এ যুগের ছেলেমেয়েরা কি কবিতা পড়ে?

0
125
Print Friendly, PDF & Email

৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৩: হাতে লেখা চিঠি তো নেই আরপ্রিয় মানুষের কাছে লেখা চিঠিতে প্রিয় কবির কয়েক ছত্র তুলে দেওয়ার আনন্দটা কি আছে? এ যুগের ছেলেমেয়েরা কি কবিতা পড়ে? নাকি কবিতা আটকে গেল আবৃত্তি সংগঠনগুলোর প্রশিক্ষণ ঘরে?
দিব্যি মনে আছে, একসময় শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, হেলাল হাফিজ, রফিক আজাদ, নির্মলেন্দু গুণের কবিতা থাকত কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণদের মুখে মুখেআর রুদ্র কিংবা আবুল হাসান?
কবিতা নিশ্চয়ই মরে যায়নিকবি টোকন ঠাকুর তো আলাপের শুরুই করলেন এভাবে, ‘যত দিন মানুষের মন থাকবে, প্রেম থাকবে, তত দিন কবিতা থাকবেতবে ছাপানো কবিতার চেয়ে অনলাইনেই এখন কবিতা বেশি পড়া হয়
আসুন, একবার ঘুরে আসি রবীন্দ্রসরোবর থেকেওই যে, যে দুই তরুণ শুক্রবার সকালের রোদে স্নান করছেন, তাঁদের সঙ্গেই কথা হোকএকজন হিরণ, অন্যজন হিমেলশীতের হিমেল হাওয়ায় সিটি কলেজপড়ুয়া হিমেল জানালেন, কবিতার বই কিনে পড়া হয় নাভেতরে ভেতরে কাব্যচর্চা চলেগল্প-উপন্যাস পড়া হয়
চিঠি লেখা হয়?
নাফেসবুকে লিখি
বিএফ শাহীন কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র হিরণ যোগ করেন, ‘কবিতার বই আমারও পড়া হয় নাএখন মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক
ঠিক আছে, মেনে নিলামকিন্তু যেকোনো একটা কবিতার পঙিক্ত বলুন
কবিতা স্মরণে আনার প্রাণান্ত চেষ্টা করেন হিরণ-হিমেলদাঁড়ান, বলছিকিছুক্ষণ পর হতাশ হয়ে দুজনেই বলেন, ‘এই মুহূর্তে মনে করা কষ্টকর
শিক্ষার্থীদের আরও কথা শুনবগন্তব্য এবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়যাওয়ার পথে প্রকাশকদের কথাগুলো ভাসতে থাকে মনেদিব্যপ্রকাশের কর্ণধার মইনুল আহসান সাবের বলছিলেন, ‘কবিতা আর ছোটগল্পের বিক্রি পৃথিবীজুড়েই কমকবিতা পড়তে হলে পাঠককে পাঠক হিসেবে উন্নীত হতে হয়সেই পর্যায়ের পাঠক কমে গেছেকাহিনিসর্বস্ব উপন্যাসের দিকেই তারা ঝুঁকছেসময় প্রকাশনের ফরিদ আহমেদও বললেন, ‘এখনকার পাঠকের মন তৈরি নয়কবিতা পড়ার জন্য যে প্রস্তুতি থাকা দরকার, সেটা নেই
ঢুঁ মারি নৃবিজ্ঞান বিভাগেএ এফ এম জাহিদ হাসান, হাসান মাহমুদ, আবু হান্নান তালুকদাররা একবাক্যে বললেন, ‘আমরা ফেসবুকের স্ট্যাটাসে কাব্যিক শব্দ তো লিখিইরোমান্টিক কথা লিখিকিন্তু কবিতা পড়ি না
যেকোনো একটি কবিতা মুখস্থ বলতে বলায় বহুক্ষণ মনের মধ্যে খোঁজাখুঁজি করে একজন বললেন, ‘হে বঙ্গ, ভান্ডারে তব বিবিধ রতন…
পরের লাইন?
নাহ! আর এগিয়ে যেতে পারেন না তাঁরা
কবি কামরুজ্জামান কামু বলছিলেন, ‘আমি হতাশ নইফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার ব্যাপারে কবিতা থাকছেঅনেক কিছুই কাব্যিক করে বলার চেষ্টা করেন এখনকার তরুণেরাপ্রত্যেক মানুষের মধ্যে কবি মানুষ থাকেকিন্তু বলা দরকার, পাঠকের কাছ থেকে কবিতা বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকেপাঠকের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে কবিতাসব মানুষ তো কবিতা পড়বে নাকিন্তু যারা পড়তে চায়, তাদের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে কবিতাকে
বাংলা বিভাগে একসঙ্গে পেয়ে যাই মাস্টার্সের প্রণয় বিশ্বাস, মো. আলী রেজা, সালাউদ্দিন ইমন, মনির হোসেন, সামছুন নাহার আর সানজিদা ইসলামকে
আমাকে হতাশ করেননি তাঁরাসানজিদা ইসলাম বলেন, ‘আমি বলছি না আমাকে ভালোবাসতেই হবে’—তাঁর পরের পঙিক্তটি বলেন মনির হোসেনপ্রিয় কবিদের তালিকায় দেখা গেল পুরোনো কবিরা আছেন শক্তিশালী অবস্থান নিয়েকিন্তু নতুন কবিদের নাম বললেও চিনল না এঁদের কেউ!
টিএসসিতে তেজগাঁও কলেজের নুসাইবা বিনতে সগীর, সিটি কলেজের সানজানা আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের মাহমুদুল হাসান আর ইডেন মহিলা কলেজের নিশি রিমার কাছ থেকে শোনা গেল কিছু কবিতাসকালে উঠিয়া আমি’, ‘যদি ভালোবাসা পাই তবে শুধরে নেব জীবনের ভুলগুলো’, হে বঙ্গ ভান্ডারে তব,’ ‘আমার মায়ের সোনার নোলকসহ আরও কিছু কবিতা
তাহলে কবিতার আশা আছে? এই তো কবি নির্মলেন্দু গুণ বলছিলেন, ‘জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কবিতার পাঠক বাড়েনিএর মধ্যে গদ্যসাহিত্যের প্রতি আকর্ষণ বেড়েছেতবে আমার কবিতার বই তো বিক্রি হচ্ছেতরুণেরা ফেসবুকে জানায়, আমার কোন কবিতা সে তার প্রেমিকাকে উপহার দিয়েছে
মনে পড়ে যায়, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করা শিক্ষার্থী শহীদুল্লাহ কায়সার বলেছিলেন, ‘এখন আর কবিতা পড়তে ইচ্ছে হয় নাক্লাস ওয়ান থেকেই তো প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে বড় হয়েছিকবিতা পড়তে বসলেই সবাই হইহই করে উঠত, বলত, কবিতার জায়গায় ইংলিশ গ্রামার পড়ফলে কবিতা পড়ার ইচ্ছেটাই মরে গেছে
ঐতিহ্য-এর স্বত্বাধিকারী আরিফুর রহমান নাইম বললেন ভয়ংকর কথাটিএখন কেউ কিছু মনে রাখতে চায় নামুশকিল আসান গুগল তো রয়েছেইযা চাও, গুগল কর, ঠিক উত্তরটি পেয়ে যাবেমনকে দখল করে নিয়েছে যন্ত্র
কিন্তু ওই যে টোকন ঠাকুর বলছিলেন, ‘যত দিন প্রেম থাকবে…সেটাও তো সত্যি! যন্ত্র হয়ে যাওয়া মনকে আবার প্রেমের ধারায় ফিরিয়ে আনবে তো কবিতাইহোক সেটা ছাপার অক্ষরে, অথবা কম্পিউটারের মনিটরে

 

শেয়ার করুন