নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মালালা

0
60
Print Friendly, PDF & Email

আর্ন্তজাতিক ডেস্ক( ফেব্রুয়ারী): চলতি বছর নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য যাদের নাম মনোনয়ন করা হয়েছে, তাদেরমধ্যে পাকিস্তানের মালালা ইউসুফজাইও রয়েছে১৪ বছরের এই কিশোরী গত ৯অক্টোবর স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে তালেবান সন্ত্রাসীদের হাতে গুলিবিদ্ধহলেও সৌভাগ্যক্রমে সে বেঁচে যায়পরবর্তী সময়ে উন্নত চিকিসার জন্য তাকেযুক্তরাজ্যে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সে এখনো সেখানে আছেনরওয়ে পিস রিসার্চইনস্টিটিউটের প্রধান ক্রিস্টিয়ান বার্গ হারপভিকেন বলেছেন, মালালাকেপুরস্কার দেওয়া হলে সেটি নোবেল পুরস্কারের নীতিমালার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে
মালালাযে এলাকার বাসিন্দা, সোয়াতের এই মিংগোরা অঞ্চলটি ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয়এলিজাবেথের খুব পছন্দ এর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যএখন সেখানে তালেবানচাষ হচ্ছেমালালার বাবা জিয়াউদ্দিন একজন শিক্ষাপ্রচারক এবং তিনি অনেকবিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেনতাঁর ভাষায়, ‘আমরা যা করেছি, তা থেকে মেয়েটিঅনুপ্রাণিত হয়েছে এবং চরমপন্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে
ইন্টারনেটেরমাধ্যমেই মালালা প্রথম তালেবানের বিরুদ্ধে প্রচার চালায়সে বিবিসির ব্লগেলিখেছেলিখেছে তার ও সতীর্থদের সংগ্রাম সম্পর্কেলিখেছে, কীভাবে স্কুলেরঅধ্যক্ষ তাদের স্কুলের ইউনিফর্ম বাদ দিয়ে সাধারণ পোশাকে আসতে বলতেন এবংশীতকালীন ছুটি ঘোষণার পর স্কুল খোলায় আর ঘোষণা দেওয়া হলো না
গুলিবিদ্ধহওয়ার অনেক আগেই মালালা লিখেছিলেন, ‘যদি তারা আমাকে হত্যা করতে আসে, আমিতাদের বলব, তোমরা যা করছ তা ঠিক নয়শিক্ষা হলো মৌলিক অধিকারগত অক্টোবরেমালালা আন্তর্জাতিক শিশু শান্তি পুরস্কারের জন্য ডেসমন্ড টুটুর মনোনয়নপেয়েছিলএর দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে সে জাতীয় তরুণ শান্তি পুরস্কারেভূষিত হয়মালালা এখন আর প্রতিবাদকারী এক মেয়ে নয়সে হয়ে উঠেছে প্রতিবাদেরপ্রতীক
২০১২ সালের অক্টোবরে যে বন্দুকধারী মালালাকে তাক করে গুলিছুড়েছিল, সে কখনোই ভাবেনি সেই গুলিই তাদের তাড়া করে ফিরবেআর যারা তাকেহত্যা করতে পাঠিয়েছিল, তারাও চিন্তা করতে পারেনি যে মেয়েটি দ্বিতীয়বারেরমতো তাদেরই অগ্রাহ্য করেনি, অগ্রাহ্য করেছে তার মৃত্যুকেও
যখন এই বর্বরতালেবানগোষ্ঠী নারী শিক্ষাকে অনৈসলামিক ঘোষণা করল, তখন তারা ভেবেছিল যেকেউ প্রতিবাদ করতে সাহস পাবে নাকিন্তু শিক্ষার প্রতি প্রবল অনুরাগী ১২বছরের একটি মেয়ে বিবিসি উর্দু ব্লগে লিখল তার মনের কথা, অবশ্য পুল মাকাইছদ্দনামেমালালার এই প্রতিবাদ ইতিহাসের সাহসী কাজ হিসেবেই চিহ্নিত হলোকথা, আচরণ ও সাহস দিয়ে যে মেয়েটি নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছে; সে যে তালেবানেরলক্ষ্যবস্তু হবে, তাতে সন্দেহ ছিল নামালালার কথা বহির্বিশ্বের মানুষ তখনইজানল, যখন তালেবান ঘাতক তার মাথায় গুলি ছুড়ল
সোয়াত উপত্যকা তালেবানেরদখলে চলে যাওয়ার পর মালালা যে ডায়েরি লিখিছিল, সেই ডায়েরির কয়েক দিনেরবিবরণ এখানে তুলে দেওয়া হলোএই ডায়েরিতে একটি মেয়ের স্বপ্ন ও শঙ্কার কথাজানা যাবে
১ জানুয়ারি, ২০০৯: মাওলানা শাহ দুয়ান চলে গেছেন অথবা ছুটিতেআজ স্কুলে আমি বন্ধুদের কাছে আমার বানুর ভ্রমণ সম্পর্কে কথা বলছিলামআমরামাওলানা শাহ দুয়ানের মৃত্যুর গুঞ্জন নিয়ে কথা বলছিলাম, যিনি এফএম রেডিওতেবক্তৃতা করতেনতিনি হলেন তাঁদেরই একজন, যাঁরা মেয়েদের স্কুলে যাওয়ানিষিদ্ধ করে দিয়েছিলেনকয়েকটি মেয়ে জানাল, তিনি (মাওলানা শাহ দুয়ান) মারাগেছেন, কিন্তু অন্যরা দ্বিমত পোষণ করলেনসেদিন রাতে এফএম রেডিওতে কিছুবলেননি বলেই তাঁর মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে পড়ে
শুক্রবার বাড়ির কাজ না থাকায়সারা বিকেল আমি খেলা করছিলামআমি টিভি চালু করতেই লাহোরে বোমা বিস্ফোরণেরখবর শুনলামআমি নিজেই প্রশ্ন করলাম, এই হামলার ঘটনাগুলো কেন পাকিস্তানেইঘটছে
৩ জানুয়ারি ২০০৯: গতকাল আমি সামরিক হেলিকপ্টার ও তালেবান নিয়েএকটি ভয়ানক স্বপ্ন দেখেছিলামসোয়াতে সামরিক অভিযান চালানোর পর থেকেই আমি এধরনের স্বপ্ন দেখে আসছিলামতালেবান স্কুলে মেয়েদের যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণাকরায় আমি ভীত ছিলাম২৭ ছাত্রীর মধ্যে মাত্র ১১ জন ক্লাসে যেতামতালেবানেরনিষেধাজ্ঞার কারণে ছাত্রীদের ক্লাসে অনুপস্থিতি কমে যাচ্ছিলএকদিন স্কুলথেকে বাড়ি ফেরার পথে শুনছি এক লোক বলছেন, ‘আমি তোমাকে খুন করবআমি প্রথমেভীষণ ঘাবড়ে গেলাম, তবে স্বস্তিবোধ করলাম যখন দেখলাম যে লোকটি মোবাইলে কারওসঙ্গে কথা বলছেন এবং নিশ্চয়ই কাউকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন
৪ জানুয়ারি, ২০০৯: আজ ছুটির দিন এবং আমি বেলা ১০টার দিকে ঘুম থেকে উঠলামআমি শুনলাম, বাবা গ্রিন চকে (চৌমাথা) আরও তিনটি লাশ পড়ে থাকার কথা বলছিলেনএ খবর শুনেআমার খুব খারাপ লাগলসামরিক অভিযানের আগে আমরা সবাই রোববার বনভোজন করতেমারখাজার, ফিজাঘাট ও কানজুতে যেতামএখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে আমরা দেড়বছর ধরে বনভোজনে যেতে পারছি নাআমরা রাতের খাবারের পর হাঁটতে বের হতাম, কিন্তু এখন সূর্যাস্তের আগেই ঘরে ফিরে আসিআজ আমি ঘরের কিছু কাজ করলাম, আমার হোমওয়ার্ক করলাম, আমার ভাইয়ের সঙ্গে খেললামআগামীকাল স্কুলে যেতেহবে, এ কথা ভেবে আমার ভেতরে অস্থিরতা বেড়ে গেল
৫ জানুয়ারি ২০০৯: আমিস্কুলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম এবং স্কুলের পোশাক পরব ভাবছিলাম, তখনই অধ্যক্ষের কথা মনে পড়লতিনি বলেছিলেন, তোমরা কেউ ইউনিফর্ম পরে আসবেনা, সাধারণ পোশাক পরে আসবেঅতএব, আমি আমার পছন্দের মেরুন রঙের পোশাকটিপরলামঅন্য মেয়েরাও স্কুলে রঙিন জামাকাপড় পরে এল এবং স্কুলটি বাড়ির চেহারাপেলআমার এক বন্ধু আমার কাছে এসে বলল, খোদার দোহাই, আমাকে বল তো, আমাদেরস্কুলে কি তালেবান হামলা চালাবে? সকালের সমাবেশে আমাদের রঙিন জামাকাপড় পরেনা আসতে বলা হলোকেননা, তালেবান এতে আপত্তি করতে পারেআমি স্কুল থেকেবাড়ি ফিরে এলাম এবং দুপুরে খাওয়ার পর হোমওয়ার্ক করলামবিকেলে আমি টিভিখুলতেই শুনলাম, ১৫ দিন পর শাকারদ্রায় কারফিউ তুলে নেওয়া হয়েছেআমি মনে মনেখুশি হলামকেননা, আমাদের ইংরেজির শিক্ষক ওই এলাকায় থাকতেনএখন থেকে তিনিস্কুলে আসতে পারবেন
৭ জানুয়ারি ২০০৯: মহররমের ছুটি কাটাতে বানুরেএলামআমি বানুরকে ভালোবাসি এর পর্বতমালা ও সবুজ মাঠের জন্যআমার সোয়াতওঅত্যন্ত সুন্দর, কিন্তু সেখানে শান্তি নেইবানুরে শান্তি ও স্থিতি আছেএখানে গুলির শব্দ বা আতঙ্ক নেইআমরা সবাই অত্যন্ত সুখীআজ আমরা পীরবাবারমাজারে (মোসালিয়ম) গেলাম এবং সেখানে অনেক লোককে দেখলামআমরা যখন সেখানেবেড়াতে গিয়েছি, তখন দেখেছি যে অনেক মানুষ প্রার্থনা করছেনদোকানে দোকানেবালা, কানের দুল, লকেট ও অন্যান্য কৃত্রিম অলংকার বিক্রি হচ্ছিলআমি কিছুকিনতে চেয়েছিলাম; কিন্তু কোনোটাই পছন্দ হয়নিআমার মা কানের দুল ও পংলিকিনলেন
১৪ জানুয়ারি ২০০৯: আমি মন খারাপ নিয়ে স্কুলে গেলামকেননা, কালথেকে শীতের ছুটি শুরু হবেঅধ্যক্ষ শীতের ছুটি ঘোষণা করেছেন, কিন্তু কবেস্কুল খুলবে, সে সম্পর্কে কিছু বলেননিএ রকম ঘটনা এই প্রথম ঘটলএর আগেছুটি হলে স্কুল খোলার তারিখও জানিয়ে দেওয়া হতোঅধ্যক্ষ স্কুল না খোলারকারণ সম্পর্কে কিছু না বললেও আমরা আঁচ করতে পেরেছিলাম যে আগামী ১৫ জানুয়ারিথেকে তালেবান মেয়েদের শিক্ষা বন্ধ করে দিয়েছেএবার ছুটি নিয়ে মেয়েরা খুবফুল্ল ছিল নাকেননা, তারা জানত যে তালেবান যদি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে, তাহলে তারা আর কখনোই স্কুলে আসতে পারবে নামেয়েদের একাংশ ফেব্রুয়ারিতেস্কুল খোলার ব্যাপারে আশাবাদী হলেও অন্য মেয়েরা বলছে, তাদের বাবা-মা তাদেরসোয়াত থেকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেছিল, যাতে পড়াশোনা ব্যাহত না হয়
আমরাযখন জানতে পারলাম, আজকেই আমাদের শেষ দিন, সে কারণে অনেকক্ষণ মেয়েদের সঙ্গেমাঠে খেললামএত দিন স্কুল খুলবে বলেই আমি ধারণা করছিলামকিন্তুবিদায়মুহূর্তে বারবার স্কুল ভবনের দিকে তাকাচ্ছিলাম আর মনে হচ্ছিল যে এখানেআমি আর ফিরে আসতে পারব না
পাকিস্তানে খুনাখুনি চলছেই২ ফেব্রুয়ারিতালেবান সন্ত্রাসীরা লাকি মারওয়ায় একটি সেনাচৌকিতে হামলা চালিয়ে ১৩ জন সেনাও ১০ বেসামরিক লোককে হত্যা করেএর আগে কোয়েটায় সিয়া-অধ্যুষিত এলাকায় বোমামেরে শতাধিক লোককে হত্যা করেছিল সন্ত্রাসীরামালালার ঘটনাকে বিশ্লেষণকরতে গিয়ে আফগানিস্তানের জাতীয় পরিষদের সাবেক সদস্য মালালাই জয়া লিখেছেন, ‘এই ছোট্ট ঘটনা থেকেই পরিবর্তন আসবে না, যেখানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিমানহামলা ও ইসলামি মৌলবাদীদের সন্ত্রাসী আক্রমণে প্রত্যহ শত শত আফগান ওপাকিস্তানি মারা যাচ্ছেএ ঘটনা কোনো দিক পরিবর্তন করবে নাকেননা, স্নায়ুযুদ্ধ চলাকালে সিআইএ পাকিস্তানি আইএসআইএর মাধ্যমে এই মৌলবাদীদের তৈরিকরেছে এবং এখন তাদের মদদ জোগাচ্ছেএকদিকে ড্রোন বোমা, আরেক দিকেতালেবানি হানাএর ভেতরেপড়ে পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ প্রতিদিনই জীবনদিচ্ছে
আখেরে কে জয়ী হবে? মালালার পাকিস্তান, না তালেবানি পাকিস্তান?

 

নিউজরুম

 

শেয়ার করুন