হূদয়কথা

0
362
Print Friendly, PDF & Email

বয়স আমার ৬০সরকারি চাকরি করতামএখন রিটায়ার করা জীবন আমারবাড়ি আছে শহরতলিতেশহরের মাঝখানে দুই কাঠা জমিও আছেগাড়ি কিনব-কিনব করছিভরভরন্ত সংসারআমার চারদিকে পুত্রক-ন্যারাবৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা হওয়ার কথাআমার স্ত্রীর বেলায় ওই নিয়ম খাটেনি৫০ পেরিয়ে গেলেও তার শরীরের বাঁধন এখনো অটুটফরসা রং তার, চামড়ার মসৃণতা অন্য নারীর মনে হিংসা জাগায়চুল আমার ধবধবে সাদাআমার স্ত্রীর মাঝেমধ্যে দু-এক গাছি চুল পাকলেও ত্বরিত বুয়াকে দিয়ে মূলোপাটন করেস্ত্রীর পাশে নিজেকে বড় বুড়ো বুড়ো মনে হয়আমার সবকিছু আছে, কিন্তু কী যেন নেইভরা আনন্দের সময়েও মন খচখচিয়ে ওঠে, কী যেন এক গভীর অতৃপ্তি আমার মনকে চঞ্চল করে তোলেচেহারায় বোধ হয় এই চাঞ্চল্যের প্রভাব পড়েমাঝেমধ্যে আমার স্ত্রী জিগ্যেস করে, ‘তোমাকে এত অস্থির লাগছে কেন? শরীর কি খারাপ করেছে?’ আমি মুখ ফিরিয়ে ঢোঁক গিলে বলি, কই, না তো? স্ত্রী প্রসঙ্গান্তরে যায়মা-বাবার পছন্দের মেয়েটিকেই বিয়ে করেছিলাম আমিগত ৩৫ বছর ও সোহাগে আর যত্নে আমাকে ভরিয়ে রেখেছেস্নানে নিজ হাতে গরম জল এগিয়ে দিয়েছে, রাতের বেলা মাথায় তেল ঘষে দিয়েছেভালো রান্নাগুলো আমার পাতে তুলে দিয়ে পরম তৃপ্তি পেতে দেখেছি তাকেতার পরও আমার ভেতরে সুখ নেইএকটা গভীর বেদনাকে আমি আমার মধ্যে গত ৩৫ বছর লালন করে আসছিএই বেদনার কথা আমি কাউকে বলতে পারিনিকাকে বলব? পুত্র-কন্যা-স্ত্রীকাউকে বলা যাবে না এ কষ্টের কথাটিতাহলে যে সংসারে বিপর্যয় ঘটবেদীর্ঘদিন নিজের সঙ্গে নিজে যুদ্ধ করতে করতে রক্তাক্ত হয়েছিঅনেক অনেক বছর অভিনয় করে গেছি স্ত্রীর সঙ্গে, পুত্র-কন্যাদের সঙ্গেআর পারছি না আমিআমার বেদনার কথা কারও সঙ্গে শেয়ার করতে না পারলে আমার অস্তিত্ব বিপন্ন হবেতাই ঠিক করেছি, এই শেষবিকেলে জীবনের আলোকময় সকালের কথাগুলো একটু লিখে জানাবএতে হয়তো আমার অপরাধবোধ কমবেযাকে নিয়ে আমার উজ্জ্বল সকাল জড়ানো, সে যদি আমার এ লেখাটি পড়ে, তাহলে অনেক অভিমানের ভেতরে থেকেও সে আমাকে ক্ষমা করার ব্যাপারটি একটু করে হলেও হয়তো ভেবে দেখবে

এইচএসসি পাস করার পর নরসিংদী সরকারি কলেজে বাংলা বিভাগে ভর্তি হয়েছিলাম৩০ জন শিক্ষার্থী নিয়ে সেবারই প্রথম অনার্স ক্লাস শুরু হয়েছিল বাংলা বিভাগেআমাদের ক্লাসে ছেলের চেয়ে মেয়ের সংখ্যা বেশিআমরা জনা পাঁচেক ছেলে ছিলামহাসান, রফিক, সুখেন্দু চক্রবর্তী, দোর্দণ্ডপ্রতাপ বড়ুয়া আর আমিআমি হিমাংশু দাশআমার পদবি দাশ হলে কী হবে, আসলে আমরা ছিলাম শীলপদবি পাল্টালেও জাতপেশা থেকে গিয়েছিল আমাদেরগ্রামের বাজারে চুলকাটার দোকান ছিল আমাদেরবাবা সেখানে ক্ষৌরকর্ম করতেনময়ূরপুচ্ছ ধারণ করার বেদনায় সব সময় জড়সড় থাকতাম আমিহাসান, রফিক, সুখেন্দু শহরেরই ছেলেদোর্দণ্ড শহরতলি থেকে এলেও ইঁচড়েপাকা ছিল সেতার সব ভাবনা আর আলোচনার বিষয় ছিল নারী-পুরুষের শরীর নিয়েরফিক খুব পড়ুয়া ছিলতার হাতে সর্বদা পাঠ্যবহির্ভূত বই থাকতহাসান বাঁ হাতে সিগারেট গুঁজে কী যেন ভাবত সব সময়সুখেন্দু ব্রাহ্মণ ঘরের সন্তানঅন্যের কীভাবে উপকার হয়, এই চিন্তায় মশগুল থাকত সেআর আমি? মাটির গন্ধ গায়ে মেখে গ্রাম থেকে উঠে এলে একজন তরুণের যে অবস্থা হয়, আমারও সেরকম

মেয়েদের মধ্যে শরিফা খলবলিয়ে কথা বলতরেশমা ভালো নাচতে পারত; কোনো রকমে ক্লাস শেষ করে সে নাচের ক্লাসে চলে যেতনাবিলা ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে গুনগুনিয়ে গান করতকস্তুরি ছিল সংসারমগ্নএসএসসির পর বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তারসন্তান, স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়িএসবের ভেতরে থেকেও সে পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলতার চোখেমুখে সংসার, ক্লান্তির ছাপসহপাঠীদের মধ্যে আরেকজন ছিল মাধবীলতা দত্তবেঞ্চের শেষ প্রান্তে বসতসে ছিল ভীষণ রকমের চুপচাপউজ্জ্বল শ্যামলা রং তার, মাঝারি হাইটচোখ দুটি অলৌকিক, মায়া মায়াঅধর প্রশস্ত, সামান্য ঝুলানোওই অধরেই নারীর সব সৌন্দর্য ও পুরুষের সব বাসনা যেন জড়ো হয়ে ছিল

সুখেন্দুর চোখ পড়েছিল মাধবীলতার ওপরক্লাসে আমার পাশেই বসত সুখেন্দুশিক্ষকের লেকচারের ফাঁকে ফাঁকে কোমল চোখে মাধবীর দিকে তাকাত সেমাধবী তখন গভীর মনোযোগে শিক্ষকের কথা শুনছেঅন্য সময়ে মাধবীর আশপাশে ঘুর-ঘুর করত সুখেন্দুমাধবীকে জিগ্যেস করত, ‘আজ স্যার ক্ষেত্রগুপ্তের যে বইটির কথা বললেন, ওটি তোমার কাছে আছে কি না? না থাকলে আমি তোমাকে দিতে পারিআমার কাছে আছেঅথবা আগামী সপ্তাহে তো মেঘনাদবধ কাব্যের প্রমীলা চরিত্রের ওপর টিউটোরিয়াল পরীক্ষা, নোটটা তৈরি করেছ কি তুমি? না করলে আমি সাহায্য করতে পারি?’
মাধবী স্মিত হেসে বলত, ‘দাদা, বইটি আমার কাছে আছেআর নোটটি আমি বেশ কিছুদিন আগে রেডি করেছি
ম্লান মুখে সুখেন্দু ফিরে আসতআমাকে বলত, ‘দেখছস, দেমাক দেখছস? বলে সাহায্যের দরকার নেই, বলে কি জানো? আমি বলে দাদা!
আমি উসখুসে মুখে সুখেন্দুর দিকে তাকাতামসুখেন্দু আমাদের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবীদীর্ঘদেহীতবে তার চেহারায় একটি অগুণ ছিলবয়স্ক না হয়েও বয়সের একটা ছাপ তার সব অবয়বে ছড়িয়ে ছিলতার চেহারায় দাদা দাদা একটা ভাব ছিলতাই ক্লাসের প্রায় সব মেয়ে তাকে দাদা বলে সম্বোধন করতএটা আবার সুখেন্দুর সহ্য হতো নারাগী কণ্ঠে বলত, ‘দাদা, কেন? প্রেমিক হওয়ার যোগ্যতা কি আমার নেই?’

সেদিন মাধবীর দাদা সম্বোধন শুনে এসে আমার পাশে বসল সুখেন্দুচাপা স্বরে বলল, ‘দাঁড়া, দেখাচ্ছি মজাদাদা ডাকার লেসন দিচ্ছিসুখেন্দুর হস্তাক্ষর ছিল অসাধারণ সুন্দর! তার সুন্দর হাতের লেখার জন্যই শুধু তাকে ভালোবাসা যেত

সপ্তাহ খানেক কেটে গেলএকদিন সিঁড়িতে দেখা মাধবীর সঙ্গেআমার সামনে একটুক্ষণ যেন থমকে দাঁড়াল মাধবী! আমার ভুলও হতে পারেএটা যে ভুল নয়, পরের দিন টের পেলামসেদিন শেষ পিরিয়ড শেষ হওয়ার পর হই হই করে প্রায় সবাই ক্লাস থেকে বেরিয়ে গেলমাধবী আমার সামনে এসে দাঁড়ালসাদা একটি খাম এগিয়ে দিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল, ‘খুব সাহসী তুমিবলেই ক্লাসের বাইরে চলে গেল মাধবীআমি কাঁপা হাতে খামটি ধরে সেই নির্জন ক্লাসরুমে দাঁড়িয়ে থাকলামতারপর প্রায় ধপাস করে বেঞ্চে বসে পড়লামগ্রামের ছেলে আমিশহুরে হালচালের সঙ্গে খুব ভালো করে পরিচিত হয়ে উঠিনিবুকটা ধড়ফড় করতে লাগলএ কিসের খাম? মাধবী কেনই বা বলল খুব সাহসী তুমিবেশ কিছুক্ষণ পর বুকের কাঁপন থামলে খামটি খুললাম আমিদেখি ভেতরে একটি চিঠিকোনো সম্বোধন নেইসরাসরি লেখা: তোমাকে দেখতে ভেজা বিড়ালের মতো মনে হলেও, দুঃসাহসী তুমি? সরাসরি চিঠি দিলে তুমি আমাকে? তাও আবার প্রিয় মাধবী বলেমুখে তো তেমন করে গুছিয়ে কথা বলতে পারো নাতোমার জিবে ও আচরণে গ্রামীণতা জড়ানোকিন্তু চিঠি তো লিখেছ বেশ খাসা! এমন অসাধারণ সুন্দর হাতের লেখা তোমার! আহা! তোমার হাতের লেখার অর্ধেক সুন্দরও যদি আমার লেখা হতো! কালকে ছুটির পর থেকে যেয়ো, কথা আছে

কী আশ্চর্য! আমার হাতের লেখা আবার সুন্দর হলো কখন? কোনো রকমে আমার হাতের লেখা বোঝা যায় মাত্রলেখা তো সুন্দর সুখেন্দুর! আর আমি কখন মাধবীকে চিঠি লিখলাম? কোনো মেয়ের দিকে ভালো করে তাকানোর সাহসটি পর্যন্ত নেই যার, তার আবার চিঠি লেখা! বড় দ্বিধায় পড়ে গেলাম আমিমাধবীর চিঠির মর্মার্থ বুঝতে পারলাম নাদ্বিধা-দ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে বাড়ি ফিরলাম আমি

পরদিন সেমিনারকক্ষের সামনে কাঁধে বিরাট একটা থাপড় খসিয়ে সুখেন্দু বলল, ‘কীরে হিমাংশু, কেমন লাগছে তোর? তোর মুখের রং তো পাল্টে গেছে রে?’

মানে? নিচু স্বরে বললাম
মানে, মানে কীরে বেটা? চিঠির উত্তর পাসনি?’ চাপা স্বরে জিগ্যেস করল সুখেন্দু
এতক্ষণে আমার কাছে সবকিছু খোলাসা হয়ে গেলতাহলে চিঠি সুখেন্দুই লিখেছে মাধবীকে, আমার নাম দিয়েআমি সুখেন্দুকে টানতে টানতে ক্যানটিনে নিয়ে গেলামচা-শিঙাড়ার অর্ডার দিয়ে জিগ্যেস করলাম, সুখেন, ঘটনাটা খুলে বল তো ভাই

চা খেতে খেতে সুখেন্দু জানায়, চিঠির ইতিতে আমার নাম ব্যবহার করে প্রেমের চিঠি গছিয়েছে সে মাধবীকেদাদা ডাকার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য সে এ কাজ করেছেচেয়ার ছেড়ে উঠতে উঠতে সুখেন্দু বলল, ‘দত্তের এবার দেমাক ভাঙবেসুখেন্দু আমার জাতপাতের বিষয়টি জানত

এরপর আমাদের অন্য রকম একটা জীবন শুরু হয়ে গেলআমাদের মানে আমার আর মাধবীরক্লাস ফাঁকি দেওয়া শুরু হলো আমাদেরআজকে মেঘনা নদীর পাড়ে তো পরশু চৈতন্যার বনেকখনো সকালের ট্রেনে বসে পড়া; ঘোড়াশাল স্টেশনে নেমে এধার-ওধার ঘোরাঅন্য সহপাঠিনীরা সালোয়ার-কামিজ পরলেও শাড়ি পরত মাধবীশাড়িতে তাকে অসাধারণ লাগত! তাকে ঘিরে আমার অলৌকিক স্বপ্ন দানা বাঁধতে থাকত! আমাদের এ ভালোবাসাবাসিতে শরীর ছিল নাএকটু হাত ধরাধরি, একটু কাছ ঘেঁষে বসাএই-ই ছিল আমাদের প্রেমক্লাসমেটরা আড়েঠারে তাকাত আমাদের দিকেআমাদের প্রেমের ব্যাপারটি ডিপার্টমেন্টে চাউর হয়ে গিয়েছিলদু-একজন শিক্ষকের কানেও যে গেছে, তা টের পেয়েছিলাম পরে

বিভাগ থেকে রাঙামাটিতে বনভোজনে গেলামপ্রায় ১০০ জন শিক্ষার্থী আর পাঁচ-সাতজন শিক্ষক-শিক্ষিকারাঙামাটিতে আমরা একটু আড়াল খুঁজছিলামদু-চারটা গাছ পেরিয়ে একটু সামনে গেছি মাত্র দুজনে, অমনি সিরাজ স্যারের কণ্ঠ শোনা গেল, ‘কীরে, কোথায় যাও দুজনে? দূরে যেয়ো নাআসো আসো

তখন আমরা থার্ড ইয়ারে উঠে গেছিবাংলা বিভাগের দেয়াল পত্রিকায় আমার একটি কবিতা ছাপা হলোকবিতার বিষয়বস্তু তেমন বিশেষ কিছু নাসিরাজ স্যার খুব জ্বালাতেন আমাদেরসাদা চুল-দাড়িতে মেহেদি লাগাতেন তিনিকবিতায় তাঁকেই টার্গেট করলাম আমিলিখলাম
চুল-দাড়ি পাকিয়াছে, মন পাকে নাই,
মনে যার থাকিবার, সে তো থাকে নাই;
তাই চুল-দাড়ি পাকিয়াছে মন পাকে নাই
ইত্যাদি
স্যারের চোখে পড়েছিল কি না জানি না, কিন্তু বিভাগের নানা ইয়ারের শিক্ষার্থীদের নজর কেড়েছিল কবিতাটিএকদিন ফার্স্ট ইয়ারের একজন ছাত্রী এগিয়ে এসে কবিতাটির খুব তারিফ করলআমি মিষ্টি হেসে সৌজন্য দেখালামআমি সরে গেলাম তার কাছ থেকেকিন্তু নাদিয়া ইয়াসমিন আমার পিছু ছাড়ল নাকারণে-অকারণে আমার সামনে এসে দাঁড়াতে লাগলতার কাছ ঘেঁষে দাঁড়ানো, ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলাএসব কিছুতে ভুল-বোঝাবুঝির সৃষ্টি হলোসবচেয়ে বেশি ভুল বুঝল মাধবী

একদিন মাধবী বলে ফেলল, ‘এসব কী হচ্ছে?’
আমি বললাম, কী বিষয়ে বলছ তুমি?
ওই যে নাদিয়া ইয়াসমিন, তার সঙ্গে এত ঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলার প্রয়োজন কী?’ বলল মাধবী
আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকালামদেখলাম, তার চোখেমুখে সন্দেহ আর ঘৃণার মাখামাখি! আমি দৃঢ় কণ্ঠে বললাম, ও কবিতা ভালোবাসেমাঝেমধ্যে কবিতা নিয়ে আলোচনা হয়এ ছাড়া তো বেশি কিছু নাতারপর স্পষ্ট গলায় বললাম, তুমি কি আমাকে সন্দেহ করো?
সন্দেহ নয়কানাঘুষা চলছে ডিপার্টমেন্টেনানা রকম নোংরা কথা কানে আসছেতুমি স্পষ্ট করে নাদিয়াকে বলে দাও, যাতে ও আর তোমার সঙ্গে না মেশেমাধবী বলল
আমি খুব আহত হলাম! মাধবী এ কী বলছে! এত নিবিড় ভালোবাসা তার সঙ্গে আমার! বিশ্বাসের ওপর আমাদের ভালোবাসা দাঁড়ানো বলে এত দিন আমি বিশ্বাস করতামকিন্তু মাধবীর আজকের কথাতে তো তা প্রকাশ পাচ্ছে না! ভেতরটা আমার জ্বলে যেতে লাগলআমাদের ভালোবাসার অপমানে আমি মর্মাহত হলাম
একধরনের ব্যথা আর ক্রোধ আমার মধ্যে চাগিয়ে উঠলআমি বললাম, অযথা সন্দেহ কোরো নাভালোবাসার অপমান কোরো না

নাদিয়ার কানেও বোধ হয় কানাঘুষার কথাটি গিয়েছিলতার হয়তো জেদ চেপে গিয়েছিল, নইলে কেন সে আরও বেশি করে আমাকে আঁকড়ে ধরল? এর পর থেকে সে আমার চারপাশে আরও বেশি করে ঘুর-ঘুর করতে লাগলঘনিষ্ঠ হয়ে কথা বলতে লাগলনাদিয়া যত কাছে এল, মাধবী তত দূরে সরে গেলনাদিয়াকে আকারে-ইঙ্গিতে বার কয়েক বললাম আমার সঙ্গ ছাড়তে, কিন্তু সে আরও বেশি করে সাপে ব্যাঙ গিলার মতো করে আমাকে গিলতে লাগলমাধবীকে বোঝালাম, ও শুনে দূর থেকে আরও দূরে সরে যেতে লাগলএকটা সময় সে আমার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করে দিলধীরে ধীরে ও এবং আমার মধ্যে কঠিন একটা দেয়াল তৈরি হয়ে গেল! আমরা একই ক্লাসে পড়িকিন্তু কারও দিকে কেউ তাকাই নাএমনি করে দুজনে একটি নদীর দুই পারের বাসিন্দা হয়ে গেলামদীর্ঘশ্বাসকে সম্বল করে থার্ড ইয়ার ফাইনাল দিলামকোনো রকমে সেকেন্ড ক্লাস পেলাম আমিমাধবী ভালো পজিশন নিয়ে অনার্স পাস করে গেল

এর মধ্যে নাদিয়া ট্রান্সফার নিয়ে জগন্নাথ কলেজে চলে গেলতার বাবা বিদ্যু বিভাগে চাকরি করতেনতিনি ঢাকায় বদলি হয়েছেন
রেজাল্টের পর তিন মাসের বিরতিতিন মাস পর রেজাল্ট বের হবে, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএ শুরু করবআমি আমার গ্রামের একটা স্কুলে পার্টটাইম শিক্ষকতা শুরু করলামএর মধ্যে কতবার যে ভেবেছি, এমএ পড়তে পড়তে মাধবী আর আমার মধ্যকার ভুল-বোঝাবুঝির অবসান হবেআমরা আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাব

রেজাল্টের পর এমএ পড়তে গিয়েই বিহ্বল হয়ে পড়লাম আমিদেখি, মাধবীর হাতে শাঁখা, কপালে সিঁদুর!

কোনো রকমে এমএ পাস করে বেরিয়ে এসেছিলাম আমি
তারপর চড়াই-উতরাইয়ের জীবন আমারচাকরি, বিয়ে, সন্তানএসব
কোথায় হারিয়ে গেল মাধবীলতা! আমার কাছ থেকে অনেক দিন আগেই মাধবী নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলকিন্তু আমি মাধবীকে শেষ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে সরিয়ে দিতে পারিনিলতার মতো এই দীর্ঘ সময় ধরে সে আমার হূদয়কে জড়িয়ে থেকেছেঅনেক চেষ্টা করেছি মাধবীলতার মূলোপাটন করতেকিন্তু আমার হূদয় হার মানেনিআমি এখনো আমার স্ত্রীকে ফাঁকি দিয়ে যাচ্ছিহূদয় থেকে বারবার মাধবীকে টেনে নামিয়ে ওখানে স্ত্রীকে স্থান দিতে চেয়েছি; কিন্তু হূদয় আমার কথা শোনেনিভবিষ্যতেও শুনবে কি না, জানি না

 

শেয়ার করুন