ত্বকীর খুনিদের গ্রেফতারে ৩৩ নাগরিকের বিবৃতি

0
112
Print Friendly, PDF & Email

ঢাকা: ত্বকী হত্যায় জড়িত অপরাধীদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবিতে শিক্ষক, লেখক, শিল্পী, সাংস্কৃতিক কর্মী, নৃবিজ্ঞানী, আইনজীবী, আলোকচিত্রী, শ্রমিক নেতা, চলচ্চিত্র নির্মাতাসহ সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মোট ৩৩ জন নাগরিক যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।

বিবৃতি প্রদানকারীরা হলেন- অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ, অধ্যাপক নাসিম আখতার হুসাইন, নৃবিজ্ঞানী, লেখক রেহনুমা আহমেদ, বিশিষ্ট আলোকচিত্রী শহীদুল আলম, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন, আলোকচিত্রী ঢালী আল মামুন, ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া, শিক্ষক মির্জা তাসলিমা, প্রকৌশলী ও লেখক কল্লোল মোস্তফা, শিল্পী মাকসুদুল হক, অরূপ রাহী ও কৃষ্ণকলি ইসলাম, শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু, শিক্ষক সায়েমা খাতুন, শিক্ষক নাসরিন খন্দকার, বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা মোশরেফা মিশু, চলচ্চিত্র নির্মাতা জাইদ আজিজ, একপক্ষের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ, শিক্ষক মিথিলা মাহফুজ, শিক্ষক ও নাট্যব্যক্তিত্ব সামিনা লুৎফা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমল আকাশ, সাংবাদিক ফারুক ওয়াসিফ ও উদিসা ইসলাম, আলোক চিত্রশিল্পী, দিলারা বেগম জলি, শিক্ষক সাঈদ ফেরদৌস, শিক্ষক সাদাফ নূর-এ ইসলাম, শিক্ষক মাহমুদুল সুমন, শিক্ষক মাসুদ ইমরান, নীরু শামসুন্নাহার, শিপ্রা বোস, অ্যাক্টিভিস্ট নৃবিজ্ঞানী সাইদিয়া গুলরুখ, নাজনীন শিফা, রাজনৈতিক কর্মী ও আলোকচিত্রী তাসলিমা আখতার।

বিবৃতিটি হুবহু তুলে দেওয়া হলো

আশির দশক থেকেই রফিউর রাব্বি নারায়ণগঞ্জের সব প্রগতিশীল আন্দোলন সংগ্রামের পরিচিত নাম। রফিউর রাব্বির ১৭ বছর বয়সী সন্তান ৬ মার্চ থেকে দু’দিন নিখোঁজ থাকার পর ৮ মার্চ তার লাশ শীতলক্ষ্যার পাড়ে পাওয়া যায়। পুলিশ এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টে এটি হত্যাকাণ্ড হিসাবেই উল্লেখ করা হয়েছে। ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন এবং এই হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত করেছেন নারায়ণগঞ্জের শামীম ওসমান পরিবারকে। রফিউর রাব্বির সন্দেহ আরো ঘনিভূত হয় যখন দেখা যায় প্রশাসন ত্বকীকে উদ্ধারের কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করে না। ৬ মার্চ রাত থেকেই ৠাব, পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দফায় দফায় অনুরোধ জানানোর পরেও তারা ত্বকীর লাশ উদ্ধারের জন্য যথাযথ কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আর এ ঘটনার মধ্য দিয়ে পুলিশ ও ৠাব প্রশাসন প্রমাণ করে যে নারাণয়গঞ্জের প্রশাসন একটি ‘বিশেষ মহল’-এর কাছে  জিম্মি।”

রফিউর রাব্বির আপসহীন নেতৃত্বের কারণেই নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক আন্দোলন কখনই কোনো শাসক গোষ্ঠীর সংকীর্ণ স্বার্থবাদী সীমায় আটকা পড়েনি। একই সঙ্গে তিনি বিভিন্ন স্থানীয় আন্দোলন- যেমন যাত্রী অধিকার আন্দোলন, নাগরিক কমিটির আন্দোলন, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলন, পরিবেশ আন্দোলন, রেলওয়ের ভূমি রক্ষা আন্দোলন, সর্বশেষ যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে চলমান আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন।

অর্থাৎ নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত প্রায় সব সামাজিক আন্দোলনে তিনি নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। এছাড়া তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জের একটি ‘বিশেষ মহল’-এর পথের কাঁটা হয়ে গিয়েছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার তৎপরতা। আর এ দ্বন্দ্ব চূড়ান্ত রূপ লাভ করে যখন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে সন্ত্রাসের বিরূদ্ধে তার অবস্থান নেওয়ার মধ্য দিয়ে।

রফিউর রাব্বির প্রতি দীর্ঘদিনের আক্রোশের ফলেই তার সন্তানকে নৃশংসভাবে বলি হতে হয়েছে বলে মনে করেন বিবৃতিদানকারীরাও।

ত্বকী হত্যার পর ময়নাতদন্তে এবং পুলিশ রিপোর্টে যেসব আলামত পাওয়া গেছে তার সাথে- আশিক, চঞ্চলসহ আরো হত্যাকাণ্ড, যেসব হত্যকাণ্ডের সুরাহা বা বিচার এখনো হয়নি সেসব হত্যার আলামতের মিল পাওয়া গেছে। ত্বকীর শরীরে পাওয়া আঘাতের চিহ্ন বলে দেয় কতটা নির্মম আর নৃশংসভাবে তাকে হত্যা করা হয়েছে। পিতার প্রতিবাদের অপরাধে তার সন্তান এবিসি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এ লেভেলের মেধাবী শিক্ষার্থী ত্বকীর প্রাণ কেড়ে নেয়। এই নৃশংসতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না।

অবিলম্বে অভিযুক্ত শামীম ওসমানসহ সবাইকে গ্রেফতারের দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে আশিক চঞ্চলসহ এ যাবত নারায়ণগঞ্জে যেসব হত্যার কোনো সুরাহা হয়নি তার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিও দাবি জানাচ্ছি।

ক্ষমতার বলয়ের মধ্য থেকে এক শ্রেণীর গডফাদাররা ত্বকীর মতো শিশুসহ সাধারণ জনগণকে গুম-খুন করছে। আর ত্বকী হত্যা সবাইকে সংকেত দিচ্ছে এই রাষ্ট্র সমাজে কেউ নিরাপদ না, নিরাপদ না ছোট শিশুরাও। বিশ্বজিতের মতো সাধারণ একটি কিশোর নিরাপদ না, বিশেষভাবে নিরাপদ না যারা জনস্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রাম ও নানা তৎপরতায় যুক্ত আছেন তারা। সমাজের নানা গডফাদার শ্রেণীর হত্যাকারীরা ক্ষমতার ছায়াতলে থেকেই তাদের স্বার্থ-সিদ্ধির জন্য নির্মম এসব হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে।”

আইনিভাবে এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করছি এবং একই সঙ্গে দেশবাসীকে সোচ্চার হবার আহ্বান জানাচ্ছি।  এই মুহূর্তে সোচ্চার প্রতিবাদ ছাড়া হত্যাকারীরা আবারো ক্ষমতার ছায়াতল দিয়ে বেরিয়ে যাবে এবং এই ধরনের হত্যাকাণ্ড চলতে থাকবে। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষার বাংলাদেশ গড়তে সময় এসছে এসব হত্যার জবাব দেওয়ার, সময় এসেছে রুখে দাঁড়াবার।

এই দেশ সব নাগরিকের জন্য নিরাপদ ও বাসযোগ্য করে তোলার জন্য এবং আর কোনো ত্বকীর প্রাণ যাতে অকালে না হারায় তার জন্য সোচ্চার হওয়ার দাবি জানাচ্ছি।

মার্চ ২৪, ২০১৩

শেয়ার করুন