ইতিহাস থেকে শেখা না-শেখা

0
86
Print Friendly, PDF & Email

দার্শনিক জর্জ সান্টায়ানার বিখ্যাত একটি কথা: যারা অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না, তারা সেই অতীত পুনর্যাপন করার দুর্ভাগ্য বহন করে। এক দশক থেকে পরের দশকে, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসজুড়ে এই কথাটাই অনুরণিত হচ্ছে। যা বলতে বাকি ছিল তা হলো, আমাদের শেখার ব্যর্থতার ফলে বছরের পর বছর ধরে সংকটের পর সংকট ঘনীভূত হয়ে অবধারিতভাবে সমাজে আরও বিপজ্জনক চিড় ধরিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ইস্যু নিয়ে চলমান সংঘাত আগেকার একটি সংকটেরই পুনর্মঞ্চায়ন। কেবল আগেকার সংকটে নাটকের পাত্র-পাত্রীদের ভূমিকা এবারের সংকটে একেবারে উল্টে গেছে।
১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ষষ্ঠ জাতীয় সংসদের নির্বাচন মুক্ত ও নিরপেক্ষ করার শর্তগুলো নিয়ে ১৯৯৫ সালে প্রথম যে সংকট দানা বাঁধে, তা নিরসনের প্রক্রিয়ায় আমি সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলাম। সে সময় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ তার হরেক রকম মিত্রের মধ্যে জাতীয় পার্টি (জেপি), জামায়াতে ইসলামী এবং বামপন্থীদের কয়েকটি দলকে নিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য অসহযোগ আন্দোলন চালায়।
শেখ হাসিনার যুক্তি ছিল যে বিএনপি পরিচালিত সরকার তো নয়ই, কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের অধীনেই মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে বলে আস্থা রাখা যায় না। শেখ হাসিনার এই দৃষ্টিভঙ্গি দেশে ব্যাপক সমর্থন পায়। সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দাবির পক্ষের আন্দোলন যথেষ্ট জনসমর্থন অর্জন করে।
সে সময় তত্ত্বাবধায়কব্যবস্থার ব্যাপারে শেখ হাসিনার অভিমত তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া এবং ক্ষমতাসীন বিএনপির নেতারা
গ্রহণ করেননি। এখন শেখ হাসিনা যেমন করে বলছেন, তখন খালেদা জিয়াও তেমন করে বলতেন যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন একই সঙ্গে সংবিধানের লঙ্ঘন এবং নির্বাচিত গণতন্ত্রের নীতির বরখেলাপ।
১৯৯৫ সালের দ্বিতীয়ার্ধে সৃষ্টি হওয়া যে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেশকে অচল করে ফেলেছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার উপায় খুঁজতে সিভিল সোসাইটির অধিকাংশের সমর্থনে পাঁচজনের একটি গ্রুপ গঠন করা হয়, যাদের বলা হয় জি-৫। সমঝোতার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য সমাধান খুঁজতে আমরা পালা করে দুই নেত্রীর কাছে যাওয়া-আসা করতে থাকি। তাঁরাও তখন এ ধরনের মধ্যস্থতায় রাজি ছিলেন এবং আমাদের সঙ্গে প্রতিটি সাক্ষাতে আলোচনা করে সমস্যাগুলো সুরাহায় যথেষ্ট সময়ও দিয়েছিলেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনে সমঝোতা চুক্তিতে উপনীত হওয়ার উপযোগী সমাধান-সূত্রটি উদ্ভাবন করেছিলেন জি-৫-এর সদস্য প্রয়াত ব্যারিস্টার ইশতিয়াক আহমেদ। সম্প্রতি অন্তর্বর্তীকালীন/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল যে প্রস্তাব তৈরি করেছে, ব্যারিস্টার ইশতিয়াকের প্রস্তাব ছিল তারই অনুরূপ। ইশতিয়াক মডেল এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যাতে তা একই সঙ্গে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা ও গণতান্ত্রিক বৈধতা—দুটিই রক্ষা করে। এতে প্রস্তাব করা হয়েছিল, উভয় পক্ষ নির্বাচিত সাংসদদের মধ্য থেকে পাঁচজন করে মনোনীত করবে, কিন্তু তাদের নেতৃত্ব দেবেন উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য একজন নির্দলীয় ব্যক্তি, যিনি বিশেষভাবে নির্বাচিত হয়ে সংসদে আসবেন।
এটাই হলো সেই প্রস্তাব, যার প্রতিক্রিয়ায় খালেদা জিয়া আমাদের উদ্দেশে বলেছিলেন, কেবল পাগল ও শিশু ছাড়া বাংলাদেশে নির্দলীয় কোনো ব্যক্তি নেই। অসাধারণ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে জি-৫-এর প্রস্তাবে শেখ হাসিনা এক শর্তে সমর্থন দিলেন যে খালেদা জিয়াকেও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে একজন নির্দলীয় ব্যক্তি নির্বাচনে সম্মত হতে হবে।
বিএনপির জন্য দুর্ভাগ্যজনক, খালেদা জিয়া এই চূড়ান্ত শর্তটি মানতে নারাজ হলেন এবং সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে প্রধান তত্ত্বাবধায়ককে তাঁর দল থেকেই নিতে হবে বলে চাপ দিতে থাকলেন। এই চূড়ান্ত প্রশ্নে জি-৫-এর উদ্যোগ ভেস্তে যায় এবং বিএনপি এককভাবে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রতারণাপূর্ণ অংশগ্রহণবিহীন নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে দলটি যে গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জন করেছিল, এই নির্বাচন তা বরবাদ করে দেয়।
এর পরিণাম হয় ব্যাপক গণ-অসন্তোষ। সিভিল সোসাইটি বিরোধী দলের সঙ্গে যোগ দেয় এবং রাজনৈতিকভাবে বৈধতা হারিয়ে ফেলা বিএনপি সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বাধ্য হয়। তা হলেও জনপ্রিয় দাবিকে আমলে নেওয়ায় এতই দেরি হয়ে গিয়েছিল যে ১৯৯৬ সালের জুনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পরাজয়ের মাধ্যমে বিএনপিকে সেই বিলম্বের মূল্য পরিশোধ করতে হয়। সেই নির্বাচনে ২১ বছর ক্ষমতা থেকে নির্বাসিত থাকার পর আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতাসীন হয়।
রাজনীতির অদ্ভুত মোচড়ে বর্তমানের আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বৈধতাকেই চ্যালেঞ্জ করছে, আদিতে তারা যার জন্য লড়াই করেছিল। আমাদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার নিরিখে এ সিদ্ধান্ত এতই কলঙ্কিত যে নির্বাচনী বন্দোবস্তে ফিরে যাওয়ার পথে এ সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক মূল্য সরকার ও দেশ উভয়ের জন্যই অনেক চড়া হতে পারে।
যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে জামায়াতের বিক্ষোভের পাশাপাশি হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের স্থায়ী অনুঘটক হলো সহিংসতা। উভয় পক্ষের রাজনৈতিক সমীকরণেই এই সহিংসতার উপাদান উপস্থিত। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবির সুবিধা হবে ভেবে ১৮-দলীয় জোট দৃশ্যত এই হানাহানিকে উৎসাহিত, এমনকি উসকে দিয়ে অদূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। এ ধরনের প্রচেষ্টা হানাহানিকে এমনভাবে ছড়িয়ে দিতে পারে, যা থেকে সরকারি বা বিরোধী জোটের কেউই রেহাই পাবে না।
তাই এখন ১৮ দলের নেতৃত্বকে ভাবতে হবে, ২০১৩ সালের শেষাশেষি সরকারের বৈধ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকারের পতন ঘটাতে
তারা ও তাদের সহযোগীরা সহিংসতা ছড়াবে, নাকি সমঝোতার মাধ্যমে মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের দিকে শান্তিপূর্ণ রূপান্তর ঘটানোর বন্দোবস্তে পৌঁছাবে।
বিরোধী দলের মনে রাখা উচিত, ১৯৯১ সালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন দুটি এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন একটি মিলে মোট তিনটি সরকারই নির্বাচনের মাধ্যমে অর্জিত ক্ষমতার বৈধতা নিয়েই যার যার মেয়াদ শেষ করেছে। সরকার পতনের বড় বড় আন্দোলন চলা সত্ত্বেও মেয়াদের আগে তাদের কারোরই পতন হয়নি। মেয়াদের আগেই নির্বাচিত সরকারের উচ্ছেদ চাওয়ার মাধ্যমে বর্তমান বিরোধীদলীয় জোট কার্যত এমন এক বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চাইছে, যা ভবিষ্যতের সরকারগুলোকে ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রথম দিন থেকেই অস্থিতিশীলতার হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগেরও বিএনপির ১৯৯৫-৯৬ এবং ২০০৬-০৭-এর অভিজ্ঞতা থেকে শেখা উচিত। বৈধ পন্থায় ক্ষমতায় ফিরে আসার বাসনা আওয়ামী লীগের থেকে থাকলে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপিকে অংশগ্রহণমূলক মুক্ত ও নিরপেক্ষ নির্বাচনে পরাস্ত করার মাধ্যমেই
তাদের সেই আশা পূরণের বাসনা রাখা উচিত। নির্বাচনের অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার পথ পরিহার করলে তাদেরও বর্তমানের গণতান্ত্রিক বৈধতা খুইয়ে ১৯৯৬ ও ২০০৮-এর বিএনপির পরিণতি বরণ করতে হবে।
এ অবস্থায় সরকারের উচিত নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের যে আশু ও সমাধানযোগ্য চ্যালেঞ্জ হাজির হয়েছে, সবকিছুর আগে তার বিহিত করা। আর দেরি না করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উচিত আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে উভয় পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য সুনির্দিষ্ট নির্বাচনী বন্দোবস্ত প্রণয়ন করা; এবং এর উদ্যোগ নিতে হবে সরকারি দলকেই।
বিএনপিরও উচিত এ ধরনের যেকোনো আলোচনার আহ্বানে বিনা শর্তে সাড়া দেওয়াকেই অগ্রাধিকার হিসেবে সাব্যস্ত করা। একমাত্র এ ধরনের সংলাপের মধ্য দিয়ে গিয়েই বিরোধী দলের পক্ষে সরকারের সত্যিকার অভিপ্রায় সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া সম্ভব। এরপর বিরোধী দলও তাদের চূড়ান্ত পদক্ষেপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে।
ইতিহাসের সংকটের এই সন্ধিক্ষণে উভয় দলই যদি গঠনমূলক পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে আমাদের গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অপরিমেয় ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
রেহমান সোবহান: অর্থনীতিবিদ; সভাপতি, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

শেয়ার করুন