রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ইন্তেকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন এই নির্বিরোধ অভিভাবক

0
202
Print Friendly, PDF & Email

২২ মার্চ, ২০১৩।।

রাষ্ট্রপতি মো: জিল্লুর রহমান গত বুধবার সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তার মৃত্যুতে দেশে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। ৮৫ বছরের পরিণত বয়সে তিনি বিদায় নিয়েছেন কিন্তু নানা সঙ্কট সন্ধিক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী এই ব্যক্তিত্বের মৃত্যু সর্বস্তরের মানুষকে শোকাহত করেছে।

২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেয়ার আগ পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সর্বজন শ্রদ্ধেয় এই ব্যক্তি কখনো দলীয় রাজনীতির সঙ্কীর্র্ণ গণ্ডিতে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে ফেলেননি। তিনি ছিলেন তার দলের আদর্শ ও নেতৃত্বের প্রতি প্রশ্নহীনভাবে অনুগত, আবার ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন নির্বিরোধ নীতিবান ও প্রতিহিংসামুক্ত মানুষ। দলের সিদ্ধান্তে নেয়া তার অনেক পদক্ষেপের ব্যাপারে প্রশ্ন উঠতে পারে কিন্তু ব্যক্তি জিল্লুর রহমানের মধ্যে এমন এক সংবেদনশীল মন ছিল, যার কারণে তিনি চরম রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ব্যক্তিরও খোঁজখবর নিতেন। বঙ্গবন্ধু ও তার কন্যা শেখ হাসিনা দু’জনই তার ওপর আস্থা রেখেছেন। এই আস্থার মূল্য তিনি রেখেছেন আমৃত্যু।

রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের জীবন বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাসের সাথে জড়িয়ে আছে। ১৯৫২ সালে তিনি ভাষা আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টে ময়মনসিংহ এলাকায় সংগঠকের ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনÑ সব কিছুতেই উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল তার। তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন ১৯৭০ সালে। স্বাধীনতার পরে গণপরিষদ সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নে ভূমিকা রাখেন। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মোট পাঁচবার। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং সংসদের উপনেতা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭২, ১৯৭৪, ১৯৯২ ও ১৯৯৭ সালে চার দফায় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলে এই জাতীয় দলের প্রথম সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি।

জীবনের শেষপর্যায়ে স্ত্রী আইভি রহমানের মর্মান্তিক মৃত্যুর দুর্বহ শোক তাকে সহ্য করতে হয়েছে। কিন্তু এতবড় বিপর্যয় তাকে প্রতিহিংসাপরায়ণ করেনি। এর পরও ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি দেশে জরুরি আইন জারির পরে শেখ হাসিনা গ্রেফতার হলে জিল্লুর রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে বিচণতার সাথে দল পরিচালনা করেন। সেই সঙ্কটকালেও তিনি দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখেন। জিল্লুর রহমানের দীর্ঘ ছয় দশকের কর্মময় রাজনৈতিক জীবনে বহু চড়াই-উৎরাই এসেছে। কিন্তু ভয়ভীতি কিংবা লোভ-লালসার কাছে নীতি ও আদর্শ বিসর্জন দিতে দেখা যায়নি তাকে। নিজের দল, দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন তা এখন খুব বেশি দেখা যায় না। রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের মৃত্যুতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে তা সহজে পূরণ হবার মতো নয়।

কিন্তু প্রতিটি জন্মের পর মৃত্যুও যে অনিবার্য সে বাস্তবতা অস্বীকারের সুযোগ নেই। তবু কিছু মৃত্যু জাতিকে অনেক বেশি শোকাহত করে। মৃদুভাষী, শান্তিপ্রিয় ও পরমত শ্রদ্ধাশীল এই ব্যক্তির প্রতি আমরা শ্রদ্ধা জানাই। একই সাথে পরম করুণাময়ের কাছে আমরা তার রূহের মাগফিরাত কামনা করি আর প্রার্থনা করি আল্লাহ যেন তার শোকসন্তপ্ত পরিবারকে এই শোক বইবার ধৈর্য ও সাহস দেন।

শেয়ার করুন