তৎকালীন মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী নতুন যুদ্ধে

0
114
Print Friendly, PDF & Email

চট্টগ্রাম: ২০০৩ সালের কথা। তৎকালীন নৌপরিবহনমন্ত্রী প্রয়াত আকবর হোসেন খানের বিশেষ আগ্রহে মন্ত্রণালয়ের মেরিন ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পান মোহাম্মদ মুনীর চৌধুরী। দায়িত্ব নিয়েই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের মালিকানাধীন হিসেবে পরিচিত লঞ্চ কোকো-১ সহ আরও কয়েকটি নৌযানকে ত্রুটিপূর্ণ অভিযোগে আটক করেন। তোলপাড় শুরু হয় সরকারে, বিপাকে পড়েন নৌপরিবহনমন্ত্রী। মেরিন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব মাত্র আট মাসে ছুটে যায়।

মুনীর চৌধুরীকে পাঠানো হল চট্টগ্রাম বন্দরের ম্যাজিস্ট্রেট করে। সেখানে যোগ দিয়েই নেমে পড়েন বন্দরের ভুমি অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধারের যুদ্ধে। ২০০৫ সালে বঙ্গোপসাগর আর কর্ণফুলীর মোহনায় লালদিয়ার চরে প্রায় ৪২ বছর ধরে অবৈধ দখলে থাকা এক’শ একর জমি উদ্ধার করে আবারও আলোচনায় উঠে আসেন। দু’বছরেরও বেশি সময় দায়িত্ব পালনকালে বন্দরের দেড় হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের জমি দখলদারদের হাত থেকে উদ্ধার করেন। পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ত্রুটিপূর্ণ, অযোগ্য জাহাজকে জরিমানা করে বন্দরে জাহাজ চলাচলে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন।

মাঝে ২০০৪ সালে আরেক যুদ্ধে নামেন মুনীর চৌধুরী। শুরু করেন পণ্যে ভেজালবিরোধী একের পর এক অভিযান। দেশে প্রথম তিনিই শুরু করেন এ অভিযান। অবস্থা এমন দাঁড়ায়, ম্যাজিস্ট্রেট মুনীর চৌধুরী আসছেন শুনলেই ভেজাল খাবার বিক্রেতা, নোংরা পরিবেশে খাবার উৎপাদনকারীরা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে পালাতে থাকেন। চট্টগ্রামের এ অভিযান পরবর্তী সময়ে ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায়।

২০০৭ সালে ওয়ান ইলেভেন শুরুর পর প্রভাবশালীদের চাপ উপেক্ষা করে মুনীর চৌধুরী চালিয়ে যেতে থাকেন তার যুদ্ধ। এতে তিনি প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়েন। তাকে বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) হিসেবে বদলি করে দেয়া হয়। কিন্তু এতেও থামবার পাত্র নন মুনীর চৌধুরী। তিনি নেমে পড়েন রাজস্ব আয় বাড়ানো এবং জেলা প্রশাসনের ভুমি উদ্ধারের যুদ্ধে। রাজস্ব আয় মাত্র দু’কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৬ কোটি টাকায় উন্নীত করেন।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের জুলাই মাসে মুনীর চৌধুরীকে বদলি করা হয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (এনফোর্সমেণ্ট) পদে। পরিবেশ রক্ষায়, নদী-সমুদ্র দখল, পাহাড় ও বনভুমি দখলের বিরুদ্ধে টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত শুরু করেন নিরন্তর সংগ্রাম। সেণ্টমার্টিন দ্বীপে অবৈধ দালানের গায়ে যেমন পড়ে তার নির্দেশে হাতুড়ি-শাবলের আঘাত, তেমনি আনোয়ারায় বিদেশি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান কেইপিজেডকেও পাহাড় কাটার অভিযোগে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। পরিবেশ দূষণকারী কলকারখানাগুলোর কাছে মুনীর চৌধুরী মূর্তিমান আতংকে পরিণত হন। তার হাত থেকে ছাড় পায়নি সরকারি দল, বিরোধী দলের মন্ত্রী-এমপিদের প্রতিষ্ঠানও।

বন্দরের জমি উদ্ধার, নৌপথে শৃঙ্খলা আনা, ভেজাল রোধ আর পরিবেশ রক্ষার অকুতোভয় এ যোদ্ধা এখন নেমেছেন নতুন যুদ্ধে। পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে গত ২৯ জানুয়ারি তাকে বদলি করা হয়েছে বাংলাদেশ দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় ইউনিয়ন লিমিটেডের (মিল্কভিটা) মহাব্যবস্থাপক হিসেবে। বদলি হওয়ার পর গত ৪ ফেব্র“য়ারি তিনি যোগ দেন নতুন কর্মস্থলে।

গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বদলি তাকে পরিকল্পিতভাবে গুরুত্বহীন করা বলে অনেকে ভাবলেও মুনীর চৌধুরী বলছেন অন্য কথা।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘অনেকে বলছেন, এটা ডাম্পিং পোস্ট। তোমাকে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু আমি বলছি, এটা আমার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ, নতুন যুদ্ধ। পরিবেশ রক্ষার যুদ্ধ থেকে আমি এখন জনস্বাস্থ্য রক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তার যুদ্ধে নেমেছি। আমি কোনদিন চাপের কাছে মাথা নত করিনি, ভবিষ্যতেও করব না। দেখবেন, মিল্কভিটাকে আমি দেশের আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলব।’

মুনীর চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘গত আড়াই বছরে প্রায় সাড়ে ৯’শ অভিযান চালিয়েছি। তিন’শ একর পাহাড় ও বনভুমি, চার’শ একর কৃষিজমি উদ্ধার করেছি। ১২টি কারখানা উচ্ছেদ করেছি, ৬০টিরও বেশি কারখানা পরিবেশ দূষণের অভিযোগে বন্ধ করেছি। নীতিমালা না মানায় আড়াই’শ ইটভাটা উচ্ছেদ করেছি।’

অপচয়-দুর্নীতিকে ‘জিরো টলারেন্স’
মিল্কভিটার মহাব্যবস্থাপক পদে যোগ দিয়েই মুনীর চৌধুরী সর্বপ্রথম অপচয়-দুর্নীতি রোধের যুদ্ধে নেমেছেন। গত এক মাস ধরে তিনি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, মিল্কভিটার কোন কোন খাতে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হচ্ছে, কোথায় কোথায় অনিয়ম হচ্ছে। এসব বিষয়ে সার্বিক ধারণা নিয়ে সেগুলো প্রতিরোধ করে প্রতিষ্ঠানটিকে দক্ষ ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে দিনান্ত পরিশ্রম করছেন মুনীর চৌধুরী।

তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘মিল্কভিটার অনেক সম্ভাবনা থাকলেও অপচয়, দুর্নীতি, দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভাব আর সঠিক বিপণন নীতিমালা না থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বাজারে প্রতিযোগিতামূলক পর্যায়ে পৌঁছতে পারছেনা। আমি সবার কাছে মেসেজ পৌঁছে দিয়েছি, দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমাতে হবে।’

মিল্কভিটাকে ঘিরে এখন বড় স্বপ্ন
১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের আমলে যাত্রা শুরু হয় সমবায়ী প্রতিষ্ঠান মিল্কভিটার। একইসময়ে শুরু হয় ভারতের আমূল। কিন্তু সঠিক ও দূরদর্শী পরিকল্পনার কারণে আমূল সারা ভারতে সাড়া ফেললেও মিল্কভিটা গ্রাহকের কাছে সেই চাহিদা অর্জন করতে পারেনি।

মুনীর চৌধুরী জানান, সারাদেশে মিল্কভিটার ২৬টি দুগ্ধ শীতলীকরণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র আছে। এসব কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন দু’লক্ষ থেকে আড়াই লক্ষ লিটার দুধ বাজারজাত হচ্ছে। তিনি যোগদানের পর নতুনভাবে দৈনিক চার লক্ষ থেকে সাড়ে চার লক্ষ লিটার দুধ বাজারজাতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছেন।

মুনীর চৌধুরী বাংলানিউজকে বলেন, ‘নতুন লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য নতুন নতুন প্ল্যান্ট স্থাপন করতে হবে। চট্টগ্রামের পশ্চিম পটিয়ায় এক মাসের মধ্যে একটি প্ল্যান্ট চালুর জন্য কাজ করে যাচ্ছি। আরও প্ল্যান্ট স্থাপনের কাজ শিগগিরই শুরু করব।’

পশ্চিম পটিয়ায় প্ল্যান্টের বিষয়ে তিনি জানান, এ কেন্দ্র থেকে চলতি মাসেই দুধ সংগ্রহ শুরু হবে। প্রাথমিকভাবে পাঁচ হাজার লিটার দুধ সংগ্রহ করা হবে। এক সপ্তাহের মধ্যে তা ১০ হাজার লিটারে দাঁড়াবে। তবে তাদের পরিকল্পনা আছে, পশ্চিম পটিয়া থেকে দৈনিক ২০ হাজার লিটার দুধ বাজারে যাবে। এজন্য দিনে দু’বার ঢাকায় দুধ নেবার ব্যবস্থা করতে হবে বলে জানান মুনীর চৌধুরী।

জানা গেছে, সিরাজগঞ্জের বাঘাবাড়ি ও ঢাকার মিরপুরে মিল্কভিটার দু’টি ফিনিশড প্রোডাক্ট প্ল্যান্ট আছে। এসব কেন্দ্রে তরল দুধ, গুঁড়ো দুধ, মাখন, দই, রসমলাই, আইসক্রিম তৈরি হয়। প্ল্যান্ট  দু’টিকে আরও বেশি উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন করার পাশাপাশি নতুন প্ল্যান্ট নির্মাণের পরিকল্পনাও নেয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

মুনীর চৌধুরী বলেন, ‘মিল্কভিটার পাস্তুরিত দুধের গুণগত মান নিয়ে কোন কম্প্রোমাইজ হবেনা। গুণে, মানে এবং দক্ষতায় মিল্কভিটাকে ভারতের আমূলের মত বিশ্বসেরা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই। তবে এজন্য শুধু আমার একক ইচ্ছা কিংবা প্রচেষ্টা থাকলে হবে না। খামারি, সমবায়ী ভাইদের, সর্বস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সর্বোপরি সরকারের সহযোগিতা আমার লাগবে।’

 মার্চ ২০, ২০১৩

শেয়ার করুন