কামারুজ্জামানের ফাঁসি

0
57
Print Friendly, PDF & Email

একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ কামারুজ্জামানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল।

এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে হত্যাকাণ্ডসহ প্রথম চারটি ও সপ্তম অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। পঞ্চম ও ষষ্ঠ অভিযোগ পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবের কারণে প্রমাণিত হয়নি।

বৃহস্পতিবার বেলা সোয়া ১১টার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর এজলাসকক্ষে ২১৫ পৃষ্ঠার রায়ের সংক্ষিপ্তসার (৬২ পৃষ্ঠা) পাঠ শুরু হয়। সকাল ১১টা ৫ মিনিটে কামারুজ্জামানকে এজলাসকক্ষে তোলা হয়। এরপরই এজলাসে বসেন তিনজন বিচারক। চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক প্যানেলের সদস্য শাহিনুর ইসলামের আদালতে এ বিচারকাজ শেষ হয়েছে গত ১৬ এপ্রিল।

বিচারক শাহিনুর ইসলাম রায়ের প্রথম অংশ পড়ে শেষ করেন। তার পর দ্বিতীয় অংশ পড়েন বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া। দুপুর সোয়া ১টার দিকে তৃতীয় অংশ পড়া শুরু করেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। রায়ের মোট ৬৫১টি অনুচ্ছেদ।

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনাল-২-এ নেওয়া হয়। এদিন সকাল সাড়ে ৯টার দিকে তাকে বহনকারী মাইক্রোবাসটি ট্রাইব্যুনালে পৌঁছে। আগের দিন সন্ধ্যার দিকে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের সশস্ত্র বিরোধীতাকারী, মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্ত জামায়াতের এই নেতাকে কড়া নিরাপত্তার মধ্যে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আনা হয়।

জামায়াতের এই গুরুত্বপূর্ণ নেতার রায় ঘোষণা উপলক্ষে ট্রাইব্যুনাল ঘিরে নিরাপত্তা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, বুধবার রায় ঘোষণার এ দিন ধার্য করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। সকাল ১১টায় এ আদেশ দেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল।

এর আগে গত ১৬ এপ্রিল বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হওয়ায় যে কোনো দিন কামারুজ্জামানের মামলার রায় দেওয়ার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) বলে রেখে দেন ট্রাইব্যুনাল।

কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে যতো অভিযোগ
ট্রাইব্যুনাল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন, একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরসহ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা কামারুজ্জামান। শেরপুর ডাকবাংলোয় বসে মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সন্দেহভাজনসহ নিরীহ বাঙালিদের ধরে আনার নির্দেশ দিতেন এবং হত্যা, নির্যাতন চালাতেন তিনি।

এছাড়া শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর গ্রামে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে তার পরিকল্পনা ও পরামর্শে ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই ১৬৪ জন পুরুষকে হত্যা করা হয় এবং ওই গ্রামের প্রায় ১৭০ জন মহিলাকে ধর্ষণ ও নির্যাতন করা হয়। সে ঘটনার পর থেকে সোহাগপুর গ্রাম এখন ‘বিধবাপল্লী’ নামে পরিচিত। এ কারণে সোহাগপুরের বিধবাপল্লীর জন্যও দায়ী কামারুজ্জামান।

সব মিলিয়ে গণহত্যা সংঘটনে ষড়যন্ত্র, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও হত্যা, ব্যাপক নির্যাতনযজ্ঞ, নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মগত ও রাজনৈতিক কারণে ক্রমাগত নির্যাতনের সুপিরিয়র হিসেবে সব অপরাধের একক ও যৌথ দায় কামারুজ্জামানের ওপর বর্তায় বলেও উল্লেখ করেন প্রসিকিউশন।

১. বদিউজ্জামানকে হত্যা
প্রথম অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৯ জুন সকালে কামারুজ্জামানের নেতৃত্বে আলবদররা শেরপুরের ঝিনাইগাতী থানার রামনগর গ্রামের আহম্মেদ মেম্বারের বাড়ি থেকে বদিউজ্জামানকে অপহরণ করে আহম্মেদনগরে পাকিস্তানি সেনাদের ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে সারা রাত নির্যাতন করে পরদিন হত্যা করে লাশ পানিতে ফেলে দেওয়া হয়।

২. অধ্যক্ষ আব্দুল হান্নানকে নির্যাতন
দ্বিতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা শেরপুর কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ আবদুল হান্নানকে প্রায় নগ্ন করে শহরের রাস্তায় হাঁটাতে হাঁটাতে চাবুকপেটা করেন।

৩. সোহাগপুর গণহত্যা
তৃতীয় অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৫ জুলাই আলবদর ও রাজাকাররা পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে শেরপুরের সোহাগপুর গ্রামে নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় এবং নারীদের ধর্ষণ করে। এটি কামারুজ্জামানের পরামর্শে পরিকল্পিতভাবে করা হয়। সেদিন ওই গ্রামে নাম জানা ৪৪ জনসহ ১৬৪ জন পুরুষকে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনার দিন থেকে সোহাগপুর গ্রাম ‘বিধবাপল্লী’ নামে পরিচিত।

৪. গোলাম মোস্তফাকে হত্যা
চতুর্থ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের ২৩ আগস্ট কামারুজ্জামানের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা গোলাম মোস্তফাকে ধরে সুরেন্দ্র মোহন সাহার বাড়িতে স্থাপিত আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে কামারুজামান ও আলবদররা তাকে গুলি করে হত্যা করেন।

৫. লিয়াকত-মুজিবুরকে নির্যাতন ও ১০ জনকে হত্যা
পঞ্চম অভিযোগে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালে রমজান মাসের মাঝামাঝি কামারুজ্জামান ও তার সহযোগীরা শেরপুরের চকবাজার থেকে লিয়াকত আলী ও মুজিবুর রহমানকে অপহরণ করে বাঁথিয়া ভবনের রাজাকার ক্যাম্পে নিয়ে যান। সেখানে তাদের নির্যাতনের পর থানায় চার দিন আটকে রাখা হয়। পরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে ওই দু’জনসহ ১৩ জনকে ঝিনাইগাতীর আহম্মেদনগর সেনা ক্যাম্পে পাঠানো হয়। পরে লিয়াকত, মুজিবুরসহ ৩ জনকে সরিয়ে নিয়ে ১০ জনকে উপজেলা পরিষদের কার্যালয়ের কাছে সারিতে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। কামারুজ্জামান ও তার সহযোগী কামরান সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

৬. টুনু হত্যা
ষষ্ঠ অভিযোগে বলা হয়েছে, একাত্তরের নভেম্বরে কামারুজ্জামানের নির্দেশে আলবদর সদস্যরা টুনু ও জাহাঙ্গীরকে ময়মনসিংহের জেলা পরিষদের ডাকবাংলোতে আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। টুনুকে সেখানে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। জাহাঙ্গীরকে পরে ছেড়ে দেওয়া হয়।

৭. দারাসহ ছয় হত্যা
সপ্তম ও শেষ অভিযোগে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধকালে ২৭ রমজান কামারুজ্জামান আলবদর সদস্যদের নিয়ে ময়মনসিংহের গোলাপজান রোডের টেপা মিয়া ও তার বড় ছেলে জহুরুল ইসলাম দারাকে ধরে জেলা পরিষদের ডাকবাংলোয় আলবদর ক্যাম্পে নিয়ে যান। পরদিন সকালে আলবদররা ওই দু’জনসহ সাতজনকে ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে নিয়ে হাত বেঁধে সারিতে দাঁড় করান। প্রথমে টেপা মিয়াকে বেয়নেট দিয়ে খোঁচাতে গেলে তিনি নদীতে লাফ দেন। আলবদররা গুলি করলে তার পায়ে লাগে। তবে তিনি পালাতে সক্ষম হন। কিন্তু অন্য ছয়জনকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়।

আসামিপক্ষের পুনর্বিচারের আবেদন খারিজ
গত ৩ জানুয়ারি শুনানি শেষে কামারুজ্জামানের মামলা পুনর্বিচারে আসামিপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ২ জানুয়ারি মামলাটির পুনর্বিচারের আবেদন জানান কামারুজ্জামানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট তাজুল ইসলাম। ৩ জানুয়ারি আবেদনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন কামারুজ্জামানের আইনজীবী ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী। বিপক্ষে শুনানি করেন রাষ্ট্রপক্ষের প্রসিকিউটর এ কে এম সাইফুল ইসলাম।

আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ বেলজিয়ামের ব্রাসেলসপ্রবাসী বাংলাদেশি আহমেদ জিয়াউদ্দিনের সঙ্গে ট্রাইব্যুনাল-১ এর পদত্যাগী চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হকের স্কাইপি কথোপকথনের সূত্র ধরে এ আবেদন করে আসামিপক্ষ।

ওই স্কাইপি কথোপকথনের সূত্র ধরে ট্রাইব্যুনাল-১ এ জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযম, বর্তমান আমির মতিউর রহমান নিজামী ও নায়েবে আমির দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী এবং ট্রাইব্যুনাল-২ এ জামায়াতের অপর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে মামলা ৪টিরও পুনরায় শুরু করার আবেদন গত ৩ ও ৭ জানুয়ারি খারিজ করে দেন দু’টি ট্রাইব্যুনাল।

১০ জানুয়ারি এসব খারিজ আদেশের বিরুদ্ধে আসামিপক্ষ রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদন করেন। ১৫-১৬ জানুয়ারি শুনানি শেষে ২১ জানুয়ারি সেসব আবেদনও ট্রাইব্যুনাল খারিজ করে দেওয়ায় মামলাগুলোর বিচারিক কার্যক্রমের সকল প্রতিবন্ধকতা দূর হয়েছে।

অন্যদিকে একই ঘটনার সূত্র ধরে ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক পদত্যাগ করায় ট্রাইব্যুনাল-১ এর পাশাপাশি পুনর্গঠিত হয় দ্বিতীয় ট্রাইব্যুনালও। ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর প্রথম ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন আর তার স্থলাভিষিক্ত হন এ ট্রাইব্যুনালেরই বিচারক প্যানেলের সদস্য বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

শেয়ার করুন