ধ্বংসস্তূপে বিস্ময়কন্যার ১৭ দিন

0
57
Print Friendly, PDF & Email

সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের মেজর মোয়াজ্জেম সঙ্গী সার্জেন্ট রাজ্জাককে নিয়ে গর্তের পানি সরিয়ে ধ্বংসস্তূপ সরানোর পরিকল্পনা করছিলেন। হঠাৎ দেখতে পান, ছোট একটি ফুটো দিয়ে একটি স্টিলের রুপালি রঙের সরু পাইপ নড়ছে। ফুটোর মুখের সুরকি, বালু আর জঞ্জাল একটু সরাতেই দুটি চোখ জ্বলজ্বল করতে দেখে আঁতকে ওঠেন তাঁরা। একটি মেয়ে বাঁচার আকুতি জানাচ্ছেন। জিজ্ঞেস করে জানলেন, তাঁর নাম রেশমা।

১৭ দিন, খুব নির্দিষ্ট করে বললে ৩৯১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট পর গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটায় জীবিত বেরিয়ে এলেন এই রেশমা। তখন দুই চোখ মেলে পৃথিবীর আলো দেখছিলেন গোলাপি রঙের থ্রি পিসে মোড়ানো ক্লান্ত রেশমা। জীবন্ত কবরবাসের দীর্ঘ অভিজ্ঞতার পর তরুণী রেশমা বললেন, ‘শরীরে অনেক ব্যথা। আমি খুব কষ্ট করেছি। আমি এখন ভালো আছি। আমার খুব ভালো লাগছে।’
রেশমাকে উদ্ধারের ঘটনাটি মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে। বিশ্বের প্রায় সব সংবাদ সংস্থার মূল সংবাদই ছিল ১৭ দিন পর উদ্ধার হওয়া রেশমা। সারা দেশের মানুষেরও চোখ ছিল টেলিভিশনের পর্দার দিকে। প্রধানমন্ত্রী রেশমাকে দেখতে ছুটে যান সাভারে, সিএমএইচে। উদ্ধারকর্মীদের অভিনন্দন জানান রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া।
সাভার সিএমএইচের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেন রেশমা। তাঁর ক্ষীণ ও ক্লান্ত দেহটা তখন আইসিইউর নরম বিছানায় মিশে গেছে। কেমন ছিলেন জানতে চাইলে ক্ষীণ কণ্ঠে রেশমা বলেন, ‘আমি পানি খেয়েছি। বোতলের পানি খেয়েছি। কয় বোতল জানি না।’ আর কিছু কি খেয়েছেন? রেশমা বলে চলেন, ‘ওইখানে কার্টন ছিল। কার্টন ছিঁড়েছি। আমি খেয়েছি। জানি না, কী খেয়েছি।’
নিজের উপস্থিতির সংকেত দেওয়ার ব্যাপারে রেশমা বলেন, ‘আলো দেইখা অনেকক্ষণ ধইরা ডাকতে থাকি। কেউ শুনে না। পরে একটা লাঠি ভাইঙ্গা দেয়ালে আঘাত করতে থাকি। তখন লোকজন শুনছে।’
ঘটনার কথা বর্ণনা করে রেশমা বলেন, ‘এর আগে বিল্ডিংয়ে ভাঙা ছিল। ছুটি দেওয়ার পর লাঞ্চের টাইমে আবারও যাই। স্যাররা বলে পরের দিন আসতে। পরের দিন সকালে গেলে স্যাররা বলে, কোনো সমস্যা নাই। যার যার মতো কাজ করো।’
রেশমা বলেন, ‘কিছুক্ষণ পর দেখি, বিল্ডিংয়ের কোনায় কোনায় ভাঙা। সবাই চিৎকার দিয়া ‘‘বাইর হ’’ ‘‘বাইর হ’’ কইতে কইতেই বিল্ডিংটা ভাইঙ্গা পড়লো। কখন পড়লো বুঝতেও পারি নাই। হেরপর অন্ধকার, শুধু অন্ধকার। আল্লাহরে বলছি, আল্লাহ, তুমি আমারে এখান থেইকা বাইর করো। আল্লাহ আমারে বাঁচাইছে।’
রেশমার এই অবিশ্বাস্য বেঁচে থাকার বিষয়ে সাভার সিএমএইচের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক লে. কর্নেল হাসান মুর্শেদ বলেন, ‘ওর বেঁচে থাকার মূল অনুষঙ্গ পানি। পানি খেয়ে ১৫ দিন বেঁচে থাকা যায়। এর বাইরেও তিনি কিছু খেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু কী খেয়েছেন, বলতে পারছেন না। মানুষের শরীরে যে ফ্যাট থাকে, তা পুড়িয়েও বেশ কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারে।’
রেশমার সঙ্গে কথা বলার সময় দেখা গেছে, তাঁর মাথার চুল খাবলা খাবলা করে কাটা। মাথার তালু বরাবর চুলগুলো চামড়ার কাছাকাছি কাটা। চার পাশের চুলও ছোট করে কাটা, তবে অসমান।
সিএমএইচের চিকিৎসকেরা জানান, রেশমা তাঁদের জানিয়েছেন, গরমের কারণে অস্বস্তি লাগছিল। কাঁচি দিয়ে চুল তিনি নিজেই কেটেছেন। পাশেই কাঁচি পেয়েছেন। কথা বলার একপর্যায়ে রেশমা এ-ও জানিয়েছেন, তিনি তিনতলায় কাজ করতেন। একতলা নিচে নামতে পেরেছিলেন। ধসে পড়ার আগেই নিচে নেমেছিলেন, নাকি পরে নেমেছেন, তা বলতে পারছেন না।
এক ঘণ্টার উদ্ধার অভিযান: ধসে পড়া ভবনের মাঝামাঝিও না। সামনের দিকেই কিছুটা উত্তর পাশ ঘেঁষে বুলডোজার এবং হাইড্রোলিক হ্যামার দিয়ে বড় একটি গর্ত করেছেন সেনাবাহিনীর উদ্ধারকর্মীরা। গর্তটা প্রায় ধসে পড়া ভবনের বেজমেন্টে গিয়ে লেগেছে। গর্তের দিকেই ধ্বংসস্তূপ রয়েছে। তবে পূর্ব পাশের কিছু স্ল্যাব অক্ষত। গর্তের মধ্যে পানি উঠে গেছে বলে উদ্ধারকাজ চালানো যাচ্ছিল না। এই স্ল্যাবগুলোর পাশেই হাইড্রোলিক হ্যামার রাখা। উদ্দেশ্য, পূর্ব দিক থেকে টেনে স্ল্যাবগুলো সরানো হবে। এ অবস্থায় গতকাল বেলা সোয়া তিনটার দিকে সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের সদস্য মেজর মোয়াজ্জেম সঙ্গী সার্জেন্ট রাজ্জাককে নিয়ে গর্তের পানি সরিয়ে কীভাবে ধ্বংসস্তূপ সরানো যায়, সে পরিকল্পনা করতে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তাঁর চোখ পড়ে ছোট একটা ফুটো দিয়ে নড়তে থাকা স্টিলের রুপালি রঙের সরু একটি পাইপের দিকে। এক হাতের চেয়ে একটু লম্বা হবে পাইপটি। তখনই দাঁড়িয়ে যান মোয়াজ্জেম ও রাজ্জাক। ফুটোর মুখের সুরকি, বালু আর জঞ্জাল একটু সরাতেই জ্বলজ্বলে দুটি চোখ দেখে আঁতকে ওঠেন। কানে আসে একটি মেয়ের বাঁচার আকুতি! জিজ্ঞেস করে জানতে পান, তাঁর নাম রেশমা। তখনই মোয়াজ্জেম চিৎকার করে অন্য সঙ্গীদের ডাক দেন। তৎক্ষণাৎ শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। প্রথমেই মেয়েটিকে ফুটো দিয়ে জুস, পানি ও বিস্কুট দেওয়া হয়।
গর্তের মধ্যে দাঁড়ালে ফুটোর মুখটি বুক বরাবর হয়। বেলা সাড়ে তিনটার দিকে ফুটোর মুখ কেটে বড় করে প্রবেশ করেন মোয়াজ্জেম ও তাঁর আরেক সঙ্গী। এই উদ্ধার অভিযানে শুধু কাটার, ছোট হাতুড়ি ও ছেনি ব্যবহার করা হয়। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর অ্যাম্বুলেন্স এনে দাঁড় করানো হয় পাশে। একপর্যায়ে রশি চাওয়া হয় গর্তের ভেতর থেকে, যাতে রেশমাকে টেনে বের করা যায়। একে একে হাজির করা হয় টুকটাক যন্ত্রপাতি। ফ্যান দিয়ে বাতাস দেওয়ারও ব্যবস্থা করা হয়। বিকেল চারটার দিকে গর্তের মুখ থেকে বলা হয়, সবাই যেন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন রেশমাকে জীবিত উদ্ধার করার জন্য।
ততক্ষণে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মানুষের ঢল। সবাই হাত তুলে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা শুরু করেন। অনেককে ফুঁপিয়ে কাঁদতে দেখা যায় সে সময়।
বিকেল সাড়ে চারটায় এল সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। রেশমাকে ভেতর থেকে জীবিত উদ্ধার করে নিয়ে আসেন উদ্ধারকর্মীরা। এ সময় রেশমার দুই চোখ খোলা ছিল। এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিলেন। ততক্ষণে হর্ষধ্বনি আর উল্লাসে মেতে উঠেছেন উপস্থিত লোকজন। আনন্দে কেঁদে ফেলেন অনেকে। উদ্ধারকর্মী মোয়াজ্জেমকে আবেগে জড়িয়ে ধরেন অন্য কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে ১৭ দিনের মৃত্যুপুরীর ধকল সয়ে আসা রেশমাকে যেন আর কোনো ধকল সামলাতে না হয়, সে জন্য দ্রুত অ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠিয়ে দেওয়া হয় সাভার সিএমএইচে।
উদ্ধার শেষে মেজর মোয়াজ্জেম বলেন, ‘এটা অবিশ্বাস্য, অকল্পনীয়। এটা আল্লাহর বিশেষ ব্যবস্থা।’ তিনি বলেন, রেশমা প্রথমে দেখেই তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। এই অভিযানে অক্সিজেন ব্যবহার করা হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর আগে শাহীনাকে উদ্ধার করতে গিয়ে গ্যাস থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। এ জন্যই অক্সিজেন ভেতরে দেননি।’ তিনি জানান, রেশমা যে স্থানটিতে আটকে ছিলেন, সেখানকার চারদিকে কলাম আর বিম। রেশমা দাঁড়ানোর মতো করে হাঁটু গেড়ে ছিলেন। ভেতরে বেশ ভালো জায়গা ছিল।
এরপর বিকেল পৌনে পাঁচটার দিকে মোয়াজ্জেম আবারও ওই গর্ত দিয়ে প্রবেশ করেন জীবিত আর কেউ আছেন কি না, দেখতে। ওই গর্তে পরে প্রবেশ করেছিল কিশোর স্বেচ্ছাসেবী তুষার ও রিয়াজ। তুষার পুরান ঢাকার প্রভাতী আইডিয়াল স্কুলের ছাত্র। আর রিয়াজ পরিবহনশ্রমিক। তারা জানায়, দাঁড়ানো না গেলেও হাঁটু গেড়ে বসার মতো বেশ জায়গা আছে সেখানে।
রেশমার পরিবার: ভবনধসের পর থেকে রেশমার বোন আসমা ও তাঁদের মা জোবেদা খাতুন সাভার অধরচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠকে ঠিকানা বানিয়ে অবস্থান নিয়েছিলেন। কথা হয় আসমার সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আমরা ধরেই নিয়েছিলাম, বোন মারা গেছে। লাশের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। মা এখনো অধরচন্দ্র বিদ্যালয়ের মাঠে আছে। শুধু কাঁদছে।’ আসমা জানান, সিএমএইচে তিনি রেশমার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁকে দেখে ‘বোন’ বলে কেঁদে দিয়েছেন। আর কিছু বলতে পারেননি রেশমা।
আসমা জানান, রেশমা ধসে পড়া রানা প্লাজায় কাজ নেন গত ২ এপ্রিল। ২২ দিন কাজ করার পরই ভবন ধসে পড়ে। সিএমএইচের চিকিৎসকেরাও জানিয়েছেন, রেশমা সাভার বাজার রোডে থাকেন বলে জানিয়েছেন। বাড়িওয়ালার মুঠোফোন নম্বরও বলতে পেরেছেন। বাড়িওয়ালার সঙ্গে চিকিৎসক কথাও বলেছেন।
এর আগের বেঁচে থাকার গল্প: এর আগে ১০০ ঘণ্টা পর জীবিত উদ্ধার করা হয়েছিল কে এ এম সাদিক নামের এক ব্যক্তিকে। এ ছাড়া ১৩০ ঘণ্টা ধ্বংসস্তূপে বেঁচে ছিলেন শাহীনা নামের আরেক পোশাককর্মী। কিন্তু তাঁকে উদ্ধার করতে কাটার মেশিনের যে আগুনের স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়, তা থেকে আগুন লেগে শাহীনা মারা যান। শাহীনার মৃতদেহ ২৯ এপ্রিল উদ্ধার করা হয়। শাহীনাকে উদ্ধারে ব্যর্থ হওয়ার পরই ২৮ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়। এরপর আর কাউকে জীবিত উদ্ধার করা যায়নি।

শেয়ার করুন