হৃদয়ের কথা

0
137
Print Friendly, PDF & Email

বনতলে বসন্ত এসেছে। থোকায় থোকায় নাম না-জানা বুনো ফুল ফুটেছে। নতুন পাতার সমারোহ। কোকিল ডাকে। শহরে থেকেও কী করে যেন সেটা টের পেয়ে গেছে লোকটি, উতলা হয়ে উঠেছে মন। স্ত্রীকে ডেকে বলল, ‘আর দেরি করা যায় না। এবার যেতে হয়।’
স্ত্রী বলল, ‘যেতে হয় যাও।’
উসখুস করে লোকটি। মাথা চুলকায়। বলে, ‘ভাবছি এবার সত্যি সত্যি বেচে দেব।’
মুচকি হাসল স্ত্রী। বলল, ‘হাজারবার শুনেছি ও কথা। যা পারবে না, তা বলে আর কী লাভ?’
লোকটি বলে, ‘না, আমি সিরিয়াস। এবার ছেড়েই দেব। চাহিদা আছে এখনো। কিনতে যখন চায়, দিয়েই দেওয়া উচিত।’
ধরা যাক লোকটির নাম হাশেম, হাশেম চৌধুরী। চন্দ্রঘোনায় পাহাড়ের কোলে একটা সুন্দর কটেজ আছে তাদের। ৯৩ বছর আগে বাড়িটা ওখানে করেছিলেন তার দাদা। চমৎকার লেক আছে বাড়ির সামনে। সেই বাড়িতেই প্রকৃতির মাঝে বড় হয়েছে হাশেম। বাঁচার তাগিদে এই বিদেশ বিভুঁইয়ে পড়ে থাকলেও যখনই বসন্ত আসে, আর স্থির থাকতে পারে না সে। রক্তে যেন ঝড় ওঠে। ছুটে যেতে ইচ্ছা করে সেই পাহাড়ের কোলে। যায়ও।
এই যাওয়াকে বেড়াতে যাওয়া বলে না হাশেম, বলে তীর্থযাত্রা। তার কাছে অন্তত সে রকমই লাগে।
তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ যাওয়ার কথা বলে অনেকে, হাশেমদের ব্যাপারটাও অনেকটা সে রকম। তেঁতুলিয়া না হলেও বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে প্রায় আরেক প্রান্তে চলে গিয়েছিল তার পূর্বপুরুষেরা। রংপুর থেকে চন্দ্রঘোনায় পাহাড়ের কোলে ওই জায়গায় গিয়ে বাড়ি করেছিলেন হাশেমের দাদা-দাদি, তার বাবা তখন ছোট। ছোট একটা কটেজ তৈরি হলো প্রথমে। পুরো আঠারোটা বসন্ত ওখানে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাটিয়েছেন তার বাবা। মনে মনে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়িয়েছেন, লেকে মাছ ধরেছেন, সাঁতার কেটেছেন, নৌকা বেয়েছেন। ওই সময়টায় তাঁর জীবনটাই একটা কবিতা হয়ে গিয়েছিল।
পরে সেই বাড়ির পরিবর্তন করেছিলেন হাশেমের দাদা। তবে খুব একটা নয়। কেবল বাঁশের বেড়ার জায়গায় ইটের দেয়াল হয়েছিল, ওপরে টিন ঠিকই রইল। প্রচুর ফুলের গাছ লাগিয়েছিলেন চারপাশে। অনেক পরে হাশেমের বাবা বাড়িটার আরও খানিকটা সংস্কার করেছেন। জেনারেটর বসিয়ে আলোর ব্যবস্থা করেছেন। বিদ্যুতের সঙ্গে সঙ্গে এল অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। পিলার বসিয়ে তার ওপর পানির ট্যাংক করা হলো। বাথরুমের কলের চাবি ঘোরালেই এখন পানি বেরিয়ে আসে।
বড় হয়ে জীবিকার তাগিদে সেই বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে আসতে হয়েছিল হাশেমের বাবাকে। তবে প্রতিবছরই বসন্ত এলে হাতে যত কাজই থাকুক, সব এক পাশে সরিয়ে রেখে বেরিয়ে পড়তেন তিনি, সঙ্গে থাকতেন হাশেমের আম্মা আর অবশ্যই হাশেম।
বাবার মতোই জায়গাটা যেন নেশা ধরিয়ে রেখেছে হাশেমের রক্তে। বাবাই সাঁতার কাটা শিখিয়েছেন তাকে, শিখিয়েছেন মাছ ধরা, নৌকা বাওয়া। মাছ ধরতে গেলে নৌকাটা ঠিক কোনখানে রাখতেন বাবা, সব মনে আছে তার। লেকের একধারে কতগুলো শাপলার মাঝখানে। লাল লাল শাপলা ফুটে থাকত। তার মাঝে ঘাই দিত মাছ। সব মনে আছে হাশেমের, সব। একদিনের কথা। শীতের সকাল। লেপের নিচ থেকে টেনে তুলে তাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন বাবা।
প্রথম যেদিন মাছ ধরা শেখানোর জন্য নৌকায় করে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন বাবা, সেদিনটার কথা জীবনে ভুলবে না সে। নৌকা বাইছিলেন বাবা, হাশেম গলুইয়ের কাছে বসে বসে দেখছিল তাঁকে। সকালের রোদ তখন একপাশ থেকে এসে পড়েছিল তাঁর মুখে। ধারালো চেহারার ঝাঁকড়া চুলওয়ালা মানুষটির দিকে তাকিয়ে সেই মুহূর্তে হাশেমের মনে হয়েছিল, তার বাবার মতো এত সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। তার বাবা আজও তার কাছে হিরো।
তরতর করে এগিয়ে চলেছিল নৌকা। ছোট ছোট লাখো কোটি ঢেউ কাঁপতে কাঁপতে ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে। লেকের পানিকে মনে হচ্ছিল তরল সোনা। অনেক লাল শাপলার মাঝখানে নিয়ে গিয়ে নৌকা রেখেছিলেন বাবা। ছিপ ধরিয়ে দিয়েছিলেন হাশেমের হাতে।
ফাতনার দিকে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ বলে উঠেছিলেন তিনি, ‘এই, আধার খেয়েছে। আস্তে টান দে। খবরদার, ঝাঁকি যেন না লাগে!…ফাতনাটা আরও নিচে নিয়ে যাক,…হ্যাঁ, নিয়ে যাক।…দে, এইবার দে টান!’
একটা টাকি মাছ টেনে তুলেছিল হাশেম। সেই তার প্রথম মাছ। সেটা পেয়েই থরথর করে কাঁপছিল উত্তেজনায়। কাঁপা গলায় জিগ্যেস করেছিল, ‘কী করব এটাকে?’
হেসে উঠে বাবা বলেছিলেন, ‘কী আর, ছেড়ে দে। এটা রেখে লাভ নেই।’
আবার ছিপ ফেলেছিল হাশেম। মাঝারি আকারের দুটো শোল আর একটা কাতলার পোনা ধরা পড়ল। ততক্ষণে পেটের মধ্যে গুরুগুরু ডাক শুরু হয়ে গেছে দুজনেরই। নাশতার জন্য বাড়ি ফিরে এল ওরা। এতগুলো মাছ ধরে গর্বে তখন আধ হাত ফুলে গেছে হাশেমের বুক। মাছগুলো দেখাল মা আর দাদা-দাদিকে।
সবাই হাসল, বাহবা দিল তাকে। দাদা বললেন, ‘দুপুরের খাওয়াটা আজ দারুণ জমবে। তাজা লাউ দিয়ে শোল মাছ, কাতলা মাছের ভাজি, উফ্! ও তো জাত জেলেরে। মাছ হাতে একটা ছবি তুলে রাখা দরকার।’ তারপর বললেন, ‘আমার ক্যামেরাটা কোথায়?’
ভাবলে মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। অথচ কত বছর পার হয়ে গেছে। সেই কবে মারা গেছেন দাদা-দাদি, মুক্তিযুদ্ধের অনেক আগে।
তারপর হাশেম বড় হয়েছে, লেখাপড়া শিখে বাবার ব্যবসার ভার নিয়েছে, বিয়ে করেছে, ছেলেমেয়ে হয়েছে। দেখতে দেখতে আরেকটা প্রজন্ম প্রেমে পড়ে গেল লেকের ধারে পাহাড়ের কোলের সেই বাড়িটার। প্রতিবছর ছেলেমেয়ে নিয়ে সেখানে বেড়াতে যায় হাশেম।
‘এই মিমি, দেখো,’ পানি থেকে চিৎকার করে বলে লেকের পাড়ে বসা বোনকে হাশেমের ছেলে অপু, ‘দেখো, একডুবে কদ্দুর যেতে পারি।’ অনেকক্ষণ দাপাদাপি করে সাঁতার কেটে পানি থেকে যখন উঠল সে, চোখ তখন টকটকে লাল, আঙুলের চামড়া সিঁটিয়ে কুঁচকে গেছে।
হাশেমের চতুর্থ বাচ্চাটা হওয়ার অনেক আগেই মারা গেলেন তার বাবা। সেই বাড়িতেই। ছেলেকে ব্যবসা বুঝিয়ে দিয়েই আবার ফিরে গিয়েছিলেন তিনি তাঁর পুরোনো জায়গায়, স্বপ্নভূমিতে। বাবা মারা যাওয়ার পর মাকে শহরে নিজের কাছে নিয়ে আসার অনেক চেষ্টা করেছে হাশেম, কিছুতেই রাজি করাতে পারেনি। তিনি সেখানেই রয়ে গেলেন।
তারপর একদিন মা-ও গেলেন। বাড়িটা দেখাশোনার আর কেউ রইল না। প্রতিবছর বসন্ত এলে আগের মতোই পুরো পরিবার নিয়ে সেখানে কয়েক হপ্তা কাটিয়ে আসতে লাগল হাশেম। কিন্তু আগের মতো আর হেসেখেলে সময় কাটাতে পারে না। গিয়েই লেগে যেতে হয় ঘরদোর পরিষ্কার আর মেরামতের কাজে। সবকিছু ঠিকঠাক হয়ে যাওয়ার পর যখন হাঁপ ছাড়ে, তখন দেখে সময় শেষ, এবার ফিরে যেতে হবে।
প্রতিবছরই যায়, আর একই অবস্থা হয়। মানুষ না থাকলে বাড়িঘর ঠিক থাকে না। আস্তে আস্তে বিরক্ত হয়ে উঠল হাশেম। মনে হতে লাগল, ঝামেলাটা বিদায় করা উচিত। কথাটা পরিচিত মহলে একবার পাড়তেই দেখা গেল বাড়িটার প্রতি অনেকেরই আগ্রহ, একজন তো তখনই কিনে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বসল।
সমস্যাটা নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করল হাশেম। স্ত্রী বলল, ‘যা ভালো বোঝো করো।’
তার পরও পর পর আরও দুই বছর বাড়িটাতে গেল হাশেম, বিরক্ত হয়ে ফিরে এল।
ফিরে এসেই বলে বিক্রি করে দেবে, কিন্তু করা আর হয় না।
আরেকবার এল যাওয়ার সময়। এবার মনস্থির করে ফেলেছে হাশেম, সত্যি সত্যি বিক্রি করে দেবে। সে যত জোর দিয়েই বলুক, স্ত্রী বিশ্বাস করতে পারল না কথাটা। লেখাপড়ার চাপ আর পরীক্ষার সময় বলে বড় তিনটি ছেলেমেয়ে যেতে পারল না, স্বভাবতই ওদের মাকেও থেকে যেতে হলো। ছোট ছেলে হিরোকে কেবল সঙ্গে নিল হাশেম। বাপ-দাদার ভিটায় শেষবারের মতো বেড়িয়ে আসবে।
বেচেই যখন দেওয়া ঠিক করেছে, মেরামত করে আর কী হবে? তাই এবার আর ওসব ঝামেলায় গেল না সে।
ছেলেটা জিগ্যেস করল, ‘আচ্ছা, আব্বা, এখানে পানির স্বাদ এ রকম কেন?’
‘লোহা বেশি। তা-ও তো এখন মেশিনে তোলা হয় বলে, বেশি নিচে থেকে ওঠে বলে অনেক ভালো। আগে যখন টিউবওয়েলের পানি খেতাম, আরও খারাপ ছিল স্বাদ।’
‘তাই বুঝি?’
‘হ্যাঁ। শুধু কি তাই? জেনারেটর আসার আগে তো এখানে বিদ্যুৎও ছিল না, বাথরুমে বালতিতে করে পানি টেনে আনতে হতো। ফ্রিজ ছিল না, টিভি ছিল না।’
‘টিভি ছিল না! সন্ধ্যাটা কাটাতে কী করে তখন?’
‘লুডু খেলতাম, ক্যারম খেলতাম।’
‘আলো ছাড়া কী করে খেলতে?’
‘হারিকেন। ক্যারম খেলার সময় মোম জ্বেলে বোর্ডের কোনায় বসিয়ে নিতাম।’
শুনে অদ্ভুত দৃষ্টিতে হাশেমের দিকে তাকিয়ে রইল হিরো।
পরদিন বাবার ছিপটিপগুলো বের করল হাশেম। হিরোকে বলল, ‘মাছ ধরা শিখবে?’
হিরো রাজি। মাটি খুঁড়ে কিছু কেঁচো বের করে নিয়ে ছেলেকেসহ মাছ ধরতে চলল হাশেম। নৌকা নিয়ে সেই জায়গাটায় চলে এল ৫০ বছর আগে যেখানে তাকে মাছ ধরার হাতেখড়ি দিয়েছিলেন তার বাবা।
বাবার মতো করেই নিজের ছেলেকে শেখাতে শুরু করল হাশেম, ‘প্রথমে বড়শিতে অর্ধেক গাঁথতে হবে।’ টিনের কৌটা থেকে কিলবিলে একটা কেঁচো বের করে কীভাবে গাঁথতে হয়, দেখিয়ে দিল সে। ‘তারপর এইভাবে ছুড়ে ফেলে ফাতনার দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করবে। নাও, ধরো ছিপটা।’
ঘিনঘিনে কেঁচোগুলোর দিকে তাকিয়ে একবার দ্বিধা করল হিরো। ধরল ছিপটা। বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, টান লেগে ডুবতে শুরু করল ফাতনা।
‘আধার গিলেছে,’ হাশেম বলল।
উত্তেজনা দেখা দিল হিরোর চোখে। ‘টান দেব?’
‘দাও,’ কী করে দিতে হবে, শিখিয়ে দিল হাশেম।
আনাড়ি ভঙ্গিতে মাছটাকে টেনে তুলল হিরো। নৌকার পাটাতনে তার পায়ের কাছে লাফাতে থাকা মাছটার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এটা সে ধরেছে বিশ্বাসই করতে পারছে না। ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে এল বড় বড় হয়ে যাওয়া চোখ। হাসি ছড়িয়ে পড়ল মুখে।
‘এভাবেই ধরতে হয়, বুঝলে,’ হাসিমুখে বলল হাশেম, ‘এখন থেকে মৎস্যশিকারি হয়ে গেলে তুমি। আমরা এখানে মাছশিকারিকে বলি মেছুয়া।’ মাছের মুখ থেকে বড়শিটা খুলে মাছটাকে পানিতে ছেড়ে দিল সে। আবার বড়শিতে কেঁচো গেঁথে পানিতে ফেলে ছিপটা বাড়িয়ে ধরল ছেলের দিকে।
এবার আর ছিপ নিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করল না হিরো।
সেদিন সন্ধ্যায় বারান্দায় বসল পিতা-পুত্র। চা-নাশতা খেতে খেতে আলোচনা চলল। ছেলের মুখে কেবল মাছ ধরার গল্প। পরের একটা হপ্তা যেন উড়ে চলে গেল। আবার বারান্দায় বসল দুজনে। লেকের অন্য পাড়ে আরেক পাহাড়ের মাথায় তখন সূর্য ডুবছে। টকটকে লাল। রক্ত ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে যেন পশ্চিম আকাশটায়। তার প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে লেকের টলটলে পানিতে।
বসেই আছে দুজনে, বসেই আছে। গোধূলি শেষ হয়ে রাত নামল। মস্ত চাঁদ উঠল পুবের পাহাড়ের মাথায়। লেকের পানি এখন গলিত রুপা। তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে হাশেম। ছেলেটাও চুপ।
ডানা ঝাপটে উড়ে গেল একটা বাদুড়, যেন চাঁদের উদ্দেশে চলেছে। সেদিকে তাকিয়ে হিরো জিগ্যেস করল, ‘আব্বা, বাড়িটা সত্যি বেচে দেবে?’
যেন ঘুমের জগৎ থেকে উঠে এল হাশেম। ‘না, বাপ। নিজের সত্তাকে কি কেউ বেচতে পারে!’

শেয়ার করুন