দুই নেত্রীর দিকে তাকিয়ে গোটা দেশ

0
88
Print Friendly, PDF & Email

বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও ঢাকায় কর্মরত বিদেশী কূটনীতিকদের দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের প্রায় সাড়ে চার বছর ইতোমধ্যে অতিবাহিত হয়েছে। আদালতের রায়ে বাতিল হওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, মানবতাবিরোধী অপরাধ তথা যুদ্ধাপরাধের বিচারসহ নানা ইস্যুতে চলমান আন্দোলন ব্যাপক সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। নির্বাচনের আগে এই সহিংসতা ক্রমশ বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগও প্রকাশ করেছে বিশ্ব সম্প্রদায়। তারা বারবারই বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোকে সংলাপ বা আলোচনার মাধ্যমে সংকটের সমাধান করার আহ্বান জানাচ্ছে। আর এরই ধারাবাহিকতায় এই মুহূর্তে ১৯৩ দেশের সংস্থা জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনের সংলাপের বার্তা নিয়ে ঢাকা সফর করছেন জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিদেশী হস্তক্ষেপ নতুন কোনো বিষয় নয়। বিশেষ করে নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে কূটনীতিকদের তৎপরতা অনেকগুণ বেড়ে যায়। কারণ নির্বাচনের আগে বিভিন্ন ইস্যুতে আন্দোলন ও সহিংসতাও বেড়ে যায়। তবে দেশের রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন কারণে বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়ছে যা ঠিক নয় বলেও মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। দেশের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে যখন বিদেশী সিদ্ধান্ত মুখ্য হয়ে ওঠে তখন দেশের পররাষ্ট্রনীতিও অনেক নতজানু হয়ে পড়ে। সেক্ষেত্রে এদেশের রাজনীতিকদেরই দুর্বলতাকে দায়ী করেন তারা। তাদের মতে, দুর্বল গণতন্ত্র আর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সুযোগ নিয়ে বিদেশীরা বিশেষ করে পশ্চিমা কূটনীতিকরা সরাসরি হস্তক্ষেপ করছে।

বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরাসরি বিদেশীদের হস্তক্ষেপ শুরু হয় ১৯৯৫ সালে কমনওয়েলথের বিশেষ দূত স্যার নিনিয়ান স্টেফানের মধ্যস্থতার উদ্যোগের মধ্য দিয়ে। এরপর ২০০৫ সাল থেকে তৎকালীন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত প্যাট্রেসিয়া বিউটেনিস, ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেলিগেশন প্রধান রাষ্ট্রদূত স্টিফেন ফ্রয়েন এবং ভারতীয় হাইকমিশনার বীণা সিক্রিসহ বিদেশী কূটনীতিকদের সংলাপের লক্ষ্যে তৎপরতার কথা তো সবারই জানা।

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বিদেশী দূতাবাসের বিবৃতি, রাষ্ট্রদূতদের বক্তব্য, বিদেশ থেকে আসা প্রতিনিধিদলের মূল্যায়নসহ বিদেশী পরামর্শের ওপর ক্রমশ নির্ভর হয়ে পড়ছে দেশ। ফলে নতুন করে শঙ্কাও অমূলক নয়। কারণ দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল দুটির মধ্যে সংলাপ আয়োজনে ব্যর্থ কূটনৈতিক তৎপরতার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭-২০০৮ টানা দুই বছর সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকে। ওই সময় রাজনীতিকদের জেল-জরিমানা ও হয়রানির নেপথ্যে সংলাপের ব্যর্থতার সমুচিত জবাব দিতে বিদেশী কূটনীতিকদের উসকানি ছিল বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, রাজনীতির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বিদেশীরা নিজেদের মত চাপিয়ে দিতে চায়। আর এটিই রাজনীতিকদের বিশেষভাবে বিবেচনায় রাখতে হবে।

তবে বিদেশীদের পরামর্শকে খারাপ মনে করেন না বর্ষীয়ান কূটনীতিক ওয়ালিউর রহমান। তিনি বলেন, আজকের বিশ্বে বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ নানা কারণে একটি দেশ অন্য আরেকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল। তাই বাংলাদেশের মতো সম্ভাবনাময় দেশে নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতায় তারা বেশি উদ্বিগ্ন হন। বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে পরামর্শ দেন।

এদিকে চলমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনে বহুল প্রত্যাশিত সংলাপ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। যদিও জাতিসংঘ সহকারী মহাসচিব বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে বৈঠক করে সংলাপের ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। আর ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বারবার আহ্বান সত্ত্বেও বিরোধী দলের কঠোর অবস্থানের কারণেই সংলাপ অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিমত। তাদের মতে, সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন অন্তর্র্বর্তী সরকার গঠনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া ফর্মুলা প্রত্যাখ্যান করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তাদের তত্ত্বাবধায়ক ইস্যুতে (যা ইতোমধ্যে আদালত বাতিল করে দিয়েছে) অনড় অবস্থান আলোচনার পথকে আরো জটিল এবং সংঘাতময় করে তুলছে। উপরন্তু বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নতুন চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হেফাজতে ইসলাম। এ পরিপ্রেক্ষিতে দেশী-বিদেশী কূটনীতিক মহল চাইছেন, যে করেই হোক সংলাপ বা আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত জটিল পরিস্থিতির মোকাবেলা করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরাই সংলাপে বসে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট নিরসনের উদ্যোগ গ্রহণ করুক।

বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডব্লিউ মজিনা বরাবরই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছেন। জাপানের রাষ্ট্রদূত শিরো সাদোসিমাও সম্প্রতি রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। আর পশ্চিমা দেশের কূটনীতিকরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন কূটনীতিকদের বাসভবনে সংকট নিরসন ও সংলাপ আয়োজনের উপায় নিয়ে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। এ ব্যাপারে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনাও করছেন। ঢাকায় কর্মরত বিভিন্ন দেশ ও দাতাসংস্থার প্রতিনিধিরাও বিভিন্ন অনুষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আলোচনার মাধ্যমে সংকট নিরসনের আহ্বান জানিয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সহিংসতায় উদ্বিগ্ন হয়ে এবার প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরাক, মরক্কো, ওমান, মিসর ও লিবিয়া এই ১০ আরব দেশের কূটনীতিকরাও সরকার ও বিরোধী দলকে সংলাপে বসাতে উদ্যোগ নিয়েছে। এর আগে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এভাবে নিজেদের জড়ায়নি এসব দেশ। তারা সকলেই সহিংসতা পরিহার করে শান্তিপূর্ণ উপায়ে আলোচনার মাধ্যমে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো সংলাপের ব্যাপারে এখনো একমত হতে পারেনি।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, আমাদের রাজনীতিকদের ব্যর্থতার কারণে বিদেশীরা অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলাতে সুযোগ পায়। আগামী নির্বাচন যতোই ঘনিয়ে আসছে রাজনৈতিক সহিংসতা ততোই বাড়ছে। আমরা যেন কিছুতেই সমস্যার সমাধান করতে পারছি না। এ অবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার অভাব স্বাভাবিকভাবে দাতা দেশ, সংস্থা ও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। তাদের উদ্বেগেরও যৌক্তিকতা আছে। তাই যতোদিন না আমরা নিজেরা সংকটের সমাধানে সমঝোতার মানসিকতা তৈরি করবো, ততোদিন বিদেশী তৎপরতা থাকবেই।

শেয়ার করুন