প্রেমের গল্প

0
159
Print Friendly, PDF & Email

জানুয়ারি, ২০১৩: একসময় পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটি বাড়িতে একটি ছেলে বাস করতকুকুর ভালোবাসত সে, ঘোড়া ভালোবাসত, সংগীতের ভক্ত আর স্পোর্টস কারের পাগল ছিলগাছে চড়ত, সাঁতার কাটত, ফুটবল খেলত, সুন্দরী মেয়েদের পেছনে লাগতসুন্দর উদ্দাম জীবন
একদিন এক দরবেশকে পেয়ে বলল ছেলেটি, ‘বড় হয়ে কী কী পেতে চাই আমি ঠিক করে ফেলেছিআপনি কি আমাকে সেসব দেবেন?’
কী কী চাও?’ দরবেশ জানতে চাইলেন
অনেক বড় একটা বাড়ি হবে আমার, সামনে থাকবে ছড়ানো বারান্দাদুটো অনেক দামি কুকুর পুষবপেছনে থাকবে একটা সুন্দর ফুলের বাগানদেশি-বিদেশি নানা জাতের ফুল থাকবে তাতেখুব সুন্দরী একটি মেয়েকে বিয়ে করবটানা টানা গভীর কালো চোখ হবে ওর, মেঘের মতো চুল, লম্বা শরীর আর সুন্দর ফিগারসেতার বাজাতে পারবে, ভালো গান গাইতে পারবে
তিনটে ছেলে হবে আমার, ভালো বল খেলতে পারবে ওরাএকজন হবে বিজ্ঞানী, একজন পলিটিশিয়ান, আরেকজন নামকরা খেলোয়াড়
আমি হব একজন অ্যাডভেঞ্চারারসাগরে সাগরে কাটাব, কখনো একাই জাহাজ নিয়ে ভেসে পড়ব, উঁচু উঁচু পাহাড়ে চড়ব, পর্বতে চড়ব, বিপদে পড়া মানুষকে উদ্ধার করবলাল একটা ফেরারি গাড়ি থাকবে আমারসুন্দর জীবন, তবে বড় বেশি উদ্দাম আর অগোছালো, কারণ সাজানো জীবন আমার সহ্য হবে না
মৃদু হাসলেন দরবেশখুব সুন্দর একটা সুখ-স্বপ্নদোয়া করি, তুমি সুখী হও
একদিন, বল খেলতে গিয়ে হাঁটু ভেঙে ফেলল ছেলেটিপুরোপুরি আর ঠিক হলো নাপাহাড়ে ওঠা বন্ধ হলো, গাছেও চড়তে পারে নাসাগরে জাহাজ ভাসানোর স্বপ্ন শেষমার্কেটিংয়ের ছাত্র হয়ে ভালোভাবেই পাস করল, শুরু করল ওষুধ আর ডাক্তারি যন্ত্রপাতির ব্যবসা
সুন্দরী একটা মেয়েকে বিয়ে করলস্বভাব খুব ভালো মেয়েটিরলম্বা চুল আছে, তবে শরীরটা লম্বা নয়, বেঁটেই বলা যায়চোখও কালো নয়, বাদামিপিয়ানো বাজানো তো দূরের কথা, গানই গাইতে পারে নাতবে রান্নার হাত খুব ভালোদেশি-বিদেশি অনেক ধরনের খাবার চমকার রাঁধতে পারেআরও একটা জিনিস পারে, ছবি আঁকতে
ব্যবসার কাজে শহরে চলে আসতে হয়েছে ছেলেটিকেথাকে ফ্ল্যাটবাড়ির ওপরতলার একটা ফ্ল্যাটেজানালা দিয়ে নদী দেখা যায়, নৌকা-লঞ্চ চোখে পড়ে, চাঁদনি রাতে বিদ্যু চলে গেলে আর চাঁদ থাকলে নদীর অপরূপ শোভা দেখে সময় কাটাতে পারেকুকুর পোষার জায়গা নেই, তবে বারান্দায় একটা তোতাপাখির খাঁচা ঝোলাতে পেরেছেবাগানও নেই, টবে কয়েকটা লাল গোলাপের গাছপ্রজাপতির ঢল নামে না সে বাগানে, ভোমরারা গুঞ্জন তোলে নাতবে এক শীতে কোথা থেকে যেন কয়েকটা মৌমাছি উড়ে এসে বসেছিল ফুলে
তিন মেয়ে তার, তিনজনই খুব সুন্দরীছোট মেয়েটা সবচেয়ে সুন্দরী, কিন্তু তার দুর্ভাগ্য, সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে আছাড় খেয়ে পা ভাঙলপঙ্গু হয়ে গেলহুইলচেয়ার ছাড়া আর গতি নেইবাবাকে সাংঘাতিক ভালোবাসে তিনজনেইবল খেলতে পারে না ওরা, তবে বেশ গুণীবড়টি ভালো রাঁধতে পারে, মেজোটি ছবি আঁকতে পারে, আর ছোটটি চমকার গিটার বাজায়, গলাও ভালোগভীর রাতে নিঝুম হয়ে আসে যখন ব্যস্ত শহর, কোথাও কোনো শব্দ নেই, পাহারাঅলার বাঁশি আর থামের গায়ে লাঠি ঠোকার আওয়াজে চমকে ঘুম ভেঙে যায় ছেলেটির, তখন মাঝেমধ্যে কানে আসে পাশের ঘর থেকে অপূর্ব সুরের মূর্ছনাতন্ময় হয়ে শুনতে শুনতে কখন আবার ঘুমের অতলে তলিয়ে যায় সে
সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকার মতো যথেষ্ট আয় করে ছেলেটি, কিন্তু ফেরারি গাড়ি কেনার টাকা ওর জমে নাবেশির ভাগ সময় রিকশাতেই চলাচল করতে হয়হাঁটার শখ হয় মাঝেসাঝেফুটপাত ধরে হেঁটে যেতে যেতে আলগোছে তুলে পাশের ডাস্টবিনে রেখে দেয় অসাবধানি খামখেয়ালি মানুষের ফেলে যাওয়া কলার খোসা, রাস্তা পার করে অন্ধ মানুষকে
একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টি শুরু হলো ভোর থেকেইঝমঝম ঝমঝম একটানা বর্ষণ, ঝরেই চলে ঝরেই চলে, থামে না আররাস্তাঘাট সব ডুবে গেল পানিতেসারাটা দিন ঘরে আটকে থাকতে হলো ছেলেটিকে, কাজে বেরোতে পারল নাবিকেলের দিকে বিরক্ত হয়ে দুত্তেরি ছাই বলে ছাতাটা নিয়ে বেরিয়ে পড়লঝিরঝির করে তখনো বৃষ্টি পড়ছে, আকাশের গোমড়া মুখে হাসি ফোটার কোনো লক্ষণই নেইআষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল, গেলরে দিন বয়েগুন গুন করে গেয়ে উঠেছিল, পেছনে গাড়ির হর্নের তীক্ষ শব্দে চমকে গেল, লাফিয়ে সরে না গেলে যেন তাকে চাপা দিয়েই চলে যেত বেপরোয়া ড্রাইভারছলাক করে কাদাপানি ছিটিয়ে জামাকাপড় নষ্ট করে দিয়ে গেল ছেলেটির
বন্ধুর বাড়িতে এল সেবলল, ‘আমার মনে বড় দুঃখ
কেন?’
আমার স্বপ্ন ছিল অন্য রকমভেবেছিলাম বিয়ে করব লম্বা একটি মেয়েকে, যার হবে মেঘের মতো চুল, গভীর কালো চোখ, পিয়ানো বাজাতে পারবে, গান গাইতে পারবেকিন্তু যাকে করলাম সে লম্বাও না, চোখও কটাবাজাতেও পারে না, গাইতেও পারে না
কিন্তু খুবই সুন্দরী,’ বোঝানোর চেষ্টা করল বন্ধুনরম মেজাজ, ফুঁসে ওঠে না, ঝগড়া করে নাভালো রাঁধতে পারে, ছবি আঁকতে পারে
বন্ধুর কথায় কান দিল না ছেলেটি
একদিন স্ত্রীকে বলল, ‘আমার মনে বড় দুঃখ
কেন?’ স্ত্রী অবাক
আমি চেয়েছিলাম বড় একটা বাড়ি হবে আমার, প্রকৃতির কাছাকাছি, সেখানে পাহাড় থাকবে, বন থাকবে, ঝরনা থাকবে বাড়ির পেছনে, বাগান থাকবেদুটো কুকুর পুষবকিছুই হলো নাপেলাম কি? দশতলার ওপরে একটা ফ্ল্যাটবাড়ি
তাতে কী? অনেক সুন্দর আমাদের ঘরনদী দেখা যায়, ওপারের গ্রাম দেখা যায়টাকা-পয়সার অভাব নেই, পাখি পুষছি, টবে ফুল আছে, দরকার হলে আরও লাগাবতিন-তিনটি এত ভালো মেয়ে আছে আমাদেরসুখেই তো আছি আমরা
তুমি যা-ই বলো, আমার মনে বড় দুঃখ,’ ছেলেটি জবাব দিল
ডাক্তারের কাছে গেল সেমানসিক রোগের চিকিসক
আমার মনে বড় দুঃখ,’ ছেলেটি বলল
কেন?’ ডাক্তারের কণ্ঠে সহানুভূতির সুর
মনে করেছিলাম বড় হয়ে অ্যাডভেঞ্চারার হবহলাম ওষুধের ব্যবসায়ীটাকমাথা, তার ওপর ল্যাংড়া!
এই বয়সে অনেকের মাথায়ই চুল থাকে নাল্যাংড়া বলল কে? হাঁটেন তো ঠিকইক্রাচ লাগে নাআর ওষুধের ব্যবসা, এ তো ভালো কাজঅসুস্থ মানুষের সেবা করছেন
ডাক্তারের কথা পছন্দ হলো না ছেলেটিরমুখ বেজার করে বেরিয়ে এল
আমার মনে বড় দুঃখ,’ নিজের ম্যানেজারকে একদিন বলল ছেলেটি
কেন, স্যার?’
আমি চেয়েছিলাম লাল রঙের একটা ফেরারি গাড়ি কিনবউদ্দাম জীবন যাপন করবকিছুই হলো নারোজ শেভ করে, গোসল করে, টেবিলে বসে নাশতা খেয়ে রিকশায় করে অফিসে আসতে হয়
ভালোই তো, স্যার? কটা লোক এমন সুযোগ পায়কতজনে তো রিকশায়ও চড়তে পারে নাবাসে বাদুড়ঝোলা হয়ে প্রাণটা হাতে নিয়ে চলাফেরা করে, অফিসের দেরি হয়, বসের বকা শোনেআপনার ওসব কিছুই করতে হয় নাওরা টিফিন ক্যারিয়ারে করে আনা ঠান্ডা ভাত খায়, আপনি দামি রেস্টুরেন্টে গিয়ে লাঞ্চ খান…
ম্যানেজারের কথা ভালো লাগল না ছেলেটিরবলল, ‘যান, কাজ করুনগে
ছেলেটির মামা শিক্ষকতা করেনতাঁর কাছে গিয়ে বলল, ‘মামা, আমার মনে বড়ই দুঃখ
কেন রে?’ অবাক হলেন মামা
আমি চেয়েছিলাম, আমার তিন ছেলে হবেএকজন বিজ্ঞানী হবে, একজন পলিটিশিয়ান, আরেকজন খেলোয়াড়হলো তিনটি মেয়েছোটটি হাঁটতেও পারে না
তাতে কী? তিনজনই সুন্দরী, বুদ্ধিমতীএকজন ডাক্তার হয়েছে, একজন টিচার, আরেকজন গায়িকাখারাপটা কোথায়? কজনের এ রকম হয়?’
নাহ্, কেউ তার কথা বুঝতে পারে না, বুঝতে চায় না! বিরক্ত হয়ে চলে এল ছেলেটিদুঃখ বেড়েই চলল তারযতই ভাবে জীবনটা বিফলে গেল, ততই আরও বাড়ে দুঃখ, আরও, আরওঅসুস্থ হয়ে শেষে বিছানাতেই পড়ে গেলহাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো তাকেস্যালাইন দেওয়া হলো, রোগ নির্ণয়ে যেসব যন্ত্রপাতি ব্যবহার করলেন ডাক্তাররা, তার কয়েকটি ছেলেটারই সরবরাহ করা
অসুস্থ হয়ে আরও বিষণ্ন হয়ে গেছে ছেলেটিমনের কষ্ট তার অপরিসীমপরিবার-পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এসে ঘিরে থাকে বিছানার পাশেতার মন খারাপ দেখে ওদেরও মন খারাপকেউই বুঝতে পারে না কী হয়েছে তার
গভীর রাতে হাসপাতাল যখন নীরব, ছেলেটি কেবিনে একা, ঘর অন্ধকার, এই সময় আবার দেখা দিলেন ছেলেবেলার সেই দরবেশছেলেটি জিজ্ঞেস করল, ‘কেন এসেছেন?’
তোমাকে দেখতে
আমাকে দেখে আর কী হবে? আমি শেষ হয়ে গেছিছেলেবেলায় অনেক আশা করে আপনার কাছে কয়েকটা জিনিস চেয়েছিলামমনে আছে?’
আছেখুব সুন্দর স্বপ্ন ছিল তোমার
ইচ্ছে করলে কি আপনি আমাকে ওসব জিনিস পাইয়ে দিতে পারতেন না?’
পারতাম
তাহলে দিলেন না কেন?’
আমি চেয়েছিলাম যেসব জিনিসের স্বপ্ন তুমি দেখো না ওসব দিয়েই তোমাকে সুখ দিতেঅনেক কিছুই তো দেওয়া হয়েছে তোমাকে: সুন্দরী স্ত্রী, স্ত্রীর প্রেম, ভালো ব্যবসা, আরামে থাকার মতো একটা বাড়ি, তিনটে চমকার মেয়ে…
বাধা দিয়ে ছেলেটি বলল, ‘কিন্তু আমি ভেবেছিলাম যা যা চাইব ঠিক তা-ই দেবেন
আর আমি ভেবেছিলাম আল্লাহকে তুমি ঠিক তা-ই দেবে তিনি যা চান
আল্লাহ আমার কাছে কী চান?’ ভেবে পায় না ছেলেটি, আল্লাহ তার মতো একজন সাধারণ মানুষের কাছে কী চাইতে পারেন? কী দিতে পারে সে?
আল্লাহ চান, তিনি যা দিয়েছেন তা-ই নিয়ে সন্তুষ্ট থাকোসুখের প্রচুর উপকরণ দিয়েছেন তিনি তোমাকে, চেষ্টা আর ইচ্ছে থাকলে সেসব নিয়ে সুখে থাকতে পারো
অন্ধকারে সারাটা রাত জেগে রইল ছেলেটি, শুয়ে শুয়ে ভাবলদুঃখ ভুলে গেলসুখে কী করে থাকতে হয় বুঝে গেছেপরদিন সকালে ডাক্তাররা এসে দেখেন রাতারাতি অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে রোগীরপরিজনের মুখে আবার হাসি ফুটলভালো হয়ে বাড়ি ফিরে এল সেআবার অফিসে যাতায়াত শুরু করল
স্ত্রীর বাদামি চোখকেই এখন প্রচণ্ড ভালোবাসে ছেলেটি, রান্না খেয়ে তৃপ্ত হয়, দেয়ালে ঝোলানো ছবির দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়মেয়ের গান শোনেতোতাটাকে খাবার খাওয়ায়, ফুলগাছের মরাপাতা ছেঁটে দেয়গভীর রাতে খোলা জানালায় বসে তাকিয়ে থাকে নদীর দিকেঅন্ধকার রাতে দেখে আকাশে তারার মিটিমিটি, দেখে শেষরাতের হেলে যাওয়া ক্ষয়া চাঁদপাশে শোয়া ঘুমন্ত স্ত্রীর নিঃশ্বাসের শব্দকে মনে হয় সংগীতআহ্, জীবন বড়ই মধুর, বড়ই সুখের, ভাবে ছেলেটিভাবে, তার মানে এত দিনে সত্যিকারের প্রেমে পড়েছি আমি

 

শেয়ার করুন