নগর ঢাকায় জনৈক জীবনানন্দ

0
120
Print Friendly, PDF & Email

নগর ঢাকায় প্রতিদিন কত আজব লোকের যে দেখা মেলে তার ইয়ত্তা নেইএই যেমন গত পরশু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের মোড়ে উদ্ভ্রান্তের মতো হাঁটছিলেন রোগামতো কালোবরণ একটা লোকপরনে আধ-ময়লা পাঞ্জাবি, ততোধিক ময়লা ধুতি আর পায়ে বহু বছরের পুরোনো মডেলের স্যান্ডেলহাঁটছেন ২০১২ সালের বিভক্ত ঢাকার দক্ষিণাংশের রাস্তায় কিন্তু লোকটার তাকানোর ভঙ্গি, হাঁটাচলার ঢংসবকিছুতে কেমন যেন বিংশ শতাব্দী-বিংশ শতাব্দী গন্ধচিনলেন না লোকটাকে? চোখ-মুখে বেদনাধারা বয়ে চললেও লোকটার নাম আসলে জীবনানন্দ দাশঅনেক আগে তাঁর কবিতায় লিবিয়ার জঙ্গলের কথা উল্লেখ করেছিলেন তিনিএখন নানাপক্ষের বোমাবাজি-হত্যা-লুটপাটে আসলেই লিবিয়া এক বৃহদাকার জঙ্গলে পরিণত হয়েছে শুনে তিনি একটু সরেজমিনে দেখে আসতে চাইছিলেনকিন্তু একটু ধাতস্থ হয়ে বুঝলেন, লিবিয়ায় নেওয়ার নাম করে দালালচক্র তাঁকে আসলে ঢাকায় নামিয়ে গেছে
যা হোক, জগন্নাথের মোড়ে হাঁটতে হাঁটতে, জীবনানন্দের খেয়াল হলো এই এলাকার আশপাশেই লাবণ্য দাশের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়েছিলকিন্তু জায়গাটা ঠিক ঠাহর করে উঠতে না পেরে উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করলেনহাড়-জিরজিরে ঘোড়াটানা টমটমের দঙ্গল পেরিয়ে পাটুয়াটুলী নামে একটা জায়গায় আসতেই চোখে পড়ল বিশালকায় সুমনা ক্লিনিকএকবার ভাবলেন ঢাকায় ঢুকে ডায়াবেটিসের পাল্লায় পড়লেন কি না পরীক্ষা করে আসবেন কিন্তু পরক্ষণেই ব্রাহ্ম সমাজ মন্দিরের সাইনবোর্ড দেখে নিরস্ত্র হলেনকিন্তু তালাবদ্ধ গেট ভেদ করে ভেতরে ঢোকা হলো নাযা হোক, দূর থেকে দেখেই শান্তি পাওয়া গেলতাঁর বিবাহের স্থলটি পৃথিবী থেকে এখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি তবে!
না, ক্ষুধার চোটে আর কিছু ভাবতে পারছিলেন নাসামনে একটা খালি ট্যাক্সি পেয়ে উঠে পড়লেনবললেন, ‘কোনো ভালো হোটেলে নিয়ে চলোঘণ্টার বেশি ঢাকাই যানজটে আটকে থেকে ট্যাক্সিওয়ালা তাঁকে নামিয়ে দিল প্রেসক্লাবের মোড়েবলল, ‘স্যার, ওই যে ধানসিঁড়ি হোটেলমোগো বরিশালের বালো হোডেলএকটু এগোতেই খেয়াল করলেন আসলেই হোটেলের নাম ধানসিঁড়ি রেস্তোরাঁআর সামনে লেখা আসেন ভাই, জীবনানন্দের বরিশালের বালাম চালের ভাত খেয়ে যানএখন তিনি তাহলে ভাতের বিজ্ঞাপনেও কাজে লাগেন! ক্ষুধা তো এতেই মিটে গেল
উল্টো দিকে আবার হাঁটতে হাঁটতে বাংলা একাডেমীর গেটের সামনে গিয়ে একটা ব্যানার দেখে থামতে হলোব্যানারে লেখা আমৃত্যু জীবনানন্দ গবেষক আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রয়াণে আমরা শোকাহতহায়, হায়! মনে হচ্ছে অল্প কদিন আগেই মারা গেছেন লোকটাবেঁচে থাকলে তো অন্তত জানা যেত তাঁর জীবনানন্দ গবেষণার কারণ ও ফলাফলবাংলা একাডেমী ছাড়িয়ে তারপর টিএসসি মোড়ে ডাস’-এ গিয়ে একটা লাচ্ছি অর্ডার দিলেন জীবনানন্দলাচ্ছি খেতে খেতে টিএসসির ভেতর থেকে একটা আবৃত্তি-কণ্ঠ ভেসে এল কানে: “… বলেছে সে, ‘এতদিন কোথায় ছিলেন?’ পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেনবনলতার নামটা অনেক দিন পরে শুনে একটু নস্টালজিক হয়ে পড়লেনআজ কোথায় সেই বনলতা? কোথায় সেই সব হারিয়ে যাওয়া দিন?
টিএসসি থেকে একটা রিকশা নিয়ে শাহবাগ মোড়ে এসে নামলেন
রাস্তা পেরোলে দেখেন একরাশ ওষুধের দোকানসামনে একটা পত্রিকার স্ট্যান্ডএকটা পত্রিকা খুলতেই দেখেন চার পাতাব্যাপী ক্রোড়পত্রবিষয়: গদ্যশিল্পী জীবনানন্দএক আলোচক লিখেছেন জীবনানন্দের মাল্যবান, জলপাইহাটি-র মতো উপন্যাস বাংলা গদ্যের গতি ঘুরিয়ে দিয়েছেতাই নাকি? জানলে তো এভাবে ট্র্যাঙ্কবন্দী করে রাখতেন না গল্প-উপন্যাসের খাতাগুলোহঠা পত্রিকাওয়ালার কথায় হুঁশ হলোআরে ভাই, না নিলে এমন ঘাঁটাঘাঁটি করতাছেন কেন?’ পত্রিকাটা যথাস্থানে রেখে সামনে এগোতে এগোতে ঢুকলেন আজিজ সুপার মার্কেটেএকটা বইয়ের দোকানে কাচের আড়ালে সাজানো একটা বই বিশেষভাবে চোখে পড়লঅনন্য জীবনানন্দবইটা দেখে একটু কৌতূহলী না হয়ে পারলেন না
দোকানটার ভেতরে গিয়ে দ্রুত বইটা হাতে নিয়ে দেখেন মূল লেখক ক্লিনটন বি সিলি, বাংলা অনুবাদক ফারুক মঈনউদ্দীনঢাউস বইভূমিকাটায় একটু চোখ বুলিয়ে জানা গেল মার্কিন মুলুকের এক লেখক প্রচুর ঘেঁটেঘুঁটে বইটা লিখেছেনঅজানিতে চোখের কোণে একটু জলও জমে উঠলএই তাঁকে বেঁচে থাকতে সজনীকান্তর দল কী উপেক্ষাই না করেছে ! আর আজ তাঁকে নিয়ে দূরদেশের গবেষকেরাও গবেষণা করছেনপাঞ্জাবির খুঁটে চোখের জল মুছে দোতলায় পা রাখলেনবাংলার মুখ নামে একটা বইয়ের দোকানের সামনে দেখেন কয়েকজন তরুণ আড্ডা দিচ্ছেএকজন বলল, ‘চলএকটা লিটল ম্যাগাজিন বের করিনাম দিই অদ্ভুত আঁধারপাশের অন্য এক তরুণ সায় দিয়ে বলল, ‘এক্কেবারে জুতসই নামহ্যাঁ, জীবনানন্দ একটা জিনিস বটেএখনকার সময়টা সেই কবে কী ঠিক ধরতে পেরেছেনঅদ্ভুত আঁধার
দোতলা ছেড়ে তিনতলায় উঠতেই দেখেন সারি সারি বস্ত্রবিপণিএকটা দোকানের নাম উটের গ্রীবাদেখে ভেতরে ঢুকলেনকিন্তু এখানে তো উটের গ্রীবার মতো নিস্তব্ধতা নেইভিড়ের চোটে দাঁড়ানোই দায়উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েরা বৈশাখের পাঞ্জাবি-ফতুয়া-শাড়ি কিনতে এসেছে বোঝা গেলএকটা শাড়ির জমিনে রুপালি রেখায় লেখা হায় চিল! সোনালি ডানার চিল…কবিতার কিয়দংশহাসি পেল জীবনানন্দেরকোন দুপুরে না রাতে চিল এসেছিল তার মনে, আর কি না তা এখন ঢাকার আজিজ মার্কেটে ঘুরে বেড়াচ্ছে?
আজিজ মার্কেটের নিচে নেমে ওই লিটল ম্যাগাজিনের ছেলেগুলোকে আবার দেখতে পেলেন জীবনবাবুশুনলেন ওরা বলছে, ‘চল চলবেঙ্গল গ্যালারিতে যাইআজকে ভূমেন্দ্র গুহ জীবনানন্দ নিয়ে বক্তব্য দেবেনকী বলছে ওরা? সেই ভূমেনজীবনের শেষ দিনরাতগুলো যে সেবা-শুশ্রূষা করেছে তাঁর! ভূমেন তাহলে বেঁচে আছে? শাহবাগ থেকে বাসে করে ধানমন্ডি সাতাশ নম্বর গিয়ে নামলেনএকটু এগোতেই বেঙ্গল গ্যালারি ক্যাফেনা, ভেতরে যেতে হলো নাবাইরে থেকেই লাবণ্যর কথা কানে আসতেই থমকে দাঁড়ালেন জীবনানন্দশোনা গেল কয়েকজন শ্রোতা ভূমেন্দ্রকে লাবণ্য বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন করছেনহায়! বেঁচে থাকতে লাবণ্য তাঁকে ভাবত একজন ব্যর্থ মানুষআজ যদি সে শুনত ঢাকা শহরের একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে অসফল স্বামীটির সূত্রে লাবণ্যের নামও বারবার উচ্চারিত হচ্ছে তবে কী খুশিই না হতো সেজীবনানন্দ একবার ভাবলেন, ভূমেন্দ্র গুহের সঙ্গে দেখা করে আসবেন কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো কী দরকার হূদয় খুঁড়ে বেদনা জাগানোর
বেঙ্গল গ্যালারি থেকে আবার সাতাশ নম্বরের মোড়ের দিকে হাঁটতে হাঁটতে চিন্তা করলেন এবার একটু বরিশাল গিয়ে নিঃশ্বাস নিতে পারলে হয়বরিশালবগুড়া রোডসর্বানন্দ ভবনরাস্তায় একটা লোকের কাছে শুনলেন গাবতলী থেকে বরিশালের বাস ছাড়েধূসর পাণ্ডুলিপি পরিবহন নামে একটা বাসে উঠে বসলেন গাবতলীর উদ্দেশেতাঁর পাশের সিটেই একটা মেয়ে বসেছেঅনেকটা মঞ্জুশ্রীর মতো দেখতেহঠা মেয়েটার পার্স থেকে বেজে উঠল একটা গানের কলি বিশ্বকবির সোনার বাংলা, নজরুলের বাংলাদেশ, জীবনানন্দের রূপসী বাংলা রূপের যে তার নেই কো শেষ, বাংলাদেশআরে বাহ্! তাহলে তো মোবাইল ফোনের রিংটোনেও তিনিফোনে কথা সারতেই মেয়েটির নাম জিগ্যেস করলে উত্তর এল অরুণিমাঅরুণিমা সান্যাল নয়তো আবার!
মেয়েটি তারপর নিজেই বলে চলল তার বিস্তারিত পরিচয়বরিশাল বিএম কলেজের বাংলার ছাত্রীঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিল এমফিলে ভর্তির ব্যাপারেকী বিষয়ে জানতে চাইলে বললজীবনানন্দের নাবিকবৃত্তিএতশত বিষয় থাকতে এমন খটোমটো বিষয় কেন ঠিক করলেন?’ কিছুটা যেন উপহাসের হাসি ছুড়ে দিয়ে অরুণিমা বলল, ‘সে আপনি বুঝবেন নাজীবনানন্দ আগে ভালো করে পড়ুনতবে বুঝবেনকবি-টবি কিছু নাতিনি তো আসলে এক ট্র্যাজিক নাবিকসিংহল মালয় কত সমুদ্রে কত জাহাজ বদল করলেন কিন্তু বন্দর ঠিক করে উঠতে পারলেন নানা জীবন, না প্রেমতাই ছিটকে পড়লেন দেশপ্রিয় পার্কের মোড়েজল থেকে একেবারে রুক্ষ করুণ সবুজ ডাঙায়
জীবনানন্দ একটু নড়েচড়ে বসলেনবলে কী মেয়েটা! এমনভাবে ধরে ফেলেছে তাঁকেমুহুর্মুহু কৌতূহল চাপা না রাখতে পেয়ে জানতে চাইলেন অরুণিমার কাছে, ‘জীবনানন্দের এই পরিণতির কী কারণ ছিল বলুন তো?’ মেয়েটা বিজ্ঞের ভঙ্গিতে বলল—‘বিপন্ন বিস্ময় বলে একটা অসুখের নাম জানেন? মজার ব্যাপার হলো জীবনানন্দ দাশ নিজেই এই অসুখের আবিষ্কারক আবার এর শিকারও তিনি
আর সহ্য হচ্ছিল না জীবনানন্দেরএকেবারে বাক্রুদ্ধ হয়ে পড়লেনচোখ দুটো বন্ধ করে যেন নিস্তার পেতে চাইলেন অসহ্য সত্যের হাত থেকেকিন্তু অরুণিমা ছাড়বে কেন? মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলল, ‘আপনাকেও দেখি বিপন্ন বিস্ময় রোগে পেয়েছেউঠুন, গাবতলী তো এসে গেল

২২ এপ্রিল /২০১৩.

শেয়ার করুন