এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী

0
155
Print Friendly, PDF & Email

মাআনিসুল হক
প্রকাশক: সময় প্রকাশন

আজাদ ভাইয়ের মাকে নিয়ে একটা নাটক লিখে দাওএকুশে টেলিভিশনে মুক্তিযুদ্ধের নাটক করব
নাসির উদ্দীন ইউসুফ বললেন আমাকেআজাদের মায়ের গল্পটা তাঁর মুখ থেকেই প্রথম শোনা, ‘শোনোআজাদ ভাইয়ের মা ভাত খেতেন না জানোখুব কষ্ট করেছেন ভদ্রমহিলাআজাদ ভাই তাঁর একমাত্র সন্তান ছিলেনএকাত্তর সালে আজাদ ভাই ধরা পড়লেনমা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন রমনা থানায়আজাদ ভাই বলেছিলেন, আমার জন্য ভাত এনোমা ভাত নিয়ে গিয়েছিলেনগিয়ে দেখলেন, ছেলে নেইএই ছেলে আর কোনো দিন ফিরে আসেনিআর এই মা ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত বেঁচে ছিলেনএই ১৪টা বছর তিনি কোনো দিনও ভাত খাননি
গল্প শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে যাইআমি বলি, ‘এই গল্প নিয়ে টেলিভিশনের নাটক নয়, আমি একটা উপন্যাস লিখতে চাইআমাকে বিস্তারিত বলেন
নাসির উদ্দীন ইউসুফ, নাট্যজন ও মুক্তিযোদ্ধা, শূন্যের মধ্যে কী যেন খুঁজছেন, দূরাগত কণ্ঠে বলেন, ‘শোনো, আমি তো আজাদ ভাইয়ের ঘনিষ্ঠ ছিলাম না, ঘনিষ্ঠ ছিলেন হাবিবুল আলম বীর প্রতীকএকটা কাজ করিআমি তোমাকে হাবিব ভাইয়ের সঙ্গে বসিয়ে দিই
২০০২ সালএকদিন নাসির উদ্দীন ইউসুফ ভাইয়ের পল্টনের বাসায় সন্ধ্যার সময় আমরা বসিহাবিব ভাই তাঁর মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার গল্প বিশদভাবে বলেনশিমূল ইউসুফ শোনান সেই ভোরের গল্প, যেদিন বালিকা তিনি, গলা সাধছিলেন হারমোনিয়ামে, আর পাকিস্তানি সৈন্যরা ঘিরে ফেলে তাঁদের বাসা, আলতাফ মাহমুদ কৌন হ্যায়আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারীর সুরকার আলতাফ মাহমুদের কপালে বেয়নেট চালায় পাকিস্তানিরা, তাঁর কপালের চামড়া ঝুলে পড়ে চোখের ওপরে, তিনি কোদাল চালিয়ে বের করে দিতে থাকেন মুক্তিযোদ্ধাদের লুকিয়ে রাখা অস্ত্র
ওই একই রাতে ধরা পড়েছিলেন আজাদতাঁদের বাড়ি থেকে মিলিটারি ধরে নিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধা ক্রিকেটার জুয়েলসহ অনেককে, আর পাকিস্তানি কর্তার অস্ত্র কেড়ে নিয়ে গুলি করতে করতে জন্মদিনের পোশাকে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন কাজী কামাল (বীর বিক্রম, এখন প্রয়াত)
সারা রাত গল্প চলেভোরবেলা নাসির উদ্দীনদের বাড়ি থেকে বের হই
আস্তে আস্তে আজাদের গল্পটা স্পষ্ট হচ্ছেকিন্তু আজাদের মায়ের বিশদ বিবরণটা কই পাওয়া যাবে? মাসের পর মাস চলে যাচ্ছেআমি একটা গল্পের ঘোরের মধ্যে নিশিপাওয়া মানুষের মতো তড়পাচ্ছিঅনন্যোপায় হয়ে বিজ্ঞাপন দিই প্রথম আলোয়একাত্তর সালের শহীদ মুক্তিযোদ্ধা আজাদ, যিনি ধরা পড়েছিলেন জুয়েল, বদি প্রমুখের সঙ্গে, তাঁর কোনো খোঁজ কি কেউ দিতে পারেননিচে আমার নাম, আর মোবাইল নম্বর
পরের দিন পত্রিকা প্রকাশিত হলে প্রথম আসে উড়ো কলগালিগালাজ হজম করিদ্বিতীয় ফোনটি করেন আজাদের দ্বিতীয় মাযাঁকে আজাদের বাবা বিয়ে করেছিলেন বলে প্রতিবাদে আজাদের মা স্বামীর প্রাসাদোপম বাড়ি ত্যাগ করেছিলেন সন্তানের হাত ধরেআশ্রয় নিয়েছিলেন এক ছোট্ট ভাড়া বাসায়
মগবাজারে এখন যেখানে কুইনস গার্ডেন সিটি নামে অ্যাপার্টমেন্ট উঠেছে, সেখানে ছিল আজাদের বাবার বাড়িতারই পেছনে একটা দোতলা বাসায় থাকতেন আজাদের দ্বিতীয় মাতিনি আমার সঙ্গে খুবই ভালো ব্যবহার করেনআজাদের ছোটবেলার গল্প শোনান বিস্তারিততিনিই বলেন, কীভাবে গাড়ি চালিয়ে তিনি আজাদকে নিয়ে গিয়েছিলেন গুলিস্তানে, কিনে দিয়েছিলেন এলভিস প্রিসলির গানের রেকর্ড
দ্বিতীয় ফোনটি করেন গাজী আমিন আহমেদ, বামপন্থী রাজনীতিক, আজাদের দূর-সম্পর্কের ভাই, আমি ছুটে যাই তাঁর বাড়িতেসেখান থেকে আমি সন্ধান পাই আজাদের নিত্যসহচর ও খালাতো ভাই জায়েদেরজায়েদ ভাইকে পাওয়া মানে সোনার খনি পেয়ে যাওয়াআজাদের বাড়ির খবর, হাঁড়ির খবর, চিঠিপত্র, ফটোগ্রাফসব হাতে এসে যায়
একজনের পর একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্ধান পাই আমিকাজী কামাল উদ্দিন থেকে শুরু করে শহিদুল্লাহ খান বাদলআমি ছুটে যাই সবার কাছে
তখন ৫১বর্তী ধারাবাহিক নাটকটার শুটিং হচ্ছে ডিওএইচএস মহাখালীর একটা বাড়িতেরোজ সেখানে যাই শুটিং দেখার নাম করে, আর সেখানে না থেকে দুই বাড়ি পরে সাংবাদিক শাহাদত চৌধুরীর বাসভবনে ঢুকে পড়িদিনের পর দিন শাহাদত চৌধুরী আমাকে বলেন মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোর গল্পকফি খেতে খেতে শাহাদত ভাই একবার কাঁদেন, একবার হাসেন
আমি আজাদের খালাতো ভাইবোন সবার সঙ্গে কথা বলতে তাঁদের বাড়ি বাড়ি যাইটগর কিংবা মহুয়াসবার কাছে আমি গেছিএকদিকে আমি সাক্ষাকার নিচ্ছি, বাড়িঘরগুলো দেখতে যাচ্ছি, অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধের বইপত্র, ইতিহাস পড়ছিহাবিবুল আলম ভাই তাঁর ব্রেভ অব হার্ট বইয়ের পাণ্ডুলিপি দিয়ে দিলেন, জাহানারা ইমামের একাত্তরের দিনগুলি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্রদিন নাই রাত নাই আমি পড়ে চলেছিতথ্য মোটামুটি যা পেয়েছি, হয়ে যাবেএবার দরকার লেখাটাকে সাহিত্য করে তোলার প্রস্তুতিগোর্কির মা, ব্রেশটের জননী সাহসিকা, মহাশ্বেতা দেবীর হাজার চুরাশির মামা নিয়ে কে কোথায় কী লিখেছেন, জোগাড় করে এনে আবারও পড়তে লাগলামআমার মতো স্বার্থপর পাঠক জগতে দ্বিতীয়টা নাই, আপনি একটা বই দিয়ে পড়তে বললেই আমি পড়ব না, আলস্যবশতই; কিন্তু যে বই আমার দরকার, সেটা পড়ে ফেলতে আমার পঞ্চ-ইন্দ্রিয় এতটুকুনও শ্রান্ত হবে না
তারপর এক সকালে লিখতে শুরু করলাম
তিন পৃষ্ঠা লেখা হলোপছন্দ হলো নাস্রেফ ওই ফাইল বন্ধ করে আরেকটা ফাইল খুললাম
আবার প্রথম থেকে লেখা শুরু হলোমায়ের সেই প্রথম তিন পৃষ্ঠার পরিত্যক্ত পাণ্ডুলিপি আমার কম্পিউটারে এখনো আছে
মা উপন্যাসের সংক্ষেপিত সংস্করণ প্রথম বেরোল প্রথম আলোর প্রথম ঈদসংখ্যায় ২০০২ সালেবেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে হইচইআমাকে চিঠি লিখেছেন লেখকদের মধ্যে জিয়া হায়দার আর রফিকুর রশীদ, পাঠকদের কত চিঠি যে পেলামবই হয়ে বেরোল ২০০৩ সালেএর মধ্যে আরও কয়েকজনের কাছ থেকে আরও নতুন তথ্য পেয়ে বইটাকে বড় করতে হলো ২০০৩ সালেই
আমার কাছে আজাদের চিঠিপত্র, ফটোগ্রাফ ইত্যাদি যা ছিল, তা আমি তুলে দেব মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের হাতেতাই একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলো মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনেইআনিসুজ্জামান স্যার ছিলেন, নাসির উদ্দীন ইউসুফ ছিলেন, জায়েদ ভাই ছিলেন, আরও বেশ কজন ঢাকার গেরিলা উপস্থিত ছিলেন সেদিন
আজাদের মায়ের প্রিয় গান ছিলআজি বাংলাদেশের হূদয় হতে কখন আপনি, তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী
শিমূল ইউসুফ আমার অনুরোধে সেই গানটা গাইতে শুরু করলেন
আমি দর্শকসারিতে বসে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলামআমার কান্না কেউ থামাতে পারে না
গত দেড়টা বছর আমি ভীষণ একটা আবেগকে আমার বুকের মধ্যে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছিলামআজ শিমূল ইউসুফের গান আমার বুকের পাথরটাকে সরিয়ে দিল
মা বইটি লিখে আমি কী পেয়েছি? একটা ছোট ঘটনা বলিআজাদের খালাতো ভাই জায়েদ একদিন আমাকে বললেন, আপনার জন্ম কবে?
আমি বললাম, কেন?
তিনি বললেন, আপনি বইয়ে এমন কিছু ঘটনা লিখেছেন, যা আমি আপনাকে বলিনিকিন্তু আপনি সেটা নির্ভুলভাবে লিখেছেনযেমন আজাদ দাদা করাচি যাওয়ার আগে আমাকে হাতঘড়ি দিয়ে গিয়েছিল, এটা তো আমি আপনাকে বলিনিআপনি কোথায় পেলেন
আমি বললাম, এটা আমি পেয়েছি রবিঠাকুরের ছুটি গল্পেফটিক কলকাতায় যাওয়ার সময় মাখনলালকে তার ঘুড়ি নাটাই সব দিয়ে যায়
জায়েদ বললেন, ‘না না, হতেই পারে নাআজাদ দাদারও কান বড় ছিলআপনারও কান বড়আপনার জন্ম কবে?’
আমি বললাম, ‘আমার জন্ম ১৯৬৫ সালে, আর আজাদ শহীদ হয়েছেন ১৯৭১ সালেপাগলামো কইরেন না
আমি জায়েদ ভাইয়ের মনে এই ধন্দ যে তৈরি করতে পেরেছি একটা বই লিখে, একজন লেখক হিসেবে এর চেয়ে বেশি আমি কী চাইতে পারিতবু বলি, এ দেশের বীর মুক্তিযোদ্ধারা বুকের রক্ত দিয়ে আর বীর মায়েরা অশ্রু দিয়ে মায়ের কাহিনি রচনা করেছেনব্যর্থতার দায় লেখকের, গৌরবের ভাগ নয়!

২৬ মার্চ/২০১৩/নিউজরুম.

শেয়ার করুন