সময় চলে যাচ্ছে, দ্রুত সংলাপ চায় জাতিসংঘ

0
84
Print Friendly, PDF & Email

সংকট উত্তরণে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় জাতিসংঘ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। সময় চলে যাচ্ছে। যত দ্রুত সম্ভব সংলাপ শুরু করতে হবে। সংলাপ শুরু করলে সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।
জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো চার দিনের ঢাকা সফরের শেষ দিনে গতকাল সোমবার এই মন্তব্য করেন। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী সংলাপের যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে বিরোধী দলের সাড়া দেওয়া উচিত।
অস্কার ফার্নান্দেজ মনে করেন, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণভাবে আয়োজনের লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দলকেই সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য ভূমিকা রাখতে হবে। আর এই পরিবেশ এমন হতে হবে, যাতে সবার জন্য সমান সুযোগ থাকে।
নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশের চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে আলোচনার জন্য জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত গত শুক্রবার ঢাকায় আসেন। তিনি ইতিমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী দীপু মনি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব উদ্দীন, প্রধানমন্ত্রীর দুই উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম ও গওহর রিজভী, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রতিনিধিদল, নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন।
এদিকে অস্কার ফার্নান্দেজ গতকাল বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনায় বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা, স্থিতিশীলতা বজায় রেখে শান্তি ও উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে তাগিদ দেন। এ লক্ষ্যে সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে সংশ্লিষ্ট সবার ভূমিকা রাখা উচিত বলে তিনি মত দেন। সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশে সহিংসতা বেড়ে যাওয়ায় জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন যে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন, সেই বার্তাটিও দিয়েছেন তিনি। তাই সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই তিনি শান্তিপূর্ণভাবে সমাধানের পথ খুঁজে নিতে জাতিসংঘের মহাসচিবের পক্ষ থেকে অনুরোধ জানান।
নির্বাচন না হওয়ার ফল: নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের সমঝোতা না হওয়ার ফল কী হতে পারে জানতে চাইলে অস্কার ফার্নান্দেজ বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের ব্যাপারে সমঝোতা না হওয়ার ফল কী হতে পারে, বাংলাদেশের ইতিহাসেই তার নজির রয়েছে। সাধারণত শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন না হওয়ার মানে জনগণের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, স্বাধীনতা ও তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে আপস করা। কাজেই নির্বাচন না হওয়ার ফল কী হতে পারে, সে সম্পর্কে সব রাজনৈতিক নেতারই ধারণা আছে। এ নিয়ে আমি আর মন্তব্য করতে চাই না। কিন্তু আমাদের উদ্বেগ হচ্ছে, সময় শেষ হয়ে আসছে। যত দ্রুত সংলাপ শুরু হবে, সমাধান পাওয়া যাবে তত সহজেই।’
সংলাপের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে জাতিসংঘের দূত বলেন, প্রধানমন্ত্রী যে প্রস্তাব দিয়েছেন, সেটি সংলাপের প্রাথমিক প্রস্তাব। আর সংলাপের প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এই প্রস্তাবে সাড়া দেওয়া উচিত। কীভাবে সংলাপ হবে, তা নিয়ে অনেক ধরনের প্রস্তাব আছে। দলগুলোকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা কোন প্রক্রিয়ায় এগোবে।
ফর্মুলা আনিনি: নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য জাতিসংঘের কোনো ফর্মুলা (সমাধানের প্রস্তাব) তুলে ধরেছেন কি না, জানতে চাইলে জাতিসংঘের মহাসচিবের বিশেষ দূত বলেন, ‘আমরা এখানে কোনো ফর্মুলা নিয়ে আসিনি। আমাদের কাছে কোনো ফর্মুলা নেই। কী করতে হবে, রাজনৈতিক দলগুলোকে সেটা বলে দেওয়া আমাদের কাজও নয়। বরং আমরা এটা বলে উৎসাহিত করতে চাই যে সমস্যা যাদের, সমাধানটা তাদেরই খুঁজে বের করতে হবে। এ জন্য দরকার রাজনৈতিক সদিচ্ছা। এর বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে পারলে সব পক্ষের ছাড় দেওয়ার মধ্য দিয়ে সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি সম্ভব।’
স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন: অস্কার ফার্নান্দেজ বলেন, ‘নির্বাচনকালীন যে ধরনের সরকার থাকুক না কেন, ওই সরকারকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। বিষয়টির গুরুত্ব এখানকার সব নেতাই স্বীকার করেছেন। কাজেই নির্বাচনকালীন সরকার কীভাবে কাজ করবে, তা নিয়ে সবার মতৈক্য থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে নেওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছেন। এ ব্যাপারে দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছি।’
আগামী নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে অস্কার ফার্নান্দেজ বলেন, বাংলাদেশকে স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি ও উন্নয়নের পথে হাঁটতে হলে আগামী নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এই নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতার সঙ্গে আয়োজন করাটা জরুরি। এখানকার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে প্রক্রিয়াগত ব্যাপারে ভিন্নমত থাকলেও সবাই শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনের বিষয়টিতে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সমাধানের পথ বাংলাদেশেই: বর্তমান সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নির্বাচনের বিষয়ে আলোচনার জন্য জাতিসংঘ মিশন কেন ঢাকা সফর করছে জানতে চাইলে অস্কার ফার্নান্দেজ বলেন, ‘বাংলাদেশের কাছে জাতিসংঘের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সাফল্যের পাশাপাশি আর্থসামাজিক ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের অনেক সাফল্য সমাদৃত। সব মিলিয়ে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশ অঙ্গীকারবদ্ধ। আমরা নিশ্চিতভাবেই বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষই সমাধানের পথ খুঁজে নেবে।’

শেয়ার করুন