জামায়াত নেতা ইউসুফ গ্রেপ্তার

0
43
Print Friendly, PDF & Email

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির আবুল কালাম মোহাম্মদ ইউসুফকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৷ রোববার তাকে গ্রেপ্তারের আদেশ দেন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবিরের নেতৃত্বে ৩ সদস্যের ট্রাইবু্যনাল৷
এ আদেশের পর দুপুরে তাকে ধানমণ্ডির ১০/এ রোডের ৩৭/এ নম্বর বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়৷ ইউসুফ ওই বাড়িতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন৷
র্যাব-২-এর অপারেশন অফিসার এএসপি রায়হান জানান, একেএম ইউসুফকে গ্রেপ্তার করে শেরেবাংলা নগরে র্যাব-২-এর কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে৷ এখান থেকে তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হবে৷ এরপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবু্যনালে নেওয়া হবে৷
গত বুধবার একেএম ইউসুফকে গ্রেপ্তারের আবেদন করেছিল প্রসিকিউশন৷ এছাড়া তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমালচার্জ) ট্রাইবু্যনালে দাখিল করা হয়৷ বুধবার ট্রাইবু্যনালের রেজিস্ট্রার অফিস বরাবর প্রসিকিউটর হৃষিকেষ ১৫টি অভিযোগের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করেন৷ একই সঙ্গে একেএম ইউসুফ (৮৪) গ্রেপ্তারের আবেদনও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন এ প্রসিকিউটর৷
গত ২২ এপ্রিল জামায়াতের এ নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত চূড়ান্ত করে প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটর বরবার প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত সংস্থা৷
একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে একাত্তর সালে ৭০০ লোক গণহত্যা, আটজনকে হত্যা, ২০০ হিন্দু লোককে জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করাসহ ৩০০ বাড়ি এবং ৪০০ দোকান লুন্ঠন ও অগি্নসংযোগ করার অপরাধে অভিযুক্ত করা হয়েছে৷
মাওলানা একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে (ফরমাল চার্জে) মূল ৮৫ পৃষ্ঠার ১৫ টি অভিযোগের ভিত্তিতে ফরমাল চার্জ দাখিল করা হয়েছে বলে জানান তিনি৷ তদন্ত সূত্রে জানা যায়, একেএম ইউসুফের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ২২ জানুয়ারি তদন্ত শুরু করে গত ২১ এপ্রিল শেষ করে৷
তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ছাত্র জীবনে একেএম ইউসুফ জমিয়তে তালাবি-ই-আরাবিয়ার একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন৷ ১৯৫২ সালে তিনি জামায়াতে যোগ দেন এবং ১৯৫৭ সালে খুলনা বিভাগের প্রধান হন৷’
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জামায়াতে ইসলামীর সহকারি আমির হিসেবে নিযুক্ত হন৷ ওই বছরেই তিনি খুলনা জেলার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন৷ তিনিই রাজাকার বাহিনী গড়ে তুলে৷’
তিনি বলেন, ‘৭১ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রী পরিষদে রাজস্ব, পূর্ত, বিদ্যুত্‍ ও সেচ মন্ত্রী হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন৷ এর আগে গত ৮ মে ট্রাইবম্ন্যনালের রেজিস্ট্রারের কাছে এ কে এম ইউসুফ নামে বেশি পরিচিত এই জামায়াত নেতার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দেন প্রসিকউটর হায়দার আলী৷ তার বিরুদ্ধে হত্যা, গণহত্যা, ধর্মান্তরকরণ, বাড়ি-ঘর ও দোকানে লুটপাট, অগি্নসংযোগের ১৫টি মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগে৷
মুক্তিযুদ্ধকালে খুলনায় রাজাকার বাহিনী প্রতিষ্ঠা, ডা. মালেক মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে এবং পাকিস্তানি বাহিনীর সকল সহযোগী বাহিনীকে নেতৃত্ব দানের কারণে তিনি অভিযুক্ত হয়েছেন সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (উধর্্বতন নেতৃত্ব) দায়েও৷ ইউসুফের বিরুদ্ধে জব্দ তালিকার ৬ জন সাক্ষীসহ ৭১ জন সাক্ষী করা হয়েছে৷ ইউসুফের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ

আনুষ্ঠানিক অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এ কে এম ইউসুফের নেতৃত্বে প্রথম রাজাকার বাহিনী গঠন করা হয়৷ তার নেতৃত্বে বাগেরহাট জেলার কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা, রামপাল ও সদর উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় হত্যা, গণহত্যা, ধর্মান্তরকরণ, অগি্নসংযোগ, বাড়িঘর লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানো হয়৷
জানা গেছে, মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা, শান্তি কমিটির খুলনা জেলার চেয়ারম্যান এবং মালেক মন্ত্রিসভার সদস্য ইউসুফের বিরুদ্ধে খুলনায় গণহত্যা, হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, অগি্নসংযোগ ও লুটপাটে নেতৃত্বে দেওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার দায়িত্ব পালনেরও অভিযোগ আনা হয়েছে৷ ডা. মালেক মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনি পাকিস্তান হানাদার বাহিনীকে গণহত্যা ও যুদ্ধপরাধে সক্রিয় সহযোগিতা দেন৷ এছাড়া খুলনায় শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীসহ পাকিস্তানি বাহিনীর সকল সহযোগী বাহিনীর নেতৃত্ব দেন তিনি৷ এ কারণে তার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (উধর্্বতন নেতৃত্ব) অভিযোগও আনা হয়েছে৷
অভিযোগে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দালালি করার দায়ে মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে এ কে এম ইউসুফের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল৷
অভিযোগে বলা হয়েছে, ইউসুফের বাড়ি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার রাজৈর গ্রামে৷ তিনি ওই গ্রামের মুন্সি আজিম উদ্দিনের পুত্র্#২৫৫১; পাকিস্তানি আমলে খুলনা শহরের টুটপাড়ায় দিলখোলা রোডে এসে বসবাস শুরু করেন্#২৫৫১; ছাত্র জীবনে তিনি জমিয়তে তালাব-ই-আরাবিয়ার একজন সক্রিয় সদস্য ছিলেন৷ ১৯৫২ সালে জামায়াতে যোগ দেন৷ ১৯৫৭ সালে খুলনা বিভাগের আমির ছিলেন৷ ১৯৬২ সালে জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন৷ ১৯৬৯ সালে জামায়াতের প্রাদেশিক জয়েন্ট সেক্রেটারির দায়িত্ব পান৷ ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের ডেপুটি আমির হন৷ ১৯৭১ সালে বৃহত্তর খুলনার শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হন এবং সশস্ত্র রাজাকার বাহিনী গঠন করেন৷
জামায়াতের বর্তমান সিনিয়র নায়েবে আমির মাওলানা এ কে এম ইউসুফ একজন কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী৷ একাত্তরের এপ্রিলে ঢাকায় গঠনের পর পরই কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির নির্দেশে খুলনা জেলা শান্তি কমিটি গঠন করেন ইউসুফ৷ তিনি নিজেই এ কমিটির চেয়ারম্যান হন৷ খুলনা জেলা শান্তি কমিটির আওতায় ছিল তত্‍কালীন খুলনা সদর, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট মহাকুমা৷ পাকিস্তান অবজারভারসহ সে সময়কার পত্র-পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশিত হয়৷
এরপর প্রত্যেক মহাকুমা, থানা ও ইউনিয়ন পর্যায়েও জামায়াত, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য স্বাধীনতাবিরোধী দলগুলোকে নিয়ে শান্তি কমিটি গঠন করেন ইউসুফ৷
এ কে এম ইউসুফ রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা৷ রাজাকার নামটিও তার দেওয়া৷ একাত্তরে আনসার বিলুপ্ত করে দিয়ে তিনিই প্রথম খুলনায় প্রতিষ্ঠা করেন রাজাকার বাহিনী৷ ৯৬ জন জামায়াত কর্মীকে নিয়ে খুলনার খান জাহান আলী সড়কের একটি আনসার ক্যাম্পে ১৩ মে প্রতিষ্ঠিত হয় এ বাহিনী৷ জামায়াতের দলীয় মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামসহ সে সময়ের সব সংবাদপত্রে এ খবর ছাপা হয়৷
অভিযোগে বলা হয়েছে, ইউসুফের নেতৃত্বে পরিচালিত হতো খুলনার নয়টি প্রধান নির্যাতন সেল৷ রাজাকার বাহিনীর ৯৬ ক্যাডার মুক্তিযুদ্ধকালীন নয় মাস সেসব সেলে পাশবিক নির্যাতন চালিয়েছে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের মানুষদের ওপর৷ সেখান থেকে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হতো শহরের প্রধান চারটি স্থানে৷
খুলনার তত্‍কালীন ভূতের বাড়ি (বর্তমানে আনসার ক্যাম্পের হেড কোয়ার্টার) ছিল তার রাজাকার বাহিনীর হেড কোয়ার্টার এবং প্রধান নির্যাতন সেল৷ আরও দু’টি প্রধান নির্যাতন সেল ও রাজাকার বাহিনীর ক্যাম্প ছিল বর্তমান শিপইয়ার্ড ও খালিশপুরে৷ এছাড়া পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর মূল ক্যাম্প সার্কিট হাউস (ডাক বাংলো) এবং পাকিস্তানি বাহিনীর অপর চারটি ঘাঁটি হেলিপোর্ট, নেভাল বেস, হোটেল শাহিন ও আসিয়ানা হোটেলও হয়ে উঠেছিল এই বাহিনীর নির্যাতন সেল৷ প্রথম তিনটি নির্যাতন সেল পরিচালিত হতো সরাসরি রাজাকার বাহিনীর নেতৃত্বে আর পাকিস্তানি বাহিনীর অবশিষ্ট চারটি ঘাঁটি যৌথভাবে পরিচালিত হতো৷ অন্যদিকে ডাকবাংলোর পাকিস্তানি বাহিনীর সদর দফতরেই ছিল শান্তি কমিটির সদর দফতর্#২৫৫১; সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর অধিনায়ক কর্ণেল শামসের রাজনৈতিক পরামর্শক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করতেন ইউসুফ্#২৫৫১; আর অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডই সংঘটিত হয়েছে গঙ্গামারি, সার্কিট হাউসের পেছনে ফরেস্ট ঘাঁটি, আসিয়ানা হোটেলের সামনে ও স্টেশন রোডসহ কিছু নির্দিষ্ট স্থানে৷
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ইউসুফের কথামতো খালেক মেম্বার ও আদম আলীর মতো আরো কয়েকজন রাজাকার সে সময় মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের পরে আরো অসংখ্য নারী-পুরুষকে হত্যা করেছে এবং নারী ধর্ষণ করেছে৷ রাজাকার বাহিনী গঠনের পর ইউসুফ মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা থেকে বহু লোককে জোর করে ধরে নিয়ে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন৷ যারা রাজি হননি, তাদের মেরে ফেলা হয়েছে৷ অনেকের লাশও পাওয়া যায়নি৷
তাদেরই একজন শহীদ আবদুর রাজ্জাক৷ একাত্তরের আষাঢ় মাসের একদিন রাজাকার খালেক মেম্বার রাজ্জাককে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিতে বলেন৷ রাজ্জাক তা প্রত্যাখ্যান করলে সে মাসের ১১ তারিখ সকালে খালেক মেম্বার ও অপর রাজাকার আদম আলী পুনরায় বাসায় এসে রাজ্জাককে ধরে নিয়ে যান৷
সেদিন সন্ধ্যায় রাজ্জাকের মা গুলজান বিবি জানতে পারেন, তার ছেলেকে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে৷ ছেলেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য মা গুলজান বিবি রাজাকার বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা একেএম ইউসুফের কাছে যান এবং তার ছেলেকে ফিরিয়ে দিতে করজোড়ে অনুরোধ জানান৷ সে সময় ইউসুফের সঙ্গে খালেক মেম্বারও ছিল৷ তারা দু’জনই জানিয়ে দেন, রাজ্জাককে ছাড়ানোর ব্যাপারে কোনো অনুরোধেও কাজ হবে না৷ পরে গুলজান বিবি তার ছেলেকে আর পাননি৷ সন্ধান পাননি লাশেরও৷
একাত্তর সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে পাকিস্তান সরকার জাতীয় পরিষদের আসনগুলো শূন্য ঘোষনা কর্#২ে;৫৫১; ইউসুফ শরণখোলা এলাকা থেকে এম এন এ নির্বাচিত হন৷ এসব এমএনএদের মধ্যে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সমর্থনে গঠিত ডা. মালেকের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় জামায়াতের দু’জন সদস্য ছিলেন৷ তাদের একজন এই ইউসুফ ছিলেন রাজস্ব, পূর্ত, বিদ্যুত্‍ ও সেচ মন্ত্রী৷ অপরজন সাবেক ভারপ্রাপ্ত আমির আব্বাস আলী খান শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন৷ আব্বাস আলী খান বেঁচে নেই৷ মুক্তিযুদ্ধের পর তারা দু’জনসহ ওই মন্ত্রিসভার সব সদস্য গ্রেফতার হন৷
বাংলাদেশ দালাল (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে স্বাধীনতার পর আর সকলের সঙ্গে ইউসুফেরও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়েছিল৷ ১৯৭২ সালের ১৭ ডিসেম্বর পত্র-পত্রিকায় সে সংবাদ ছাপা হয়৷ বাংলার বাণী পত্রিকায় ওই সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘দালাল মন্ত্রী ইউসুফের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড’৷
সংবাদটি থেকে জানা গেছে, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দালালি করার অভিযোগে ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে মালেক মন্ত্রীসভার সদস্য ও রাজনৈতিক নেতাসহ ৩৭ হাজার ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয়েছিল৷ পাঠানো হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে৷ আদালতের রায়ে অন্য অনেকের সঙ্গে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয় একেএম ইউসুফের৷
কিন্তু পরে সরকারের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণার আওতায় ১৯৭৩ সালের ৫ ডিসেম্বর মুক্তি পান ইউসুফ৷
অভিযোগ থেকে আরও জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ২২ সেপ্টেম্বর আব্বাস আলী খান ও মাওলানা ইউসুফসহ মালেক মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্র ও শিক্ষকেরা সংবর্ধনা দেন৷ পরদিন দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় তা নিয়ে যে সংবাদ প্রকাশিত হয় তাতে দেখা যায়, ওই অনুষ্ঠানে ইউসুফ বলেছিলেন, ‘যুব সমাজকে পাকিস্তান সৃষ্টির মূল লক্ষ্য সম্পর্কে অবহিত করা হয়নি বলেই তারা আজ নিজেদের পাকিস্তানি ও মুসলমান পরিচয় দিতে লজ্জা বোধ করে৷’
২৫ সেপ্টেম্বরের সংগ্রামের প্রথম পাতায় তেজগাঁও থানা শান্তি কমিটি মালেক মন্ত্রিসভার সদস্যদের সংবর্ধনা দিয়েছে বলে খবর প্রকাশিত হয়৷ ওই খবরে দেখা যায়, এ কে এম ইউসুফ তার বক্তব্যে বলেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকেই ইসলামের দুশমনরা এর অস্তিত্ব ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র চালিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন পন্থায় তারা এই ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করেছে৷’ মার্চ মাসের ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপকেও ইউসুফ এই ষড়যন্ত্রের পরিণাম বলে উলেস্নখ করেন৷

১৮ অক্টোবর সংগ্রামে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, মালেক মন্ত্রিসভার রাজস্ব মন্ত্রী ইউসুফ বলেন, ‘দেশের সার্বভৌমত্বের ওপর হামলার যেকোনো অপচেষ্টা নস্যাত্‍ করে দেওয়ার জন্য সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের পেছনে আমাদের সাহসী জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকবেন৷’
২৮ নভেম্বর করাচিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলোচনাকালে ইউসুফ বলেছিলেন, ‘রাজাকাররা আমাদের বীর সেনাবাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভারতীয় হামলার মোকাবিলা করছে৷’ তিনি রাজাকারদের হাতে আরও আধুনিক অস্ত্র দেওয়ার দাবি জানান৷ পরদিন ২৯ নভেম্বর দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় এ সংবাদ প্রকাশ হয়৷
এছাড়া ১০ অক্টোবর খুলনার জনসভায়, ২৬ অক্টোবর সিলেটের জনসভায়, ১২ নভেম্বর সাতক্ষীরার রাজাকার শিবির পরিদর্শনকালে এবং বিভিন্ন সময় তার বক্তৃতা-বিবৃতিতে স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে৷ এসব বক্তৃতা-বিবৃতি পরের দিন দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক সংগ্রামসহ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে৷
এ কে এম ইউসুফ খুলনায় রাজাকার বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, নির্যাতন, নারী ধর্ষণ, অগি্নসংযোগ ও লুটপাটে নেতৃত্বে দেওয়ার পাশাপাশি দেশ-বিদেশে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলার দায়িত্বও পালন করেন৷ তদন্ত কার্যক্রম এর আগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত শেষ করে গত ২২ এপ্রিল চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন প্রসিকউশনে জমা দেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা৷ এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে তাকে গ্রেফতারের আবেদন জানানোর জন্য প্রসিকিউশন টিমকে অনুরোধও জানান তদন্ত কর্মকর্তারা৷ একই সঙ্গে প্রসিকিউশনকে তার বিরুদ্ধে সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির (উধর্্বতন নেতৃত্ব) অভিযোগ আনারও অনুরোধ জানান তদন্ত কর্মকর্তারা৷
তদন্ত সংস্থা জানান, এ কে এম ইউসুফের বিরুদ্ধে গত বছরের ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু করে গত ২১ এপ্রিল পর্যন্ত তদন্ত করে ১১১ পৃষ্ঠার চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করেন তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ হেলাল উদ্দিন৷ এর সঙ্গে ৭০ খণ্ডে ২৩৪৬ পৃষ্ঠার ডকুমেন্টস দেওয়া হয়৷
তদন্ত কর্মকর্তা মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, “জামায়াতের সিনিয়র নায়েবে আমির একে এম ইউসুফের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ পাওয়ার পর তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তারা কয়েক দফায় বাগেরহাটের বিভিন্ন এলাকায় সরজমিনে তদন্ত করেন৷ তারা শহীদদের পরিবারের সদস্য, মামলার বাদী ও বিভিন্ন সাক্ষীদের জবানবন্দি করে এবং বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করেছেন৷
উলেস্নখ্য, এর আগে জামায়াতের সাবেক-বর্তমান ৯ শীর্ষ নেতাকে গ্রেফতারের পর তাদের ৪ জনের বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে, বিচার চলছে ২ জনের ও তদন্ত চলছে আরো ৩ জনের বিরুদ্ধে৷ জামায়াতের ১০ম শীর্ষ নেতা হিসেবে যুদ্ধাপরাধের মামলায় অভিযুক্ত করা হচ্ছে ইউসুফকে৷ এছাড়া বিচার শেষ হয়েছে সাবেক এক জামায়াত নেতার, বিচার চলছে বিএনপির সাবেক-বর্তমান দুই নেতার আর তদন্তাধীন রয়েছে আরও ৬ জনের মামলা৷ শেষোক্ত ৯ জনের মধ্যে পলাতক ১ জন আর আটক রয়েছেন ৪ জন৷

শেয়ার করুন