‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ও ‘অতিথি’: বন্ধনমুক্তির গল্প

0
1857
Print Friendly, PDF & Email

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর [জন্ম: ৭ মে ১৮৬১; মৃত্যু: ৭ আগস্ট ১৯৪১] কেবল বাংলাসাহিত্যে নয়; তাঁর কীর্তির জন্য তিনি সারা দুনিয়ার সাহিত্য-পরিমণ্ডলে একটি বিশেষ মর্যাদার আসন পেতে বসেছেন। কবিতা ও সঙ্গীতের গীতলতা, ছোটগল্পের বিরাট-ব্যাপক পটভূমি, উপন্যাসে মনোভঙ্গির পরিবেশনশৈলী, নাটকের নানান তত্ত্ব আর প্রবন্ধ ও চিত্রকর্মের মনন-বয়নসূত্র উপহার দিয়ে তিনি সাহিত্যশিল্পের সহযাত্রী ও ভোক্তাদের মনে জাগিয়ে রেখেছেন বিপুল আনন্দধারা। তিনি যেন কবি ও কবিতার জগৎ ছাড়িয়ে, ব্যক্তিমানুষের পরিচয় হারিয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে পড়েছেন কোনো এক প্রতিষ্ঠানের আদলে; যেখান থেকে প্রতিনিয়ত উৎপাদন হচ্ছে মানবিক বিজ্ঞানের বিচিত্রসব অনুভূতি। আর তাই, রবীন্দ্রনাথ দিনে দিনে আমাদের মন ও মননের ভাষ্যকার হয়ে উঠেছেন। প্রকৃতির অপার শক্তি ও রহস্যের সাথে মানুষের মনের গহীন অতলের নিবিড় সম্বন্ধ আর জাগতিক ও পারিবারিক বন্ধন থেকে মানুষের মুক্তির যে নেশা যুগে যুগে প্রকাশ পেয়েছে, তারই শৈল্পিক রূপায়ন দেখি রবীন্দ্রনাথের শিল্পকর্মে। তাঁর সমগ্র রচনাকর্মে এই প্রবণতা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ও ‘অতিথি’ নামক গল্পে আমরা এরকম এক বিশেষ অনুভূতির বাস্তব রূপই পাঠ করি।
‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ গল্পে একটি সম্পন্ন পরিবারের পুরনো-অভিজাত ভৃত্যের জীবনে ঘটে-যাওয়া কষ্টদায়ক ঘটনার বিবরণ উপস্থাপন করেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গল্পটির ক্যানভাস আর পরিবেশ-বাস্তবতা অত্যন্ত হৃদয়-বিদারক। রাইচরণ নামক ভৃত্যটি মুন্সেফ অনুকূল বাবুর বাড়ির আগ-প্রজন্মের চাকর। অনুকূলের যখন এক বছর বয়স, তখন রাইচরণ আসে তাদের বাড়িতে। অনুকূল আজ রাষ্ট্রের বড়কর্তা; রাইচরণ এখনও চাকর। মুন্সেফ বাবু বিয়ে করে সংসার পেতেছেন, কাজের অবসরে কিংবা দিনের শেষে স্ত্রী-সন্তানের উষ্ণ সান্নিধ্য লাভ করে পুলকিত হয়; চাকরটির পরিবার আজও দূর গ্রামে অপেক্ষার প্রহর যাপন করছে। উপরন্থ যুক্ত হয়েছে আরেক অপ্রতিরোধ্য যন্ত্রণার বহর। গল্পটির আরম্ভ হয়েছে তৃতীয় প্রজন্মের বাবু নবকুমারের দেখাশোনার দায়িত্ব ভৃত্য রাইচরণের ওপর অর্পনের পটভূমির মধ্য দিয়ে। বৃদ্ধ রাই মনে করে নতুন বাবু বড় হয়ে জজ হবে। ছেলেটির চাতুর্য-বিচারশক্তি-হাস্যবদন ভৃত্যকে যারপর নাই বিমুগ্ধ করে তোলে। অশিক্ষিত-গ্রাম্য চাকরটির এমন ধারণা সম্বন্ধে গল্পকার বলছেন: ‘পৃথিবীতে আর কোনো মানবসন্তান যে এই বয়সে চৌকাঠ-লঙ্ঘন প্রভৃতি অসম্ভব চাতুর্যের পরিচয় দিতে পারে তাহা রাইচরণের ধ্যানের অগম্য, কেবল ভবিষ্যৎ জজেদের পক্ষে কিছুই আশ্চর্য নহে।’
শিশু নবকুমারের বেড়ে-ওঠা, তার শিশুসুলভ প্রবণতা প্রভৃতির অনুষঙ্গ বর্ণনার পাশাপাশি লেখক তাঁর পাঠকের সামনে কৌশলে হাজির করেছেন সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াবলি। কাল্পনিক ও অবাস্তব কাহিনীর অবতারণা করে শিমুকে বিভ্রান্ত করার সংস্কৃতিকে আমরা লালন করছি বহুকাল ধরে। যে মানুষটি বড় হচ্ছে, আগামিদিনের পরিবার-সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের জন্য যে মানবসন্তানটি নিজেকে তৈরি করছে, তাকে মিথ্যা শিক্ষা অথবা অবাস্তব ধারণা দেওয়া অবশ্যই যুক্তিযুক্ত নয়। রবীন্দ্রনাথ তার বর্তমান গল্পে সামাজিক এই বিভ্রান্তি থেকে মুক্তির পথ খুঁজেছেন; শিশুর স্বাভাবিক আগ্রহ এবং প্রত্যাশাকে বাস্তবায়নের পথও নির্দেশ করেছেন। রাইচরণ যখন বালকটির দৃষ্টি কদমফুল থেকে অন্য দিকে ফেরানোর জন্য “দেখো, দেখো ও-ই দেখো পাখি” প্রভৃতি মিথ্যা প্রলোভন দেখাতে গিয়ে ব্যর্থ হয়, তখন গল্পকার ওই পরিস্থিতিটি পাঠক জানাচ্ছেন এভাবে: ‘কিন্তু যে ছেলের ভবিষ্যতে জজ হইবার কোনো সম্ভাবনা আছে তাহাকে এরূপ সামান্য উপায়ে ভুলাইবার প্রত্যাশা করা বৃথা- বিশেষত চারিদিকে দৃষ্টি আকর্ষণের উপযোগী কিছুই ছিল না এবং কাল্পনিক পাখি লইয়া অধিকক্ষণ কাজ চলে না।’
মুশকিল হলো যখন রাইচরণ ছেলেটিকে গাড়িতে বসিয়ে রেখে, তারই আনন্দের জন্য,  কাদা মাড়িয়ে কদম ফুল আনতে গেল, তখন। ‘একবার ঝপ করিয়া একটা শব্দ হইল, কিন্তু বর্ষার পদ্মাতীরে এমন শব্দ কত শোনা যায়। রাইচরণ আঁচল ভরিয়া কদম্বফুল তুলিল। গাছ হইতে মানিয়া সহাস্যমুখে গাড়ির কাছে আসিয়া দেখিল, কেহ নাই। চারিদিকে চাহিয়া দেখিল, কোথঅও কাহারও কোনো চিহ্ন নাই।’
শিশুটিকে কোথাও পাওয়া গেল না; সন্দেহের তীরটি পদ্মানদী, নদীর তীরে গ্রামের প্রান্তে বেদের দল ঘুরে ঘুরে অবশেষে রাইচরণের দিকে ধাবিত হলো। রাইচরণ কেবল কাঁদে আর বলে: ‘জানি নে, মা।’ কিন্তু মাঠাকুরানীর বিশ্বাস রাইচরণই তার ছেলেকে চুরি করেছে। ভৃত্যকে কাছে ডেকে অনুনয়পূর্বক বললেন: ‘তুই আমার বাছাকে ফিরিয়ে এনে দে- তুই যত টাকা চাস তোকে দেব।’ অনুকূলবাবু অবশ্য স্ত্রীকে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন যে রাইচরণ এমনটি করতে পারে না; কিন্তু গৃহিণীর ধারণা বালকের গায়ের সোরার গয়নার লোভে চাকর তাকে চুরি করেছে।
গল্পটির পরের আবহ খুবই নাটকীয় এবং সম্ভবত দায়মোচন কিংবা সামাজিকতার বিষবাষ্প থেকে মুক্তির উপায় হিশেবে রবীন্দ্রনাথ এই পথ অবলম্বন করেছেন। ব্যাপারটি এইরকম- রাইচরণ গ্রামে ফিরে গেল। পরের বছর তার নিঃসন্তান স্ত্রী একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে মারা গেল। ফেল্‌না নামের এই শিশুটির ভেতর কেমন যেন সেই হারিয়ে-যাওয়া শিশুটির ছায়া দেখতে পেল রাইচরণ। সে কী ভেবে ছেলেটিকে গ্রামের পরিবেশ থেকে ভিন্নমেজাজে তৈরি করতে লাগলো; কারো সাথে তেমন মিশতে দিত না। বিদ্যাশেখার বয়স হইলে রাইচরণ নিজের জোতজমা সমস্ত বিক্রয় করে লেখাপড়ার জন্য তাকে কলকাতায় নিয়ে গেল। ছাত্রাবাসে নিজের পরিচয় গোপন রেখে “রাইচরণ লেহে বাপ এবং সেবায় ভৃত্য” সেজে বারো বছর অতিক্রম করলো। তারপর একদিন, তার আর্থিক সঞ্চয় প্রায় নিঃশেষ হয়ে এলে, বারাসাতে মুন্সেফ অনুকূল বাবুর বাড়িতে গিয়ে হাজির হলো। “সন্ধ্যার সময় বাবু কাছারি হইতে আসিয়া বিশ্রাম করিতেছেন এবং কর্ত্রী একটি সন্ন্যাসীর নিকট হইতে সন্তানকামনায় বহুমূল্যে একটি শিকড় ও আশীর্বাদ কিনিতেছেন।” এমন সময় জয়ধ্বনি তুলে রাইচরণের প্রবেশ। অনুকূল অবশ্য তাকে পেয়ে খুশিই হলো এবং কাজে নিয়োগ করার প্রস্তাব করলো। কিন্তু এই পুরনো-বিশ্বস্ত-অভিজাত ভৃত্যটির অভিপ্রায় ভিন্ন; সেএসেছে দীর্ঘদিন পুষে-রাখা অপমানের- লজ্জার যন্ত্রণা থেকে মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করতে; মনিব এবং স্ত্রীর সাংসারিক ও মনোকষ্ট লাঘব করার ইচ্ছা মনে নিয়ে। রাইচরণ মাঠাকুরানীর প্রতি জোড়হাতে বললো : “প্রভু, মা, আমিই তোমাদের ছেলেকে চুরি করিয়া লইয়াছিলাম। পদ্মাও নয়, আর কেহও নয়, কৃতঘ্ন অধম এই আমি-”
অনুকূল কিন্তু এবারও বিশ্বাস করতে চায়নি; চুরির প্রমাণ চেয়েছে। কিন্তু রাইচরণ যখন জানালো কেবল তার অদৃষ্ট আর ভগবান জানেন এই চুরির কথা; পৃথিবীর আর কেহ নয়, তখন অনুকূল তার প্রতি রুষ্ঠ হলো। মাঠাকুরানী অবশ্য ছেলেকে ফিরিয়ে পেয়ে অপরাধীকে ক্ষমা করার পক্ষে মত দিল; তাকে বাড়িতে জায়গাও দিতে চাইল। ফেল্‌না যদিও চোরের প্রতি পক্ষপাত করেনি, তবে মাসোহারা দেওয়ার ব্যাপারে পরামর্শ দিল। কিন্তু লেখক, পাঠক আর তাদের অন্তর্যামি জানেন যে, রাইচরণ এখন তার দীর্ঘদিনের মনিববাড়ির সকল মোহ-আকর্ষণ থেকে অনেক দূরে; তাকে আর কোনো সান্তনা দিয়েই আবদ্ধ করা যাবে না- সে এখন মুক্ত। সকল বিশ্বাস্ত অবিশ্বাস,স্নেহ-প্রীতি, দায়-সম্ভ্রমবোধের সীমানা ছাড়িয়ে সে এখন এক পরমাস্থার ভুবন- পৃথিবীর কোলো স্থান করে নিয়েছে। গল্পটির শেষাংশে কাহিনিকার বলছেন:
রাইচরণ কোনো কথা না বলিয়া একবার পুত্রের মুখ নিরীক্ষণ করিল, সকলকে প্রণাম করিল; তাহার পর দ্বারের বাহির হইয়া পৃথিবীর অগণ্য লোকের মধ্যে মিশিয়া গেল। মাসান্তে অনুকূল যখন তাহার দেশের ঠিকানায় কিঞ্চিৎ বৃত্তি পাঠাইলেন তখন সে টাকা ফিরিয়া আসিল। সেখানে কোনো লোক নাই।
মানুষ নয় পৃথিবীই মানুষের বড় আশ্রয়; সব ঠিকানার শেষ ঠিকানাও এই পৃথিবী। যখন কারো কাছেই আমাদের জন্য আর কোনো সান্তানা অবশিষ্ট থাকে না, তখন স্নেহের হাত বাড়িয়ে দেয় এই বিরাট দুনিয়া- এই সত্যবাণীর ঘোষণা আছে গল্পটির ছোট্টপরিসরে।
‘অতিথি’ গল্পটির বয়নরীতি আর পরিবেশনকৌশলে আছে চমৎকারিত্ব; একটি বিশেষ চরিত্রের গল্পের ফ্রেমে প্রবেশ এবং তাঁর চারিত্রিক বৈচিত্র্য পাঠককে নিঃসন্দেহে দান করে অনাস্বাদিত অনুভব। পাঠক ধীরে ধীরে পরিচিত হতে থাকে আশ্রিত একটি কিশোর এবং আশ্রয়দাতা পরিবারটির লোকজনদের সাথে। রান্না-গোসল-খাবার-সঙ্গীতের আসর- সবই অনুপ্রবেশ করেছে মানবচরিত্রের বহুধাবিচিত্র প্রবণতাকে হাজির করবার জন্য। অবশ্য গল্পের একেবারে শুরুতে প্রকৃতির নিবিড় নির্মলতার পরিচয় দিয়েছেন গল্পকার এভাবে- ‘বাহিরে বর্ষার নদী পরিপূর্ণতার শেষ রেখা পর্যন্ত ভরিয়া উঠিয়া আপন আত্মহারা উদ্দাম চাঞ্চল্যে প্রকৃতিমাতাকে যেন উদ্‌বিগ্ন করিয়া তুলিয়াছিল।’
কাঁঠালিয়ার জমিদার মতিলাল বাবু পরিবার নিয়ে নৌকাযোগে নিজগ্রামে যাচ্ছিলেন; পথিমধ্যে পনের-ষোল বছরের এক কিশোর উপযাচক হয়ে তাদের আতিথ্য গ্রহণ করলো; অবশ্য সে জানায় যে, মাঝপথে- নন্দীগ্রামে সে নেমে পড়বে। কিন্তু স্বভাবগুণে তার আর প্রতিশ্রুত জায়গায় নামা হয় না; ঘরছাড়া এই বালকটি গল্পে গল্পে পরিবারটির একরকম আপনজনে পরিণত হয়। শৈশব থেকে বাড়ির বাহির হয়েছে সে; ঠিক জীবিকার অন্বেষায় নয়- পৃথিবীর মহত্ব ও উদারতার টানে হয়তো। অবশ্য জীবিকার জন্যও তাকে মাঝে মধ্যে যাত্রার দলে কাজ করতে হয়েছে। তারাপদ মানের এই ছেলেটি স্ব্‌তন্ত্র একটি ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছে তার ই”ছাশক্তি আর স্বাধীনচেতা মানসিকতার কারণে; সে কাজ করে আপন অভিপ্রায় অনুযায়ী। আর কাজ করার মধ্যেও আছে আনন্দের যোগ, বাধ্য হয়ে কিংবা নিতান্ত প্রয়োজনে তাকে কোনো কাজ করতে দেখা যায় না, লজ্জা-সংকোচ-স্নেহবন্ধন প্রভৃতিকে ঝেড়ে ফেলে সে আপন ভুবন তৈরি করে নিতে পেরেছে অনায়াসে। ‘তারাপদ হরিণশিশুর মতো বন্ধনভীররু, আবার হরিণেরই মতো সংগীতমুগ্ধ।’ জগৎকে দেখবার, জানবার অফুরন- আগ্রহ তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে হয়তো, যেন সে প্রকৃতিরই এক শান্ত-উদগ্রীব সন্তান। নানান মানুষ, বিচিত্র দল-গোষ্ঠীর সাথে মিশেও সে রয়ে গেচে আলাদা; নিজের মতো। কারো দ্বারা প্রভাবিত হবার মতো দুর্বল-চরিত্র ব্যক্তি নয় তারাপদ; মনের দিক থেকে সে সম্পূর্ণভাবে নির্লোভ-নির্লিপ্ত ছিল- মুক্তি; আত্মজড়তা থেকে মুক্তিই ছিল তার একমাত্র উপাসনা। গল্পকার জানাচ্ছেন- ‘সম্মুখাভিমুখে চলিয়া যাওয়াই তাহার একমাত্র কার্য।’ তারাপদ’র কোনো প্রতিযোগী নেই; সে নিজকেই অতিক্রম করে ক্রমাগত। প্রকৃতির মতো চঞ্চলতা ও উদাসীনতা তার আছে; আর আছে সকলকে জয় করবার অসীম সামর্থ্য। জমিদারবাবুর স্ত্রী, পরিবারের প্রায় সব সদস্য এবং গ্রামবাসীদের মন জয় করতে তাকে বিশেষ পরিশ্রম করতে হয় না; স্বভাববলেই তা সে পেয়ে যায়। কেবল জমিদারের একমাত্র কন্যা বালিকা চারুশশীকে আয়ত্ব করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়লো; অবশ্য এর পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল চারুশশীর ঈর্ষা আর তারাপদও বিশেষভাবে এই মেয়েটিকে জয় করতে চেয়েছিল কবলে মনে হয় না। কেননা, মানুষকে, সমাজকে, পরিবারকে জয় করতে শেখেনি তারাপদ- সে জেনেছে এইসব ষড়যন্ত্রবন্ধন থেকে মুক্তির অনুভূতি। এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের অভিব্যক্তি এরকম- ‘স্নেহ-প্রেম-বন্ধুত্বের ষড়যন্ত্রবন্ধন তাহাকে চারিদিক হইতে সম্পূর্ণরূপে ঘিরিবার পূর্বেই সমস- গ্রামের হৃদয়খানি চুরি করিয়া একদা বর্ষার মেঘান্ধকার রাত্রে এই ব্রাক্ষ্মণবালক আসক্তিবিহীন উদাসীন জননী বিশ্বপৃথিবীর নিকট চলিয়া গিয়াছে।’ চারুশশীর সাথে তার বিয়ের আয়োজন সম্পন্ন করতে চেয়েছিল মতিলাল বাবু ও তারাপদ’র পরিবারের সদস্যরা; সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনে আটকে ফেলে তাকে জাগতিক অর্থে সংসারী বানাতে চেয়েছিল সবাই মিলে। কিন্তু সে তো রবীন্দ্রনাথের মুক্তি-অন্বেষার প্রতীক-প্রতিনিধি; তাকে তো বেঁধে রাখা যায় না। তাই, তারাপদ বেরিয়ে পড়লো সীমিত পরিসরের পরিবার-সমাজকে পিছনে ফেলে বৃহৎ পৃথিবীর অসীম আলোকের সন্ধানে।
‘অতিথি’ নামক এই গল্পে আমরা পাই চার”শশীর শিশুসুলভ ও নারীসুলভ উৎসাহ-আকর্ষণ-ঈর্ষা, অন্নপূর্ণার মাতৃ্লেহ ও বাঙালির চিরন্তন অতিথিপরায়ণতা, চারুশশীর সখি সোনামণির পাঁচ বয়সে বিধাব হবার ঘটনার অন্তরালে সমাজ-পরিপ্রেক্ষিতের এক বিশেষ সত্য আর মনোবাস্তবতার কিছু প্রাসঙ্গিক ছবি। চারুশশী সম্বন্ধে লেখক বলছেন- ‘আন্তরিক আগ্রহ কাহাকেও জানিতে দিত না, এবং এই অশিক্ষাপটু অভিনেত্রী পশমের গলাবন্ধ বোনা একমনে অভ্যাস করিতে করিতে মাঝে মাঝে যেন অত্যন্ত উপেক্ষাভরে কটাক্ষে তারাপদর সন্তরণলীলা দেখিয়া লইত।’ সোনামণির সাথে তারাপদ’র বন্ধুত্বকে সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি চারুশশী; সে চেয়েছে ছেলেটি কেবল তার একার হবে। ‘যে তারাপদকে চারু মনে মনে বিদ্বেষশরে জর্জর করিতে চেষ্টা করিয়াছে, তাহারই একাধিকার লইয়া এমন প্রবল উদ্‌বেগ কেন!- বুঝিবে কাহার সাধ্য।’
‘অতিথি’ সামান্য ও সল্পপরিসরের বিপরীতে বিরাট ও অমিতপরিসরে উত্তরণের গল্প; পরিবার ও সমাজ কাঠামোর গণ্ডির বাইরে পৃথিবীর উদারতা ও মানবতা প্রতিষ্ঠার গল্প। রবীন্দ্রনাথ এক বিশেষ সত্য ও উপলব্ধিজ্ঞানকে এখানে আমাদের সামনে হাজির করেছেন সমাজ ও মানুষের পরিচিত পাটাতনে রেখে।

শেয়ার করুন