কী নামে ডাকি তাঁদের

0
63
Print Friendly, PDF & Email

তাঁরা কেউ কাউকে চেনেন নাজীবনের ঝুঁকি নিয়ে ধসে পড়া ভবনের ভেতর ঢুকে পরিচয়পরস্পরের নামও জানা নেইনাওয়া-খাওয়া ভুলে গত বুধবার থেকেই ভবনের ভেতর ঢুকে উদ্ধার করেন জীবিত-মৃত শ খানেক মানুষকেএর মধ্যে চিকিসকদের পরামর্শ নিয়ে ছুরি আর হ্যাক্সো ব্লেড চালিয়ে পা কেটে চারজনকে, হাত কেটে একজনকে জীবিত বের করে এনেছেন তাঁরা
দীর্ঘ পরিশ্রম আর ভবনের ভেতরের গুমোট পরিবেশে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁদের চারজনকে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে আনা হয় সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেহাসপাতালে আসার পর চারজন পরস্পরের নাম জানতে পারেনআর তখনই জানা যায়, এই কয়েকজন যুবকের জীবন বাজি রেখে স্বেচ্ছায় উদ্ধারকর্মী হওয়ার এক অসামান্য গল্প
এই চারজন হলেন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি রুবেল, স্নাতক শ্রেণীর ছাত্র আবির হোসেন, পোশাকসামগ্রীর ব্যবসায়ী মো. হাবিব ও ব্যবসায়ী কাওসার হীরাদুই দিনের এই উদ্ধারকাজে সঙ্গী বাকি তিনজনের নাম জানাতে পারেননি এই চারজননাম জানার ফুরসতই তাঁরা পাননি
শুধু এই সাতজন নন, বুধবার থেকেই শত শত সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে চিড়েচেপ্টা হয়ে যাওয়া নয়তলা ভবনের ভেতর ঢুকে ও বাইরে থেকে উদ্ধারকাজ করে গেছেনতাঁদের সঙ্গে ভবনের ভেতরে-বাইরে কাজ করে যাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরাস্থানীয় মানুষই ভবনের ভেতর থেকে উদ্ধার করছেন, অ্যাম্বুলেন্সে হাসপাতালে বা লাশ রাখার স্থানে নিচ্ছেন, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিড় সামলাচ্ছেন, অ্যাম্বুলেন্স আর ওষুধ নিয়ে আসা যানবাহনের দ্রুত চলাচলের রাস্তা করে দিচ্ছেন, রক্ত দিচ্ছেনএ এক অভূতপূর্ব সহমর্মিতার উপাখ্যানতাঁরাই স্বজনের খোঁজে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা মানুষকে খাবার আর পানি দিচ্ছেন, হাসপাতাল আর লাশ রাখার জায়গা চিনিয়ে দিচ্ছেন, সান্ত্বনা আর পরামর্শ দিচ্ছেনরাজধানী থেকে মানুষ ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে ওষুধ, খাবার আর পানি নিয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাচ্ছেন
ওঁরা সাতজন: স্বেচ্ছায় উদ্ধারকর্মী হয়ে পড়া সাতজনের দলটির একজন বৈদ্যুতিক মিস্ত্রি মো. রুবেলের বড় বোন রিমা ও ভগ্নিপতি ফরিদ ভবনের চারতলায় ফ্যান্টম ট্যাক কারখানায় কাজ করতেনভবনধসের পর ফরিদ বের হতে পারলেও রিমাকে লাশ হতে হয়েছেরিমার লাশটা আটকে রয়েছে একটা বিমের নিচেরুবেল বোনের মৃত মুখটা দেখতে পারলেও বোনকে উদ্ধার করতে পারেননিবোনকে উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয়েও থেমে যাননি তিনিঅন্যদের উদ্ধারে ঝুঁকিপূর্ণ এক মরিয়া লড়াইয়ে নেমেছেন সর্বশক্তি দিয়ে
স্নাতকের ছাত্র আবিরের বাসা ঢাকার আজিমপুরেসাভারে ভবনধসের খবর পেয়ে তিনি সেখানে যানএকপর্যায়ে নিজে থেকেই উদ্ধারকাজে জড়িয়ে পড়েনতিনি জানান, বুধবার বেলা একটার দিকে চেপে থাকা দুই ছাদের ফোকর দিয়ে কোনোরকমে হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢোকেন তিনিসেখানে গিয়ে দেখেন আরও ছয়জন কাজ করছেনআবিরের দাবি, তাঁরা অন্তত দেড় শ জনকে সেখান থেকে বের করেছেনএর মধ্যে কয়েকজন ছিলেন মৃত
আবির বলেন, বুধবার ভবনের ভেতরে ঢোকার পর তাঁরা কয়েকজনকে টেনে বের করেনবিভিন্ন তলায় আটকে পড়া ব্যক্তিরা তখন চিকার করছিলেনতাঁরা সেই শব্দ শনাক্ত করে করে সামান্য হাতুড়ি-ছেনি ব্যবহার করে দেয়াল ভেঙে কয়েকজনকে উদ্ধার করে আনেনকিন্তু ভবনটি এমনভাবে ধসেছে যে দুটি ছাদের মাঝে কেবল শুয়ে, হামাগুড়ি দিয়ে অল্প জায়গায় চলা যায়কিন্তু দীর্ঘ সময় শুয়ে শুয়ে হাতুড়ি-ছেনি দিয়ে কাজ করা যাচ্ছিল নাভেতরে যেমন প্রচণ্ড গরম, তেমন নিকষ অন্ধকারবুকভরে শ্বাসও নেওয়া যায় নাঅল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে প্রাণ
এই উদ্ধারকারীরা জানান, গতকাল সকাল থেকে মৃতদেহগুলো থেকে গন্ধ ছড়ানো শুরু হয়েছেসেটাও পরিবেশ ভারী করে তুলছেবারবার অক্সিজেন সরবরাহের জন্য বললেও কোনো কাজ হয়নি
কীভাবে এই পরিবেশে কাজ করেছেন, প্রশ্ন করলে কাওসার হীরা বলেন, ‘দুই ছাদের মাঝের সরু জায়গায় শুয়ে পড়ে কেউ আছেনবলে চিকার করিকোনো প্রান্ত থেকে সাড়া মিললে সেখানে পৌঁছানোর চেষ্টা করিবা বাইরে থাকা উদ্ধারকর্মীদের বিষয়টি জানাইতখন ভেতর থেকে ফোকর করে ও বাইরে থেকে দেয়াল ভেঙে উদ্ধার করা হয় তাঁদের
আরেকজন স্বনিয়োজিত উদ্ধারকর্মী হাবিব ওই এলাকায় থাকেনতিনি বলেন, গতকাল তাঁরা একজনের ওপর আরেকজন করে পড়ে থাকা তিনজন নারীকে ভবনের এক অংশে খুঁজে পানতিনজনের একজন জীবিত ছিলেনপাখি নামের ওই মেয়েটির একটি পা ভবনের বিমের নিচে চাপা ছিলপরে হাঁটুর ওপর থেকে পা কেটে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন তাঁরাকারণ, ছাড়া তাঁকে আর বাঁচানোর কোনো উপায় ছিল নাআরেকজন পুরুষকর্মীর গোড়ালি কেটে পা মুক্ত করে বের করে আনেন তাঁরা
হাবিব আর রুবেল বলেন, হাত-পা চাপা পড়ে আটকে থাকা কাউকে পেলে প্রথমে তাঁরা বাইরে অপেক্ষায় থাকা চিকিসকদের বিষয়টি জানানচিকিসকেরাই আটকে পড়া অঙ্গ কেটে তাঁদের জীবিত উদ্ধারের সিদ্ধান্ত দেনতবে এর জন্য উদ্ধারকারী যুবকদের চেতনানাশক ইনজেকশন প্রয়োগের কৌশল শিখিয়ে দেন চিকিসকেরাপাখি নামের মেয়েটিকে উদ্ধারের ক্ষেত্রে তাঁর শরীরে চেতনানাশক দিয়ে অজ্ঞান করা হয়তারপর চিকিসকদের পরামর্শমতো চাপা পড়া পা দড়ি আর ব্যান্ডেজের কাপড় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে সরবরাহ করা ছুরি দিয়ে সেটি বিচ্ছিন্ন করেনগতকাল বেলা সাড়ে ১১টার দিকে পাখিকে বাইরে বের করে আনতে সক্ষম হন তাঁরাএই উদ্ধারকাজে তাঁদের সময় লেগেছে সাড়ে তিন থেকে চার ঘণ্টা
রুবেল বলেন, ‘কাজ করার সময় খেয়াল ছিল নাপরে ছিন্ন অঙ্গ দেখে ঘটনাস্থলেই অজ্ঞান হয়ে পড়িপরে অন্যরা আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) পরিচালক খন্দকার আবদুল আউয়াল রিজভী বলেন, জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয় যে ঘটনাস্থলে অস্ত্রোপচার করে কিছু লোককে উদ্ধার করতে হবেসে জন্য সহযোগী অধ্যাপক মো. আবদুল গণি মোল্লার নেতৃত্বে চারজন চিকিসকসহ কয়েজন নার্স ও ওয়ার্ডবয়ের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়তারা পাঁচজনকে ঘটনাস্থলে অস্ত্রোপচারের পর উদ্ধার করে
দীর্ঘ সময় না খাওয়া, পরিশ্রম ও অতিরিক্ত ঘামের ফলে এসব উদ্ধারকর্মী পানিশূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েনপরে এনাম মেডিকেলে নিয়ে তাঁদের অক্সিজেন ও স্যালাইন দেওয়া হয়
এই চার উদ্ধারকর্মী জানান, ভবনের ভেতর থেকে তাঁরা ১০০-এর বেশি পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে সেনাবাহিনীর এক কর্মকর্তার হাতে দিয়েছেনযাতে পরবর্তী সময়ে তাঁদের পরিবারের খোঁজ পাওয়া যায়

 

(রুপশী বাংলা নিউজ) ২৬ এপ্রিল /২০১৩.

 

শেয়ার করুন