই হচ্ছে না। রমজানের আগে এ নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা তেমন নেই বলেও তার বক্তব্যে এসেছে।
 
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বাংলানিউজের সঙ্গে আলাপে অবশ্য কিছুটা কৌশলে জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘‘নির্বাচন আবারও অনিশ্চিত। কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। এখন আর এ বিষয়ে সিদ্ধান্তের কিছু নেইও।’’
 
তিনি বলেন, ‘‘বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা, দলের পক্ষ থেকে কোনো প্রার্থীকে সমর্থনের আহ্বান রাখা হবে কিনা সে বিষয়ে এখনো দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’’
 
আব্বাস ও খোকাকে নির্বাচনে এনে চমকে দেওয়ার বিষয়টি এখনো ঠিক আছে কি না জানতে চাইলে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি মোশাররফ।
 
তিনি বলেন, ‘‘দলের প্রার্থীরা যার যার মতো প্রস্তুতি নিয়েই নির্বাচনে যেতে পারেন। এ বিষয়ে আগে কারও কারও নাম হয়তো আলোচনায়ও এসে থাকতে পারে। তবে সেটা দলের পক্ষ থেকে বলা নয়।’’
 
মোশাররফ বলেন, ‘‘বিএনপি জনমুখী ও নির্বাচনমুখী দল। নেতাকর্মীরাও নির্বাচনে আগ্রহী। জনমানুষের স্বার্থে তারা নির্বাচনে অংশ নেন, মানুষ তাদের বিশ্বাস করে।’’
 
তিনি বলেন, ‘‘ডিসিসি নির্বাচনের যেহেতু এখনও তারিখই ঘোষণা হয়নি, তাই এর আগে দলের মধ্যে কোনো আলোচনা হয়নি বলেই আমি জানি। কোনো প্রার্থী নিয়েও দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত এখনো আমার জানা নেই।’’
 
দলের নির্বাহী কমিটির এক সদস্য বলেন, ‘‘নির্বাচন পেছালেও সার্বিকভাবে প্রস্তুত থাকতে চায় বিএনপি। এক্ষেত্রে দলটির ভেবে রাখা ‘চমক’ও বহাল রয়েছে এখনো।’’
 
তিনি বলেন, ‘‘আমি যতোদূর জানি, আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কারা নির্বাচনে অংশ নেবেন এর ওপর নির্ভর করছে বিএনপির প্রার্থী বিবেচনা।’’
 
তবে চমকের হিসেবের বাইরেও বিএনপির পক্ষ থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে ইচ্ছুক কয়েকজনের নাম আগে থেকেই আলোচনায় রয়েছে। 
 
তারা হলেন, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আবদুল আওয়াল মিন্টু, মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব আবদুস সালাম, দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ড. আসাদুজ্জামান রিপন ও সাবেক ওয়ার্ড কাউন্সিলর এম এ কাইয়ুম।
 
সালাম বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘আজ বললে আজ, কাল বললে কাল। যখনই নির্বাচন হোক, আমি আছি। দেশ, মানুষ ও দলের স্বার্থে এ নির্বাচনের জন্য সর্বাত্মক প্রস্তুতি রয়েছে।’’
 
রিপন বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘নির্বাচনে আগ্রহীতো অবশ্যই। দলের সিদ্ধান্তের প্রতিও পূর্ণ সম্মান রয়েছে।’’
 
এছাড়া ভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, সরাসরি বিএনপির হয়ে না করলেও দলটির সুনজরে থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে চান মাহি বি চৌধুরী। এ বিষয়টি মাথায় রেখেই নাকি তিনি সম্প্রতি খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলাপ করেছেন।
 
ডিসিসি নির্বাচনে অংশ নিতে চান ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক কাজী আবুল বাশারও।
 
তবে শেষ পর্যন্ত যদি আব্বাস ও খোকার নির্বাচনের বিষয়টিই চূড়ান্ত থাকে, আগ্রহী অন্য প্রার্থীদেরও পরে বিশেষ মূল্যায়ন করা হবে বলে জানায় দলের সূত্র।
 
সূত্র জানায়, এর আগে ঘোষিত নির্বাচনের জন্য যারা মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন, বা আগামীতে জমা দেবেন, তাদের আগামীতে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থিতার সুযোগ ভালোভারে রাখা হতে পারে। এছাড়া তারা যেন নিজেদের শক্তিটুকু দলের স্বার্থেই আব্বাস ও খোকার জয়ের জন্য ব্যয় করেন সেই আহ্বানও এর মধ্যে তাদের প্রতি রাখা হয়েছে।
 
শ্রমিক দলের এক নেতা বাংলানিউজকে বলেন, ‘‘আমি যতোদূর জানি, ডিসিসি নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে নাস্তানাবুদ করার পরিকল্পনা রয়েছে। খালি মাঠে গোল করবে তারা, সেটি আর হবে না। এর জন্য বড় চমকের কথা বলা হয়েছে।’’
 
তিনি বলেন, ‘‘কোনো মাঝারি গোছের নিরীহ নেতাকে সামনে এনে হেরে না গিয়ে, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীদের পিলে চমকে দিতেই দুই ‘টাইগার’কে মাঠে নামাতে চায় বিএনপি।’’
 
তিনি বলেন, ‘‘বিএনপিতো সরাসরি এ নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যাবে না। তাই নাগরিক কমিটি বা এ জাতীয় কোনো ব্যানারেই ঢাকা জয়ের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।’’
 
তিনি জানান, আব্বাসকে ঢাকা উত্তর ও খোকাকে ঢাকা দক্ষিণ থেকে নির্বাচন করানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে গতবারই।
 
এর আগে গত বছরের এপ্রিলে ঢাকার দুই সিটি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। সে অনুযায়ী ওই বছরের ২৪ মে নির্বাচন হওয়ার কথা থাকলেও একটি রিট আবেদনে আদালত স্থগিতাদেশ দেয়।
 
গত ১৩ মে সেই রিট খারিজ করে হাইকোর্ট স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করলে আইনি বাধা কেটে যায়। এরপর এখনো সরকার পক্ষ থেকে কোনো আপিল করা হয়নি বলে ধরে নেওয়া হচ্ছিল ডিসিসি নির্বাচন সহসাই অনুষ্ঠিত হবে। এ সম্পর্কে নির্বাচন কমিশনারও একই কথা বলেন।
 
তবে মঙ্গলবার কমিশন থেকে উল্টো বক্তব্য আসে। সেই প্রেক্ষিতে যোগাযোগ করেই বিএনপির প্রস্তুতি সম্পর্কে এসব তথ্য পাওয়া যায়। 
 
উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের মে মাসে অবিভক্ত ডিসিসির নির্বাচনের মেয়াদ শেষ হয়। ২০১১ সালের নভেম্বরে ৫৬টি ওয়ার্ড নিয়ে দক্ষিণ ও ৩৬টি ওয়ার্ড নিয়ে উত্তর নামে দুই ভাগ হয় ডিসিসি। বিএনপি তখন এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে জোরালো অবস্থান নিলেও নির্বাচনে ‘চমক’সহ অংশ নেওয়ার ঘোষণা দেয়। কিন্তু আইনি জটিলতায় ঝুলে যায় নির্বাচনি কার্যক্রম।

শেয়ার করুন