স্পোর্টস ডেস্ক: এটাকে কী বলা যায়? সমালোচকদের মুখে ছাই, নাকি বার্সেলোনার জাদুকরী ফুটবল! কাল রাতে ন্যু ক্যাম্পে যা ঘটল, সেটাকে যে যেভাবেই দেখুন, একটি কথা স্বীকার করতেই হবে—সাম্প্রতিক সময়ে নিজেদের নিয়ে চারদিকে যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, তার একটা মোক্ষম জবাব দিয়ে দিল কাতালানরা। এসি মিলানকে নিজেদের মাঠে, দ্বিতীয় লেগের ম্যাচে ৪-০ (হোম-অ্যাওয়ে মিলিয়ে ৪-২) গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের শেষ আট নিশ্চিত করল তারা অনন্য ঢংয়ে। ইতিহাসের প্রথম দল হিসেবে বার্সেলোনা ২ গোলের ঘাটতি পুষিয়ে, প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলে সবাইকে দেখিয়ে দিল আক্রমণাত্মক ফুটবলটা আসলে কী!
বার্সেলোনার সাফল্যে লিওনেল মেসিকে সফল হতে হয়। কাল ন্যু ক্যাম্পেও তার ব্যত্যয় ঘটেনি। নিজে দুই গোল করেছেন। অন্যদের খেলিয়েছেন। এসি মিলানের সমর্থকদের প্রত্যাশার বাড়া ভাতে ছাই ঢেলে দিতে কাল ন্যু ক্যাম্পে কেবল মেসিই ছিলেন না; জাভি, ইনিয়েস্তা, জর্দি আলবা, ডেভিড ভিয়া কিংবা দানি আলভেজ—সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে খেলেছেন নিজেদের সেরা ফুটবলটা। বার্সা ফুটবলারদের সম্মিলিত কারিশমার কাছে কাল এক ফুঁত্কারেই উড়ে গেছে সাতবারের ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়ন এসি মিলানের প্রত্যাশা, স্বপ্ন—সবকিছুই।
খেলা শুরুর মাত্র পাঁচ মিনিটের মাথায় বার্সাকে এগিয়ে দেন মেসি। বাঁ পায়ের এক চকিত শটে এসি মিলানের জাল কাঁপিয়ে দেন তিনি। গোল খেয়ে উজ্জীবিত হওয়ার বদলে বার্সার আক্রমণাত্মক ফুটবলের কাছে বারবার পরাজিত হয়েছে এসি মিলান। পুরো ম্যাচেই এসি মিলানের ফুটবলারদের শরীরী ভাষা ছিল ‘ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি’র মতো। আক্রমণাত্মক ফুটবলের প্রদর্শনী কাকে বলে, সেটা পুরোমাত্রায় বিশ্বকে কাল দেখিয়ে দিয়েছে বার্সেলোনা। বিরতির ঠিক আগ দিয়ে মেসি নিজের দ্বিতীয় গোল করেন।দলকে উজ্জীবিত করে তোলেন এক অনন্য অর্জনের পথে। মেসির দেখিয়ে দেওয়া পথে হেঁটেই দ্বিতীয়ার্ধে ডেভিড ভিয়া ও জর্দি আলবা আরও দুটো গোল করেন। খেলার অন্তিম মুহূর্তে জর্দি আলবার গোলটি হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবেগের ফল্লুধারা ঢেকে দেয় পুরো ন্যু ক্যাম্পকে। সেই আবেগে ছিল নিন্দুকদের কথা মিথ্যা প্রমাণ করার এক অনাবিল আনন্দ।
আগেই বলা হয়েছে, পুরো খেলায় এসি মিলানের ওপর কর্তৃত্ব ফলিয়েছে বার্সেলোনা। বার্সার আক্রমণের তোড় পুরো খেলায় বারবার মিলানকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে তাদের অর্ধে। মিলানের রক্ষণ সেনানীরা পুরো ম্যাচেই ব্যস্ত ছিলেন মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তাদের আক্রমণের ঝড় সামাল দিতে। খেলার ধারা অনুযায়ী স্কোরশিটে যদি বার্সেলোনার পক্ষে চার গোলের বেশি লেখা হতো, তাহলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকত না।
বার্সেলোনার প্রথম গোলটি আসে লিওনেল মেসি ও জাভির যুগলবন্দীতে। মিলানের রক্ষণসীমায় দুজন পাস খেলে ঢুকে পড়েন অবলীলায়। এ পর্যায়ে বল মেসির পায়ে এলে তিনি বাঁ পায়ের এক শটে বল জালে জড়িয়ে দেন। মেসির পা থেকে বেরোনো বাঁক খাওয়া শটটির গতিপথ কেবল চোখ চেয়ে দেখেছেন এসি মিলানের গোলরক্ষক ক্রিস্টিয়ান আবিয়াত্তি।
এক গোলে পিছিয়ে যাওয়ার পর মিলান আরও দুটি গোল খেতে পারত।প্রথমটি ব্যর্থ হয় গোলরক্ষক আবিয়াত্তির দৃঢ়তায়। ইনিয়েস্তার দারুণ এক ভলি আবিয়াত্তি কোনোমতে হাত ছুঁয়ে বারের ওপর দিয়ে পাঠিয়ে দেন। এরপর জাভির আরও একটি দূরপাল্লার শট লক্ষ্যভ্রষ্ট হয় অল্পের জন্য।
এত কিছুর পরও মিলানের সামনে এসেছিল গোল করার দারুণ এক সুযোগ। বার্সার রক্ষণভাগের হাভিয়ের মাচেরানো হেড করতে গিয়ে একটি বল মিস করে বসলে বল পেয়ে যান এসি মিলানের এমবায়ে নিয়াং। নিয়াং বল ধরে এগিয়ে গিয়ে তা গোলে মারেন। কিন্তু বলটি বার্সেলোনা গোলরক্ষক ভিক্টর ভালদেসকে পরাস্ত করলেও পোস্টে লেগে প্রতিহত হয়। এই দুর্ভাগ্যজনক মিসই হয়তো ছিল কাল ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট।
বার্সেলোনার দ্বিতীয় গোলটি মেসি করেন আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার এক অসাধারণ পাস থেকে বল পেয়ে। প্রায় মধ্যমাঠ থেকে বাড়ানো ইনিয়েস্তার থ্রু খুঁজে নেয় মেসির জাদুকরী পা। মেসি পেনাল্টি বক্সের বাইরে থেকে বল আবিয়াত্তিকে পরাস্ত করেন অসাধারণ দক্ষতায়।
দ্বিতীয় গোলটির সঙ্গে সঙ্গে মেসি চ্যাম্পিয়নস লিগে পূর্ণ করেন তাঁর ৫৮তম গোল। কালকের দুটি গোলে মেসি পেছনে ফেলেছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাবেক স্ট্রাইকার রুদ ফন নিস্তেলরুইকে। মেসির ওপরে এখন আছেন কেবল রিয়াল মাদ্রিদের সাবেক তারকা রাউল গঞ্জালেস (৭১ গোল)।
খেলার ৫৫ মিনিটের মাথায় ম্যাচে ৩-০ গোলে এগিয়ে যায় বার্সেলোনা। এবার বার্সার পক্ষে গোলদাতা ডেভিড ভিয়া। তিনি প্রথম একাদশে নিজের অন্তর্ভুক্তির যথার্থতা প্রমাণ করেন দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত এক গোল করে। জাভির বাড়ানো এক বল ভিয়া পেয়ে যান ডান প্রান্তে। দারুণ দক্ষতায় তিনি ডান দিক থেকে বল বাঁ পায়ে নিয়ে বল ঠেলে দেন এসি মিলানের জালে।
তিন গোলে পিছিয়ে থেকে সর্বশক্তি দিয়ে অন্তত একটি গোলের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে এসি মিলান। কোচ আলেগরি নিয়াং ও অ্যামব্রোসিনির পরিবর্তে মাঠে পাঠান সুলে মুন্তারি ও রবিনহোকে। এই পরিবর্তনে উজ্জীবিত হয়েই কিনা দ্বিতীয়ার্ধের শেষদিকে বেশ আক্রমণাত্মক ছিল এসি মিলান। তবে এ সময় আরও একটি গোল খেয়ে যেতে পারত তারা।আলেক্সিস সানচেজের একটি গোল এ সময় অফসাইডের অজুহাতে বাতিল হয়ে যায়। তবে ম্যাচের একদম অন্তিম মুহূর্তে এসি মিলানকে ‘এক হালি’ গোলের লজ্জায় ফেলে দেন জর্দি আলবা। আলেক্সিস সানচেজের দারুণ এক পাস থেকে গোটা ন্যু ক্যাম্পকে উন্মাতাল করে দেন এই আলবা।
পরিসমাপ্তি ঘটে কাতালানদের এক স্বপ্নময় কাহিনিচিত্রের।
১৩ মার্চ/নিউজরুম









