পাঁচ নাম্বার ঘাট

0
190
Print Friendly, PDF & Email

পাঁচ নাম্বার ঘাটএকটু দেিণ লঞ্চ টার্মিনালতার পাশ ঘেঁষেই শহরের প্রধান বাস টার্মিনালবন্ধন আনন্দ উসব সেতু অবশ্য কাউন্টার সার্ভিসতার পরও বাসগুলো এলোমেলো পার্কিং করায় স্বাভাবিক চলাচলে অনেক বিরক্তিকর অবস্থায় পড়তে হয়কারণ রাস্তা দখল করে বসে আছে এলোমেলোভাবে অনেক ফলের দোকানদারতবুও এ শহরের যাত্রীরা আয়েশে আজকাল ঢাকা বা যার যার ঠিকানায় শান্তিমতো যেতে পারেআগে তাও ছিল নাআগে ছিল লক্কড়ঝক্কড় করতোয়া আর কিছু মুড়ির টিন বাসওতে করে বাদুরের মতো জীবনের মায়া ত্যাগ করে ঝুলে পড়াছোট্ট এই শহরের পথঘাট কোনোটারই রূপ-যৌবন বলতে কিছুই ছিল নাছিল না কোনো পার্ক বা শিশুদের নিয়ে একটু বেড়ানোর জায়গাএখন হয়েছে অনেক কিছুই, এখন জনগণের কর্তৃক নির্বাচিত হয়ে সাবেক পৌর চেয়ারম্যানের সুযোগ্য কন্যা আসন অলঙ্কৃত করেছেনএখন এ শহরের শরীরে আলাদা প্রসাধনীকোনো শত্রও বলতে পারবে না এখানে কাজ হচ্ছে না

শহরের রাস্তাঘাটের লাবণ্য বেড়েছেসৌন্দর্য বাড়ার সাথে সাথে পথঘাট অনেক প্রশস্ত হয়েছেডিভাইডারগুলো ফুলে আর বৃে তার সবুজ বাহারি শরীরকে জানান দিচ্ছেতবে এসব শেষ করতে গিয়ে পৌরসভার কর্মীদের কম কষ্ট করতে হয়নি; কারণ যখন কোনো অলিগলিতে রাস্তা প্রশস্তের জন্য গাড়ি ঢুকেছে তখনই প্রভাবশালী কেউ বা মেয়রের আত্মীয়রা কর্মীদের ফেরত পাঠিয়েছেন এই বলে যেÑ গিয়ে বলো আমি মেয়রের অমুক, এখানে বাড়ি ভাঙা যাবে নাএসব শুনে মেয়র বিনয়ের সাথে আবার কর্মীদের রাস্তা ভাঙার জন্য পাঠিয়েছেনকর্মীদের বলেছেনÑ শহর উন্নয়নের কাজে বাধা হলে মেয়রের আপন বোনকেও ছাড়া হবে না

তো এই হলো নারীদের মডেল নতুন মেয়রসাবেক চেয়ারম্যানকন্যা বর্তমান মেয়র আজ বাংলাদেশের নারী নেত্রীদের অন্যতমকাছের, ঘরের, বাইরের জাতীয় পর্যায়ের অনেকেই তাকে সম্মান করেন, যা আজকাল অনেক জাতীয় পর্যায়ের নেতানেত্রীর কপালেও জোটে না

আগে ছিল না এত পরিকল্পিত সৌন্দর্যের পূজা এই শহরেযখন হাসান আলী মাস্টার এ পথে আসা-যাওয়া করততখন পাঁচ নাম্বার ঘাটের পানি থেকে শ্যাওলা আর সারা শহরের পয়ঃনিষ্কাশনের আবর্জনার ময়লা গন্ধে অনেকেরই বমির ভাব হতো

আর এখন এখানে বসে থেকে অনেকেই বলাবলি করে যে, মনে হয় একটা চমকার সি বিচের ধারে বসে আছিসেই টার্মিনাল থেকে শুরু করে নদীর পাড় ঘেঁষে সুন্দর পরিকল্পিতভাবে পাকা ড্রেনেজ সিস্টেম করা হয়েছে আর পথচারীদের জন্য প্রশস্ত স্ল্যাবের মাধ্যমে ফুটপাথ করা হয়েছে, যা গিয়ে বাঁক নিয়ে চাড়ার গোপ হয়ে সেই কুমুদিনী গিয়ে ঠেকেছেসব শরীরের পানি ডুবিয়ে নদী যখন তার যৌবনের ডাক দিয়ে যায় তখন মনে হয় সত্যিই প্রাকৃতিক নৈসর্গে ভরা এই বাঁকটুকু যেন সবার নজর কাড়ে; মনে হয় যেন এই শহরের মানুষের আর কক্সবাজারের স্বাদ একটু হলেও এখানে দাঁড়িয়ে মেটানো যায়এটা অতিরিক্ত মনে হলেও সত্যিকারের উপলব্ধি মাধ্যমেই টের পাওয়া সম্ভব

তার পরও একটির অভাব আজো সবাই অনুভব করেতা হলো কালীরবাজার চাড়ার গোপের ফলপট্টি ঘেঁষে নদীর যে বাঁকটি যুবতীদের কোমরের মতো অপার সৌন্দর্য নিয়ে কুমুদিনী গেছে তা থেকে বিভিন্ন ট্রলার আর পণ্যবাহী নৌকা ভিড়তে না দিলে আরো মোহনীয় হয়ে উঠতে পারে আর যদি সেখানে পর্যটনের একটি ভাসমান রেস্তোরাঁ যোগ করে দেয়া যায় তাহলে এই শহরের মননশীল মানুষেরা সারা জীবন এখানকার সুখে অবগাহন করে যেতে পারবেএমন ভাবনায় অবশ্য কেউ কেউ না পড়লেও হাসান আলী মাস্টারের একমাত্র ছেলে সাংবাদিক নাফিজ আশরাফ পড়েযখন সে একরামপুরের বাড়ি থেকে প্রতিদিন এ পথে নৌকা পাড়ি দিয়ে ঢাকায় যায়, তখনই তার চোখে এমন একটি স্বপ্ন তাড়িত হয়পরপরই অবশ্য ছোট বোনের একটি অস্বাভাবিক ঘটনায় নিজেকে স্বপ্ন থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখে

নাফিজ ছোটবেলায় বাবার সাথে প্রতিদিন এ পথে স্কুলে যেত আর ফেরার পথেও বাবার হাত ধরে এদিক দিয়ে আসতএ পথ নাফিজের শরীরের ভেতর নাড়ির মতোই এক সাথে গাঁথাবাবা আমলাপাড়ার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক, কত টাকাইবা বেতনতবু সংসারে শান্তি ছিলঅল্প বেতনেই চলে যেত সংসারনিজের বাড়ি থেকে প্রতিদিন আসা যাওয়াখরচের মধ্যে কেবল নাফিজের আবদার রার জন্য টিফিনের সময় এটা ওটা কিনে দেয়াআর ছিল একমাত্র মেয়ে সুমি যে একরামপুর প্রাইমারি স্কুলে পড়ে, তার জন্য আলাদা শিক রেখে পড়ানোর খরচ দেয়াতবে হাসান আলী মাস্টার বুদ্ধি করে নিজের বাড়িতে চার রুমের একটি টিনের ঘর করে তাতে ভাড়া দেয়ায় কটা টাকা ওখান থেকেও আসেতাই অভাব তাকে পাকড়াও করতে পারে না

মৃত্যুর প্রায় ৩০ বছর আগে কুমিল্লার হোমনার গ্রামের বাড়ির বাটোয়ারা নিয়ে ছোট ভাইয়ের সাথে রাগ করে একপর্যায়ে নিজের অংশটুকু বেচে দিয়েই একরামপুরের এই ৮ শতাংশ মাটি কিনে বসবাস করাএ সংসারে নাফিজের ছয় বছর পর যখন সুমি জন্ম নিলো তারও বছর দুয়েকের পরই হাসান মাস্টারের স্ত্রী চলে গেল ওখানে, যেখান থেকে আর কেউ ফেরত আসে নাঅনেকের অনুরোধ থাকার পরও হাসান মাস্টার আর দ্বিতীয় বিয়ে করেনিলোকটি হয়তো কোনো অভিমান না হয় সত্যি নিজের স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসত বলেই সুমি আর নাফিজকে বুকে পিঠে করে জীবনটা পার করে গেল

হাসান মাস্টার নিষ্ঠা আর সততার গুণে স্কুলের হেড স্যার পর্যন্ত তার নিজের চাচাতো শ্যালিকার সাথে সম্পর্ক করাতে চেয়েছিলতাই এক দিন অফ কাসে নিজেই প্রস্তাব দিয়ে দেয়Ñ

Ñহাসান সাহেব, বয়স হইছে, নিজের সেবার জন্যও তো একটা দাসী-বান্দী ঘরে থাকেমনে করেন বিয়া কইরাই একটা দাসী-বান্দী রাখলেন

Ñনা স্যার, আমার দুইটা চোখের মণিরে আর কষ্ট দিতে চাই না মায়ের জ্বালা আমি বুঝিনাফিজ আর সুমি বড় হইলে আমার আর কোনো কষ্ট থাকব না

Ñতবু চাইছিলাম আপনার সংসারের ঝামেলা একটু কমাই

Ñআপনাদের দোয়ায় আমি অনেক শান্তিতে আছি, কোনো ঝামেলা নেই স্যারআর কটা বছরই চাকরি আছেতার পর তো আস্তে আস্তে চইলা যামু নাফিজের মায়ের কাছে

হাসান মাস্টার একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে হেড স্যারের মুখের দিকে তাকায় আর নিজের মরণের জন্য একটা ছবি আঁকে মনের ভেতরওখানে সাদা কাপড় পরা লাশ হয়ে নিজেই শুয়ে পড়ে খাটেমনে মনে ভাবে নাফিজের মা এই দৃশ্য দেখে খুব খুশিওই দূর কবরে শুয়েই কণ্ঠ নামিয়ে স্বামীকে বলেÑ

Ñখুউব ভালো একটা কাম করলেন আইসাকত বছর হইল আপনে আসেন না, খালি ইস্কুল আর পোলাপান লইয়া পইড়া থাকেনআপনে কত নিষ্ঠুর দেখেন, সারা জীবন আপনার সংসারের চুলা ঠেইলা আর পোলাপান দেইখা আসলাম অথচ আমারে একলা রাইখা আপনে দিন কাটাইতাছেন

স্কুলের ঘণ্টার আওয়াজে নিজের মধ্যে ফিরে আসে হাসান মাস্টারসে খেয়াল করে এখনো হেড স্যারের রুমেই বসে আছে কিন্তু হেড স্যার নেইহয়তো কোনো রুটিন ডিউটিতে বের হয়েছে

স্কুল ছুটির পর ধীরে ধীরে হাসান মাস্টার বাড়ির উদ্দেশে বের হয়এখন আর ছেলে নাফিজ সাথে আসে নানাফিজ গত বছরই সাংবাদিকতায় অনার্স করে একটা ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় জয়েন করেছেনতুন চাকরি তাও মিডিয়ায়, সময়মতো বাড়ি ফেরার নাম নেইহাসান মাস্টার ছেলের জন্য তবু অপো করে পাঁচ নাম্বার ঘাটেফেরার পথে হাতে করে প্রতিদিনের যে পেপার নিয়ে আসে তা নিয়ে ঘাটে হারু মিয়ার চায়ের দোকানে বসে পেপারের পাতা উল্টাতে উল্টাতে সব খবর পড়েওখান থেকে কয়েকটা চুম্বক সংবাদ নিয়ে পাশে বসে থাকা দু-একজনের সাথে কথার খই ফোটায়

হারু মিয়ার দোকানে বসে বসে দু-এক কাপ চা গলায় ঢালে হাসান মাস্টারমাঝে মধ্যে অন্যরাও তাকে অফার করে, কাউকে ফিরিয়ে দেয় নাসবার সাথেই সখ্য তারতা ছাড়া যারা বিকেলে এখানে এসে বসে, তাদের অনেকেই অফিস, ব্যবসা, স্কুল, কলেজ শেষ করেই আসেহারু মিয়ার দোকানটি যেন একরত্তি জিরোবার জন্য ভালো পয়েন্ট বক্সএকরামপুর, সিএসডি, নবীগঞ্জ, ইস্পাহানি, চিতাশাল, নোয়াদ্দা, কাইতা খাল, বন্দরের অনেক বেপারি এ পথে তরিতরকারি বা বিভিন্ন পণ্যসহ টাটকা সবজির বোঝা নিয়ে নৌকায় পার হয়ে বেচার জন্য দিগুবাবুর বাজারের উদ্দেশে আসা-যাওয়া করেপ্রায় সবাই হাসান মাস্টারের ভক্তঅনেকের ছেলে মেয়েইতো তার হাতে মানুষঅন্তত স্কুলের পাঠ তো তার হাতেতাই গার্জিয়ানদের সম্মান আর সালাম নেয়ার জন্য হাসান মাস্টারের ঠোঁট যেন তড়বড় করতে থাকেতার ওপর নদী পারাপারের সময় ছেলেমেয়েরাও সামনে পড়ে তাকে সালামে সালামে ব্যস্ত রাখে

কিন্তু এই সম্মানে নদীর স্রোতের মতোই একদিন ভাটা পড়ে

এর দুটো কারণÑ প্রথমটি হলো যে দিন সবাই জানল হাসান মাস্টারের চাকরি শেষ, সে অবসরে গেছে, তার পর থেকেই সেসব প্রিয় লোকগুলোই যেন বদলে যেতে লাগলকাছের লোকগুলোই ধীরে ধীরে হাসান মাস্টারকে সমীহ করা কমাতে লাগলআগের মতো তাকে ডাকচাপ দিয়ে কথা বলে নাআবার এমনো হতে পারে যে, তার ছেলে নাফিজ মিডিয়া জগতে থাকায় অনেকেই ভেতরে ভেতরে ভয় পেতে থাকে আবার কখন কার কোন গোমর ফাঁস হয়ে যায়তাই অনেকেই হাসান মাস্টারের কাছ থেকে অনেটা দূরত্ব তৈরি করে মেলামেশা করে

দ্বিতীয় যে কারণ সেটির জন্য হাসান মাস্টার একেবারে নদীর তলদেশে মাটির সাথে মিশে যায়যা ভাবেনি সে তাই হলোসারাজীবন যে লোকটি অন্যের সন্তানদের শিা দিয়ে এসেছে, যা করতে বলেছে, আর যা করতে সবাইকে বারণ করেছে তা-ই করে ফেলল তার কাস টেনে পড়য়া মেয়ে সুমি

সেদিন হাসান মাস্টার শহর থেকে ফিরে বাড়ির উদ্দেশে পারাপার হবেতখন ঘাটে নৌকা কমহালকা বৃষ্টি হচ্ছেনদীর জলে টুপটাপ মুক্তোর দানা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছেঘাটের দণি দিকে এমভি রুস্তম আর এমভি বরিশাল নোঙর করাতারও একটু দূরে কয়েকটা ট্রলার-তাতে হয়তো গম আর কয়েকটায় কীটনাশক সার ভরাআনলোড হলে এখান থেকে ট্রাকে করে শহরের বিভিন্ন গুদামে চলে যায়আর গমগুলো যাবে রেললাইনে করে সিদ্ধিরগঞ্জ সাইলোতেবিশাল সাইলোর পেটে কোটি কোটি মন গম জমা থাকে, আর তা সময়মতো ট্রাকে করে দেশের বিভিন্ন শহরের রেশন শপে চলে যায়দেশের ভেতর তখন অভাব চার দিকেরেশন শপের চাল আর গমের জন্য প্রচণ্ড ভিড় লেগে থাকে সবখানে

তবে হাসান মাস্টারের কোনো অভাব ছিল না সংসারে কিন্তু সেদিন নদীর বহমান গতি থেকে ঝড় সৃষ্টি হয়ে সব লণ্ডভণ্ড করে দেয়টুপটুপ বৃষ্টি যে কখোন হাসান মাস্টারের মনের নদীতে ঢেউ তুলে সব ডুবিয়ে দিয়েছে তা ভাবতেও পারেনিহারু মিয়ার দোকানে আজ চায়ের জম্পেস আড্ডা বসেছেএকটু বৃষ্টি আর হালকা বাতাস মানুষের চায়ের তেষ্টা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে, তাই অন্য দিনের চেয়ে আজ ভিড়-বিক্রি বেড়ে গেছে

হাসান মাস্টার হারু মিয়াকে আগুন গরম এক কাপ চায়ের অর্ডার দেয় এবং ছোট্ট কাচের গ্লাসের মতো কাপ হাতে নিয়ে মুখে দিতেই পাশের বাড়ির আনু মুন্সি তাকে উদ্দেশ করে বলতে থাকেÑ

Ñকি মাস্টার সাব, মাইয়ারে শেষ পর্যন্ত কুলি মজুরের সাথে ভাগাইলেন

হাসান মাস্টার প্রথম কিছুই বুঝতে পারে না আনু মুন্সির কথা, তবু সে মুখের কাছের এক চুমুক চা গলায় ঢুকিয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে বলেন, মুন্সি কার কথা কইলেন?

Ñআরে মাস্টার আপনার মাইয়ার কথা

Ñকেন আমার মাইয়ার আবার কী হইল ?

Ñও আপনে সারা দিন বাড়িতে ছিলেন না তাইলে ?

Ñনা আমি তো সকালে বাইরে আইছি আর ফিরি নাই

Ñসকালেই শুনলাম আপনের মাইয়া ভাগছে জরিফ মিয়ার পুলার লগেকন আপনের মতো শিতি লোকের মাইয়া ওই রিকশাওয়ালার পুতের লগে গেল এইডা কি ভালা কাম হইল

পাশে বসা অনেকেই আনু মুন্সির কথা কানে নেয়এই কথা শুনে হাসান মাস্টারের হাত কেঁপে ওঠে, সামান্য চায়ের কাপও ঠিকমতো ধরে রাখতে পারছে নাতার অত দিনকার নিষ্ঠা সততা আর সম্মান মেয়েটা জলে মিশিয়ে দিলো

সে মাথা নিচু করে দোকান থেকেই বৃষ্টি মাথায় করে বের হলোআর তার কানে গেল মুন্সির আরেকটি কথাÑ মাস্টার হইলে কী হইবঅন্যের পোলাপান মানুষ কইরা নিজের মাইয়ারেই অমানুষ বানাইল

হাসান মাস্টারের মাথায় অমানুষ, অমানুষ, অমানুষশব্দটা সিলিং ফ্যানের মতোই ঘুরপাক খেতে লাগলসে নৌকায় উঠতেই কয়েকবার দুলতে থাকেনদীতে বৃষ্টির পানি, তার চোখের কোণায় পানি, মাথায় পানি, যে হাতে শাসনের বেত ধরত সেই বাহুতে গড়িয়ে পড়ছে পানিআজ তার সারা গায়ে ঘৃণার পানি সাগরের মতো বইতে থাকেওপারে ঘাটে গিয়ে নামার সময় সে পা পিছলে পড়ে যায়এতে তার পায়ের একটি হাড় ভেঙে যায়কিন্তু এ সংবাদটি মিডিয়ায় প্রকাশ না পেলেও কয়েক দিন পর ঘটে আরেকটি মর্মান্তিক ঘটনাটিভির পর্দায় ভাসে একটি চিত্রশীতল্যা নদীর পানিতে একটি লাশ ভাসছেপাঁচ নাম্বার ঘাটের কাছে পানিতে ভেসে থাকা কচুরিপানা আর অন্য সব ভাসমান ময়লা-আবর্জনার সাথে একজন মেয়ে মানুষের বিকৃত লাশ ফুলে ফেঁপে ছিলএ সংবাদ হাসান মাস্টারের কানে গেলেও ভাঙা পা নিয়ে ঘাটে এসে তা দেখার সুযোগ হয়নিতবে মনের ভেতর বারবার সুমির চেহারা উঁকি দেয়ায় তার চোখ বেয়ে পানির ধারা নামে

এক দিন পরই নাফিজ এসে বাবাকে বলে, ‘বাবা বড় সুসংবাদ আনছি, দোয়া করোআগামী সপ্তায় যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধি হয়ে লন্ডন যাইতেছিআমার অফিস সব ব্যবস্থা করতেছেহাসান মাস্টার ছেলের এই খবরে এবারো চোখের পানি ফেলেনতবে এ পানি বেদনার নয়, আনন্দের

২৩ মার্চ/২০১৩/নিউজরুম.

শেয়ার করুন