ফজিলা তেজগাঁও রেললাইন ধরা বস্তি এলাকার ঝুপড়ি ঘরের বেড়াকাটা ফোকরে বসে দিনের বেশির ভাগ সময় দেখেন, ট্রেন আসে-ট্রেন যায়। চড়া হুইসেল বাজিয়ে। এসব ট্রেন কোত্থেকে আসে, কোথায় যায়, তাঁর জানা নেই। মাঝে মাঝে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে ভাবেন, এ ট্রেন কি পদ্মানদীর ধারে-কাছে যায় কিংবা মানিকগঞ্জের কোথাও?
বাবার দেওয়া নাম ফজিলাতুননেছা, গাঁয়ে তা ছিল ফজিলাতুন। ঢাকা শহরে এসে নামটা আরও একটু খাটো হয়ে হয়েছে ‘ফজিলা’। যত সংক্ষিপ্ত তাতে তত কম সময় লাগে। এই শহরে সময়ের বড় সংকট।
ফজিলা ঢাকায় এসেছে ছেলে ইব্রাহিম ফকির ও তার স্ত্রী জয়তুনের হাত ধরে। শখে নয়, বিপদে পড়ে। পদ্মানদীর ভাঙন তাঁদের ঘরছাড়া করেছে।তাঁরা এসেছে মানিকগঞ্জের দিঘিনালা থেকে। পদ্মার পাড়ে তাঁদের ঘরদোর ছিল।পদ্মায় ছিল অফুরান ইলিশও। তাঁদের ছোট্ট উঠানে ছিল বকুল ফুলের গাছ আর ডালিমের চারা। চরের ভেসে ওঠা জমিতে বর্গা ফসল ওঠাতে যেত বাপ-বেটা। খুউব সকালে। মোরগ ডাকার আগে। ঘরে ফসল এলে ফজিলাতুন তা বিছিয়ে দিতেন ছোট্ট সেই উঠানে।
চরাচরের স্বল্প জলে বলয়াকার বিশাল তেজী সূর্যের আভাস দেখা দিলে উড়ন্ত বকপক্ষীর মেলা বসে যেত। তিরতিরে নদীর জলে। তাঁর মনে পড়ে, আগের দিনে চরে চখাচখি পাখি পড়ার কথাও। তখন গাঁয়ের নামকরা শিকারি সোলেমান আকন্দের দিনকাল। তিনি তাঁর দোনলা টোটা-বন্দুক কাঁধে নিয়ে বেরিয়েছিলেন। মেরেছিলেন চখাচখি। প্রথম গুলিতে একটা। যদিও তিনি নিশানা করেছিলেন দুটো একসঙ্গে।দ্বিতীয়টি উড়ে গেলে, তিনি হাঁটু গেড়ে বালুতে বসে বন্দুকের নল ওপরের দিকে তুলে যে গুলিটি ছুড়েছিলেন তা ছিল অব্যর্থ। আকাশ থেকে ডানা ঢলে অসহায়ের মতো ভেঙে পড়ে বড় আকারের পাখিটি।
সেই দৃশ্য আজও আনকোরা হয়ে আছে ফজিলাতুনের স্মৃতিতে। তিনি তখন সবে দিঘিনালা গ্রামের ফকিরবাড়িতে এসেছেন। ইজ্জত ফকিরের বউ হয়ে। তখন তাঁর বয়স ১২-১৩ হবে। অদম্য কৌতূহল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন গ্রামের আর দু-চারটা গেরস্থ বাড়ির বউ-ঝির সঙ্গে। তখন দিঘিনালা গ্রামে উৎসবের মহরত। ১০-১৫ জনের একটা মিছিল এগিয়ে চলেছে গাঁয়ের পথ ধরে। পেছন পেছন হাত ধরাধরি করে শিশুরাও। সবার আগে দোনলা বন্দুক কাঁধে সোলেমান আকন্দ।দ্বিতীয় সারিতে তাঁর স্বামী ইজ্জত ফকির। পাশে মতলুব আলী। তাঁদের কাঁধে ঝুলছে সদ্য মারা বিরল পাখি দুটি। এদের ছেড়ে দেওয়া লম্বা গলা ও পাখা নেমে গেছে বাহকের শরীর বেয়ে। তা থেকে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত।
দীর্ঘশ্বাস চাপেন বৃদ্ধা ফজিলা। তাঁর কোলে ঘুমন্ত দুই বছরের শিশু মুন্তু। তার পুরো নাম বাপের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখা। মোমতাজ ফকির। তাঁর ছেলের বউ জয়তুন, সারা দিন ইটা ভাঙে। দিনের শেষে ফুটের মাপে পয়সা পায়। তা খুব একটা বেশি হয় না।প্রথম প্রথম কোলের শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হতো। এখন সে দুধ ছেড়েছে। দাদির কাছে থাকে।
যত দিন মুন্তু কমবেশি মায়ের দুধের ওপর ছিল, তত দিন তার বাড়ন্ত শরীর এক রকম মন্দ ছিল না। মা ছাড়া মুন্তু, দাদির কাছে থেকে এক রকম জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে যেতে থাকে। এর প্রধান কারণ খাদ্য-পুষ্টির অভাব। ঘরে তেমন কিছু থাকে না। বাসি-পান্তা কিছু থাকলেও তা তার মুখে রোচে না। ফলে তার মুখে কথা ফোটে দেরিতে। নিজ শক্তিতে দাঁড়ানো-হাঁটার অভ্যাসও খুব একটা হয়নি। দাদি ধরে ধরে হাঁটানোর চেষ্টা করে সুবিধা করতে পারেননি। বস্তির পাড়ার অন্য শিশুদের মতো নিজ বলে হাঁটা-ছুটোছুটি মুন্তুর হয়ে ওঠেনি তেমন। দাদি বোঝেন, তাঁর গ্রামগঞ্জের মায়ের অভিজ্ঞতা থেকে যে শিশুদের খাদ্যতালিকার একটা আলাদা ধরন আছে, যা এখানে হয়ে ওঠা দায়। তা অভাবের তাড়নায়।
ফজিলাদের ঝুপড়ির অবস্থান থেকে তিন ঘর পরেরটার অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তেলেইঙ্গার মা তিন জায়গায় কাজ করে। সময়ের সঙ্গে দৌড়ায় সে। সকাল ছয়টা থেকে কাজ ধরে। টাকাও সে সেভাবেই কামায়, মাসে ছয়-সাত হাজার। তার সাত বছরের ছেলে তেলেইঙ্গাকে দিয়েছে কাওরান বাজার হোলসেল মার্কেটের আলুর আড়তে। এখন সে পেটেভাতে। মহাজন তেলেইঙ্গার মাকে বলেছে, মাস ছয়েক পরে শ-পাঁচেক ধইরা দিমুনে। আর তুই হাইনজার দিকে আইইছ। সময় লইয়া…।’
‘হাইনজার দিগে আইইছ’—এই সূত্রে তার আয় হয় যথেষ্ট। দিনপ্রতি পাঁচ শ থেকে এক হাজার। তার দেহাঙ্গিক, গঠন আকর্ষণীয়। কোমরে প্যাঁচ দিয়ে শাড়ি পরে। হাঁটে বুক উঁচিয়ে। মাজা দুলিয়ে। সে এসেছে পুরোনো শহরের পূর্বেকার পাকিস্তান মাঠ (এ নামটা ’৭১-এর পর বদল হলেও স্থানীয়রা এখনো এ নামেই ডাকে-চেনে) সংলগ্ন মেথরপট্টি থেকে। তার স্বামী লক্ষণ কাজ করে আসাম-বর্ডারে।থাকে সিলেট অঞ্চলে। রাতের অন্ধকারে পাশের দেশের অবৈধ মসলাপাতির বস্তা টানে। সে বছরে দু-চারবার পূজা-পার্বণে ঘরে ফেরে। তখন তেলেইঙ্গার মার আয় কমে যায়। বিশেষ করে অনিয়মিত সন্ধ্যার উপরি আয়টা।
ইব্রাহিম ট্রাকের কাজ করে।জায়গায় জায়গায় অর্ডারের ইটা-বালু নামায়। হপ্তা গেলে বেতন। দুজনের আয়ে সংসার চলে কষ্টেসিষ্টে। দু-একদিন ফিরতিপথে তেলেইঙ্গার মার সঙ্গে দেখা হয় জয়তুনের। তারা অভাবের কথা বলে। তখন সে জয়তুনকে তার পথে টানতে চায়। ‘হাইনজায় চল আমার লগে। জামাই তো ট্রাকের কাজ কইরা গরে ফিরে দেরিতে। ঘণ্টা খানেকে আয় অয় কমপক্ষে শ-পাঁচেক। কেউ কেউ বেশিও দেয়। পুরুষ মানুষের আরামের উপরে সব।তর এহনো বয়স কম…।’
জয়তুন ভীতচকিত হয়। সে এদিক-সেদিক চায়। কেউ আবার শুনে না তো?
‘এইডা কেমনে অয়। গরে মরদ আছে না। ঘরের মানুষ কেমনে জানি টের পায়। সংসার বাঙ্গে। তর সুবিধা…তর জামাই বিদেশে…।’
ফজিলাও জয়তুনের সঙ্গে ইট-ভাঙায় যেতে চেয়েছিলেন। ছেলে দেয় নাই। ছেলের কথার জের ধরে ফজিলা তাঁর বয়স হিসাব করার কথা ভাবেন সময় সময়। কিন্তু তিনি তা পেরে ওঠেন না। তবে স্বামী ইজ্জত ফকির যে কবে বা কয় বছর আগে মারা গেছেন, মোটামুটি তা তাঁর হিসাবে আছে। ২০-২৫ বছর হবে।
‘তুমি গরে থাহ ছেলে লইয়া। বয়স অইছে…এই বয়সে…।’ ফজিলা ঝুপড়ি ঘরের বেড়াকাটা ফোকরে মুখ রেখে মুন্তুকে কোলে নিয়ে বসে থাকেন। কয়েক হাত দূর দিয়ে গেছে সমান্তরাল রেল লাইন। তিনি দেখেন, দিনের সময়-অসময়ে সারা দিন সিটি বাজিয়ে ট্রেন আসে, ট্রেন যায়। এই বস্তি এলাকা ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত ট্রেনের হুইসেল থামে না। ট্রেনের লাইন ধরে অবুঝ শিশুদের আনাগোনা। ছুটোছুটির যে ক্ষান্তি নেই। মুন্তু জাগনা থাকলে ফজিলাও ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে। সে সমবয়সীদের সঙ্গে রেললাইন বা এর ধারে খেলায় থাকলে ছুটে গিয়ে তিনি তাকে ধরেন। যতক্ষণ ট্রেন এ এলাকা না ছেড়ে যায়, ততক্ষণ ফজিলা তাকে আটকে রাখেন। দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ। গত বছর চলতি ট্রেনে কাটা পড়ে একটি ১২-১৪ বছরের বাড়ন্ত ছেলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
বাড়ন্ত জ্বর নিয়ে জয়তুন ঘরে ফেরে। এসেই শুয়ে পড়ে। ফজিলা চুলায় ভাত চড়ান। ইব্রাহিম কখন ফিরবে ঠিক নেই।
তাঁদের সংসারের হিসাব, দিন আনা-দিন খাওয়া। জয়তুন তিন দিন জ্বর নিয়ে পড়ে থাকলে ফজিলা হিসাব করতে বসেন।
‘বউগো গরে যে চাইল নাই। আমি গুইরা আইয়ি। তুমি মুন্তুরে দেইক্কো।’
দিন শেষে এক মুঠি চাল নিয়ে ফেরেন ফজিলা। সঙ্গে কিছু ফেলনা শুঁটকিও।
‘ছোটখাটো একটা কাজ পাইলাম। হুটকি মাছের আড়তে পোকা বাছা। মাছের মধ্যে যে এত পোকা আমার জানা আছিল না। পোকা বাইচ্চা কী একটা পাউডার দিতে হয়। হপ্তাভর কাজ পাইছি। সহজ কাজ…তুমি চিন্তা কইর না বউ…।
ইব্রাহিম বাড়ি ফিরলে কুপির আলোতে সবাই মিলে খায়। মজা করে। ভাত-শুঁটকি। পদ্মার নোনা ইলিশ না হলে কি, মাছ তো।
ভোররাতের দিকে শুরু হয় মুন্তুর বমি, প্রস্রাব-পায়খানা। বিরতিহীন। আধা ঘণ্টার মধ্যে হালকা থেকে প্রবল খিঁচুনির পালা শুরু হয়ে যায় তার। গরমের মধ্যেও মুন্তুর শীতের কাঁপন থামে না। জয়তুন-ফজিলার কান্নাকাটি, হইচই শুনে রেললাইনের ওই পারের ইদু মুন্সি এগিয়ে আসেন। তাঁর মাথায় টুপি। হাতে তসবিহছড়া।
মুন্তু ততক্ষণে হাত-পা ছেড়ে চোখ উল্টিয়ে দিয়েছে। দেহ হয়ে যেতে থাকে অসাড়-ঠান্ডা।
ইদু মুন্সি জয়তুনের কাছে এক গ্লাস পানি চান। বার তিনেক পানিতে ফুঁ দিয়ে তা মুন্তুর গায়ে ছিটিয়ে দেন। পা থেকে মাথা পর্যন্ত।
‘ছেলেডারে জিন-ভূত দুইডাঐ এক সাথে ধরছে। আল্লাহ….আল্লাহ….করেন। লক্ষণ খারাপ।’
ছুটে আসে তেলেইঙ্গার মা।
‘এখখনঐ চল কলেরা হাসপাতালে। মহাখালী…।’
ইব্রাহিম কোলে তুলে নেয় মুন্তুকে। হেঁটে চলে রাস্তার দিকে। রিকশার খোঁজে। পেছন পেছন জয়তুন-তেলেইঙ্গার মা।
কলেরা হাসপাতালের ডাক্তার তাঁর গতানুগতিক ভাষায় বলে দেন, ‘দেরি হয়ে গেছে।’ তিনি হেঁটে যান অপেক্ষারত সারির অন্য রোগীর দিকে। বিলাপ করে কাঁদেন জয়তুন-ইব্রাহিম। কাঁদে তেলেইঙ্গার মাও। মুন্তুর মৃতদেহ নিয়ে তারা বস্তিতে ফিরে এলে ইদু মুন্সি আসেন সবার আগে। ‘সূর্য উঠলে ওই ছেড়াডারে একবারে আজিমপুর লইয়া যাও। দাফন-কাফন এহানে করা ঠিক অইত না। জিন-ভূতের আছরের মরা।আর একডা কতা…ওই মেথরানি তেলেইঙ্গার মা যেন মুর্দারে না ছোয়…মুসলমানের ছাওয়াল।’
সবার কাছ থেকে বিদায় নেয় ইব্রাহিম। তাঁর কোলে মৃত মুন্তু।জীর্ণ-শীর্ণ দুই বছরের কোলের শিশুর ভার বাবার কাছে আজ বিশাল বোঝার মতো।তাঁর গন্তব্যস্থল আজিমপুর। মুন্তুর মা বিলাপ করছে। কেঁদে চলেছেন দাদি ফজিলাও। এগিয়ে চলা ইব্রাহিম যেন শুনতে থাকে, পেছন থেকে তার মা বলছেন, ‘আমার মুন্তুরে তুই আজিমপুর না….লইয়া যা দিঘিনালা, পদ্মার পাড়, মানিকগঞ্জ।আমগোর ভিটাবাড়ি আমগোর গোরস্থানে…। তেলেইঙ্গার মা এসে ইব্রাহিমের হাতে একটা পাঁচ শ টাকার নোট গুঁজে দেয়। ‘রাহেন পথে লাগব।’
দ্রুত পথ ভাঙে ইব্রাহিম। কোলে তার মৃত শিশু ছেলে। সে সিএনজি ধরে। গাবতলী যাবে। ধরবে মানিকগঞ্জের বাস। সামনে তার দিঘিনালা গ্রাম। পদ্মার চর। চরে সাদা বক-পক্ষীর মেলা।
৯ মার্চ, ২০১৩,








