ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে ইকোনমিস্টের মন্তব্য বিষয়গুলো গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় আনা দরকার

0
244
Print Friendly, PDF & Email

২৪ মার্চ, ২০১৩।।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিরোধীদলীয় কয়েকজন নেতার বিচার চলছে। এরই মধ্যে তিনজনের ব্যাপারে ট্রাইব্যুনাল রায়ও ঘোষণা করেছেন। ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে নানা ধরনের আলোচনা-সমালোচনাও একই সাথে চলমান। কোনো পক্ষ বলছে, ট্রাইব্যুনাল বিচারের প্রশ্নে নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারেনি।

সরকার পক্ষের দাবিÑ ট্রাইব্যুনাল সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতার মধ্য দিয়েই পরিচালিত হচ্ছে। সরকার ট্রাইব্যুনালের কোনো কাজেই হস্তক্ষেপ করছে না। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, সরকার বিরোধী দল নির্মূলে ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করছে। বিরোধী দল বারবার বলছে, তারাও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চায়। তবে সে বিচার হতে হবে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। শুধু বেছে বেছে বিরোধী দলের নেতাদের নয়, সব দলে থাকা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে হবে। কিন্তু সরকার তা করছে না। তা ছাড়া বিচারকাজেও স্বচ্ছতা রক্ষায় সরকার ব্যর্থ হচ্ছে। ইতোমধ্যে ট্রাইব্যুনালের বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দেশের বাইরেও সমালোচনা এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে। গণমাধ্যমে এসব সমালোচনা আমরা এর আগে সময়ে সময়ে জানতে পেরেছি। একই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সম্পর্কে সর্বসাম্প্রতিক প্রবল সমালোচনাটি এসেছে যুক্তরাজ্যভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্ট থেকে।

আমাদের দেশের বেশ কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত খবরে জানা গেছে, বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধীদের বিচারকার্যক্রমে কঠোর সমালোচনা করেছে এই সাময়িকীটি। গতকাল ২৩ মার্চ শনিবার সাময়িকীটির মুদ্রণ সংস্করণে ‘বাংলাদেশে ন্যায়বিচার, আরেক ধরনের অপরাধ’ (জাস্টিস ইন বাংলাদেশ : অ্যানাদার কাইন্ড অব ক্রাইম) শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ সমালোচনা করা হয়। আগের বৃহস্পতিবারে তা অনলাইন সংস্করণে প্রকাশ করা হয়। সমালোচনাকর এই নিবন্ধটির শুরুতেই বলা হয়, ১৯৬১ সালে অ্যাডলফ আইখম্যানকে আর্জেন্টিনা থেকে অপহরণ করে ইসরাইল নিয়ে আসে। এরপর তাকে জেরুসালেমে বিচারের মুখোমুখি করা হয় ২০ বছর আগে করা অপরাধের অভিযোগে। আইখম্যান ছিলেন নাৎসিদের ওয়ানসি সম্মেলনের সেক্রেটারি। ওই সম্মেলন থেকেই ইহুদি নিধনের সূত্রপাত। ইকোনমিস্টে উল্লিখিত নিবন্ধে বলা হয়, জেরুসালেমে আইখম্যানের এই বিচার ছিল যথাযথ বিচারপ্রক্রিয়ার একটি মডেল। বিচারে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ছিলেন ইসরাইলের অ্যাটর্নি জেনারেল। আর আসামিপক্ষে ছিলেন জার্মানির একজন শীর্ষ অ্যাটর্নি। বিচারকার্যক্রম প্রকাশ্যে সম্প্রচার করা হয়। কোনো কিছুতেই গোপনীয়তা ছিল না। পুরো বিচারপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় প্রকাশ্যে। ওই নিবন্ধে লেখা হয়, এখন বাংলাদেশের ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে যে বিচার চলছে, তা বহু বছর আগের অপরাধের, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময়কার। আসামিদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, গণধর্ষণ এবং দেশের মানুষের একটি অংশকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়ার চেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। কিন্তু ইসরাইলে আইখম্যানের বিচারের ওই মডেলের সাথে বাংলাদেশের বিচারের বিস্তর ফারাক। নিবন্ধে আরো বলা হয়, আদালতের কর্মকাণ্ডে হস্তক্ষেপ করছে সরকার। বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশ্যে মতপ্রকাশের ওপরও বিধিনিষেধ আছে। বিবাদিপক্ষের সব সাক্ষীকে সাক্ষ্য দিতে দেয়া হচ্ছে না। এমনকি আসামিপক্ষের এক সাক্ষীকে আদালত চত্বর থেকে অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। একটি ঘটনায় ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদত্যাগ করেন এবং ওই মামলায় আসামিকে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন এমন তিনজন বিচারপতি, যারা পুরো সাক্ষ্য শোনেননি। অপর একটি মামলায় আসামিপক্ষের আইনজীবী মামলায় প্রস্তুতির পর্যাপ্ত সময় পাননি। ওই মামলায় আসামির মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। বিচারপ্রক্রিয়ায় ব্যাপক ত্রুটি রয়েছে। ঘাটতি বা ত্রুটি শুধু আইখম্যানের বিচারের মানদণ্ডের দিক দিয়েই নয়, বাংলাদেশী আইন অনুযায়ীও এখানে ত্রুটি আছে। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার এ বিচার দেশের বিচারিক কার্যক্রমের জন্য একটি মডেল হবে বলে দাবি করে আশ্বস্ত করা হয়েছে। তবে সরকারের এ দাবির সাথে বিচারপ্রক্রিয়ার বৈপরীত্য আছে।

পত্রিকাটি আরো লিখেছে, লোকদেখানো এবং প্রশংসা কুড়ানোর এ বিচারের লক্ষ্য হচ্ছে, দেশ সৃষ্টির বিরোধিতা করে যারা অপরাধ করেছিল, তাদের বিচারের আওতায় আনা। এ দিক দিয়েও এ বিচারপ্রক্রিয়ার ব্যর্থতা চরম। কেননা, অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বেশির ভাগ জামায়াতে ইসলামীর সাথে সংশ্লিষ্ট। ইসলামপন্থী এ দলটি দেশের প্রধান বিরোধী জোটের শরিক। দেশের অন্তর্ঘাতমূলক রাজনীতির সাথে জড়িয়ে গেছে বিচারপ্রক্রিয়া। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্যান্য সমালোচনার মাঝে পত্রিকাটি উল্লেখ করেছেÑ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সেই কুয়োতেই বিষ ঢালছে, যার পানি একদিন বাংলাদেশ পান করতে চাইবে।

আমরা জানি না, সরকার ইকোনমিস্টের এই সমালোচনাকে কোন দৃষ্টিতে নেবে। তবে আমরা মনে করি, ইকোনমিস্টের এই সমালোচনা ও ট্রাইব্যুনালের বাস্তব পরিস্থিতিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজন ট্রাইব্যুনালকে সব ধরনের বিতর্কের ঊর্ধ্বে নিয়ে যাওয়ার আন্তরিক প্রয়াস চালানো, যদিও এ ব্যাপারে এরই মধ্যে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এর বিপরীত কিছু ভাবা সরকারের জন্য কোনো ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে না।

 

শেয়ার করুন