পাহাড়ি গ্রুপগুলোর সংঘর্ষে বারবার প্রাণহানি হাত দিতে হবে সঙ্কটের মূলে

0
357
Print Friendly, PDF & Email

১৫ মার্চ, ২০১৩।।

পার্বত্য জেলাগুলোতে, বিশেষত রাঙ্গামাটি ও খাগড়াছড়িতে পাহাড়ি গ্রুপগুলোর মধ্যে সংঘর্ষে বারবার প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার রাঙ্গামাটির লংগদুর মধ্যছডা এলাকায় একদল অস্ত্রধারীর অতর্কিত হামলায় অন্তত চারজন পাহাড়ি নিহত হয়েছেন। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করেছে। নিহতরা জনসংহতি সমিতির এমএন লারমা গ্রুপের রাঙ্গামাটি জেলা শাখার নেতা। পার্বত্য চুক্তিবিরোধী ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির এমএন লারমা গ্রুপের নেতাকর্মীরা এ হত্যাকাণ্ডের জন্য জনসংহতি সমিতির সন্তু গ্রুপকে দায়ী করেছে। এর আগে গত ২০ ডিসেম্বর লংগদু উপজেলার কাটতলি ইউনিয়নে ইউপিডিএফের দুই সদস্য নিহত হয়েছেন। এ ঘটনার জন্যও জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করা হয়। এর আগে ৪ ডিসেম্বর খাগড়াছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী কাঞ্চননগরে জনসংহতি সমিতির দুই সদস্যকে সন্ত্রাসীরা গুলি করে হত্যা করে। এ জন্য দায়ী করা হয় ইউপিডিএফকে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি লংগদু ও বরকল উপজেলার সীমান্তবর্তী জোটটিলা এলাকায় জনসংহতি সমিতির ৭০ জনকে অপহরণ করার অভিযোগ করা হয় ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে।

 

পার্বত্য জেলাগুলোর বিভিন্ন পাহাড়ি গ্রুপের মধ্যে এ ধরনের সঙ্ঘাত সহিংসতা ক্রমেই বাড়ছে। এর সাথে জড়িত রয়েছে প্রধানত তিনটি গ্রুপ। এর মধ্যে প্রভাবশালী ইউপিডিএফ পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরোধী, তারা পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বায়ত্তশাসন চায়। খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির অর্ধেক এলাকায় তাদের প্রাধান্য রয়েছে। আরেকটি গ্রুপ হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি। এটি শান্তিবাহিনী নামে একসময় পার্বত্য এলাকাকে বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে সশস্ত্র লড়াইয়ে লিপ্ত ছিল। ১৯৯৬ সালের পর আওয়ামী লীগ সরকার আমলে সম্পাদিত শান্তিচুক্তির পর জনসংহতির সদস্যরা অস্ত্রসমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসেন। চুক্তির অংশ হিসেবে জনসংহতি নেতা সন্তু লারমাকে আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান করা হয়। সেই থেকে এখনো পর্যন্ত তিনি আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান আছেন। চুক্তিকে কেন্দ্র করে ইউপিডিএফ জনসংহতি থেকে প্রথম বেরিয়ে আসে। পরে এম এন লারমা গ্রুপ হিসেবে সংস্কারপন্থী আরেকটি গ্রুপ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় সন্তুর মূল ধারা থেকে। সংস্কারপন্থীদের দাবি, সন্তু সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিয়ে পাহাড়িদের স্বার্থের কথা ভুলে গিয়ে এখন সরকারের দালালের ভূমিকায় নেমেছেন। ইউপিডিএফ এবং সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধেও পাল্টা অভিযোগ রয়েছে সন্তুর। তবে বাস্তবতা হলোÑ পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রশাসনিক পদগুলোতে সন্তুর সহযোগীরা থাকলেও বাস্তব ময়দানে তার কর্তৃত্ব আগের মতো নেই। সন্তুর নিয়ন্ত্রণ এখন ২০ শতাংশের বেশি এলাকায় নেই বলে মনে করা হয়।

 

পাহাড়ে এই গ্রুপ দ্বন্দ্বের মূল কারণ হলো পাহাড়ি সম্পদ আহরণ ও তা থেকে চাঁদা আদায়। সেখানকার দুর্গম এলাকায় সরকারের শিথিল নিয়ন্ত্রণের সুযোগ নেয় সশস্ত্র পাহাড়ি গ্রুপগুলো । চাঁদাবাজির এই নিয়ন্ত্রণ নিয়েই তাদের মধ্যে সঙ্ঘাত-সংঘর্র্ষের ঘটনা ঘটে থাকে।

আমরা মনে করি, পাহাড়ে শান্তি আনতে হলে সেখানকার সঙ্কটের মূলে দৃষ্টি দিতে হবে। সেখানকার ভূমির মালিকানা নিষ্পত্তি করতে হবে। তবে তাতে পাহাড়িদের ভূমির মালিকানা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনিভাবে সেখানকার ৫০ শতাংশ বাঙালি অধিবাসীর অধিকারেরও স্বীকৃতি থাকতে হবে। অন্য দিকে প্রশাসনিক পদ-পদবিতে সেখানকার অধিবাসীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে সব স্থানীয় পরিষদে নির্বাচনের ব্যবস্থাও করতে হবে।

এটি করা হলে সঙ্ঘাত কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা, জাতীয় সার্বভৌমত্ব, ছোটবড় সব গ্রুপের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মৌলিক অধিকারগুলোর নিশ্চয়তা বিধান হতে পারে পাহাড়ের সমস্যা সমাধানের মূল মানদণ্ড।

শেয়ার করুন