হাউ আর ইউ টিচার?

0
203
Print Friendly, PDF & Email

মনোহরগঞ্জ, কুমিল্লা থেকে: কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার নাথেরপেটুয়া মডার্ন একাডেমিতে উড়ছে কালো পতাকা। পুরো স্কুল জুড়ে শোকের মাতম। শনিবারই যে স্কুলটি হারিয়েছে আট ছাত্রকে।

রোববার সকালে গিয়ে দেখা যায় ক্লাসের বেঞ্চে বসে কান্নাকাটি করছেন শিক্ষিকারা। প্লে গ্রুপের ব্লক শিক্ষিকা জোবায়দা খানমের চোখের পানি যেনো থামছেই না।

তিনি বলছিলেন, এতো সুন্দর ছিল আমার এ ছাত্ররা! ক্লাসে ঢুকলেই দাড়িয়ে জিজ্ঞাসা করতো, ‘হাউ আর ইউ টিচার?’ আমি উত্তর দিতাম, “ফাইন”। আর বলবে না, আমার পুতুলগুলো নেই।

শোকাহত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে কথা হয় প্লে এর ক্লাস রুমে কথা হচ্ছিল জোবায়দা খানমের সঙ্গে। এ শিক্ষিকার প্লে গ্রুপের তিন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছেন ট্রাক চাপায়।

জোবায়দা বলছিলেন, প্লে গ্রুপের রোল নাম্বার এক ছিল হাসিবুল হাসান নিহাদের।সে দেখতে যেমন মায়াবী ছিল, কথা বলতোও সুন্দর করে। সে এ স্কুলে ভর্তি হয়েছে তিন মাস, কিন্তু আচরণ দেখে মনে হতো তিনবছরের শিক্ষা সে লাভ করেছে।

রাকিবুল হাসান এর রোল নাম্বার ছিল ৯।সে সবার আগে লেখা দিত। অংক করেই বলতো, ‘ম্যাডাম শেষ।”
মোক্তাকিম হোসেন ছিল একটু চঞ্চল। এতো মিষ্টি ছেলে আমাদের চোখে ভাসে এখনো।

গত ১ বছর ৪ মাস ধরে এ স্কুলের শিক্ষকতা করছেন জোবায়দা।স্কুলের ৫ জন শিক্ষিকার মধ্যে তার নিয়োগই হয়েছিল প্রথমে।

জোবায়দার হাতের বামে বসে তখন হাউ মাউ করেই কাদছে নার্সারি ক্লাসের শ্রেণি শিক্ষিকা সালমা আক্তার। তার আবেগ অন্য সকলের চেয়ে বেশি।

তিনি জানান, তার ছাত্রী জান্নাতুল মাওয়া শোভার রোল নং ছিল ১। সে ক্রীড়া প্রতিযোগিতায়ও প্রথম হয়েছিল। অনেক ভদ্র-নম্র ছিল সে। নার্সারির আরেক ছাত্র আল আমিনের রোল নং ছিল ৭। সে ছেলেদের খেলায় প্রথম হয়েছিল।

সালমা আক্তারের পরেই ছিল নার্সারি ক্লাসের ব্লক শিক্ষিকা নাজমা আক্তার। ছোট শিক্ষার্থীদের হারিয়ে কথা বলার শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন এ শিক্ষিকা।
 
৩য় শ্রেণির শিক্ষিকা সুরাইয়া আক্তারের ক্লাসে পড়তো ফাহাদুল ইসলাম মিথুন। বলেন, ‘এখনো মনে আছে, মিথুন বলছে, ম্যাডাম আজ ছুটি দিয়ে দেন।’ এখন মিথুন আর ছুটি চাইবে না।
 
৪র্থ শ্রেণির টিচার মাহমুদুল হাসান সাঈদ কান্নায় কথা বলতে পারছেন না। শিক্ষার্থীদের মৃত্যুর খবর শুনে সাঈদ শনিবার লাকসামে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল বলে জানান আরেক শিক্ষক মো. শাহাদাৎ হোসেন।

স্কুলের অধ্যক্ষ আমিরুল ইসলামের সঙ্গে কথা হয় স্কুলের বারান্দায়। তিনিও বলেন নিহাদের কথা। নিহাদ এবার খেলাধুলা ও কবিতা আবৃতিতে প্রথম হয়েছে। স্কুলের সকলের প্রিয় ছাত্র ছিল সে।
 
তিনি বলেন, স্কুলের ভ্যান গাড়ির ওই চালক কখনো সিটে বসে চালাতো না, টেনে নিত। শনিবারও টেনেই নিয়েছিল। ট্রাকটি সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে আমার ফুলগুলোকে হত্যা করেছে। তাজা প্রাণকে মেরে ফেলেছে।
১৩ বছরের শিক্ষকতা জীবনে কথনো এতো ছটফটে বাচ্চা দেখেনি আমিরুল।

জোবায়দার মতো তিনিও জানান, ক্লাসে ঢুকলেই ওরা উঠে সালাম করতো, জিজ্ঞাসা করতো, ‘হাউ আর ইউ টিচার?” আমরা উত্তর দিতাম ‘ফাইন’।

স্কুলে তিনদিনের শোক পালন করা হবে এবং ৪র্থ দিন দোয়া ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হবে বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, শনিবার দুপুরে নাথেরপেটুয়া এলাকায় ট্রাক চাপায় নিহত হয় স্কুলভ্যানের আরোহী আট শিশুশিক্ষার্থী। আহত হয় ভ্যানচালকসহ আরও দুই শিক্ষার্থী। হতাহত শিক্ষার্থীরা সবাই নাথেরপেটুয়া মডার্ন একাডেমির শিক্ষার্থী। নিহত শিক্ষার্থীরা হলো- প্লে শ্রেণির ছাত্র হাসিবুল হাসান নিহাদ (৭), একই শ্রেণির রাকিব হোসেন শুভ (৭), মোক্তাকিম হাসান হূদয় (৭), নার্সারি শ্রেণির জান্নাতুল মাওয়া শোভা (৭), আতিকুর রহমান আল আমিন (৭), তৃতীয় শ্রেণির নাসির উদ্দিন (১০) ও ফাহাদুল ইসলাম মিথুন (১০) এবং চতুর্থ শ্রেণির সুলতান আহমেদ ওরফে স্বাধীন (১০)। তাদের বাড়ি উপজেলার হাতিমারা গ্রামে। একসঙ্গে এত শিশুর প্রাণহানির ঘটনায় এলাকায় নেমে এসেছে শোকের ছায়া।

আহত হয় চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিজা আক্তার (১০) ও প্লে শ্রেণির ফাহমিদা তাহের তমা (৭) এবং ভ্যানচালক জয়নাল আবেদীন (৫০)। জয়নালের বাড়ি উপজেলার বিনাঘর গ্রামে।

 মার্চ ১৭, ২০১৩

শেয়ার করুন