ট্রাইব্যুনালের তৃতীয় রায় এত বিতর্ক গ্লানিমুক্ত করে না

0
82
Print Friendly, PDF & Email

২ মার্চ, ২০১৩।।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার রায় ঘোষণা করেছেন। মাওলানা সাঈদীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর মধ্য থেকে দু’টিকে প্রমাণিত ধরে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ডাদেশ ঘোষণা করেন। তার বিরুদ্ধে ২০টি অভিযোগ এনে চার্জ গঠন করা হয়। এর মধ্যে আটটি অভিযোগ প্রমাণিত ধরে দু’টিকে হত্যার অভিযোগ চিহ্নিত করে সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়।

আসামিপক্ষ তাৎক্ষণিক রায় প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এই রায় ন্যায়ভ্রষ্ট। তারা ন্যায়বিচার পাননি, আপিলে ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করেন। অপর দিকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, এ রায় উদাহরণ হয়ে থাকবে। সরকারি দল, মহাজোটভুক্ত শরিক দলগুলো ও শাহবাগকেন্দ্রিক মঞ্চ থেকে এই রায়কে প্রত্যাশিত অভিহিত করে উল্লাস প্রকাশ করা হয়। জামায়াতে ইসলামী এই রায়কে বিচার বিভাগীয় হত্যা ও নাস্তিক ব্লগারদের কাছে আত্মসমর্পণ হিসেবে মন্তব্য করেছে।

বিচারপ্রক্রিয়া এখনো শেষ হয়নি। আপিল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে চূড়ান্ত মন্তব্য করা সম্ভব নয়। তবে সাধারণ মানুষ এ রায়কে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেননি, বরং তারা সরকারদলীয় লোকজন ও মহাজোটভুক্ত দলগুলোর নেতাদের বক্তব্যকে শাহবাগের প্রতিধ্বনি হিসেবে দেখেছেন। রায় নিয়ে উচ্ছ্বাস এবং পুলিশি বাড়াবাড়িকেও জনগণ মেনে নেননি। এর প্রমাণ হিসেবে বলা যায়, দলীয় ক্যাডার ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্ছ্বাস প্রকাশে জনগণ সম্পৃক্ত হননি। রায়ের পক্ষে অবস্থানকারীদের প্রতি পুলিশ প্রশাসনসহ পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। অন্য দিকে যারা রায় মানতে পারেননি, প্রতিবাদ করে ক্ষোভ জানাতে চেয়েছেন, তাদের প্রতি রাষ্ট্রযন্ত্র ও পুলিশ নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। রায়ের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেয়া আদালত অবমাননা নয় ধরে নিলে সরকারের বাড়াবাড়ি ও পুলিশের গণহত্যা কোনোভাবে মেনে নেয়া যায় না।

এই ট্রাইব্যুনাল কখনো বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠতে পারেননি। প্রশ্নবিদ্ধ ট্রাইব্যুনালের মান, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক বলয়ে বারবার বিতর্কের ঝড় তুলেছে। যে বিচারের প্রক্রিয়ায় ত্রুটি থাকে, সেই বিচারের রায়ও প্রশ্নবিদ্ধ হতে বাধ্য। মাওলানা সাঈদীকে ‘দেল্ল্যা রাজাকার’ ধরেই বিচারপ্রক্রিয়া এগিয়েছে। আসামিপক্ষ নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছেন বলে দাবি করছেন দু’জন এক ব্যক্তি নন। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল তা আমলে নেননি। সঙ্গত কারণেই পুরো রায়কে রাজনৈতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার কিংবা সরকারের ইচ্ছাপত্রের সাথে মিলিয়ে দেখার সুযোগ রয়েছে। এর সাথে শাহবাগের ব্লগারদের পুরো ‘ফাঁসি মিশনের’ সাথে সম্পর্ক যে প্রত্যক্ষ তা-ও বিবেচনায় নেয়ার মতো।

জাতি একটি স্বচ্ছ সুবিচার চেয়েছে, অবিচার নয়। অপরাধের বিচার চেয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার নয়। এখন রায় নিয়ে দেশ-বিদেশে যে প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হচ্ছে তাতে মনে হয়Ñ সরকার অপরাধের নয়, সাঈদীর বিচার চেয়েছে। একজন খ্যাতিমান আলেম ও প্রতিবাদী রাজনীতিবিদের বিচার চেয়েছে, মানবতাবিরোধী অপরাধীর নয়। একজন খ্যাতিমান আইনজীবী বলেছেন, সাঈদী সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত না হলে তার বিরুদ্ধে কোনো মামলাই হতো না। এসব মন্তব্য উড়িয়ে দেয়া সম্ভব নয়। ট্রাইব্যুনালের ওপর সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় শাহবাগকেন্দ্রিক মঞ্চ থেকে যে স্নায়বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত চাপ সৃষ্টিকারীদেরই বিজয় হওয়ার যে বক্তব্য রয়েছে, তা অমূলক ভাববার কোনো সুযোগ নেই।

আমরা আশা করেছিলাম, স্কাইপ বিতর্কের পর ট্রাইব্যুনাল নিয়ে সব বিতর্কের অবসান ঘটানোর যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল, সরকার তা আমলে নেবে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিযোগগুলোও বিবেচনায় নেবে। সরকার সে পথে যায়নি; বরং ট্রাইব্যুনালকে আরো বিতর্কিত করার জন্য দ্বিতীয় রায়ের পর আইন সংশোধন করে বিতর্ককে আরো বাড়িয়েছে। সঙ্গত কারণেই বিতর্কিত আদালতের প্রশ্নবিদ্ধ রায় গ্লানিমুক্ত না করে গ্লানি বাড়িয়ে দেবে। সরকার সম্ভবত জনগণের মনের ভাষা ও হৃৎস্পন্দন বুঝতে চায় না। আন্তর্জাতিক মান রক্ষার দায়ও সরকারের নেই। তাই পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ বানিয়ে এগোতে চাচ্ছেÑ যা গ্রহণযোগ্য নয়, একই সাথে নিন্দনীয়ও। একটি ফাঁসি বা মৃত্যুদণ্ড শেষ কথা নয়, বিশ্বাসযোগ্য সুবিচার ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠাই বড় কথা। সে ক্ষেত্রে সরকার শুধু ব্যর্থই নয়, ট্রাইব্যুনালের সব কর্মকাণ্ডকেও প্রশ্নের মুখোমুখি ও অবিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে।

শেয়ার করুন