‘জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ড’

0
54
Print Friendly, PDF & Email

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক: জালিয়ানওয়ালাবাগগিয়েও জালিয়ানওয়ালাবাগের নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞের জন্য ক্ষমা না চেয়েবিতর্ক উসকে দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনপ্রথমআলোর কলকাতা প্রতিনিধি লিখেছেন জায়গাটি ঘুরে এসে

ভারতের পাঞ্জাবরাজ্যের শিখ ধর্মাবলম্বীদের পুণ্য শহর অমৃতসরের জালিয়ানওয়ালাবাগএরপাশেই শিখ তীর্থভূমি স্বর্ণমন্দিরগত শতকের গোড়ার দিকে এইজালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশরা চালায় ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কজনকহত্যাকাণ্ড যা জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডনামে পরিচিতএ ঘটনার দীর্ঘ৯৪ বছর পর গত ২০ ফেব্রুয়ারি হত্যাকাণ্ডস্থলে এসে এই প্রথম ক্ষমতায় থাকাএকজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করেছেনসেই প্রধানমন্ত্রীর নামডেভিড ক্যামেরন
কেন এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড আর কেনই বা এই দুঃখ প্রকাশ? ১৯১৯ সালের ১৩ এপ্রিল, রোববারদিনটি ছিল শিখদের নববর্ষ উসবস্বর্ণমন্দিরসংলগ্ন জালিয়ানওয়ালাবাগে বিশেষ প্রার্থনাসভায় উপস্থিতহয়েছিলেন অমৃতসরের নানা ধর্মের অন্তত ২০ হাজার মানুষশহরে তখন চলছেসামরিক আইন রাওলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনআন্দোলন থামাতে ব্রিটিশসরকার জারি করেছে ১৪৪ ধারাসে ধারা ভঙ্গ করেই নববর্ষ উসব পালনের জন্যসবাই সমবেত হয়েছে জালিয়ানওয়ালাবাগের ঐতিহাসিক ময়দানেময়দানের চারপাশদেয়াল দিয়ে ঘেরাপ্রবেশদ্বারও ছোটব্রিটিশ ব্রিগেডিয়ার জেনারেলডায়ারের কানে পৌঁছে যায় এই জমায়েতের কথাক্ষণা ডায়ার ৫০ জনরাইফেলধারী সেনা নিয়ে হাজির জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই প্রার্থনাসভায়মূলফটক বন্ধ করে নিরীহ ও নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেনএইময়দানের পাশেই ছিল একটি কুয়োগুলিবর্ষণের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে যায়উপস্থিত লোকজনগুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে একে একেচলে ছোটাছুটিপাশেরকুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষ-শিশুএকটানা ১০ মিনিট ধরে চলে গুলিবর্ষণএক হাজার ৬৫০টি গুলি কেড়ে নেয় প্রায়দেড় হাজার মানুষের প্রাণ
এ ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়লে গোটা দেশেররাজনীতি হয়ে পড়ে উত্তালব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করেখেপে ওঠেন মহাত্মা গান্ধীডাক দেন ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অসহযোগ আন্দোলনেরকবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনপ্রত্যাখ্যান করেন ব্রিটিশদের দেওয়া নাইটহুড সম্মানদেশজুড়েব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ায় গণমানুষের চাপে ব্রিটিশসরকার গঠন করে একটি তদন্ত কমিটিতদন্ত শেষে ঘোষণা দেওয়া হয় এই নারকীয়হত্যাযজ্ঞে নিহত মাত্র ৩৭৯ আর আহত এক হাজার ১০০ জনযদিও সেদিন জাতীয়কংগ্রেস দাবি করে এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হয়েছে সহস্রাধিক মানুষকালীনসিভিল সার্জন ডা. স্মিথ জানান, এই হত্যাযজ্ঞে নিহত মানুষের সংখ্যা এক হাজার৫২৬ জন
ঘটনার পরপরই ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারকে অপসারণ করে ব্রিটিশসরকারতাঁকে ফিরিয়ে নেওয়া হয় লন্ডনকিন্তু প্রতিশোধের আগুন ধিকি ধিকিজ্বলতে থাকে শিখদের মধ্যেসে আগুনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে এক শিখ যুবকলন্ডনে গিয়ে গুলি করে হত্যা করে ডায়ারকেডায়ার তখন লন্ডনের ক্যাক্সটনহলে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে ভাষণ দিচ্ছিলেন
১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতস্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫১ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগের স্মৃতি সংরক্ষণের জন্যআইন করে গড়া হয় স্মৃতিসৌধ ও স্মারকআমি এবং আলোকচিত্রী ভাস্কর মুখার্জিকলকাতা থেকে যখন প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার পথ পেরিয়ে জালিয়ানওয়ালাবাগেপৌঁছালাম তখন সকাল ১০টাশত শত মানুষ প্রবেশ করেছে এই ঐতিহাসিক ময়দানেসেদিনকার সেই হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ করতেপ্রবেশদ্বারটি এখনো সেই ছোট্টটিইরয়ে গেছেসেখান দিয়ে প্রবেশ করেই আমরা একটু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা লালবেলে পাথরের শহীদ স্মৃতিসৌধের কাছে এগিয়ে গেলামসামনে ফুলের বাগানসুন্দরভাবে সংরক্ষিতএর কাছেই সেই ঐতিহাসিক কুয়োএটিও সংরক্ষিতলোহারজাল দিয়ে ঘেরা কুয়োটির ভেতরে প্রবেশের ব্যবস্থা না থাকলেও বাইরে থেকে বেশদেখা যায়কুয়োর ওপর তৈরি করা হয়েছে একটি স্মারক ভবনজালিয়ানওয়ালাবাগের এই ঐতিহাসিক বাগানে আরও তৈরি করা হয়েছে শহীদদেরস্মরণে অমর জ্যোতিনামে শিখা অনির্বাণ২৪ ঘণ্টাই জ্বলছে এই শিখাআর সেইঐতিহাসিক প্রবেশপথের সামনে, যেখানে দাঁড়িয়ে ব্রিগেডিয়ার ডায়ারেরনির্দেশে গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল সেখানেও নির্মাণ করা হয়েছে একটি স্মারকস্তম্ভসেই স্মারক স্তম্ভের চারদিকে লেখা রয়েছে, এখান থেকেই গুলিবর্ষণকরা হয়েছিল নিরস্ত্র জনতার ওপরপ্রবেশদ্বারের আরেক পাশে রয়েছেজালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাযজ্ঞের ঐতিহাসিক স্মারকএখানে গড়া হয়েছে সেইহত্যাযজ্ঞকে নিয়ে একটি সংগ্রহশালাসেখানে রাখা হয়েছে সেই হত্যাকাণ্ডেরনানা স্মারক ও ঐতিহাসিক দলিলআর এই জাদুঘরের দোতলায় নিয়মিত প্রদর্শিতহয় জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাযজ্ঞ নিয়ে নির্মিত চলচ্চিত্র
এবার ২০ফেব্রুয়ারি জালিয়ানওয়ালাবাগের এই হত্যাযজ্ঞস্থলে এসে দুঃখ প্রকাশ করলেনব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরনতিন দিনের ভারত সফরে এসে তিনি ছুটেগিয়েছিলেন পাঞ্জাবের এই ঐতিহাসিক জালিয়ানওয়ালাবাগেশহীদ স্মৃতিসৌধেরসামনে হাঁটু গেড়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান তিনিপরিদর্শন বইয়েলিখেছেন, ‘ব্রিটিশদের ইতিহাসে এটা ছিল চরম লজ্জাজনক একটি ঘটনাএখানে যাঘটেছিল তা কোনোভাবেই ভোলার নয়
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীরজালিয়ানওয়ালাবাগ পরিদর্শনের খবর প্রচারিত হওয়ার পর শহীদ পরিবারেরসংগঠনের পক্ষ থেকে দাবি তোলা হয়েছিল এই ঘটনার জন্য ব্রিটিশপ্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমা চাইতে হবেকিন্তু সেদিনের ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশকরলেও ক্ষমা চাননি ক্যামেরন
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা চাওয়ারবিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে বলেছেন, ‘এটি লজ্জাজনক ঘটনাএর আগে ১৯২০ সালে এইঘটনাকে নিষ্ঠুরবলে মন্তব্য করেছিলেন সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীউইনস্টন চার্চিলআর ১৯৯৭ সালে ভারত সফরকালে ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয়এলিজাবেথ স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ইতিহাসের দুঃখজনকমুহূর্তগুলোর বেদনাদায়ক উদাহরণ এটি’ –

 

 

 

১ মার্চ/নিউজরুম

 

শেয়ার করুন