অলংকরণ

0
46
Print Friendly, PDF & Email

২২ ফেব্রুয়ারী, ২০১৩: এই খোঁয়াড়ে আমাদের পাঁচ সদস্যের সংসারে গতকাল আরও একজন যোগ হয়েছেএখন সব মিলিয়ে আমরা ছয়জনআমরা মানে মা আর আমরা দুই বোন, সঙ্গে জ্ঞাতি দুই খালামাকে সবাই বুড়ি নামে ডাকে, আমি লালিআর আমার বোন কালিখালাদের একজন গলাছিলাআর অন্যজন ধলানামেই পরিচিতএখন নতুন অতিথিকে আমরাধইল্যানামে ডাকতে চাইলামকিন্তু এতে সে প্রবল আপত্তি তুললহতে পারে সে আমাদের ধলা খালার চাইতেও সুন্দরী, কিন্তু তাতে তো তাকে ধবল নামে ডাকা যায় নাতার জন্য ধইল্যানামটিই যুক্তিযুক্ততা ছাড়া এভাবে ডেকে আমরা অভ্যস্তকিন্তু সে যুক্তি দেখায়এত দিন যেহেতু সবাই তাকে ধবলনামে ডেকেছে, তাই আমাদেরও ডাকতে হলে তাকে ধবলনামেই ডাকতে হবেকী ঔদ্ধত্য! আমরাও অনড় থেকে বললাম, ‘ধবলনাম মুরগি জাতের জন্য নয়, ওটা বক প্রজাতির নামতবু সে অনর্থক তর্ক করলবলল, ধবধবে ফরসা বলে বকের নাম যদি ধবল বকহতে পারে, তবে মুরগির নাম কেন নয়? অকাট্য যুক্তিতার পরও মেনে নিতে কষ্ট হলো, আমরা বুঝলাম, এ বড়ই তর্কবাগীশ আর অহংকারীএকে শায়েস্তা করতে হলে সম্মিলিত বুদ্ধির প্রয়োজন
আমাদের সেই নতুন অতিথি, ধবল মুরগিকে তিন দিন ঠ্যাঙে দড়ি বেঁধে রাখা হলোআমরা বেশ খুশি হলামকালি তো বলেই ফেলল, ‘অহংকার পতনের মূলকিন্তু ধবল এ কথার কোনো উত্তর করল নাশুধু ছলছল চোখে আমাদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলআমরা তার আশপাশে কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করিপাখনা মেলে কিছু নাচের মুদ্রাও দেখাইসে কি হিংসা করছে? জানি নাসে কি দীর্ঘশ্বাস ফেলল? বুঝলাম নাবোঝার জন্য তার চারপাশে আরও কিছুক্ষণ ঘুরলামঘুরতে ঘুরতে তার জন্য কেমন একটা মায়া অনুভব করিবলি, ‘তোমার ভালোর জন্যই এমনটা করা হয়েছেসব চিনে রাখোনয়তো ছাড়া পেলে হারিয়ে গেলে তোমার নিজেরই বিপদ হবে
তার সঙ্গে কথা খুব কমই হয়কেননা, সারা দিন বাইরে থাকিমাঝে দু-একবার দেখা হয় আদার খেতে এলেতখনো আমরা খুব হুড়াহুড়ি করিবাইরের টানেসে বলে, ‘এত হুড়াহুড়ি করো কেন? গলায় আটকাবে, আস্তে খাও
আমি বলি, ‘আমরা মুরগির জাতমুখে তুলি আর গিলিএখন কি মানুষের মতো চিবিয়ে খাব?’
না, তা নয়বাইরে কী কী ঘটল? কোথাও বদ মোরগের লড়াই বাধল কি না শুনতে চাচ্ছিলাম
এখন তোমার সঙ্গে খোশগল্প শুরু করলে গিন্নিমা যখন তাড়ানি দেবে, তখন তো খাওয়াই হবে নাএ ছাড়া ভরদুপুরে বক্ বক্ গিন্নিমার একদম সহ্য হয় না
আমার কথাটা একটু ভাব তো? সারা দিন…মায়ের চেঁচামেচিতে কিছুই শোনা হলো নাইদানীং তার চিকার-চেঁচামেচি বড্ড বেড়েছেখালারা কানাঘুষা করছে, মায়ের নাকি ডিম পাড়ার সময় হয়েছেখুব ভালো কথাযত ইচ্ছে ডিম পাড়ো আর গিন্নিমাকে খুশি রাখোকিন্তু তাই বলে চিকার-চেঁচামেচি করে সবার কান ঝালাপালা করার মানে কী? আর আজকাল মা সবার সঙ্গে যাচ্ছেতাই ব্যবহার করেকথায় কথায় ঠোকর দেয়বড্ড লজ্জা লাগে মায়ের এই ব্যবহারেকিন্তু সে জন্য মায়ের কোনো অনুশোচনা নেইবরং উল্টো মা অভিযোগ করে, আমরা নাকি এখনো মুরগি হতে পারিনি, সত্যিকারের মুরগি
জানি না, সত্যিকারের মুরগি হওয়া মানে কী? তা কি কেবল ডিম পাড়া আর তা দিয়ে বাচ্চা ফোটানো? ‘গলা ছিলাখালার সঙ্গে মায়ের আর বিশেষ কোনো পার্থক্য রইল নাতার মতো মা-ও আজকাল পায়ে পাড়া দিয়ে ঝগড়া করে
ধবলকে নিয়ে সমস্যার শেষ নেইএকটা সমস্যা মিটে গেলে নতুন আরেকটা তৈরি করেএ যেন সমস্যা তৈরির কারখানাকোনো অজপাড়াগাঁ থেকে এসেছে বাবা? কোনো রুচিজ্ঞান নেইযা পায় তা-ই খায়আমরা আর যা-ই খাই, বাসি ভাত খাই নাওটা খেলে কেমন ঝিমুনি আসেকিন্তু তাকে তা বোঝাবে কে? গিন্নিমা দিচ্ছে, আর সে খেয়েই যাচ্ছেআমরা তাকে আদরে-আল্লাদে বোঝালাম, ‘ভাই রে! গরিবের পেটে লাত্থি মেরো নাতুমি খেলে তা আমাদেরও খেতে হবেও আমরা খেতে পারব নাকিন্তু কে শোনে কার কথা? গাঁইয়া ভূত কোথাকার! বলে কিনা, ‘ভাই, গরিবের ঘরে মুরগি হয়ে জন্মেছিবাসি-পচা যা পেয়েছি তা-ই খেয়ে বড় হয়েছিগায়ে তো মাংস তোমাদের চাইতে কম নাতাহলে কেন শুধু শুধু বড়লোকি দেখাব?’ আমি লালি, যে কিনা সুন্দর আর ভদ্র বলে আদরে আদরে বড় হয়েছি, সেই আমি তার পালকে পালকে ঠোঁট বুলিয়ে অনুরোধ করলাম আমাদের পায়ে কুড়াল না মারতেঅনুরোধ শুনে মনে হলো সে কিছুটা ভড়কে গেছেগলাটা উঁচু করে চোখ বড় করে তাকালঠোঁট ঘুরিয়ে নিজ পালকে কিছুক্ষণ ম্যাসাজ করলএকটু ভাবনাচিন্তার জন্য হয়তো সময় নিলতারপর কক্ কক্ করে বলল, ‘কিছুটা সময় দাওঅনেক দিনের অভ্যাস বলে কথাআমরা সানন্দে সময় দিলাম
রাত পেরোলেই ধবল ঘরের বাইরে বেরোবার অনুমতি পাবেসবাই মিলে তাকে কিছু না কিছু কৌশল শিখিয়ে দিলামকোন কোন চিহ্ন ধরে ঘরে ফিরতে হবে, ঠিক কখন খেতে আসতে হবেবাইরের কোনো শত্রু তাড়া করলে কী করে সাহায্য চাইতে হবে ইত্যাদিবারবার তাকে সতর্ক করা হলো, প্রথম দিনেই যেন বেশি দূর না যায়শেষে পথ হারিয়ে ফেলবেএসব উপদেশ দিতে দিতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লামকিন্তু রাত না পেরোতেই ধবলের হাঁকডাকে ঘুম ভেঙে গেলতখনো পাড়াতো মোরগেরা রাত পোহাবার সংকেত দেয়নিখুব রাগ হলোইচ্ছে হলো দু-চারটা ঠোকর মারিকিন্তু নিজেকে সংযত করলামনতুন জায়গায় বেচারির প্রথম বাইরে যাওয়া বলে কথা!
নির্দিষ্ট সময়ে যখন খোঁয়াড় থেকে বেরোলাম, ধবলকে এক গলা খেয়ে নিতে বললামকারণ, সারা দিন যত ছোটাছুটি করতে হবে, ঝোলাভর্তি খাবার হজম হতে বেশি সময় লাগবে নানিজেও খাব বলে খাবারের দিকে এগিয়ে গেলামমনে মনে গিন্নিমার মেয়েটার আদরের জন্য তৈরি হলামপ্রতিদিন সকালে খাবার খেতে খেতে আমি মেয়েটার আদর খাইও আমার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় আর আমি চোখ মুদে আদর খেতে থাকিশেষে মেয়েটার হাতের মুঠোয় রাখা চাল ঠুকরে খেয়ে খাবার সমাপ্ত করিকিন্তু আজ সে রকম কিছু ঘটল নাবরং দেখলাম, ধবলকে আদর করছে মেয়েটাধবল কুঁই কুঁই করে আদর খেতে লাগলআমার বুকটা ফেটে গেলচোখ ছলছল করে উঠলবোকা মেয়েটা আমার কষ্ট টেরও পেল নামানুষ এমনই, এমনই অকৃতজ্ঞঅথচ এত দিন এই মেয়েটাকে আনন্দ দিতে আমি কী না করেছি! আমাকে ধরতে এলে, কোলে নিতে চাইলে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিঅনুগত ভৃত্যের মতো তার পায়ে পায়ে ঘুরেছিকালি কখনো এমনটা করেনিধরতে গেলে দৌড়ে পালিয়েছেআজ মনে হচ্ছে ভুলটা হয়তো আমারই ছিল
মনটা একদম ভেঙে গেলভাঙা মনে আমি ধবলের ধ্বংস কামনা করলামওকে তখন খুব কুসিত মনে হলো
সারা দিন ধবলকে এড়িয়ে চললামমাঝে একবার মুখোমুখি হয়েই বলল, ‘আমার কী দোষ?’ দুপুরে বরইগাছের নিচে বালুতে বুক ডুবিয়ে ঝিমুতে ঝিমুতে আমারও একবার মনে হয়েছে, সব দোষ হয়তো ধবলের একার নয়, আমারও কিছু আছেযাকগে, ঘরে ফিরে সব মিটমাট করে নেব
কিন্তু সন্ধ্যায় ও খোঁয়াড়ে ফিরল নাগিন্নিমার মেয়েটা পাড়াময় খুঁজে বেড়ালকোথাও পাওয়া গেল নাকক্ কক্ কক্ করে গলা ছাড়িয়ে ডাকলামকোনো সাড়া নেইঅচেনা পথে ধবল কি তবে পথ হারিয়েছে? ধবল আর এল নাধবলকে চিরতরে হারিয়ে বুঝলাম, ‘হিংসা শুধু ক্ষতিই বাড়ায়
 চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্টl
পাবলিক কলেজ, চট্টগ্রাম

শেয়ার করুন