নদীর ভাঙন

0
262
Print Friendly, PDF & Email

ফজিলা তেজগাঁও রেললাইন ধরা বস্তি এলাকার ঝুপড়ি ঘরের বেড়াকাটা ফোকরে বসে দিনের বেশির ভাগ সময় দেখেন, ট্রেন আসে-ট্রেন যায়চড়া হুইসেল বাজিয়েএসব ট্রেন কোত্থেকে আসে, কোথায় যায়, তাঁর জানা নেইমাঝে মাঝে তিনি অন্যমনস্ক হয়ে ভাবেন, এ ট্রেন কি পদ্মানদীর ধারে-কাছে যায় কিংবা মানিকগঞ্জের কোথাও?
বাবার দেওয়া নাম ফজিলাতুননেছা, গাঁয়ে তা ছিল ফজিলাতুনঢাকা শহরে এসে নামটা আরও একটু খাটো হয়ে হয়েছে ফজিলাযত সংক্ষিপ্ত তাতে তত কম সময় লাগেএই শহরে সময়ের বড় সংকট
ফজিলা ঢাকায় এসেছে ছেলে ইব্রাহিম ফকির ও তার স্ত্রী জয়তুনের হাত ধরেশখে নয়, বিপদে পড়েপদ্মানদীর ভাঙন তাঁদের ঘরছাড়া করেছেতাঁরা এসেছে মানিকগঞ্জের দিঘিনালা থেকেপদ্মার পাড়ে তাঁদের ঘরদোর ছিলপদ্মায় ছিল অফুরান ইলিশওতাঁদের ছোট্ট উঠানে ছিল বকুল ফুলের গাছ আর ডালিমের চারাচরের ভেসে ওঠা জমিতে বর্গা ফসল ওঠাতে যেত বাপ-বেটাখুউব সকালেমোরগ ডাকার আগেঘরে ফসল এলে ফজিলাতুন তা বিছিয়ে দিতেন ছোট্ট সেই উঠানে
চরাচরের স্বল্প জলে বলয়াকার বিশাল তেজী সূর্যের আভাস দেখা দিলে উড়ন্ত বকপক্ষীর মেলা বসে যেততিরতিরে নদীর জলেতাঁর মনে পড়ে, আগের দিনে চরে চখাচখি পাখি পড়ার কথাওতখন গাঁয়ের নামকরা শিকারি সোলেমান আকন্দের দিনকালতিনি তাঁর দোনলা টোটা-বন্দুক কাঁধে নিয়ে বেরিয়েছিলেনমেরেছিলেন চখাচখিপ্রথম গুলিতে একটাযদিও তিনি নিশানা করেছিলেন দুটো একসঙ্গেদ্বিতীয়টি উড়ে গেলে, তিনি হাঁটু গেড়ে বালুতে বসে বন্দুকের নল ওপরের দিকে তুলে যে গুলিটি ছুড়েছিলেন তা ছিল অব্যর্থআকাশ থেকে ডানা ঢলে অসহায়ের মতো ভেঙে পড়ে বড় আকারের পাখিটি
সেই দৃশ্য আজও আনকোরা হয়ে আছে ফজিলাতুনের স্মৃতিতেতিনি তখন সবে দিঘিনালা গ্রামের ফকিরবাড়িতে এসেছেনইজ্জত ফকিরের বউ হয়েতখন তাঁর বয়স ১২-১৩ হবেঅদম্য কৌতূহল নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলেন গ্রামের আর দু-চারটা গেরস্থ বাড়ির বউ-ঝির সঙ্গেতখন দিঘিনালা গ্রামে সবের মহরত১০-১৫ জনের একটা মিছিল এগিয়ে চলেছে গাঁয়ের পথ ধরেপেছন পেছন হাত ধরাধরি করে শিশুরাওসবার আগে দোনলা বন্দুক কাঁধে সোলেমান আকন্দদ্বিতীয় সারিতে তাঁর স্বামী ইজ্জত ফকিরপাশে মতলুব আলীতাঁদের কাঁধে ঝুলছে সদ্য মারা বিরল পাখি দুটিএদের ছেড়ে দেওয়া লম্বা গলা ও পাখা নেমে গেছে বাহকের শরীর বেয়েতা থেকে পড়ছে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত
দীর্ঘশ্বাস চাপেন বৃদ্ধা ফজিলাতাঁর কোলে ঘুমন্ত দুই বছরের শিশু মুন্তুতার পুরো নাম বাপের নামের সঙ্গে মিলিয়ে রাখামোমতাজ ফকিরতাঁর ছেলের বউ জয়তুন, সারা দিন ইটা ভাঙেদিনের শেষে ফুটের মাপে পয়সা পায়তা খুব একটা বেশি হয় নাপ্রথম প্রথম কোলের শিশুটিকে সঙ্গে নিয়ে যেতে হতোএখন সে দুধ ছেড়েছেদাদির কাছে থাকে
যত দিন মুন্তু কমবেশি মায়ের দুধের ওপর ছিল, তত দিন তার বাড়ন্ত শরীর এক রকম মন্দ ছিল নামা ছাড়া মুন্তু, দাদির কাছে থেকে এক রকম জীর্ণ-শীর্ণ হয়ে যেতে থাকেএর প্রধান কারণ খাদ্য-পুষ্টির অভাবঘরে তেমন কিছু থাকে নাবাসি-পান্তা কিছু থাকলেও তা তার মুখে রোচে নাফলে তার মুখে কথা ফোটে দেরিতেনিজ শক্তিতে দাঁড়ানো-হাঁটার অভ্যাসও খুব একটা হয়নিদাদি ধরে ধরে হাঁটানোর চেষ্টা করে সুবিধা করতে পারেননিবস্তির পাড়ার অন্য শিশুদের মতো নিজ বলে হাঁটা-ছুটোছুটি মুন্তুর হয়ে ওঠেনি তেমনদাদি বোঝেন, তাঁর গ্রামগঞ্জের মায়ের অভিজ্ঞতা থেকে যে শিশুদের খাদ্যতালিকার একটা আলাদা ধরন আছে, যা এখানে হয়ে ওঠা দায়তা অভাবের তাড়নায়
ফজিলাদের ঝুপড়ির অবস্থান থেকে তিন ঘর পরেরটার অপেক্ষাকৃত কম বয়সী তেলেইঙ্গার মা তিন জায়গায় কাজ করেসময়ের সঙ্গে দৌড়ায় সেসকাল ছয়টা থেকে কাজ ধরেটাকাও সে সেভাবেই কামায়, মাসে ছয়-সাত হাজারতার সাত বছরের ছেলে তেলেইঙ্গাকে দিয়েছে কাওরান বাজার হোলসেল মার্কেটের আলুর আড়তেএখন সে পেটেভাতেমহাজন তেলেইঙ্গার মাকে বলেছে, মাস ছয়েক পরে শ-পাঁচেক ধইরা দিমুনেআর তুই হাইনজার দিকে আইইছসময় লইয়া…
হাইনজার দিগে আইইছ’—এই সূত্রে তার আয় হয় যথেষ্টদিনপ্রতি পাঁচ শ থেকে এক হাজারতার দেহাঙ্গিক, গঠন আকর্ষণীয়কোমরে প্যাঁচ দিয়ে শাড়ি পরেহাঁটে বুক উঁচিয়েমাজা দুলিয়েসে এসেছে পুরোনো শহরের পূর্বেকার পাকিস্তান মাঠ (এ নামটা ৭১-এর পর বদল হলেও স্থানীয়রা এখনো এ নামেই ডাকে-চেনে) সংলগ্ন মেথরপট্টি থেকেতার স্বামী লক্ষণ কাজ করে আসাম-বর্ডারেথাকে সিলেট অঞ্চলেরাতের অন্ধকারে পাশের দেশের অবৈধ মসলাপাতির বস্তা টানেসে বছরে দু-চারবার পূজা-পার্বণে ঘরে ফেরেতখন তেলেইঙ্গার মার আয় কমে যায়বিশেষ করে অনিয়মিত সন্ধ্যার উপরি আয়টা
ইব্রাহিম ট্রাকের কাজ করেজায়গায় জায়গায় অর্ডারের ইটা-বালু নামায়হপ্তা গেলে বেতনদুজনের আয়ে সংসার চলে কষ্টেসিষ্টেদু-একদিন ফিরতিপথে তেলেইঙ্গার মার সঙ্গে দেখা হয় জয়তুনেরতারা অভাবের কথা বলেতখন সে জয়তুনকে তার পথে টানতে চায়হাইনজায় চল আমার লগেজামাই তো ট্রাকের কাজ কইরা গরে ফিরে দেরিতেঘণ্টা খানেকে আয় অয় কমপক্ষে শ-পাঁচেককেউ কেউ বেশিও দেয়পুরুষ মানুষের আরামের উপরে সবতর এহনো বয়স কম…
জয়তুন ভীতচকিত হয়সে এদিক-সেদিক চায়কেউ আবার শুনে না তো?
এইডা কেমনে অয়গরে মরদ আছে নাঘরের মানুষ কেমনে জানি টের পায়সংসার বাঙ্গেতর সুবিধা…তর জামাই বিদেশে…
ফজিলাও জয়তুনের সঙ্গে ইট-ভাঙায় যেতে চেয়েছিলেনছেলে দেয় নাইছেলের কথার জের ধরে ফজিলা তাঁর বয়স হিসাব করার কথা ভাবেন সময় সময়কিন্তু তিনি তা পেরে ওঠেন নাতবে স্বামী ইজ্জত ফকির যে কবে বা কয় বছর আগে মারা গেছেন, মোটামুটি তা তাঁর হিসাবে আছে২০-২৫ বছর হবে
তুমি গরে থাহ ছেলে লইয়াবয়স অইছে…এই বয়সে…ফজিলা ঝুপড়ি ঘরের বেড়াকাটা ফোকরে মুখ রেখে মুন্তুকে কোলে নিয়ে বসে থাকেনকয়েক হাত দূর দিয়ে গেছে সমান্তরাল রেল লাইনতিনি দেখেন, দিনের সময়-অসময়ে সারা দিন সিটি বাজিয়ে ট্রেন আসে, ট্রেন যায়এই বস্তি এলাকা ছেড়ে না যাওয়া পর্যন্ত ট্রেনের হুইসেল থামে নাট্রেনের লাইন ধরে অবুঝ শিশুদের আনাগোনাছুটোছুটির যে ক্ষান্তি নেইমুন্তু জাগনা থাকলে ফজিলাও ভীত-সন্ত্রস্ত থাকেসে সমবয়সীদের সঙ্গে রেললাইন বা এর ধারে খেলায় থাকলে ছুটে গিয়ে তিনি তাকে ধরেনযতক্ষণ ট্রেন এ এলাকা না ছেড়ে যায়, ততক্ষণ ফজিলা তাকে আটকে রাখেনদুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণগত বছর চলতি ট্রেনে কাটা পড়ে একটি ১২-১৪ বছরের বাড়ন্ত ছেলে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল
বাড়ন্ত জ্বর নিয়ে জয়তুন ঘরে ফেরেএসেই শুয়ে পড়েফজিলা চুলায় ভাত চড়ানইব্রাহিম কখন ফিরবে ঠিক নেই
তাঁদের সংসারের হিসাব, দিন আনা-দিন খাওয়াজয়তুন তিন দিন জ্বর নিয়ে পড়ে থাকলে ফজিলা হিসাব করতে বসেন
বউগো গরে যে চাইল নাইআমি গুইরা আইয়িতুমি মুন্তুরে দেইক্কো
দিন শেষে এক মুঠি চাল নিয়ে ফেরেন ফজিলাসঙ্গে কিছু ফেলনা শুঁটকিও
ছোটখাটো একটা কাজ পাইলামহুটকি মাছের আড়তে পোকা বাছামাছের মধ্যে যে এত পোকা আমার জানা আছিল নাপোকা বাইচ্চা কী একটা পাউডার দিতে হয়হপ্তাভর কাজ পাইছিসহজ কাজ…তুমি চিন্তা কইর না বউ…
ইব্রাহিম বাড়ি ফিরলে কুপির আলোতে সবাই মিলে খায়মজা করেভাত-শুঁটকিপদ্মার নোনা ইলিশ না হলে কি, মাছ তো
ভোররাতের দিকে শুরু হয় মুন্তুর বমি, প্রস্রাব-পায়খানাবিরতিহীনআধা ঘণ্টার মধ্যে হালকা থেকে প্রবল খিঁচুনির পালা শুরু হয়ে যায় তারগরমের মধ্যেও মুন্তুর শীতের কাঁপন থামে নাজয়তুন-ফজিলার কান্নাকাটি, হইচই শুনে রেললাইনের ওই পারের ইদু মুন্সি এগিয়ে আসেনতাঁর মাথায় টুপিহাতে তসবিহছড়া
মুন্তু ততক্ষণে হাত-পা ছেড়ে চোখ উল্টিয়ে দিয়েছেদেহ হয়ে যেতে থাকে অসাড়-ঠান্ডা
ইদু মুন্সি জয়তুনের কাছে এক গ্লাস পানি চানবার তিনেক পানিতে ফুঁ দিয়ে তা মুন্তুর গায়ে ছিটিয়ে দেনপা থেকে মাথা পর্যন্ত
ছেলেডারে জিন-ভূত দুইডাঐ এক সাথে ধরছেআল্লাহ….আল্লাহ….করেনলক্ষণ খারাপ
ছুটে আসে তেলেইঙ্গার মা
এখখনঐ চল কলেরা হাসপাতালেমহাখালী…
ইব্রাহিম কোলে তুলে নেয় মুন্তুকেহেঁটে চলে রাস্তার দিকেরিকশার খোঁজেপেছন পেছন জয়তুন-তেলেইঙ্গার মা
কলেরা হাসপাতালের ডাক্তার তাঁর গতানুগতিক ভাষায় বলে দেন, ‘দেরি হয়ে গেছেতিনি হেঁটে যান অপেক্ষারত সারির অন্য রোগীর দিকেবিলাপ করে কাঁদেন জয়তুন-ইব্রাহিমকাঁদে তেলেইঙ্গার মাওমুন্তুর মৃতদেহ নিয়ে তারা বস্তিতে ফিরে এলে ইদু মুন্সি আসেন সবার আগেসূর্য উঠলে ওই ছেড়াডারে একবারে আজিমপুর লইয়া যাওদাফন-কাফন এহানে করা ঠিক অইত নাজিন-ভূতের আছরের মরাআর একডা কতা…ওই মেথরানি তেলেইঙ্গার মা যেন মুর্দারে না ছোয়…মুসলমানের ছাওয়াল
সবার কাছ থেকে বিদায় নেয় ইব্রাহিমতাঁর কোলে মৃত মুন্তুজীর্ণ-শীর্ণ দুই বছরের কোলের শিশুর ভার বাবার কাছে আজ বিশাল বোঝার মতোতাঁর গন্তব্যস্থল আজিমপুরমুন্তুর মা বিলাপ করছেকেঁদে চলেছেন দাদি ফজিলাওএগিয়ে চলা ইব্রাহিম যেন শুনতে থাকে, পেছন থেকে তার মা বলছেন, ‘আমার মুন্তুরে তুই আজিমপুর না….লইয়া যা দিঘিনালা, পদ্মার পাড়, মানিকগঞ্জআমগোর ভিটাবাড়ি আমগোর গোরস্থানে…তেলেইঙ্গার মা এসে ইব্রাহিমের হাতে একটা পাঁচ শ টাকার নোট গুঁজে দেয়রাহেন পথে লাগব
দ্রুত পথ ভাঙে ইব্রাহিমকোলে তার মৃত শিশু ছেলেসে সিএনজি ধরেগাবতলী যাবেধরবে মানিকগঞ্জের বাসসামনে তার দিঘিনালা গ্রামপদ্মার চরচরে সাদা বক-পক্ষীর মেলা

 

৯ মার্চ, ২০১৩,

 

শেয়ার করুন