রুপশী বাংলা ডেস্ক: বাংলা ভাষা বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ভাষা। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, উড়িষ্যা মিলে মোট ২৫ কোটিরও বেশি লোক বাংলা ভাষায় কথা বলে। এর বাইরে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের আরও এক কোটি লোক বাংলাদেশ আর ভারতের বাইরে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন জীবিকা, ব্যবসা বা লেখাপড়ার প্রয়োজনে; যাদের মাতৃভাষা বাংলা। দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীতে এমন অনেক প্রধান ভাষা আছে, যে ভাষাতে কথা বলা লোকের সংখ্যা এক কোটিরও কম। সেদিক থেকে প্রবাসে এক কোটি বা তারও বেশি বাঙালি প্রবাসীর বাংলা ভাষাচর্চার ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় যে, এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে কোনো সরকারই তেমন একটা গুরুত্ব দিয়ে দেখেনি কোনো সময়। তাই বিদেশে বাংলা ভাষার বিস্তার ও আধিপত্যের কৌশল নির্ধারণে বাংলাদেশ সরকারের কোনো নীতিমালা নেই ইংরেজি, জার্মান বা ফরাসি ভাষার মতো। আঠারো, উনিশ আর বিশ শতকে ইংরেজ, জার্মান আর ফরাসি জাতি এশিয়া আর আফ্রিকার বহু দেশ দখল করে নিয়েছিল সামরিক শক্তির জোরে; সে জায়গা থেকে সরে এসে এসব পরাশক্তি এখন মনে করছে, এই একবিংশ শতাব্দীতে সৈন্য-সামন্ত দিয়ে নয় বরং ভাষা আর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের মধ্য দিয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগের চেয়েও অনেক সহজে একটি দেশ দখল করে ফেলা যায়। যে নীতিটি এখন ভারত অনুসরণ করছে বাংলাদেশের ব্যাপারে। আকাশ সংস্কৃতির ভয়াবহ আগ্রাসনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশী শিশু-কিশোর, তরুণ ও সাধারণ মানুষের মানসে হিন্দি ভাষা ও সংস্কৃতি এক দীর্ঘমেয়াদি আর ক্ষতিকর প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। আর বিশ্বায়ন বা গ্লোবালাইজেশনের দোহাই দিয়ে ভারতের ভাষা আর সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কাছে বাংলাদেশ নতিস্বীকার করে নিয়েছে, যার মাশুল বাংলাদেশকে আগামী দিনগুলোতে কড়ায়-গণ্ডায় পরিশোধ করতে হবে।
যেখানে ইংরেজ, জার্মান বা ফরাসিরা তাদের ভাষাকে অন্য ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে চলেছে। সে তুলনায় প্রবাসে আমাদের বাংলা ভাষাচর্চায় সরকারি কোনো সহযোগিতা নেই। আর বিদেশিদের বাংলা চর্চায় উত্সাহ বা প্রণোদনা সাহায্য কিংবা বাংলা ভাষার আধিপত্য বা বিস্তৃতির ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের কোনো আন্তর্জাতিক নীতিমালাও নেই। ঠিক বাংলাদেশের মতোই বাংলা ভাষা বিস্তারে পশ্চিমবঙ্গ সরকারেরও বাংলা বিস্তারে কোনো আন্তর্জাতিক নীতিমালা নেই।
এখানে একটি কথা বলা দরকার, ইউরোপ-আমেরিকাসহ পাশ্চাত্যের উন্নত দেশগুলোর দৃষ্টিতে ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী তো বটেই, বাংলা ভাষারও রাজধানী। আর তাই পশ্চিমবঙ্গ নয় বরং বাংলাদেশকে বিবেচনায় রেখে বিবিসি, ভয়েস অব আমেরিকা, ডয়েসে ভেলে, রেডিও ইরানসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলো তাদের নিজেদের দেশ থেকে বাংলা ভাষায় সম্প্রচার চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া প্যোলান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, চেকোশ্লোভিয়ার চার্লস বিশ্ববিদ্যালয়, লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ এশিয়ান স্টাডিজ এবং আমেরিকা ও কানাডার দুই-তিনটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগগুলো বাংলাদেশকে কেন্দ্রে রেখে বাংলা ভাষার চর্চা ও গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের নিজেদের খরচেই।
তবে বাংলা ভাষার বিস্তারে বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগের কথা স্বীকার করতেই হবে, সেটি হচ্ছে : বাংলাদেশ সরকারের উদ্যোগ ও প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই ইউনেস্কো বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০০৯ সালের পর থেকে এখন প্রতিবছর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দফতরে এবং প্যারিসের ইউনেস্কো সদর দফতরে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে উদযাপিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে জাতিসংঘ, বাংলায় একটি নিয়মিত রেডিও অনুষ্ঠান চালু করেছে, জাতিসংঘের ওয়েবসাইট থেকে এ অনুষ্ঠানটি যে কোনো বাংলাভাষী পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত থেকে শুনতে পারেন। এছাড়াও জাতিসংঘের সদর দফতরের ভেতর শহীদ মিনারের একটি রেপ্লিকা স্থাপন নিয়ে জাতিসংঘে আলোচনা চলছে।
দেখা যাচ্ছে, জাতিসংঘে ও এর অঙ্গ-প্রতিষ্ঠানগুলোতে বাংলা ভাষার প্রসারে বাংলাদেশ সরকার একমাত্র কার্যকর উদ্যোগ নিয়েছে। এর বাইরে প্রবাসে বাংলা ভাষার গবেষণা অথবা পৃথিবীর অন্যান্য ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে বাংলা ভাষাকে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য, বাংলাদেশ সরকারের প্রণোদনা বা সহযোগিতামূলক কোনো উদ্যোগ নেই। আর এর ফলে জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় বা প্যোলান্ডের ওয়ারশ বিশ্ববিদ্যালয় অথবা ডয়েসে ভেলে বা বিবিসি; এসব প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সরকারের সহযোগিতার অভাবে তাদের বাংলা ভাষা-চর্চার কার্যক্রম ও বাংলা ভাষায় প্রচারিত অনুষ্ঠানসূচিকে খুব সীমিত পরিসরে নিয়ে আসছে দিন দিন, যা খুব উদ্বেগের বিষয়।
ভাষা, আধিপত্যের যে নিয়ম মেনে চলে সেটি হচ্ছে, যে ভাষার অর্থনৈতিক আধিপত্য বেশি, সে ভাষা শিখতেই মানুষ অধিক উত্সাহী হয়। বাংলাদেশের যেহেতু বৈশ্বিক কোনো অর্থনৈতিক আধিপত্য নেই, তাই ইউরোপ বা আমেরিকা ও কানাডায় বিদেশি নাগরিকরা তো দূরের কথা, বাংলাদেশী বংশোদ্ভূতরাও বাংলা ভাষাচর্চা বা বাংলায় শিক্ষাগ্রহণে তেমন উত্সাহী হন না। যদিও ইউরোপ বা আমেরিকায় নিয়ম হচ্ছে, মাধ্যমিক স্কুলে ওঠার পর ছাত্রদের ২য় একটি ভাষা শেখার সুযোগ দেয়া হয়, কিন্তু বাংলা ভাষা আগামী দিনে বিজনেস কমিউনিটির ভাষা হয়ে উঠতে পারবে না, এ সম্ভাবনাকে মাথায় রেখে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ছাত্রছাত্রীরা বাংলা শেখায় আগ্রহী হন না। তবে আশার কথা এই যে, এরই মধ্যে চ্যানেল এস, বাংলা টিভি, এটিএন বাংলা, চ্যানেল আই, এনটিভি ও চ্যানেল নাইন মিলে ইউরোপে এখন আধাডজন টেলিভিশন চ্যানেল আর অর্ধশতেরও বেশি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রচারিত ও প্রকাশিত হচ্ছে বাংলায়। প্রবাসে বাংলাচর্চা করার জন্য প্রতিদিনই জন্ম নিচ্ছে নতুন নতুন বাংলা সংবাদপত্র আর ব্লগ। শুধু লন্ডন শহরেই রয়েছে এখন চার লাখ বাঙালি আর এখন লন্ডনের অবস্থা এমন যে, যে কোনো বাঙালি লন্ডনে গিয়ে পড়াশোনা করে, খেয়ে-দেয়ে ডিগ্রি নিয়ে বাংলাদেশে ফেরত আসতে পারেন শুধু বাংলা ব্যবহার করেই। তাই লন্ডনের মতোই ইউরোপ ও আমেরিকা বা কানাডায় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে বাংলাদেশী ছাত্রছাত্রীদের জন্য বাংলাকে পছন্দ বা নির্বাচিত করার দায়িত্ব নিতে হবে প্রবাসী বাংলাদেশী মা-বাবাদেরই। কারণ প্রবাসে আমাদের যেসব বাংলাদেশী রয়েছেন, তারা যদি বিদেশি ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষায়ও দক্ষ হয়ে উঠেন, তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও তাদের জন্য খোলা থাকবে বাংলাদেশের দরজা।প্রবাসীদের সন্তানরা বাংলা শিখে বড় হলে, একদিন যখন তারা পেশাজীবী হবে, বিশেষজ্ঞ হবে, তখন সহজেই কথাবার্তা বলতে পারছে বলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ, ব্যবসা বা চাকরির দিগন্ত খুলে যাবে। দিগন্ত খুলে যাবে প্রবাসে থাকা সব বাংলাচর্চাকারীর জন্য।
পরিশেষে এটুকুই বলব, প্রবাসে বাংলাকে অন্যান্য বিদেশি ভাষার আগ্রাসন থেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রবাসীদের আরও সচেতন হওয়া দরকার; সে সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে দরকার বাংলা ভাষা বিস্তারে সরকারি আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়ন আর সরকারের সহযোগিতা। কারণ বাংলাদেশের বাইরে বিশ্বের নানা প্রান্তে বাংলা ভাষা ছড়িয়ে পড়লে, বাংলা সংস্কৃতিও ছড়িয়ে পড়বে আর বাংলা সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়লে সংস্কৃতির হাত ধরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে যাবে বাংলাদেশের ঐতিহ্যও।
২২ ফেব্রুয়ারী/নিউজরুম








